স্নিগ্ধ রুদ্র বেলফাস্ট

Jul 17, 2019 02:07 pm
স্নিগ্ধ রুদ্র বেলফাস্ট

 

দেয়ালে দেয়ালে

পুরো এয়ারপোর্ট ছেয়ে আছে কফির ঘ্রাণে, তার ভেতর বাইরে দেখা যায় বৃষ্টি ইলিশগুঁড়ি। আমার দুই অপছন্দের বিষয়। অথচ এমন একটা সময়ে এখানে এসেছি যখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে অস্পষ্ট শহর। ঝাপসা ঝাপসা খুব ধূসর রঙের।
ধূসরের ভেতর সন্ধ্যা মিলিয়ে যাচ্ছিল। তড়িঘড়ি করে অতটুকু ফ্যাকাশে আলো দেখে নিলাম, ঠিক দেখে নেয়া না আসলে। শব্দটা হবে শুষে নেয়া। ইলিশগুঁড়ি রাত আরো বিচ্ছিরি।

একটা একটা করে সাঁঝবাতি জ্বলে উঠতে শুরু করেছে যতদূর দেখা যায়।
আব্বাকে দেখা যায় ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ওয়েটিং লাউঞ্জে, পাশে আম্মা। আব্বার ঘষা কাচের মতো চোখ খুঁজে দেখছে এদিক সেদিক।
দেয়াল আমার পছন্দের বিষয়। আমি যখন জন্মভূমিতে যাই তখন সবার অগোচরে আদিবাসী দেয়ালদেরকে ছুঁই। ফিসফিস করে দেয়ালেরা তখন অনেক কথা বলে। আমি না থাকায় এসব শালিখ পাখির, চড়ুই পাখির, ভাতঘুমের পর বিষণœ গ্রিল অথবা কোনো দিনের কোনো ঘন বরষার কী এলো গেলো এসব। কান পেতে শুনি আমি।
আর এখানকার দেয়ালটা, বেলফাস্টের প্রথম দেয়ালটা তখন একটু একটু করে পরিচিত হচ্ছিল। ফুল তোলা ওয়ালপেপারে মোড়ানো ঠিক এই দেয়ালটাকে পেছনে রেখে আব্বা স্কাইপ খুলে বসতেন। আমি এ প্রান্ত থেকে দেখতে পেতাম আম্মা হয়তো জগত সংসারের টুকিটাকি নিয়ে গল্প করতে করতে হুট করেই দেয়ালের পেছন থেকে হারিয়ে গেলেন।
দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে হেসে দিতেন আব্বা। বাড়ির পাশের প্রাইমার্কের, আজদার আজকের দিনের মতো বন্ধ হওয়ার সময় সন্নিকটে। শেষ ঘণ্টার ছাড় ওখানে এখন। আম্মাকে তাই হয়তো এখন আর পাওয়া যাবে না।
আমি নানা রকমের ফুলতোলা দেয়ালটাকেও ছুঁয়ে দিলাম। সবার অগোচরে; সাংসারিক কোলাহলে মিশে যেতে যেতে।

কথা
শাশুড়ি আম্মা সকালবেলার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পাশ কাটিয়ে আমায় নিয়ে পাড়া দেখাতে বেরুলেন। তিনি মিশুক স্বভাবের মানুষ। ভীষণ গল্প করতে ভালোবাসেন। আমি তার স্বপ্নে দেখা মাছেদের ঝাঁকের গল্প, ছোট্ট বাগানটায় গজিয়ে ওঠা আলু শাকের গল্প, হলুদ-মরিচ-রসুনের গল্প, আইরিশ বান্ধবী ম্যবেলের বাসার চায়ের কাপের গল্প শুনতে শুনতে নিউটাউনওয়ার্ডসের এই মহল্লা, সেই সড়ক, সাবওয়ে-ফুলের দোকান, গলির মুখের চিমনিশুদ্ধ ছাদওয়ালা বাসা, আস্ত একটা দুর্গ দেখে ফেললাম। আর কতগুলো পাহাড়ও। একটু দূরে কোথাও ওঁৎ পেতে আছে সমুদ্র। ‘নদীমুখের বালুময় চর’ যে শহরের নামের অর্থ আর সৈকত ঘেঁষে যে শহর গড়ে ওঠে সেখানে সমুদ্রের দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান স্পর্শ পাওয়া যাবেই।

