জালালুদ্দীন রুমি ও শামস তাবরিজি

Jun 03, 2019 02:27 pm
জালালুদ্দীন রুমি

 

জালালুদ্দীন রুমি পাশ্চাত্যের পাঠকদের কাছে এত জনপ্রিয় ও খ্যাতির অধিকারী হয়ে উঠেছেন যে, তাঁকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। রুমির সাথে পরিচিত হয়ে ওঠা যে কেউ কমপক্ষে তাঁর সঙ্গী তাবরিজের শামস আদ-দীনের নাম জানেন। দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক কতটা নিবিড় থাকলে হিউস্টন স্মিথের মতো পণ্ডিত তার ‘হোয়াই রিলিজিয়ন ম্যাটারস’ গ্রন্থে শামসের জন্য রুমির ভালোবাসাকে একটি বাক্যে বিট্রিসের জন্য দান্তের ভালোবাসার তুলনা করেছেন। রুমির কবিতায় শামসের কথা বারবার এসেছে এবং তার বিবরণী ও পরবর্তী সাহিত্যেও শামস সম্পর্কে উল্লেখ পর্যাপ্ত। কিন্তু শুরু থেকেই তাদের প্রকৃত সম্পর্কের ধরন প্রায় প্রত্যেককেই বিস্মিত করে। যিনি প্রচলিত সব বিচার-বিশ্লেষণে একজন মহান ও সফল বিদ্বজ্জন- হঠাৎ তাঁকে ঐতিহ্য ও রীতিপ্রথা দ্বারা পরিচালিত একটি সমাজের অনুমোদনের জন্য নিক্ষেপ করা হলে বিষয়টিকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করব? তা ছাড়া আমরা প্রায় সুনির্দিষ্টভাবে এমন কারো সাথে জড়িয়ে ফেলতে শুরু করি, যাকে দৃশ্যত ইতরজন বলে মনে হয়। শামস কী ধরনের ব্যক্তি ছিলেন, যিনি একজন ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, কবি এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষকের ওপর এত গভীর প্রভাব ফেলতে পারেন? রুমি সম্পর্কে যারা লিখেছেন, তার পুত্র ও মুরিদদের থেকে শুরু করে সবাই কী ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। আমরা যা শুনিনি তাহলো- কাহিনী সম্পর্কে শামসের নিজস্ব ব্যাখ্যা।

রুমিই শামসকে কল্পতুল্য বাতাবরণ দিয়েছেন। রুমির দীর্ঘতম কাজ তাঁর ২৫ হাজার লাইনবিশিষ্ট ছয় খণ্ডের আধ্যাত্মিক মহাকাব্য ‘মসনবি’ নয়; বরং তাঁর ৪০ হাজার লাইনের কবিতা সঙ্কলন, তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রেমের কবিতা, যা ‘দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি’ নামে পরিচিত। যদিও প্রেমের এই বিশাল স্তবগ্রন্থ শামসের নাম ধারণ করে আছে, কিন্তু কেউই কখনো ভাবেননি যে, তিনি এই কবিতাগুলোর রচয়িতা। রুমি স্বয়ং নিজেকে শামসের মাঝে বিলীন করেছেন এবং তাঁকে ভক্তি প্রদর্শনের প্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত বস্তুতে পরিণত করেছেন। ‘দিওয়ান-ই শামস’ ইশ্বরের জন্য প্রেম সম্পর্কিত; কিন্তু প্রেমের যাতনা ও আনন্দকে রুমি যেভাবে বর্ণনা করেছেন, সেখানে শামস একজন মানুষ মাত্র নন, অথবা নবীদের মতো কোনো পথপ্রদর্শকও নন; বরং তিনি প্রকৃতপক্ষে সত্যিকার প্রেমিকের জীবন্ত প্রতিমূর্তি, যিনি স্বয়ং ইশ্বর।

