মিথুন শিল্পকর্ম : মন্দির থেকে ক্যান্ভাসে

Jun 20, 2019 03:13 pm
মিথুন শিল্পকর্ম : মন্দির থেকে ক্যান্ভাসে

 

ভারতবর্ষে প্রাচীন শিল্পকর্মের নিদর্শন খুঁজতে গেলে অজন্তা, যুগিমারা, বাঘ, নাসিক, কার্লে ইত্যাদি প্রাচীন গুহাগুলোতে অনুসন্ধান করতে হয়। এমনকি নালন্দা ও সোমপুর বিহারেও তার খোঁজ করা যেতে পারে। আর্টহিস্টোরি সাক্ষ্য দেয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৮-৩২০ অব্দের মধ্যে ভারতবর্ষের স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্প যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেছিল, যার প্রমাণ অজন্তার ঊনত্রিশটি গুহা। এর মধ্যে আটটি গুহায় এখনো রয়েছে বহু মূর্তি, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার নিদর্শন। ভারতের নালন্দা এবং বাংলাদেশের সোমপুর বিহারেও প্রচীন শিল্পকর্মের সন্ধান মেলে অতি সহজেই। এসব স্থানেও মিথুন শিল্পকর্মের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। মিথুন শিল্পকর্মের নিদর্শন উল্লেখ করতে গেলে উল্লেখ করতে হয় মোহেঞ্জোদারোর মাতৃকা, লৌরীয় নন্দগড়ের স্বর্ণপুত্তলী, ভারহুত ও সাঁচীর চোলাকুকাদেবতা ও বৃক্ষকা, মথুরার অশোকতুরুতে পদাঘাতকারিণী তরুণী, কার্লে গুহার দম্পত্তি, সোমপুর বিহার বা পাহাড়পুরের রাধাকৃঞ্চ মূর্তি, খীচিং এর সুখাসনে উপবিষ্ট হরপার্বতী ইত্যাদি শিল্পকর্মগুলো। এই শিল্পকর্মগুলো প্রাচীন মিথুনশিল্পকর্ম চর্চার প্রয়াস।

মিথুন হচ্ছে নারী-পূরুষের একত্রে, যুগল। (হংসমিথুন)। স্ত্রী-পূরুষ মিলন বা সংযোগ; স্ত্রীসংসর্গ। রাশি চক্রের একটি নাম ‘মিথুন রাশি’। তবে স্ত্রীসংসর্গের দৃশ্য ধারণ করে যে শিল্পকর্ম তৈরি হয় তাই মিথুন শিল্পকর্ম। সংস্কৃত ভাষায় যাকে বলা হয় ‘স্ত্রীপুংসয়োর্যুগ্মম্’ অর্থাৎ কামবাসনা চরিচার্থ করার নিমিত্তে নর-নারীর যুগলশিল্পকর্ম মাত্রই মিথুন। আর একটু পরিষ্কার করে বলা যেতে পারে যে, নারীপুরুষ একত্রে এক াথে পাশাপাাশ দাঁড়ানো বা উপবিষ্ট; পরস্পর হস্ত নিবদ্ধ বা আলিঙ্গনাবদ্ধ; পুরুষমূর্তির কোলে উপবিষ্ট স্ত্রীমূর্তি; নারী দেহের কাঁধে, বাহুতে, নিতম্বে বা স্তনে হস্ত নিবদ্ধ; রতিক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি। এ সব আবেগীয় দৃশ্যাবলিকেই মিথুন বলা হয়ে থাকে।