আমি আর আমার শাশুড়ি আম্মা হাঁটছিলাম নিউটাউনওয়ার্ডসের অলিতে আর গলিতে। আম্মার গল্পমালার বাইরেও কানে যে টুকটাক লোকাল আইরিশ শব্দাবলি আসছিল সেগুলোকে একটু দুর্বোধ্যই মনে হচ্ছিল। নেটিভ ইংলিশ স্পিকারদেরও সময় নিয়ে রপ্ত করতে হবে এ ভাষার ভাবধারা। হেই হোয়াটাবাইট ই্য! নাও হয়ে যাচ্ছে ন্যই, আই এর অর্থ ইয়েস, ফ্লাওয়ারকে শুনতে পাচ্ছি ফ্লেওয়্যর। ডেড অন মানে নাকি গ্রেট!
আলস্টার আইরিশের কিংবা বেলফাস্ট আইরিশের কীর্তি কাহিনী নিয়ে অল্প বিস্তর যা কিছু শোনা যায় তার ছিটেফোঁটা আর ঝাপটা পেয়ে একে দুর্দান্ত প্যারামণ্ডিত ডায়লেক্টই মনে হয়েছে।

বেলফাস্টের আইরিশ আইরিশ ভাবটা দৃষ্টি আকর্ষণ করল বেশ। এখনো রাস্তাঘাট, ঘরদোর আর মানুষের ভেতর বিশ্বজনীন ব্যাপারটা ওভাবে পাওয়া যাবে না। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে গিয়ে রাস্তায় যেমন ব্রিটিশ দেখতে পাচ্ছি না- দেখতে পাচ্ছি না তাই ছটফটাচ্ছিলাম তার কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ যাকে ব্রিটিশ হিসেবে সন্দেহ করলাম, মুখ খোলার পর দেখি ফড়ফড় করে স্প্যানিশ বেরুচ্ছে। নস্যাৎ হয়ে গেল সন্দেহ।
সেদিক দিয়ে বেলফাস্ট পুরোদস্তুর আইরিশ। তেমন সচরাচর ভারতীয়, পাকিস্তানি অথবা ইস্ট ইউরোপিয়ান আদল দেখিনি। শুধু বাইলে নুয়া না হার্ডার একটা মসজিদের কাছে যাওয়ার সময় একজন বাঙালি গড়নের পান খাওয়া মুখের দেখা পেলাম বেলফাস্টে আসার পর থেকে পরিবারের বাইরে এই প্রথম। তিনি সিলোটি মাত মেতে উঠলেন,
- কিগো মিয়াসাবের বউ! ভালা নি? আফনার লগে আইন কে?

শাশুড়ি মায়ের ভাষার ব্যাপারে জড়তা কম। তিনি সাহসের সাথে আইরিশদের মোকাবেলা করেন। নোয়াখালীর মেয়ে হয়েও চমৎকার সিলেটী বোঝেন এবং বলার চেষ্টা করেন।
- জি অয় ভালা আফা, আল্লায় রাখছে। আফনে ভালা আসইন নি? আঁর লগে আঁর কইন্যাবেটি। (এইবাক্যে এসে অবশ্য নোয়াখালী আর সিলেটীর ভেতর হাল্কা ম্যাশআপ হয়ে গিয়েছে, বাট আই মাস্ট সে, ভেরী ওয়েল ট্রাই আম্মা! ডেড অন!)
শেকড়টা বড় যতন করে রাখা আছে বুড়িগঙ্গার তীরে। হাজবেন্ডের কর্মসূত্রে ডালপালাশুদ্ধ বিচরণ করছি এলবে নদীর আশপাশে, নামের আগে অদ্ভুতভাবে সবাই ফ্রাও লাগিয়ে কথা বলে। আর ল্যেগান নদীর খুব কাছে এসে হয়ে গিয়েছি কইন্যাবেটি। এই নদীগুলোর মতোই নানান গতিপথে বইতে থাকি একজন আমি।
আর একটা কথা, সিলেটী কইন্যাবেটি বলতে যেমন বুঝি পুত্রবধূ আর আইরিশ বাইলে নুয়া না হার্ডার বোধগম্য অর্থ নিউটাউনওয়ার্ডস এলাকা। এই বহুমাত্রিক কথার পৃথিবী বড় বিচিত্র।