‘দিওয়ান’ বা কবিতা সঙ্কলনটি ‘শামস’-এর নামে, কারণ রুমি তিন হাজার ২০০ গজলের প্রায় এক তৃতীয়াংশ তাঁর নামে লিখেছেন এবং বাকিগুলোতে তাঁর নাম নেই। অবশ্য কিছু সংখ্যক ভিন্ন কিছু নামে আছে, যেমন; তাঁর অনুসারী সালাহ আদ-দীন। ফারসি গজলে একজন কবি প্রচলিত প্রথানুসারে গজল বা কবিতার শেষ লাইনে নিজের নাম উল্লেখ করেন। বেশির ভাগ কবি যেমন- শেখ সাদী এবং হাফিজ- তাদের ছদ্মনাম বা কলমী-নামে পরিচিত; তাদের ব্যক্তিগত নামে নয়। ‘দিওয়ান’ এ দ্রুত চোখ বুলালে কোনো পাঠককে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে যে, শামস স্বয়ং কবিতাগুলো লিখেছেন, কারণ শেষ লাইনগুলোতে তাঁর নামই রয়েছে। রুমির জীবন ও তাঁর কবিতায় শামসের ভূমিকা সম্পর্কে ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে ভালো বিশ্লেষণ করেছেন ফ্র্যাঙ্কলিন লুই। তিনি তাঁর গ্রন্থ ‘রুমি : পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট, ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’-এর দীর্ঘ একটি অধ্যায়ে এ সম্পর্কিত বিবরণ দিয়েছেন। ফারসিতে লেখা শামসের বক্তব্যের বিবরণ ‘মাকালাত’ অথবা ‘সংলাপ’-এর দিকে মনোযোগী হতে হবে, যা অনেকটা তাঁর আত্মজীবনীর মতো।

জালালুদ্দীন রুমি ১২০৭ সালের বর্তমান আফগানিস্তানের বলখে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বাহা ওয়ালাদ একজন মহান ধর্মপ্রচারক ও শায়খ ছিলেন। আরবি ‘শায়খ’ শব্দের অর্থ ‘প্রবীণ’ বা বয়োবৃদ্ধ (এর সমার্থক ফারসি শব্দ হচ্ছে ‘পীর’) এবং শিক্ষার অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সম্মান দেয়ার জন্য এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুফিবাদ হিসেবে পরিচিত আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে আধ্যাত্মিক নির্দেশ করা মুরশিদের জন্য এটি সম্মানজনক একটি পদবি। বাহা ওয়ালাদ কুরআন, হাদিস, শরিয়াহ, ফিকাহ ও ধর্মতত্তের মতো বহির্বিজ্ঞান এবং সুফিবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতীকী সংলাপ ও আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্বের মতো অন্তর্বিজ্ঞানের শায়খ ছিলেন।

পূর্বদিক থেকে মোঙ্গলরা যখন ধীরে ধীরে বলখের দিকে এগিয়ে আসছিল, বাহা ওয়ালাদ তখন তাঁর পরিবার নিয়ে পশ্চিমের দিকে চলে যান এবং একপর্যায়ে আনাতোলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি শিক্ষক হিসেবে সবার শ্রদ্ধাভাজন হন। তাঁর ছেলে জালালুদ্দীন তাঁরই নির্দেশনা অনুসরণ করে বহির্বিজ্ঞান ও অন্তর্বিজ্ঞান- উভয় ধরনের শিক্ষা অর্জন করেন। ১২৩১ সালে বাহা ওয়ালাদের মৃত্যুর সময়ের মধ্যে রুমি কোনিয়ায় শিক্ষা দান ও ধর্ম প্রচারণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্য ও বাগ্মিতা বহু লোককে তাঁর সান্নিধ্যে নিয়ে আসে এবং খুব শিগগিরই তিনি নগরীতে সবচেয়ে পরিচিত শায়খের একজনে পরিণত হন, যদিও তখন তিনি ছিলেন মাত্র বিশোর্ধ বয়সী। ধর্মীয় বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তাঁকে মানসম্মত সম্বোধন ‘মাওলানা’ বা ‘আমাদের মনিব’ হিসেবে ডাকা হতো। একপর্যায়ে তাঁর ক্ষেত্রে এই সম্বোধন তাঁর নামের সাথে যুক্ত না করেই বলা হতে থাকে, যা রুমি নিজেই উল্লেখ করেছেন। এভাবে তাঁর সাথে সুফিবাদের যে ধারা জড়িত হয়ে পড়ে, সেটিকে ‘মাওলাওয়ি’ বলা হয়, (তুর্কিতে গবাষবার), যার অর্থ ‘আমাদের মনিবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

