সুখী দাম্পত্যের সাতকাহন 

Jul 18, 2019 02:44 pm
সুখী দাম্পত্যের সাতকাহন 

 

দাম্পত্য জীবনকে তুলনা করা হয় ফুলের বাগানের সাথেও। সেখানে যদি সুরভিত রঙিন ফুল ফোটে তবে তার সুবাস ছড়াবে চার দিকে। সে সুবাসে নিজেরা যেমন আদরণীয় হয় তেমনি চার পাশকেও সুখী করে তোলে। যেকোনো আবেগময় সম্পর্ক এক ধরনের বেড়ে ওঠা গাছের মতো, যা সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন প্রতিদিনের পরিচর্যা। অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে পারস্পরিক আবেগ, ভালোবাসা, আকর্ষণ, নির্ভরশীলতা এমনি এমনি বেড়ে উঠবে না। এর জন্য প্রয়োজন দু’জনের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও এর গুরুত্ব অনুধাবন!
দাম্পত্য সম্পর্ক মূলত দু’জন ব্যক্তিকে আবেগ, ভালোবাসার মাধ্যমে মানসিকভাবে যুক্ত করে। সম্পর্কের ভালোবাসা আমাদের যোগ্যতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী করে। অন্যের কাছে প্রাধান্য, যেকোনো প্রয়োজনে পাশে পাওয়ার নিশ্চয়তা, সঙ্গীর জীবনে নিজের গুরুত্ব আমাদের শুধু আনন্দিতই করে না; আমাদের মনে এক গভীর নিরাপত্তাবোধ দেয়, উদ্বেগ কমায়, জীবনের ছোট-বড় নানা সমস্যা মোকাবেলা করা সহজ করে। ইতিবাচক দাম্পত্যে ব্যক্তিকে উজ্জীবিত ও জীবনমুখী করে, কর্মস্পৃহা বাড়ায়। আর এজন্যই সুখী সুন্দর দাম্পত্য সবারই কাম্য।

ইতিবাচক দাম্পত্যে করণীয়
সময় দিন : প্রতিদিন ‘অল্প’ হলেও শুধু দু’জনের জন্য কিছুটা সময় রাখুন। এ সময়ে পরস্পরের সঙ্গ উপভোগের চেষ্টা করুন, মজা করুন, পরস্পরের খোঁজখবর নিন, তার সারা দিনের কর্মব্যস্ততা ইত্যাদি নিয়ে পারলে কথা বলুন, গল্প করুন। অল্প সময়ের জন্য হলেও সঙ্গীর নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ এবং প্রাধান্য নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে সাহায্য করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
প্রশংসা করুন : প্রতিদিন ছোটখাটো নানা ভালো কাজে প্রশংসা করুন। অন্যের প্রশংসা বা স্বীকৃতি আমাদের উৎসাহিত করা ছাড়াও আমাদের ভালো দিকগুলোর প্রতি যে সঙ্গী মনোযোগী তা প্রমাণ করে। সফল এবং সুখী দাম্পত্য জীবনের চাবিকাঠি সঙ্গীকে সাদরে গ্রহণ করা। তাই যেকোনো ভালো কাজের জন্য একে অন্যকে ধন্যবাদ বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা সঙ্গীদের ধন্যবাদ জানান, তার কাজের প্রশংসা করেন, তাদের দাম্পত্য জীবন অনেক স্বস্তির আনন্দময়।
ছোট ছোট কথাই জীবনের অনেক বড় সমস্যার সমাধান করে দেয়। সঙ্গীকে আপনার আরো কাছে নিয়ে আসে। দিনের অবসর সময়ে ছোট একটা মেসেজ করে দিন। বিনা কারণেই খোঁজ নিন তার। এতে স্পেশ্যাল ফিল করবে আপনার প্রিয় মানুষটি।
সম্মান করুন : গুণগত সম্পর্কের অন্যতম নির্ধারক পারস্পরিক সম্মান। আচরণ, কথায়, অন্যের কাছে প্রকাশে সঙ্গীর আত্মসম্মানের দিক খেয়াল রাখুন। বিয়ের আগে বাড়ির লোকের সাথে রাগ দেখিয়েছেন বলে বিয়ের পরেও সেটা করবেন, তা কিন্তু ঠিক নয়। ধীরে ধীরে স্বভাবে পরিবর্তন আনুন। সম্মান দিন একে অপরকে।
বেড়াতে যান : কর্মব্যস্ততা থাকলেও সপ্তাহে অন্তত একবেলা আপনার সঙ্গীর জন্য রাখুন। একসাথে বাইরে বের হন, ঘুরুন, একসাথে ভালো লাগার কিছু উপভোগ করুন। একান্তে কাটানো এ সময় সমস্যা নিয়ে কথা না বলে ইতিবাচক বিষয় নিয়ে কথা বলুন। ছোট ছোট এ ধরনের অভ্যাস সম্পর্কে বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করে, ক্লান্তি দূর করে।