শান্তি দেয়াল-লজ্জা দেয়াল
দেয়ালের কাজ কি? আশ্রয়? বিভাজন? অবকাশ? হয়তো সবগুলোই। আলোচনায় বেলফাস্ট এলে দেয়াল নিয়ে কথা আসে। সাংহাই পাস থেকে লোপনুরে যেমন আসে দেয়াল, মেক্সিকো ইস্যুতেও তাই, আর বার্লিনের সাথে দেয়ালের ইতিবৃত্ত তো জড়িয়ে থাকেই।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডর সঙ্ঘাতটির নাম ‘দ্য ট্রাবল’। ১৯৬০ এ শুরু হওয়া স্বাদেশিক দ্বন্দ্ব আটানব্বই এর গুড ফ্রাই ডে চুক্তির মাধ্যমে আপাতদৃষ্টিতে নিরসন হয়। দ্বন্দ্বটা মূলত ছিল নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক পদমর্যাদাকে কেন্দ্র করে, তবে ঐতিহাসিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই দ্বন্দ্ব কিছুটা ধর্মযুদ্ধেও মোড় নেয়।
সমস্যার গোড়া অবশ্য ঊনবিংশের শুরুতেই। ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যকার মতানৈক্য বাড়তে বাড়তে বড় ধরনের রাজনৈতিক গিট্টু লাগিয়ে ফেলে। তার জেরে আয়ারল্যান্ড দ্বীপটি উত্তর ও দক্ষিণ দুটো অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯২১ সালে স্বাধীন হয় দক্ষিণ আয়ারল্যান্ড। প্রটেস্ট্যান্টরা উত্তরে সংখ্যাগুরু, তাই তারা যুক্তরাজ্যের সাথে থেকে গেল।
পরবর্তী সময়ে নর্দার্ন আইরিশ ন্যাশনালিস্টরা যখন রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের মতো সার্বভৌমত্ব চাচ্ছে তখন কিছু সংখ্যক স্কটল্যান্ডীয় এবং প্রচুর সংখ্যক এই উত্তরের আলস্টার প্রোটেস্ট্যান্টরা মিলে গ্রেট ব্রিটেনের সাথেই ভীষণভাবে রয়ে যেতে চাইল। এরা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের নিরঙ্কুশ সমর্থক। এদের ইউনিয়নিস্ট/লয়ালিস্টও বলা হয়। অন্য দিকে, ন্যাশনালিস্ট বা রিপাবলিকানরা আবার ক্যাথলিক বেইজড। যার কারণে মূল সমস্যা অন্য হলেও ধর্ম মাঝখানে এসে পড়ে।
ন্যাশনালিস্ট ক্যাথলিকরা নিজেদের নানা দিক দিয়ে বৈষম্যের শিকার মনে করছিল। পদে পদে এটাও টের পাচ্ছিল যে, এই উত্তরাংশে তারা মাইনর গ্রুপ। ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী যদিও এখন পার্থক্যটা সামান্যই, ৪৮:৪৫।

যা হোক, সে সময় বৈষম্যের বিরোধিতায় আয়োজিত ক্যাম্পেইন থেকে সঙ্ঘাত তুঙ্গে ওঠে। ওদিকে লয়ালিস্ট প্রটেস্ট্যান্টরা ছিল খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ সরকারের মদদপুষ্ট। লয়ালিস্টদের সাথে দমনে যোগ দেয় সরকারের পুলিশ বাহিনী। ফলে আসে পাল্টা আঘাত। সব মিলে জটিল এক আন্তঃসাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িয়ে যায় গোটা নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডবাসী। তিন হাজারের বেশি মানুষ তিন যুগ ধরে এই দাঙ্গায় প্রাণ হারায়।
চুক্তির নাম গুড ফ্রাই ডে। এই চুক্তি মোতাবেক আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি তাদের সমরাস্ত্র ধ্বংস করে এবং ব্রিটিশ আর্মি সেনাছাউনি গোটায়। স্বাধীন আয়ারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের অংশ নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সীমান্তে কড়াকড়ি আর থাকে না। নাগরিকেরা তাদের মালসামান নিয়ে দুই ভূখণ্ডেই বিনা বাধায় যাতায়াত করতে পারবে।
ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে পিস ওয়ালস বা পিস লাইন্স নির্মিত হয় বেলফাস্ট, ডেড়ি কিংবা পোর্টাডাউনের মতো শহরগুলোয়। উদ্দেশ্য লয়ালিস্ট প্রোটেস্ট্যান্ট আর ন্যাশনালিস্ট ক্যাথলিক দেয়ালের এপার ওপার যে যার মতো থাকবে।
ক্যাথলিক প্রোটেস্ট্যান্টদের নাম ধাম, চেহারা গড়ন এমনকি চোখের অলস অথবা খ্যাপাটে দৃষ্টি নিয়েও বিভক্তির গল্প আড্ডায়-আলোচনায় উঠেই আসে। বলা হয়ে থাকে ম্যাকগিনেজ, ও’নীল এই পদবিগুলো থেকে ক্যাথলিক চেনা যায়। আবার স্মিথ-টেইলরে প্রোটেস্ট্যান্ট। তবে ব্যতিক্রমের বহু উদাহরণ পাওয়া যায়।