১২৪৪ সালের ১১ অক্টোবর তাবরিজের শামস আদ-দীন কোনিয়ায় আসেন। ‘মাওলাওয়ি’ তরিকাপন্থীরা এই তারিখটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছে, তারিখটির বিশেষ তাৎপর্য আছে বলে। তাঁর সম্পর্কে প্রাপ্ত বিবরণী থেকে জানা যায়, তখন তাঁর বয়স ৬০ বছর এবং রুমির বয়স ৩৭ বছর। রুমিকে বাজারে দেখে শামস তাঁর কাছে বিখ্যাত সুফি আবু ইয়াজিদ বাস্তামির খানকার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান। বাস্তামি ঘোষণা করেছিলেন, ‘সকল ঐশ্বর্য আমার! আমার আলখিল্লায় আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই!’ শামস বলেন, কী করে এটা বলা সম্ভব, যেখানে স্বয়ং নবী মুহাম্মদ নিজেকে শুধু ‘আল্লাহর সেবক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন? এ প্রশ্ন শুনে রুমি একটি অবস্থার (হাল) মধ্যে চলে যান, যাকে অন্যভাবে বলা যেতে পারে, আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে তাঁর মধ্যে জ্ঞান ও সচেতনতার যে প্রবাহ আসে, তা তাঁকে নিমগ্ন করে।

রুমির জন্য এটি ছিল প্রথম দর্শনেই প্রেম। তিনি শামসের প্রতি সম্পূর্ণ নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। তিনি তাঁর শিক্ষকতার কর্তব্য এড়িয়ে নিজেকে ‘সামা’ অর্থাৎ সঙ্গীত ও কাব্য শ্রবণ এবং এর সাথে নৃত্যের মধ্যে নিজেকে মগ্ন করে ফেলেন। এই আচরণ ও পরিবর্তন তাঁর অনুসারীদের নিদারুণ ব্যথিত করে। কারণ সবার শ্রদ্ধাভাজন একজন শিক্ষকের জন্য এসব ছিল বেমানান, অসঙ্গতিপূর্ণ এবং ভক্তদের অনেকে তাঁর কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ করেন। কিন্তু রুমি তাদের আপত্তি আমলে নেননি। দুই বছর পর দৃশ্যত রুমির ভক্তদের হিংসা ও শত্রুতার কারণে শামস কোনিয়া ছেড়ে চলে যান। রুমি অনেকটা উন্মাদের মতো হয়ে পড়েন। শামসের অনুসন্ধান করতে ছেলে সুলতান ওয়ালাদকে পাঠান দামেস্কে। সুলতান ওয়ালাদ শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুঁজে পান আলেপ্পোয়। তাঁকে কোনিয়ায় ফিরে আসার জন্য পীড়াপীড়ি করেন এবং তিনি ফিরে আসার পর শামস ও রুমি কয়েক মাস পর্যন্ত একত্রে কাটান। এরপর ১২৪৭ সালে শামস নিরুদ্দেশ হন। রুমি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন তার অন্তর্ধানে এবং কয়েক বছর অত্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থায় কাটিয়ে পুনরায় তাঁর সাথে সাক্ষাতের আশা ছেড়ে দেন। ‘সামা’র আশ্রয় নেন রুমি এবং এ সময়েই তাঁর মধ্যে বিরাট এক রূপান্তর ঘটে যায়, যা তাঁকে ফারসি ভাষার সেরা কবিতে পরিণত করে।

