হুমায়ূন আহমেদ : যাকে নিয়ে গৌরব করা যায়

Jul 17, 2019 02:01 pm
হুমায়ূন আহমেদ

 

একজন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি নেই আজ পৃথিবীর কোথাও। কোনো আনন্দ অথবা বিষাদের ভুবনে মিলবে না তার দেখা। জোসনার মায়াবী রাতের দুধসাদা সুন্দর দেখার আলো তার চোখ থেকে হারিয়েছে চিরকালের তরে। জোসনা পাগল এ মানুষটি আজীবন হৃদয়ের শাসন মেনেই জেগেছিলেন পৃথিবীতে। হৃদয়রাজ্যের সব আনন্দ বেদনা ও বিরহের দহনকে আপনার রাজ্যের করে তুলেছিলেন। এ রাজ্য তার একান্ত। তার নিজস্ব। তারই বৈভবের বিশাল রাজত্ব। জীবনকে উদযাপন করার আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে এসেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। সে উদযাপন অনুভূতির সবটাই হাজির করেছেন তার সুবিশাল রচনা সম্ভারে। ঢেলে দিয়েছেন পাঠকের হৃদয়ে। এভাবে রচিত হয়েছে হুমায়ূন জগৎ।
হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের সেই লেখক যাকে ঈর্ষা করা যায়। যাকে নিয়ে গৌরব করা যায়। যাকে বলা যায় হ্যাঁ তিনি আমার ভাষার লেখক। তিনি আমার সমাজের লেখক। তাকে জন্ম দিয়েছে আমার ভূগোল। আমার বাংলাদেশ। তিনি আমার জাতিরই এক অনন্য সন্তান। তাকে দেখার আনন্দ আছে। তাকে পাঠের আনন্দ আছে। তাকে অনুভব করার আনন্দও কম নয়। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সাহিত্যের এক আশ্চর্য প্রদীপ। যার আলোয় তিনি দীপ্ত করেছেন আমাদের তারুণ্যের ভুবন।

হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় লেখক। শুধু কি জনপ্রিয়? তুমুল জনপ্রিয়। জনপ্রিয়তা সাহিত্যের মানদণ্ড নয়। হ্যাঁ সত্যি। কিন্তু জনপ্রিয় কি খুব সস্তা? ইচ্ছে করলেই কি জনপ্রিয় হওয়া যায়? জনপ্রিয় সাহিত্য যে সস্তা সাহিত্য নয় হুমায়ূন সাহিত্যই এর বড় উপমা।
একজন লেখক যা লেখেন তার সবই সেরা এ কথা বলা যাবে না। কিন্তু এ কথা দ্বিধাহীন বলা চলে যিনি শ্রেষ্ঠ কিছু লিখেছেন তার মৃত্যু নেই। হুমায়ূন আহমেদ এমন মৃত্যুহীন রচনার স্রষ্টা। তিনি আপাদমস্তক একজন লেখক। আমাদের দেশে প্রায় সব লেখকের দৃষ্টি ডানে বাঁয়ে বেঁকে গেছে, যায়। এ ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ ব্যতিক্রমী এক প্রাজ্ঞজন। তার দৃষ্টি ছিল কেবলই সম্মুখ পানে প্রসারিত। দিগন্তজোড়া আনন্দ ধ্বনির দেশে। যেখানে আছে মানুষ। যেখানে আছে গ্রামীণ জনপদের দুঃখ বেদনার ঘানি। যেখানে আছে ঐতিহ্যের কল্লোল। তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। কোনো মতবাদের মানদণ্ডে কাউকে বিচার করেননি। ফলে তার সাহিত্য তার রচনা পাঠককে আকণ্ঠ জড়িয়ে নিয়েছে। তাকে নন্দিত করেছে পাঠক। বইমেলায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে একটি বই সংগ্রহ করার আশ্চর্য দৃশ্য তো সবার জানা। কেউ কেউ একে নিন্দাও করেছেন। বলেছেন, সস্তা লেখা বলে এ দশা। আসলে কি তাই? সস্তা লিখলেই যদি জনপ্রিয় হওয়া যায় তবে আর কেউ নেই কেনো হুমায়ূনের মতো? তাহলে কি আমাদের দেশে সস্তা লেখক নেই?