বেলফাস্টের পশ্চিমাংশের ফলস রোড ক্যাথলিক পাড়া কিংবা এরকম আরো বেশ কিছু পাড়ায় যেমন ফিলিস্তিনের মতো আরেক অপহৃত ভূমির আত্মকাহিনী, বঞ্চনা, স্বাধিকার আন্দোলন কেন্দ্রিক গ্রাফিতি- ম্যুরালের দেখা মিলবে তেমনি শ্যাঙ্কিল রোডের মতো প্রোটেস্ট্যান্ট পাড়াগুলোর গ্রাফিতিতে ম্যুরালে ওজঅ এর সন্ত্রাসবাদের বিভিন্ন খণ্ডচিত্র পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে রাজতন্ত্রের অখণ্ডতা, রানীর জয়গান আর সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম।

দেয়ালগুলো সাধারণত পাঁচ কিলোমিটারের মতো লম্বা হয়। কোনটায় ফটক থাকে, থাকে পুলিশি পাহারা। দিনের বেলা দেয়ালের এপার ওপার করা গেলেও রাতে ফটক হয়ে যায় বন্ধ। সুতরাং বলাই যায় সঙ্ঘাত এখানেই শেষ।
কিন্তু সেটা হয়তো খাতা কলমে। দেয়াল তৈরির শান্তি উদ্যোগকে তথাকথিত বললে কি খুব একটা ভুল হবে যখন খোদ পতাকাতেই বিভক্তি। এপার ধারণ করে সমান্তরাল সবুজ সাদা কমলা রঙ তো ওপারের বাড়ির ছাদে, পিলারের গায়ে ইউনিয়ন জ্যাক-লাল নীল আর সাদা। নবাগত হিসেবে আমি একটু কনফিউজডই হয়েছি একেক জায়গায় একেক পতাকার উড়াউড়ি অথবা দেয়ালে সেঁটে থাকা দেখে।

ছোট্ট কারণে দুই পারে শত্রুতা খুনাখুনি আজও হয়। এপাশ থেকে ছোড়া হয় পাথরের টুকরো তো ওপাশ থেকে কাচের ভাঙা বোতল।
দেয়ালগুলোকে একই সাথে লজ্জা দেয়াল বললে কি খুব ভুল হবে?

পাথরে ভাঙে ঢেউ
বেলফাস্টের নিসর্গ-সৌন্দর্য বর্ণনা করার চেষ্টা করে লাভ নেই। সাহিত্যের রঙ-ঢঙয়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে ছোটখাটো রচনা লিখতে হবে একটা। রচনা লিখতে ইচ্ছে করছে না একদম। কী থেকে কী হলো, সকাল হলো, বিকাল হলো, নীল আকাশের নীচে পথহারা পাখি হয়ে নেমে পড়লাম এগুলোও আপাতত বাদ।
বরং সরাসরি এই শহরের অন্যতম ট্যুরিস্ট আকর্ষণ দ্য জায়ান্টস কজওয়ে কি মানুষের নৈপুণ্য নাকি শক্তিশালী কোনো দৈত্যের কাজকারবার নাকি সেটা কোনো অসামান্য প্রাকৃতিক নিদর্শন সেদিকে যাবো।
ট্রিনিটি কলেজ, ডাবলিনের স্যার রিচার্ড বালকেলে একটা প্রেজন্টেশন পেপার তৈরি করলেন রয়্যাল সোসাইটিতে উপস্থাপনের জন্য। ১৬৯৩ সালের ঘটনা। সেই পেপারটিতে প্রথম উঠে আসে এরকম একটা বিচিত্র জায়গার কথা। রিচার্ড বালকেলে তার এক বছর আগে যখন ডেড়ির বিশপ ছিলেন, আবিষ্কারটা সে সময়ের যার কারণে আরো হুলস্থূল পড়ে গেল চারিদিকে, বিশেষত ধার্মিক সমাজের ভেতর।
কেউ বলছিল এটা প্রাচীন মানুষের কাজ। গাইতি, বাটালী, ছেনী নিয়ে বছরের পর বছর এই জিনিস বানিয়েছে। কারো কারো মতে, মানুষের কাজ এটা কোনো দিন হতে পারে না, এত জ্যামিতিক! এত সূক্ষ্ম!