এই সংক্ষিপ্ত বিবরণী অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে এবং শামস সম্পর্কে অসংখ্য কাহিনী আরো অনেক প্রশ্নের কারণ হয়ে আছে। মহান ব্যক্তিদের জীবনী রচয়িতা ও পণ্ডিতেরা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বেশ চেষ্টা করেছেন। যেমন- শামসের কী ঘটল? আসলে কেউই জানেন না। বরং পরবর্তী সময়ের একটি তথ্যে জানা যায়, রুমির প্রতিহিংসাপরায়ণ ভক্তরা তাঁর ছেলে আলাউদ্দিনের সাথে যোগসাজশ করে শামসকে হত্যা করেছে। আলাউদ্দিনের কাছ থেকে রুমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, বিশেষত শামসের অন্তর্ধানের পর। যারা এই কাহিনী বিশ্বাস করে, তারা কোনিয়ায় শামসের কবর চিহ্নিত করেছে, যেটি রুমির কবর থেকে খুব দূরে নয়। অন্যেরা দাবি করেন, শামস ১২৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন এবং ইরানের খুয়ে নামক স্থানে একটি কবরকে শামসের কবর বলে সেখানকার লোকজন শতশত বছর ধরে জানে। ইসলামী দুনিয়ার অন্যান্য স্থানেও কোনো কোনো সমাধিকে তাঁর দেহাবশেষের শেষ আশ্রয় বলে বিশ্বাস করা হয়; যা থেকে তাঁর মতো প্রবাদতুল্য ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে। আবার অনেকে যুক্তি দেখিয়েছেন, শামসকে হত্যা করা হয়েছে এমন তথ্যের পক্ষে কোথাও পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না।

কিন্তু তাঁকে যদি হত্যা না করা হয়ে থাকে, তা হলে তিনি সহসা চলে গেলেন কেন এবং কেনই বা আর ফিরে এলেন না? তাঁর নিজের কথা থেকে উদ্দেশ্য নির্ণায়ক কিছু জানার ক্ষেত্রে সহাবস্থা পাওয়া যেতে পারে। এটা স্পষ্ট যে, প্রেমের বস্তু থেকে বিচ্ছিন্নতাকে তিনি আধ্যাত্মিক পরিপক্বতা আনার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। একাধিক ক্ষেত্রে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, রুমিকে ছেড়ে যাওয়াই ভালো, কারণ রুমি তখনো তাঁর কাছ থেকে পুরো জ্ঞান আহরণের সুবিধা গ্রহণের মতো পরিপক্বতা অর্জন করেননি। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলেছেন, তিনি আলেপ্পোতে চলে গিয়েছিলেন; কারণ বিচ্ছেদ দ্বারা দগ্ধ হওয়ার প্রয়োজন ছিল রুমির। তিনি যখন ফিরে আসেন তখন বিচ্ছেদের ফল ছিল সুস্পষ্ট। কারণ রুমি তাঁর কাছ থেকে অনেক বেশি সুবিধা অর্থাৎ শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন : ‘এই মিলনের একটি মাত্র দিন আগের মিলনের এক বছরের সমান।’

রুমি হয়তো শামসের ভূমিকার প্রসঙ্গ একটি বিখ্যাত লাইনে উল্লেখ করেছেন, যা ইরানের বিদ্বজ্জনেরা প্রায়ই তাঁর প্রসঙ্গে উচ্চারণ করেন : আমার জীবনের ফল তিনটি শব্দের বেশি নয় আমি অপরিপক্ব ছিলাম, আমি সেদ্ধ হই, আমি দগ্ধ হই।’