মিথুনের যাত্রা কবে কোথায় কিভাবে প্রথম শুরু হয়েছিল তার কোনো পরিষ্কার তথ্য আজোবধি পাওয়া যায় না। তবে অজন্তার ১৯ নম্বর গুহার চিত্রে নারী পরিবেষ্টিত ও ললিতাসনে উপবিষ্ট নাগরাজ, খণ্ডগিরির গণেশ, গুমফায় রিলিফ-এ উৎকীর্ণ দুই স্ত্রীর সঙ্গে উপবিষ্ট লীলারত অভিজাত পুরুষ, দেওগড়ের মন্দির স্তম্ভে ও প্রবেশদ্বারে উৎকীর্ণ যুগলমূর্তি, ভুবনেশ্বরে পরশুরামেশ্বর মন্দিরে দৃঢ় আলিঙ্গনাবদ্ধ মহারাজ, লীলাসনে উপবিষ্ট হরপার্বতী, পালসেন পর্বে পোড়ামাটিতে তৈরি হরগৌরী, কোণারকের সূর্যমন্দির ও খাজুরাহোর কন্দরীয় মহাদেব মন্দিরের দেওয়ালে উৎকীর্ণ রতিক্রিয়ায় নিমগ্ন যুগলশিল্পকর্মসমূহ ভারতবর্ষের মিথুন দৃশ্যের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এই শিল্পকর্মসমূহ ঠিক কত খ্রিষ্টাব্দে রচিত হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।

ভারতবর্ষের শিল্পকলাতে মিথুন বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত রূপ লাভ করেছে। ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত মিথুন ছিল নর-নারীর পরস্পর সন্নিবদ্ধ ভঙ্গির রূপায়ণ। সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে রূপায়িত হয়েছে দৃঢ় আলিঙ্গনাবদ্ধ ভঙ্গিতে। যেমন ইলোরায় উমার সামনে নৃত্যরত শিব এবং আলিঙ্গনাবদ্ধ যুগল প্রেমিক-প্রেমিকা, এলিফান্টার নব বর-বধূ শিব-পার্বতী এবং অজন্তার একাধিক শিল্পকর্ম। এসব শিল্পকর্মে মিথুন বিকশিত হয়েছে। নবম শতাব্দীর শেষভাগ থেকে মন্দির গাত্রে রতিক্রিয়ার দৃশ্য সম্বলিত মিথুন চিত্র ও ভাস্কর্য খচিত হতে দেখা যায়। নবম শতক থেকে একেবারে মোঘল শাসন অবধি ভারতবর্ষের মন্দিরগাত্রে মিথুন উৎকীর্ণ হয়ে এসেছে এবং বিস্তার লাভ করেছে মানব-মানবীর যৌন জীবনের দৃশ্যাবলিরূপে। বলা যায় সে সময়ে ভারতীয় সমাজে মন্দিরের গায়ে যৌনদৃশ্য উৎকীর্ণ করা একপ্রকার প্রথাতে পরিণত হয়েছিল। মোটামুটিভাবে ষোড়শ শতাব্দী থেকে বিজয়নগর শিল্পপর্বের অবসানের মধ্য দিয়ে মন্দিরগাত্রে মিথুন বা যৌনদৃশ্য অঙ্কন করার প্রথা খানিকটা হ্রাস পেতে শুরু করে। উত্তর ভারতে মোগল সম্রাটদের শিল্পরসানুভূতি ভারতীয় সমাজের উচ্চস্তরে সংক্রামিত হওয়ায় এই শিল্পধারা পরিবর্তনের অন্যতম কারণ বলেই শিল্পগবেষকগণ অনুমান করেন। অনেকেই মিথুন শিল্পকর্মকে বিকৃত, বিকলাঙ্গ, কলঙ্কিত ও সুরুচিবহির্ভূত বলে মনে করেছেন। এই ধারাটির সমালোচনাও হয়েছে প্রচুর। খোদ হিন্দু পণ্ডিতগণও মিথুনকে দেবতাদের মর্যাদাহানীকর শিল্পকর্ম হিসেবে এর অবলুপ্তি চেয়েছেন। তবুও মিথুন শিল্পকর্ম বাংলাদেশের শিল্পকলাতে আর্টকালচারের নামে বেশ শক্তভাবেই এখনো বাংলাদেশী শিল্পী-কলা-কুশলীদের চেতনায় লালিত-পালিত হয়ে শিল্পসংস্কৃতিতে একটা জায়গা করে নিয়েছে।

