অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে ব্যয় ৮২ কোটি থেকে বেড়ে ৯০৫ কোটি টাকায়

Jul 08, 2019 04:56 pm
অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে ব্যয় ৮২ কোটি থেকে বেড়ে ৯০৫ কোটি টাকায়

 

ব্যয়ের লাগাম ধরে রাখা যাচ্ছে না উন্নয়ন প্রকল্পে। অনুমোদিত ব্যয়ে বেশির ভাগ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যার কারণে প্রতি বছরই সরকারকে বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প প্রথম পর্যায়ের ব্যয় দু’লাফেই আকাশচুম্বী। প্রায় ৮২ কোটি টাকার অনুমোদিত ব্যয় এখন ৯০৫ কোটি ৩১ লাখ ৮৮ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। যেখানে ৩০ মাসে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল তা এখন ৮ বছরে ঠেকেছে। পাঁচ বছর চার মাসে অগ্রগতি ৩০.৩১ শতাংশ। আর ১১টি জায়গায় বাস্তবায়নের অনুমোদন থাকলেও তা বাস্তবে হচ্ছে ২টি জায়গায় বলে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ। দ্রুত উন্নয়নশীল বাংলাদেশের উন্নয়নের এই গতিকে ত্বরান্বিত করতে দ্রুত শিল্পায়ন অবশ্যই জরুরি। বেজার মাধ্যমে নেয়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প প্রথম পর্যায় ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন করা হয়। তখন প্রকল্পের কার্যক্রম ছিল দেশের ১১টি উপজেলায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চল করা। আর অঞ্চলগুলো হলো, মিরসরাই, আনোয়ারা, টেকনাফ, জালিয়ার দ্বীপ, সোনাগাজী, কেরানীগঞ্জ, মংলা, মৌলভীবাজার, চুনারুঘাট, সোনারগাঁও ও নারায়ণগঞ্জ বন্দর। এই ১১টি অঞ্চলের জন্য মোট ২৪ হাজার ৪৬১ একর জমির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একবার ব্যয় বাড়িয়ে ১২২ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় উন্নীত করেও নির্ধারিত ৩০ মাস মেয়াদে প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। পাঁচ বছর ৪ মাসে ব্যয় হয়েছে ৩০.৩১ শতাংশ অর্থ বা ৩৭৮ কোটি ৮ লাখ ২১ হাজার টাকা।

চলতি বছরের জুনের সরেজমিন তথ্যানুযায়ী, দেশের সার্বিক সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী বিস্তৃত বিভিন্ন অঞ্চলে বহুমুখী শিল্প কারখানার প্রসার ঘটানো, দেশের জনসাধারণের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি এবং ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিল্পায়নের প্রসার ঘটাতেই এই প্রকল্প। কিন্তু প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে কচ্ছপগতিতে। প্রকল্পের ব্যয় এক হাজার ৫ শতাংশ বাড়লেও বতর্মানে কাজ হচ্ছে দু’টি জায়গাতে। সোনাগাজী ও মিরসরাইয়ে। মিরসরাই ও সোনাগাজী অর্থনৈতিক অঞ্চলটি ঘিরে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা কিছুটা অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছে। প্রকল্প অঞ্চলে পশুপালন ও মাছ সংগ্রহ করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করত, যা এখন সম্ভব হচ্ছে না। আবার শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ দ্রুত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ যথাসময়ে প্রদান, খাসজমির বাইরে জমি অধিগ্রহণ না করা এবং তাড়াতাড়ি রাস্তার মেরামত শেষ করা দরকার।
পাঁচ বছর চার মাসে কাজের মূল্যায়নে দেখা যায়, মোংলায় ভূমি উন্নয়নসহ ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মোংলাতে ভূমি উন্নয়নের পর পিপিপি মডেলে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। মিরসরাই জোন-১ ভূমি উন্নয়নসহ অন্যান্য কাজ করে পিপিপি ডেভেলপারকে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সোনাগাজী অঞ্চলে ভূমি উন্নয়নকাজ চলমান আছে। মিরসরাই ও সোনাগাজীতে ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলমান। অন্য ৮টি অঞ্চলে এ প্রকল্পের আওতায় কোনো কাজ হয়নি। বেজা নিজ উদ্যোগে অন্য জায়গায় কাজ করছে। এ দিকে মোংলাতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। জুলাই ২০১৯ সালের পর এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে বলে বেজা জানিয়েছে।