বরং ফিন ম্যাককুল (অথবা ফিওন ম্যাক কুমহাইলকে আবার আইরিশ মিথলজিতে সুপারন্যাচারাল পাওয়ারওয়ালা বীরপুরুষ হিসেবেও পাওয়া যায়) নামের আইরিশ দৈত্য এ সব কঠিন শিলার জ্যামিতি করে গিয়েছে। তার উদ্দেশ্য ছিল পাথরের সেতু বানিয়ে ওপারের স্কটিশ দৈত্যদের সাথে মারামারি করা। তাই সে যতœ করে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে ষড়ভুজাকৃতির স্তম্ভগুলো। আবার তাকে যেন লোকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সে জন্য পাথরের দলা দিয়ে এরধহঃদং বুবং নামের স্বজাতির চোখও খোদাই করে গিয়েছে। পরিধেয় বুট জুতোর একাংশ আবার মনের ভুলে হয়তো ফেলেও রেখে গিয়েছে।
লিজেন্ড তো তারাই যারা এ ধরনের অদ্ভুত মিথের জন্ম দিতে পারে।
পরে অবশ্য ষাট মিলিয়ন বছর আগের আগ্নেয়গিরি আর তার লাভার অবিস্মরণীয় কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে যে প্রায় চল্লিশ হাজার অগ্নিগিরিজাত শিলা বা ব্যাসল্টগুলোর উৎপত্তি সেটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আকার আকৃতিগত ভিন্নতার কারণে ব্যাসল্টদের নাম আলাদা আলাদা। দ্য জায়ান্টস বুট, পাহাড়ের গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা লম্বা মোটা পাথরের পাইপের মতো দ্য জায়ান্টস অরগ্যান, দ্য জায়ান্টস গেইট, সার বাঁধা পাথরের চিমনির মতো দেখতে দ্য চিমনি স্টাক।

আব্বার নেতৃত্বে আমরা পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পর্যটক দল হেঁটে ছোট পাহাড় বেয়ে নামছিলাম। গন্তব্য সমুদ্র শরীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা পাথরের সেতু, নেমে গেছে সমুদ্রেরই কোনো গহিনে। বাস ট্যুরও নেয়া যেত। কিন্তু হালকা সোনালি রোদ তার সাথে মৃদু বাতাসের প্রশ্রয়ে আমরা পাহাড়ে পায়ের চিহ্নই রাখতে চাইলাম।