কিভাবে হিন্দু রীতি-নীতি বিবর্জিত মিথুন শিল্পকর্মের ধারাটি ভারতীয় সমাজে অনুপ্রবেশ করল তা-ও আবার ধর্মের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান মন্দিরগাত্রে তার ফিরিস্তিও অনেকের অজানা নয়। অনেকেই মনে করে থাকেন, মধ্যযুগের এক তমাসাচ্ছন্ন সময়ে হিন্দুধর্মের প্রকৃত কল্যাণ, নীতি, ধ্যান-ধারণা সমাজের স্বার্থপর উচ্ছৃঙ্খল সমাজপতি দিয়ে পরিচালিত হতো এবং সে সময় ধর্মীয় বন্ধন শিথিল হয়ে আসছিল। সেজন্য সমাজের চারিদিকে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ছড়িয়ে পড়েছিল। গবেষকগণ মনে করেন, ব্রাহ্মণ ও সাধু রাজন্যবর্গের কৃপালাভের প্রত্যাশায় তাদের উচ্ছৃঙ্খল মানসিক ব্যাধিকে সমর্থন করে নানাবিধ ধর্মীয় রক্ষাকবচের ব্যবস্থা করত ভক্তগণ। ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক অপধর্মের আবরণে সমাজে নারীজাতি অত্যন্ত নির্যাতিত জীবনযাপনে বাধ্য ছিল [শ্রীকৃঞ্চলাল দাস-শিল্প ও শিল্পী ]। সে জন্যেই মন্দিরে দেবদাসী প্রথার উদ্ভব অতিব সহজ হয়েছিল।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে মন্দিরগাত্রে মিথুন উৎকীর্ণের ইতিবৃত্ত সত্যিই জীবনচর্চার এক করুণ প্রয়াস। দাসপ্রথার মতো সুন্দরী মেয়েদের ধর্মের অজুহাতে মন্দিরে আকর্ষণ করা হতো। বাইরের জগত থেকে এসব মেয়েরা আলাদা হয়ে মন্দিরের ভেতরে নৃত্য ও সঙ্গীত শিক্ষকের কাছে কামকলার সর্ববিধ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত এবং মন্দিরের ব্রাহ্মণগণ ছিলেন সেইসব সুন্দরী ললনাদের অনৈতিক প্রহরী। এসব ললনা মেয়েদেরই বলা হতো দেবদাসী। এরা মন্দির অভ্যন্তরে নৃত্যগীত ও পূজার সাহায্যকারিণী হিসেবে বসবাস করত। দেবতা যেমন প্রত্যক্ষভাবে নিবেদিত নৈবেদ্য, ভোজ্য, পানীয় গ্রহণ করেন না, সবই গ্রহণ করেন ভক্তরা, তেমনি দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত দেবদাসীদেরকে মনে করা হতো দেবপূজার ফল বা প্রসাদ। এই প্রসাদের ওপর অধিকার সম্পূর্ণরূপে ভক্তজনদের। সেজন্য মন্দির থেকে প্রসাদ ক্রয় করতে হয়। এই প্রসাদ বিক্রির অর্থ মন্দিরের আয়ের একটি চমৎকার ধর্মীয় ব্যবস্থা হয়ে উঠেছিল। প্রসাদ সমতুল্য এসব দেবদাসীরা ছিল সমাজের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বিনোদনের সামগ্রী। সে সময়ে দেবতার প্রণামী, প্রসাদ বিক্রির অর্থ এবং দেবদাসীদের দেহ বিক্রির উপার্জন ইত্যাদি অর্থ দিয়ে মন্দিরগুলোর সংস্কার করা হতো। একসময়ে রাজশক্তির পতন হলে মন্দিরগুলো ব্রাহ্মণ ও দুষ্কৃতকারীদের করায়াত্তে চলে আসে এবং সেই সাথে নানাবিধ কারণে ধীরে ধীরে মন্দিরের প্রতি জনসাধারণের আগ্রহ কমতে থাকে। সেই সাথে মন্দিরস্থ দেবদাসীগণের খদ্দেরও কমতে থাকে। এ অবস্থার সৃষ্টি হলে দেবদাসীরা খদ্দেরের খোঁজে আশপাশের স্থানে সাধারণ লোকের মনোরঞ্জনের জন্য বসতি স্থাপন করে নেয়। এভাবেই শুরু হয় ভারতবর্ষে পতিতাবৃত্তির বিস্তৃতি। অর্থাৎ মন্দির গাত্রে মিথুন উৎকীর্ণের অন্যতম কারণ হলো ভক্তদের যৌন আবেগকে উজ্জীবিত করে দেবদাসীদের দেহপসারণের মাধ্যমে মন্দিরের আয়-উপার্জন বৃদ্ধি করা।