শামস সম্ভবত রুমিকে এ কারণে ছেড়ে যান যে, তিনি সেদ্ধ হয়েছেন এবং তাঁর দগ্ধ হওয়া প্রয়োজন। নিঃসন্দেহে এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, রুমির বয়স তখন ৪০ বছর, আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা অর্জনের উত্তম সময়। আমরা দেখতে পাই, শামস বেশ ক’বার বলেছেন যে, নবী মুহাম্মদ সা: যখন ৪০ বছর বয়সে উন্নীত হন, তখনই কথা বলতে শুরু করেন... যা যিশুখ্রিষ্টের সম্পূর্ণ বিপরীত, যিনি দোলনায় থাকতেই কথা বলেন। শামস এটিকে বিবেচনা করেছেন নবী মুহাম্মদ সা:-এর পরিপূর্ণতা অর্জনের লক্ষণ হিসেবে। এর মাঝেই শামস এক মহাজাগতিক তাৎপর্য দেখতে পেয়েছেন এবং সব ঘটনায় তা প্রতিভাত হয়েছে। তিনি বলেছেন, তাঁর কোনিয়ায় আগমনের একমাত্র কারণ ছিল রুমির মধ্যে শুদ্ধতা আনা। অতএব তাঁর অন্তর্ধান হওয়াকে তাঁর কর্তব্য সম্পন্ন হওয়ার সূচক হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তা ছাড়া, শামস আমাদের বারবার বলেছেন, আল্লাহর প্রিয় দরবেশরা সবসময় আড়ালে বিরাজ করেছেন এবং তিনি তাঁর আধ্যাত্মিকতা অন্য লোকজন থেকে গোপন রাখার চেষ্টার কথাও বলেছেন। দ্বিতীয়বার কোনিয়া ত্যাগ করার পর সম্ভবত তিনি নিজেকে আড়াল করেই রেখেছিলেন: এমনকি তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, তিনি এবং রুমি এতটা উন্মুক্ত ছিলেন : ‘আমরা দু’জন চমৎকার মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিলাম। আমাদের মতো দু’জন লোক কত দীর্ঘ সময় পর মিলিত হয়েছি। আমরা সুস্পষ্টভাবেই উন্মুক্ত এবং প্রতীয়মান।’

রুমির ভক্তদের কাছে শামস কেন এতটা বিদ্বেষের পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন? প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী জানা যায়, রুমির ভক্তদের বিদ্বেষী হয়ে ওঠার বিভিন্ন কারণের একটি ছিল শামসের আগমনের আগে রুমি তাদের সাথে সময় কাটাতেন, কিন্তু শামসের আগমনে তিনি অধিকাংশ সময় কাটান তাঁর সাথে। আসলে শামস রুমির সাথে প্রচুর সময় ব্যয় করলেও এমন প্রমাণ পাওয়া যায়, শামস শুধু রুমির বৃত্তেই কাটাননি, বরং অন্যান্য সুফি ও বিদ্বজ্জনের সাথেও কাটিয়েছেন। তবে তাঁকে নিয়ে রুমির বৃত্তের সদস্যদের দ্বন্দ্ব এড়ানোর মতো সহজাত সৌজন্যমূলক আচরণে অভ্যস্ত হওয়ার মতো ধৈর্য্য শামসের ছিল না। লোকজন সম্পর্কে তিনি কী ভাবেন তা তাদের খোলামেলা বলে ফেলতেন। তাঁর বিচার-বিবেচনা ছিল অনেকটা রূঢ় এবং সম্ভবত সেটিই তাঁর বৈশিষ্ট্য ছিল। বেশির ভাগ মানুষই চায় না যে কেউ তাদের মূর্খ, আহম্মক বলুক; বিশেষ করে তা যদি সরাসরি ও তীক্ষ্ম ভাষায় বলা হয়, যা শামস বলতেন। তিনি এ কথাও বলতেন যে, তাদের সম্পর্কে আসলেই তিনি যা ভাবেন তা বলা থেকে বিরত রয়েছেন। তিনি যদি তার মনের কথা বলতেন, তা হলে তারা তাঁকে কোনিয়া থেকে বিতাড়িত করত। একটি লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আমি যদি সত্য বলতাম, তাহলে এই মাদরাসার সবাই আমার জীবনের পেছনে লাগত, কিন্তু তোমরা কোনো কিছু করতে সক্ষম নও। এই ক্ষতি তোমাদের কাছেই ফিরে আসবে। তোমরা চাইলে চেষ্টা করতে পারো।’