একটা একটা পাথর টপকে যখন সমুদ্র ছুঁয়ে ফেলব, এমন অবস্থা তখন হুড়মুড় করে ঢেউ আছড়ে পড়ল একদম খুব কাছে। আবার কোত্থেকে একটু ইলিশগুঁড়ি ভেল্কি দেখাতে চলে এলো। আমার তখন টয়লার্স অব দ্য সি’র গেলিয়াটের দশা হলো।
ঐব মড়বং ঃড় ঃযব ংবধঃ-ংযধঢ়বফ ৎড়পশ নু যরং যড়সব যিবৎব যব’ফ ংধাবফ ঃযব ৎবপঃড়ৎ’ং ষরভব, ধহফ ংরঃং ঃযবৎব ঃড় ধিঃপয উল্কৎঁপযবঃঃব ধহফ ঃযব ৎবপঃড়ৎ ংধরষ ড়ভভ ঃড় ঊহমষধহফ, রমহড়ৎরহম ঃযব ৎরংরহম ধিঃবৎ. ইু ঃযব ঃরসব ঃযবরৎ নড়ধঃ ফরংধঢ়ঢ়বধৎং ড়াবৎ ঃযব যড়ৎরুড়হ, ঃযব ধিঃবৎ যধং ৎরংবহ ড়াবৎ এরষষরধঃঃ’ং যবধফ. “ঘড়ঃযরহম ধিং ারংরনষব হড়ি নঁঃ ঃযব ংবধ”.
হ্যাঁ সেটাই। নাথিং ওয়াজ ভিজিবল নাও বাট দ্য সি।
সাঁকোর দোলনা
চঞ্চল আইরিশ সাগর আর গুরুগম্ভীর পাহাড়। এই দুইয়ের জটিল সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে দেখি ঝুলন্ত সেতু পাড়ি দিতে হবে। দিতেই হবে এমন না, ইচ্ছা। সফরসঙ্গী কাম গাইড হিসেবে আমাদের সাথে আমার ব্রাদার ইন ল আবরার ছিল। ঝুলন্ত সেতু পার হওয়ার ব্যাপারে তার থেকেই জানতে পারলাম। জেনে ইচ্ছে হলো পরখ করে দেখার।
জেলেদের মাছ ধরার সুবিধার্থে তৈরি হয় ক্যারেক এ রিড রোপ ব্রিজ। এই ব্রিজ তৈরিতে জেলেরা ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় নিয়েছিল। তখন অবশ্য শুধু হাতল আর বড় বড় গ্যাপে সরু কাঠের টুকরোই ছিল। পরে তারের দড়ি এবং দেবদারু গাছের ছাল বাকল থেকে বানানো সেতু পার হয়ে জেলেরা স্যামন মাছ ধরা শুরু করে। দর্শনার্থীদের জন্য অবশ্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতু। দড়ি ড্যামেজের মতো ঘটনাও ঘটেছে এখানে। রোমাঞ্চকর নড়বড়ে সাঁকোর ওপর হাঁটার সময় নিজেকে দুর্দান্ত অভিযাত্রীই মনে হচ্ছিল। অতি দুঃসাহসীরা নাক সিটকালেও অনুভূতিটি সত্য।

দেখা-অদেখার কারণ কিংবা অকারণ

১.
লারিব্যেন কুয়্যরিতে পৌঁছে দেখি মাথার ওপর মধ্য দুপুর। আমরা ছিলাম মাটি থেকে বেশ একটু উঁচুতে, জায়গাটা ছোট পাহাড়ের মতো। এখান থেকে অথৈ সবুজ আর জমাট বাঁধা নীলের বিস্তীর্ণ উপকূল দেখে সম্মোহিত হতে হয়। মাথা কেমন ঝিমঝিম করে ওঠে।
আব্বার ঘষা কাচের মতো চোখ ঊর্ধ্বাকাশে খুঁজে বেড়ায় অপার কোনো রহস্য। গুন গুন করে উঠলেন একেবারে যথার্থ আয়াতগুলো। কোন নিদর্শনকে অস্বীকার করবে মানুষ, আর কোন কোন নিদর্শনকে?
ঘোরলাগা অদ্ভুত সুন্দরে সবকিছু এত শূন্য মনে হওয়ার কারণ জানি না। গূঢ়তম বিষয় আশয়ের মাঝখানে অসম্ভব ক্ষুদ্র অস্তিত্ব নিয়ে দাঁড়ালাম।
আব্বার ইমামতিতে আমরা সর্বশক্তিমানের কাছে অবনত হলাম।

২.
ডানল্যুস ক্যাসলের মাথা দেখলাম দূর থেকে। প্রায় ক্ষয় হয়ে যাওয়া প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্ববাহী দুর্গটি বর্তমানে গেম অব থ্রোনস-এর ক্যুটিংয়ের জন্য খ্যাতিমান। দূর থেকে দেখাই সার। কাছে আর যাইনি। জিওটিপ্রেমীরা যে ক্যাসল গ্রেজয়কে চেনেন, এটাই সেটা।
৩.
আবারো হালকা জিওটি ফ্যাক্ট। থিওন গ্রেজয়ের আয়রন আইল্যান্ডে প্রত্যাবর্তনের পটভূমি ছিল বালিনটয় হারবার। সে তার বাপ ব্যেলন গ্রেজয়ের সাপোর্ট নিতে এ অঞ্চলে এসেছিল রোব স্টার্ককে সাহায্য করতে চায় বলে। বালিনটয় হারবারে আমরা গিয়েছিলাম কমবেশি তেকোনা চুনাপাথর দিয়ে বানানো বন্দরের শান্ত রূপ দেখতে। শান্ত, কারণ, সময়টা ছিল বিকেলবেলা। মোটামুটি লোকজন নেই।
জায়ান্ট কজওয়ে থেকে গাড়ি চালিয়ে যেতে বারো তেরো মিনিট লাগে সেখানে। এটাও বালিনটয় হারবারে পদধূলি দেয়ার অন্যতম কারণ।
৪.
গিয়েছিলাম টাইটানিকের কোয়ার্টারে। বেলফাস্টের আরেক পর্যটক আকর্ষণ। আইসবার্গের সাথে ধাক্কা লেগে অতিকায় কর্মযজ্ঞের ফলাফলটি তলিয়ে গেল এভাবে! ভাবা যায় না।
বেলফাস্ট হারবার, শিপইয়ার্ড আর জাদুঘরের টুকটাক দেখতে দেখতে নানারকম আনপ্রোফেশনাল গলাকে ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ ভাজতে শুনলাম।