মন্দির গাত্রে মিথুন উৎকীর্ণ করার আরেকটা অন্যতম উদ্দেশ্যও অনেকেই ব্যাখ্যা করে থাকেন আর তা হলো, ঈশ্বরের সান্নিধ্য পেতে হলে কিছু পরীক্ষার দ্বারা চিত্তের শুদ্ধি অর্জন করতে হয়। দেবমন্দিরে প্রবেশের পূর্বে জগতের নানা রকমের সত্যদৃশ্য অবলোকনকরতঃ মনের গোপনতম পাপ ও অভিলাসকে অতিক্রম করা। যারা এই গোপন অভিলাসকে অবজ্ঞা করতে পারবে তারা দেবতার সান্নিধ্য লাভের উপযুক্ত হবেন। এভাবে আত্মশুদ্ধির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যেই মন্দিরগাত্রে মিথুন শিল্পকর্ম উৎকীর্ণ করা হয়েছে বলে মতো পাওয়া যায়। আসঙ্গ, বিত্ত ও যশ; এই তিন প্রকার চাহিদাই মানুষের সর্ববিধ কর্মপ্রয়াসের নিয়ন্ত্রক। যদি আসঙ্গ লিপ্সাকে পাপ মনে করা হয় তবে সেই পাপের প্রলোভনকে উপেক্ষা করে মন্দিরে প্রবশ করতে হবে। তাহলেই ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে। আর ঈশ্বর সামিপ্যে যে আনন্দ পাওয়া যায় তা বাইরের পৃথিবীর সহস্র লক্ষভাগের একভাগও মানুষকে পরিতৃপ্তি দিতে পারে না। কাজেই চিত্তশুদ্ধি না হলে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছা যায় না। এই দর্শন থেকেই মন্দির গাত্রে মিথুন অঙ্কিত হয়েছিল। শিল্পবিশ্লেষক হ্যাভেন বলেন, এই রীতিটির ধারা দাক্ষিণাত্য থেকেই প্রথম শুরু হয়েছিল।

এখন আর মন্দিরগাত্রে মিথুন চর্চা দেখা যায় না। মিথুন চর্চা যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এমনও বলা যায় না। শিল্পীর ক্যানভাসে মিথুন আজও জিইয়ে রয়েছে। অনেক শিল্পীই রঙ-তুলি, হাতুড়ি-বাটালের দ্বারা মিথুন তৈরিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সে কারণে মিথুন মন্দির গাত্র থেকে কিছু মানুষের বসার ঘরে প্রবেশ করেছে এবং ড্রয়িংরুমের শোপিসে ও দেওয়ালে প্রদর্শিত হচ্ছে। জাদুঘরগুলোতেও ইতিহাস-ঐতিহ্যের নামে সর্বসাধারণের জন্য এমন যৌন আবেদনময় চিত্র ও ভাস্কর্য থরে থরে সাজিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব দেখে জাদুঘর দর্শনার্থীগণ কখনো কখনো নিজেদের মূল্যবোধের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকেন। কখনো মনে আসে আমরা কি সেই মধ্যযুগেই পড়ে রয়েছি? অনেকেই মিথুন শিল্পকর্মকে পর্নোগ্রাফির পর্যায়ে ফেলবার কথা ভাবছেন। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইনে বলা হয়েছে যৌন আবেদনময় কোনো ছবি, পোস্টার, ভিউকার্ড প্রদর্শন; যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযুক্ত অপরাধ। তার পরও মিউজিয়ামে, চিত্র আয়োজনে, ড্রয়িংরুমে, বাজারের দেওয়ালে, সিনেমার পোস্টারে কিংবা শিল্পীর ক্যানভাসে মিথুনের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।