পরবর্তী সময়ের সাহিত্যে শামস সম্পর্কে যেসব কাহিনী ও কথা বলা হয়েছে সেগুলোতে প্রায় ক্ষেত্রেই তাঁকে আধ্যাত্মিকতার প্রতিভাহীন, কেতাবি শিক্ষার প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ এবং ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ হিসেবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে পাঠ ও আলোচনায় দেখা যায়, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। শামস কুরআন পুরোটাই মুখস্ত করেছিলেন এবং শিক্ষকতা করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি ‘ফিকাহ’ বা ইসলামী শরিয়াহর ওপর শিক্ষা গ্রহণ করেন, এমনকি কোনিয়ায় তাঁর সময় অতিবাহিত করেছেন ইসলামী আইনবিদদের সাহচর্যে। শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পণ্ডিত ও বিদ্বজ্জনেরা কী বলেন তা শেখার জন্য তিনি তাদের সাথে বসতেন। দর্শনের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল বলে মনে হয়, যদিও দর্শনচর্চাকারীদের অনেককে তিনি ভর্ৎসনা করতেন। এটা নিশ্চিত, যারা নামে মাত্র শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং উলেমারা পাণ্ডিতের যে ভান করতেন; অর্থাৎ এ ধরনের ব্যক্তি, যারা মসজিদ ও মাদরাসায় শিক্ষা দিতেন, তাদের ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর দৃষ্টিতে এ ধরনের লোকজন তাদের পদ ও সম্মানের সাথে বেঈমানি ও প্রতারণা করছেন; কারণ তারা আল্লাহকে অন্বেষণের পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষাকে জীবিকা অর্জনের কাজে লাগাচ্ছেন।

শামস ও রুমি উভয়ের মতে, জ্ঞানার্জনের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর পথ অনুসন্ধান করা, যিনি নিরঙ্কুশ ও প্রকৃত সত্য (হক্ক)। ছাত্র ও জ্ঞান অন্বেষণকারীদের উচিত উপলব্ধি (তাহক্কিক) লাভ, যা একজনকে আল্লাহর বাস্তবতা জানতে এবং কোনো বস্তু বাস্তবে ও সত্যিকার অর্থে কেমন ঠিক সেভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। যারা নিজেদের হৃদয় দিয়ে সত্য আবিষ্কার না করে শুধু অন্যের কথা মুখস্ত করে শামস প্রায়ই তাদের সমালোচনা করতেন। আল্লাহর পথে যদিও এ ধরনের অনুকরণ (তাক্কলিদ) প্রথম পর্যায়ে আবশ্যক, কিন্তু তা অবশ্যই কাটিয়ে উঠতে হবে। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত না নিজেকে জানতে পারে অথবা যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহকে মুখোমুখি দেখতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষা শুধু সহায়ক উপকরণ। তাদের অবশ্যই এমন একটি পর্যায়ে উপনীত হতে হবে, যেখানে তারা এই সহায়ক উপকরণটি ছুঁড়ে ফেলে দেবে, কিন্তু তা এ জন্য নয় যে, অনুকরণ করে জ্ঞানের সত্য সম্পর্কে তারা যে শিক্ষা অর্জন করেছে, তা অস্বীকার করে নয়, বরং তাদের নিজেদের মধ্যে সত্য খুঁজে বের করার মাধ্যমে। যতদিন পর্যন্ত তাদের কোনো সহায়ক উপকরণের প্রয়োজন পড়বে, ততদিন পর্যন্ত তারা কোনো বস্তু সত্যিকার অর্থে কেমন তা জানতে পারবে না। তারা নবীর নিবেদনের উত্তর এখনো পায়নি, যা তিনি বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, কোন বস্তু কেমন, তা ঠিক সেভাবে আমাদের প্রদর্শন করো।’