কৌশলী হন : অযথা প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বা মনের মধ্যে না পুষে সরাসরি করে কথা বলুন। এমনভাবে বলবেন না, যাতে অপর পক্ষ চ্যালেঞ্জ বোধ করে বা নিজেকে ছোট মনে করে। প্রয়োজনে সঙ্গীর ব্যক্তিত্বে কিছু সীমাবদ্ধতা যা খুব একটা পরিবর্তন করতে পারবেন না, সেটা গ্রহণ করুন। সে ক্ষেত্রে তার ভালো বিষয়গুলো এবং সম্পর্কের শক্তিশালী দিকগুলো বেশি করে মাথায় রাখুন।
খোলামেলা কথা বলুন : ভালোবাসা, সততা, স্বচ্ছতা, বিশ্বাস, দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে দাঁড়ানো সম্পর্ক পরস্পরকে যে নির্ভরতা দেয় এবং যেভাবে নির্ভার করে সেটা দীর্ঘ জীবনের পথ চলার নানা জটিলতা অনেক সহজ করে দেয়। পরস্পরের সাথে খোলামেলাভাবে কথা বলা, রসবোধ রাখা, নিজের মতামতের বাইরে অন্যের মতামত গ্রহণ করার মানসিকতা রাখুন।
সম্পর্কে বন্ধুত্ব : দাম্পত্যে বন্ধুত্ব যোগ হলে এর স্থায়িত্ব বাড়ে। কাজেই পরিবার, শৈশব, অতীত, আগ্রহ ও কাজের বিষয়, জীবন সম্পর্কে ভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি নানা কিছু শেয়ার করুনএবং তার বিষয়ে আগ্রহ দেখান।
একে অপরকে চিনুন : বিয়ের ক্ষেত্রে একে ওপরকে চেনাটা খুবই জরুরি। মতানৈক্য হতেই পারে। কিন্তু তার জেরে যদি সম্পর্কটিই শূন্য হয়ে যায় তবে লাভ কী? হয়তো পরে মাথা ঠাণ্ডা হলে নিজের রাগে নিজেই লজ্জিত হচ্ছেন। তাই হুটহাট রাগ না করে অপরকে বুঝিয়ে বলুন, দেখবেন ঝামেলা মিটে যাবে।
ক্ষমা করতে শিখুন : ভুল মানুষমাত্রই হয়ে থাকে। তবে সেই ভুলটাকে ধরে বসে থাকবেন না। মাথা ঠাণ্ডা করে স্বামী অথবা স্ত্রীকে ভুলটা ধরিয়ে দিন। তার পর তাকে ক্ষমা করে দিন। পরে এই ভুল নিয়ে আর কখনোই কোনো কথা বলবেন না। ভুলের কথা সম্পূর্ণভাবে ভুলে যান।

অফিসের কাজ বাড়িতে নয় : অফিসের কাজ কখনোই বাড়িতে করবেন না। অফিসের যাবতীয় চিন্তাভাবনা ফেলে আসবেন অফিসের মধ্যেই। তাকে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে এসে নিজের কাছের মানুষের ওপর রোজ ওই রাগ দেখালে আর দাম্পত্য জীবন টিকবে না।
সব সময় বন্ধুত্ব রাখুন : বিয়ে করেই ট্রিপিক্যাল স্বামী-স্ত্রীতে পরিণত হয়ে যাবেন না। দেখবেন দু’জনের মধ্যে যেন বন্ধুত্বটি বর্তমান থাকে। বন্ধুত্ব থাকলেই আর কোনো অসুবিধা হবে না।
দায়িত্ব নিতে শিখুন : বিয়ে করেছেন ঘরে মাকে সাহায্য করার জন্য, বউ এনে দিয়েছেন বলেই সব দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলবেন না। অফিসে কাজের দোহাই দিয়ে ইলেকট্রিকের বিল বা ব্যাংকের কাজ এড়িয়ে তা কখনোই বউয়ের ওপর চাপিয়ে দেবেন না।
সারপ্রাইজ : সারপ্রাইজ সম্পর্ককে আরো উন্নত করে। প্রিয়জনকে হঠাৎ চমকে দিন উপহার দিয়ে। নিতান্ত একটি চিঠি দিয়েও ভালোবাসা জাহির করুন। এতে সম্পর্কে নতুনত্ব বজায় থাকবে। ভালোবাসায় স্বার্থের জায়গাও নেই। আপনি তার জন্য কী করলেন, তিনি আপনার জন্য কী করলেন না। এই অভিমানগুলো রাখবেন না।
ভালোবাসেন অথচ ভালোবাসার কথা বলবেন না, তাই কি হয়? আর ভালোবাসার কথা যত বেশি বলবেন, আপনাদের দাম্পত্য জীবনে সুখ তত বেশি হবে।