৫.
আমি কায়রো গিয়েছি কিন্তু মমি দেখে হিপনোটাইজড হওয়ার সুযোগ পাইনি। এক পড়ন্ত দুপুরে আলস্টার মিউজিয়ামে গেলাম সপরিবারে। সেখানেই প্রথম ইজিপশিয়ান তাকাবুতি নামের মমি দেখে প্রথম হিপনোটাইজড হয়েছি। চোখের পাতা অল্প পড়েছে।

জানা যায়, তাকাবুতি একজন রানী মমি। রানী তাকাবুতির বহু বছরের পুরনো সম্ভাব্য যাপিত জীবন নিয়ে আনমনা হয়ে ভাবতে ভালো লাগছিল। কিন্তু বাকিরা এডমোন্টোসোরাস ডায়নোসরের কঙ্কাল দেখার জন্য টানাটানি করছিল। যদিও এডমোন্টোসোরাসের যাপিত জীবন নিয়ে অত আনমনে ভাবাভাবির মুড আসছিল না, তবু মিউজিয়াম বন্ধ হওয়ার তাড়া কানে আসছিল। ইলিভেন্থ আওয়ারের দেখাদেখি নামের হুড়োহুড়ি করতে হবে। হুড়োহুড়ির সিদ্ধান্তই নিতে হলো।

৬.
মার্বেল আর্ক কেইভস নামের গুহার সিরিজ দেখলাম। প্রাকৃতিক চুনাপাথরের হাজার বছরের খেলা। স্ট্যালাকটাইটের ঝাড়বাতি, গুহার দেয়ালে খনিজ এবং ক্যালসাইটের আবরণ মিলে সে এক দেখার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে বিধায় বেলফাস্টের বাংলাদেশি এক পরিবারকে সাথে নিয়ে আমরা গুহা অভিযান চালিয়েছি।

বেলফাস্ট নিয়ে লেখাপত্র এবারের মতো স্থগিত। জাস্ট দুইটা বিশেষ দ্রষ্টব্য বাকি আছে।

বিদ্র : ১. গাড়িতে ওঠামাত্র ঘুমিয়ে পড়া দোষে দুষ্ট হওয়ার কারণে বেলফাস্ট মহাসড়কের আশপাশের ল্যান্ডস্কেপ কিচ্ছু দেখা হয়নি। আব্বা একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করেছিলেন চোখ ভরে দেখার জন্য। ইঞ্জিন চলার পরপর আব্বার কাঁধে মাথা রেখে কইন্যাবেটি বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে পড়েছে।

বিদ্র : ২. লেখার মাঝামাঝিতে এসে জানিয়েছিলাম যে জায়ান্টস কজওয়েতে আমরা পাঁচ সদস্যের একটি পর্যটক দল ছিলাম যারা নিষ্ঠার সাথে পাহাড় বেয়েছে, রোমাঞ্চকর ঝুলসেতু পেরিয়েছে।
হামবুর্গে ফিরে আসার পর জানা গিয়েছিল যে ওখানে আরো একজন সদস্য লুকিয়ে ছিল। সেও সবার সাথে সব তৎপরতায় অংশ নিয়েছিল। এভাবে সে যে লুকিয়ে ছিল সেটা তার মা টের পাননি তখনো।
টের পেলে হয়তো আচানক ক্যাফেইনে বন্দিত্বের উদ্ভট বিষয়টা সানন্দে হৃদয় পেতে মেনে নিতেন।