রুমি কী কারণে শামসকে কার্যত একটি ঐশ্বরিক মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন? শামসের মাঝে তিনি কী দেখেছিলেন? এর একটি সাধারণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় প্রেমিক-প্রেমিকা লায়লা ও মজনুর কাহিনী থেকে। শুধু মজনুর দৃষ্টি ছিল লায়লার সৌন্দর্য দেখার। শুধু রুমি তাঁর চোখে শামসের মাঝে আধ্যাত্মিক সত্তা দেখতে পেয়েছিলেন। উপদেশ বা সংলাপ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, রুমি যে একাই শামসের ঐশ্বরিক আবহ সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন তা নয়, স্বয়ং শামস আমাদের বারবার তার মহিমান্বিত মর্যাদার কথা বলেছেন এবং তা এমনভাবে বলেছেন, যাতে আমরা ধারণা করতে পারি, তাঁর ব্যবহৃত শব্দের পেছনে কী আছে; যদিও সেসব শব্দ যারা শুনেছে তাদের বেশির ভাগই কদর্থ করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রুমির মতো একজন তীক্ষ্ম ও সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী সহচরকে আহাম্মকে পরিণত করা সহজ নয়।

একটি ঐতিহাসিক বিষয়ের ওপর উল্লেখ করা আবশ্যক; তা হলো- শামসের সমসাময়িক বিখ্যাত এক ব্যক্তি ছিলেন মহীউদ্দিন ইবন-আরাবি, যিনি ১২৪০ সালে দামেস্কে মারা যান। শামস তাঁর ‘সংলাপ’ এ দু’জন ব্যক্তির (রুমি ছাড়া) প্রসঙ্গ অন্য কারো চেয়ে বেশি উল্লেখ করেছেন। একজন শিহাব হারিওয়া, যাকে তিনি শিহাব নিশাবুরি বলেছেন। শামস দামেস্কে শিহাবের সাথে আলোচনায় উপস্থিত থাকতেন। তিনি তাঁকে একজন দার্শনিক বলে বিবেচনা করতেন। তিনি বলেছেন, বড় বড় সব পণ্ডিত তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে এসেছেন; কিন্তু ওই সময়ে সবচেয়ে খ্যাতিমান দার্শনিককেও কোনো গুরুত্ব দেননি। শায়খ মুহাম্মদ দ্বিতীয় ব্যক্তি, যার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর প্রসঙ্গে এক বর্ণনায় তিনি বলেছেন, ‘ইবন আরারি এখন দামেস্কে।’ এটা আশা করা যৌক্তিক যে, শামস যদি নগরীর পণ্ডিত ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাত করে থাকেন তা হলে অবশ্যই ইবন আরাবির সাহচর্যেও এসেছেন। শায়খ মুহাম্মদকে শামস বলতেন ‘একটি পর্বত’, যা পরবর্তী সময়ে ইবন আরাবিকে ‘সেরা শিক্ষক’ পদবিতে ভূষিত করেছে। এ থেকে ধারণা করা যেতে পারে, আসলে তিনিই ছিলেন বিখ্যাত ‘ইবন আরাবি’। শামসের কর্মের ফারসি ভাষার সঙ্কলক মোহাম্মদ আলী মোবাহহেদ অনেকটাই নিশ্চিত, শায়খ মুহাম্মদ এবং ইবন আরাবি একই ব্যক্তি ছিলেন। মোবাহহেদ শায়খ মুহাম্মদকে ইবন আরাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিস্তারিত দলিল উপস্থাপন করেছেন। তবে প্রাথমিক সময়ে ইবন আরাবির মধ্যে মৌলভিদের বৈশিষ্ট্য থাকায় অনেকেই তাঁর প্রতি বিতৃষ্ণা দেখিয়েছেন। সে জন্য শামস বলেছেন, শায়খ মুহাম্মদ যদিও একটি পর্বত, কিন্তু মাওলানার (রুমি) পাশে তিনি ‘মুক্তার পাশে নুড়িপাথরের মতো।’