হুমায়ূন আহমেদ যা বিশ্বাস করতেন তাই লিখতেন। সাথে ছিল তার অসাধারণ কল্পনার মিশেল। কল্পনায় জীবনকে কখনো হিমুর মতো নিয়মহীন দেখেছেন। কখনো মিসির আলীর মতো যৌক্তিক। তিনি নিজের আনন্দে লিখেছেন। কিন্তু তার আনন্দ হয়ে উঠেছে সবার। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন স্বচ্ছ। সততা ছিল তার বিশেষ গুণ।

হুমায়ূন আহমেদ একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি আমাদের প্রকাশনাকে নিয়ে গেছেন শিল্পের জায়গায়। তিনি চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতির বহমান সৌন্দর্য।
মৃত্যুর মতো হিমশীতল হাত আর নেই পৃথিবীতে। এ হাত যাকে স্পর্শ করেছে একবার পৃথিবীতে তার কোনো উষ্ণতা অবশিষ্ট থাকে না। পৃথিবীর ফুল, পাখি, নদী-নক্ষত্র কিছুই তার হয়ে জাগে না। পৃথিবীতে সব প্রাণীই জন্ম নিয়েই নিশ্চিত করে একটি জিনিস তার নাম মৃত্যু। মৃত্যু মানেই অনন্ত ঘুমের পৃথিবী। সে পৃথিবীতে চলে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ। কিন্তু একটি মৃত্যু তুমুলভাবে জাগিয়ে দিলো হুমায়ূন আহমেদকে। বাংলাভাষাভাষী পাঠক চিত্তে নতুন করে জেগে উঠলেন তিনি। তার জন্য অশ্রু! তার জন্য দুঃখ! তার জন্য হাহাকার! তার জন্য ক্রন্দন। কী আশ্চর্য এমন করে তাকে গ্রহণ করেছে আমাদের পাঠক সমাজ। আমাদের নারী-পুরুষ, আমাদের তরুণ-তরুণী। কেন? কী ছিল হুমায়ূন আহমেদের? কী আছে? হ্যাঁ আছে। হুমায়ূন আহমেদের আছে বাংলাদেশ। আছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনযাপন পদ্ধতির রূপায়ণ। আছে তার নিজস্বতা, তার গল্প বলার একান্ত ঢঙ। তার বিশ্বাস, যে সমাজে তার বসত সে সমাজের ঐতিহ্য সংস্কৃতি। আর আছে জাদুকরী এক ভাষা, যা একজন পাঠককে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। যে যাই বলুন না কেন বাংলাভাষায় শিক্ষিত মানুষ মাত্রই তার কোনো না কোনো বই হাতে তুলেছেন। পড়েছেন তার গল্প। বোধকরি সব শিক্ষিত পরিবারেই হুমায়ূন আহমেদের কোনো-না-কোনা বই সংরক্ষিত রয়েছে। আজকের যে তারুণ্য এ তারুণ্যের হাতে বই তুলে দেয়া খুব সহজ কাজ নয়। এমন কঠিন কাজটি করেছেন হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদকে বিচার করতে হবে তার সামগ্রিকতা দিয়েই। তার কাল তার পরিবেশ তার সমাজ দিয়েই। কাদা ছোড়াছুড়ির নোংরা বিদ্বেষ অথবা পরশ্রীকাতরতার মতো ঘৃণ্য কোনো ত্রুটি হুমায়ূনে ছিল না। পরস্পরের দোষাদোষী খেলার ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। অসততার আশ্রয় নিয়ে দিনকে রাত করার তামাশাও করেননি তিনি। ফলে হুমায়ূন আহমেদ কুড়িয়েছেন সব শ্রেণীর মানুষের শ্রদ্ধা। পেয়েছেন ভালোবাসার মতো অমূল্য সম্পদ।

‘ও কারিগর দয়ার সাগর ওগো দয়াময়/চান্নি পসর রাইতে যেনো আমার মরণ হয়।’ পরম দয়াময়ের কাছে গানের ভাষায় এ আকুতি ছিল তার। তিনি জোসনাভরা রাতে মরেননি। কিন্তু তিনি যে জোসনার সৌন্দর্যকে মানুষের মনে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন সেই জোসনার মতো জেগে থাকবেন আমাদের সাহিত্যের আঙ্গিনায়।