ব্যয়ের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ক্রয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রাক্কলন ও প্রকৃত অবস্থায় কিছু ব্যত্যয় হয়েছে। বিশেষ করে ভৌত পরিমাণ ও সময় নির্ধারণে। প্যাকেজ নম্বর বেজা ডব্লিউডি ১২০১ এর প্রাক্কলিত ও প্রকৃত অবস্থায় ভিন্নতা পাওয়া গেছে। প্রাক্কলন করা হয়েছিল শুধু ১৮ লাখ ৬১ হাজার ৭০১ ঘনমিটার মাটি ভরাট করা হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ৯৩৮.৫০ একর মাটি ভরাটের সাথে ৭.৭ কিলোমিটার বাঁধ চুক্তি দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাড়ে ৩৩ কোটি টাকার স্থলে চুক্তি হয়েছে ৩২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকার। প্যাকেজ নম্বর বেজা ডব্লিউডি ১৩০৮ এর প্রাক্কলন ছিল না। কিন্তু ৪৭৬ একর মাটি ভরাটের চুক্তি দেয়া হয়েছে। প্যাকেজের সংখ্যা মূল ও সংশোধিততে ৮৬টির স্থলে ২৯টি বাস্তব করা হয়েছে।
আইএমইডি বলছে, অনেক বড় কাজ অতিসাম্প্রতিককালে শুরু হয়েছে। ফলে ২০১৪ সালে প্রকল্প শুরুর সময় থেকে অগ্রগতি কিছুটা ধীর মনে হলেও দ্বিতীয় সংশোধনীর পরের সময়ে যথেষ্ট ভালো অগ্রগতি। প্রকল্পের মূল কাজ মাটি ভরাট ও ড্রেজিং। এটিতে চাইনিজ ঠিকাদার কোম্পানির কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক। তবে রাস্তা ও ভবন নির্মাণে নিয়োজিত কিছু ঠিকাদার শিডিউল অনুযায়ী পিছিয়ে আছে। দু’বার প্রকল্পের আর্থিক আয়তন ব্যাপক বাড়ানো হলেও সে অনুযায়ী লোকবল বৃদ্ধি পায়নি। ৩৪ জন দিয়ে কাজ চলছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো নিয়োগ দেয়া হয়নি। প্রত্যন্ত সমুদ্রতীরে অনেক বড় কাজ যেমন, সুপার ডাইক নির্মাণ করা হচ্ছে। ওই এলাকায় পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়ক নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের কাজ চলছে। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের সাথে সংযোগ সড়কটির কাজও সবার আগে সম্পন্ন করা উচিত ছিল। যার জন্য সামগ্রিক কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। ১১টি এলাকায় যেখানে ৯০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪ হাজার ৪৬১ একর জমি উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, সেখানে মাত্র ১৬০৫ একর এলাকায় কাজ করা হচ্ছে। কাজের খরচের ব্যাপারে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সম্ভবত যথাযথ ছিল না।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরনো প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর টানতে গিয়ে সরকারকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারকে বড় করতে হচ্ছে। প্রকল্প সংশোধন অর্থই হচ্ছে লাফিয়ে ব্যয় বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি অনুমোদনের ১৭ মাস পর প্রথম সংশোধন করা হয়। তার ৫ মাস পর আবার দ্বিতীয় সংশোধন করা হয়।