শামসের দৃষ্টিতে মহত্বের লক্ষণ কী? তিনি বারবার বলেছেন, বড় বড় দরবেশরা থাকেন অন্তরালে এবং রুমির ভূমিকাকে তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। একটি বর্ণনায় তিনি মন্তব্য করেছেন- তাঁর নিজ নগরী তাবরিজের অনেক মানুষের কাছে তিনি কিছুই ছিলেন না; ‘সেখানে যারা ছিল তাদের কাছে আমি ছিলাম নগণ্য। তারা আমাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেছে; আমি ভাসতে ভাসতে সাগরের তীরে উপনীত হয়েছি। আমি যদি এমন একজন মানুষ হই- তা হলে তারা কেমন?’

রুমির সাহিত্য ও অনুবাদ

রুমির পাণ্ডিত্যপূর্ণ সাহিত্যের মধ্যে ‘উপদেশাবলি’ বা ‘সংলাপ’ এর অস্তিত্ব দীর্ঘ দিন থেকে স্বীকৃত। যদিও বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল তুরস্কে এবং সেগুলো বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময়জুড়ে প্রায় অজ্ঞাতই ছিল এবং বিশেষ করে এগুলোর পাঠোদ্ধার করা ছিল কঠিন। ১৯৭০ সালে একটি খণ্ডিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় তেহরানে এবং মোহাম্মদ আলী মোবাহহেদের বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ১৯৭৭ সালের আগ পর্যন্ত একই নগরীতে একটি সুগ্রন্থিত সংস্করণ প্রকাশিত হতে পারেনি। এটি দুই খণ্ডে প্রকাশিত। পাশ্চাত্যের গবেষকদের মধ্যে শুধু লুই রুমির ‘সংলাপ’ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। শামস সম্পর্কিত অধ্যায়ে তিনি বিবরণীতে উল্লেখকৃত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং কিছু সংক্ষিপ্ত অধ্যায় অনুবাদ করে শামস ও রুমির মধ্যে সম্পর্কের ওপরও আলোকপাত করেছেন।

ইতোমধ্যে যা গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয়েছে তার ভিত্তিতে বলা যায় ‘সংলাপ’ কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়। রুমির ‘সংলাপ’ সম্পর্কে যে বিষয়টি স্মরণ রাখা প্রয়োজন তা হলো, এটি শামস রচনা করেননি; বরং রুমির ঘনিষ্ঠ মহলের এক বা একাধিক ব্যক্তি এই কাজটি করেছেন, যখন শামস রুমির উপস্থিতিতে কথা বলতেন। এই আলাপচারিতার পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করা হয়েছে; কিন্তু সেগুলো কখনো চূড়ান্ত রূপ দেয়ার জন্য সম্পাদনা করা হয়নি।

জে আরবেরি রুমির ‘ফিহি মা ফিহি’ অনুবাদ করেছেন ‘রুমির সংলাপ’ হিসেবে, যা অনেকটা অসম্পাদিত বিবরণীর মতো। এটি রুমির এক বা একাধিক শ্রোতা কর্তৃক ধারণকৃত তার কথামালার সংগ্রহ। এরপর এগুলো সম্পাদনা করা হয় এবং পরিষ্কারভাবে লেখা হয়। এমন হওয়াই স্বাভাবিক যে, গুছিয়ে লেখার পর তা রুমিকে দেখানো হয়েছে, এরপর তিনি এগুলো মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অনুমোদন করেছেন। রুমির পাঠকরা তা গ্রহণ করেছেন এবং পাঠ করেছেন মুগ্ধতা নিয়ে, পাঠকের সে মুগ্ধতা এখনো কাটেনি।