বাদল দিনের স্মৃতি

Aug 01, 2019 07:07 pm
কদম ফুল

 

আমি শ্রাবণ আকাশে ঐ দিয়েছি পাতি

মম জল ছল ছল আঁখি মেঘে মেঘে
যে গিয়েছে দেখার বাহিরে
আছি তারই উদ্দেশ্যে চাহিরে
বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল দেখার পর থেকেই বর্ষার নানা গান গুঞ্জরিত হচ্ছে মনে মনে। সে গানের সুর-তাল-লয় নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই। কারণ এর শ্রোতা তো কেউ নেই, একমাত্র আমিই গায়ক ও শ্রোতা।

আসল কথা বৃষ্টি হলেই আমার মনটা ভালো হয়ে যায়। রোদ ঝলমল আকাশের চেয়ে মেঘে মেঘে ছাওয়া কালো গগনই আমার বেশি পছন্দ। কারণ আমার শৈশবের সবটুকু জুড়ে আছে বৃষ্টি আর বৃষ্টি। থাকতাম মৌলবীবাজার নামে সিলেটের একটি মহকুমা শহরে, যেখানে গ্রাম গ্রাম ভাবটি প্রধান। চার পাশে অজস্র গাছ আর গাছ।

নারকেল-সুপারি-শাল-পিয়াল-বটবৃক্ষ-তাল-তমাল এবং আরো নাম না-জানা অসংখ্য গাছে ছেয়ে আছে পরিবেশ। যখন তখন ঝুমঝুম করে নামতো বৃষ্টি। আমরা সেই মুহূর্তে ঘরের বাইরে ঘাসে ছাওয়া সবুজ উঠানে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, মায়ের ডাক শুনেও শুনি না। যখন নিতান্ত অপারগ হয়ে ঘরে ঢুকতাম আম্মা কান টেনে ধরে বলতেন, আর কখনো যেন এমনটি না হয়। আমরা নিতান্ত ভালো মানুষ সেজে বলতাম ‘কসম, আম্মা আর যদি কখনো বৃষ্টিতে ভিজি নাম বদলে দিও আমাদের’। বলা বাহুল্য, পরদিনই ভুলে যেতাম সেই কসমের কথা। শৈশবের দিনগুলো যেন সোনা-রুপায় মোড়া গয়না, কী যে ভালো লাগা সেই অনাবিল দিনগুলো। পাড়া-প্রতিবেশী সবাই আমাদের আত্মীয়, সবার বাড়ি আমাদের বাড়ি। যখন তখন ঢুকে পড়া যায়, কড়া নাড়া বা বেল বাজানো তো অকল্পনীয়।

দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় রইলো না
সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলো
এখন বাস করি যেখানে, চার দিকে শুধু ইট-কাঠ, লোহা-লক্কড়ের দেয়াল। সুউচ্চ ভবনগুলো যেন খাঁচায় বন্দী করেছে আমাদের, নিঃশ^াস নেয়ার মতো হাওয়া নেই। তবু নিজেকে আমি ভাগ্যবতী মনে করি, আমার পাঁচতলার আবাসে বারান্দায় বসলে চোখের সামনেই দেখতে পাই হলুদ হলুদ কদম ফুলে ছাওয়া সবুজ পাতার মাতাল হাওয়া। ডালগুলো যেন দুলে দুলে আমাকে স্পর্শ করতে চায়। পাশেই আছে সুগন্ধি বকুল ফুলের একটি বড় গাছ। চার পাশে তালগাছের পাতার শরশর শব্দ। একটু দূরে দৃষ্টি মেললে চোখে পড়ে তির তির করে বয়ে চলা লেকের পানি, উপরে তাকালে দেখি সুনীল আকাশ, উদার প্রশান্ত প্রশস্ত। তারা যেন আমাকে অভয় দেয় ভয় পেয়ো না, আমরা তো আছি। আরো আছে সকাল-সন্ধ্যায় উড়ে আসা পাখা মেলা শালিক-টিয়ে-ফিঙের ঝাঁক। আছে অজস্র কাক ও চিলের ওড়াউড়ি।

বর্ষাকে নিয়ে প্রায় সব কবিই গান-কবিতা রচনা করেছেন। গীতাঞ্জলির অন্যতম সম্পদ রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান, যেগুলোকে কবিতার মতো পড়া যায়।
এই শ্রাবণ-বেলা বাদল-ঝরা যুথীবনের গন্ধে ভরা॥
কোন্ ভোলা দিনের বিরহিণী, যেন তারে চিনি চিনি-
ঘন বনের কোণে কোণে ফেরে ছায়ার-ঘোমটা-পরা ॥
কেন বিজন বাটের পানে তাকিয়ে আছি কে তা জানে।
হঠাৎ কখন অজানা সে আসবে আমার দ্বারের পাশে,
বাদল-সাঁঝের আঁধার-মাঝে গান গাবে প্রাণ-পাগল-করা ॥

আমার ছোট মামা সৈয়দ মুজতবা আলী অনেক বছর কাটিয়েছেন শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে। তার কাছে শোনা অনেক গল্প মনে পড়ে এই বাদল দিনে বসে। বলতে ইচ্ছে করে- আহা আমি যদি জন্ম নিতেম সেইকালে।