আবদ্ধ

Aug 17, 2019 04:35 pm
আবদ্ধ

 

তুলসীগঙ্গা ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে মিজান আকাশের দিকে চোখ রাখল। দেখে অন্ধকারের আঁশ কেটে যেতে শুরু করেছে। ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে চলছে তুলসীগঙ্গার স্রোতে। নদীর তীর ধরে একদিকে সবুজ ক্ষেত অন্যদিকে বালুকারাশির শেষ প্রান্তে সবুজ মাঠ। বিস্তীর্ণ বালু আর সবুজ খেত তার মধ্য দিয়ে ক্ষরা মৌসুমেও বয়ে চলে তুলসীগঙ্গা। সুন্দর। সূর্য ওঠার আগ মুহূর্তে ব্রিজের চার পাশের পরিবেশ যে এত স্নিগ্ধ মনোরম হয় মিজান এ প্রথম দেখল। সে কোনো দিনই এত সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে না। রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাওয়া এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী; এ কথা সে অনেকের কাছেই বরাবর শুনে এসেছে, কিন্তু কোনো দিনই এটাকে সে গুরুত্বসহকারে নিতে পারেনি। আজ তার ব্যতিক্রম হয়েছে।

গত এক সপ্তাহ ধরে রাতে তেমন ঘুমাতে পারছে না মিজান। একটি বিরহ ব্যথা তার বুকে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। রাতের নিরিবিলিতে এ ব্যথা আরো বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। সেজন্য রাত জাগা ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে সকাল সাড়ে ৯টার আগে সে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। আজ ব্যতিক্রম। ফজরের আজানের সাথে সাথে তার ঘুম ভেঙে গেছে। আজও হয়তো এত সকালে ঘুম ভাঙত না। ব্রিজের রেলিংয়ে তালা ঝোলানোর কথাটা সে রাতেই ভেবে রেখেছে এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠার একটা মানসিক প্রস্তুতিও নিয়েছে। ভোর পৌনে ৬টার সময় টেবিল ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছে। ঘড়ির অ্যালার্ম কোনোক্রমে শুনতে না পেয়ে পরিকল্পনা যেন ভেস্তে না যায় সেজন্য বিকল্প হিসেবে মোবাইলেও অ্যালার্ম সেট করেছে। এসব প্রস্তুতি না থাকলে হয়তো আজো সে উঠতে পারত না। রাত আড়াইটা-তিনটার সময় ঘুমাতে গিয়ে সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তার কোনো কালেই ছিল না।

মিজান কখনোই ফজরের নামাজ পড়ে না। কালেভদ্রে জুমার নামাজে যায় সেটাও আবার সবার পরে মসজিদে ঢোকে; বের হয়ে আসে সবার আগে। নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করে, আল্লাহ-রাসূলে বিশ্বাস করে কিন্তু নামাজ পড়তে কেমন যেন শৈথিল্য। আজ পড়বে কাল পড়বে, শেষ অবধি আর নামাজ পড়া তার হয়ে ওঠে না। যেহেতু নামাজ পড়ে না অতএব সকালে ওঠার তাগাদাও হয় না। শেষ রাতে ঘুমের যে গভীরতা আর সুখ সেটা রাত জাগা মানুষরা কখনোই মিস করেন না। এসব মানুষের ঘুমটা এ সেময়েই বেশি হয়। লোকজন বলে, ফজর নামাজের সময় ঘুমানো ব্যক্তির চোখেমুখে শয়তান নাকি হাত বুলিয়ে দেয়। সেজন্য তাদের চেহারার সৌন্দর্য লোপ পেতে থাকে।

মিজান পূর্ব আকাশে তাকিয়ে দেখল সূর্য হয়তো পনের-বিশ মিনিটের মধ্যে আলো ছড়াতে শুরু করবে। আকাশ বেশ পরিষ্কার। ফজরের নামাজ শেষ করে কয়েকজন লোক এদিকে হাঁটতে এসেছে। তাদের মধ্যে দু’জন লোক ব্রিজের পশ্চিম মাথায় দাঁড়িয়ে মানুষের ঈমান-আমল নিয়ে নিচু স্বরে কথা বলছেন। মিজান নদীর পানির ওপর দৃষ্টি দিলো। এ কি! পানি এত কম! অবাক হলো সে। তার ছেলেবেলায় এ সময়টাতে নদী কানায় কানায় ভর্তি থাকত। এখন পানি তলানিতে পড়েছে। নদী বাঁচাও আন্দোলনের জনসভায় সে বক্তৃতায় শুনেছে যে, ভারত নদীর উজানে পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এখন সে নিজের চোখে দেখছে; বক্তৃতার তথ্য তো সত্যিই। এ বিষয়টি তো সে এতদিন আমলেই নেয়নি! মিজান মনে মনে একটু আহত হলো। ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বয়ে চলা মৃদু বাতাসটাকে খেয়াল করল। পূর্ব না দক্ষিণ দিক থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু ফিরফির পাতলা ঠাণ্ডা একটা বাতাস শরীরে লেগে মনটাকে চনমনে করে তুলছে। বাতাসে সজনা ফুলের গন্ধ মেশানো ঘ্রাণ মিজানের মনে অন্যরকমের একটা শিহরণ জাগাচ্ছে। এত বছরের জীবনে প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ বাতাস ও তার সজীবতা মিজান কোনো দিনই উপলব্ধি করতে পারেনি। আজ সে এই মহামূল্যবান সম্পদের সংস্পর্শে একটু সময় দাঁড়াল। তার বোধদয় হলো, সত্যিই সুবহে সাদেকে ঘুম থেকে ওঠার মধ্যে কল্যাণ রয়েছে।

নদীর অকৃত্রিম নিসর্গের কারণে কয়েক দিন থেকে টানা রাতজাগা ক্লান্তিটা মিজানের আর অনুভব হলো না। ভোরবেলা নদীর সান্নিধ্যে এসে তার মন নেচে উঠল; এখনই একটা ফোন দিয়ে জুলিয়াকে জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে যে, সে আজকে অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে বেরিয়ে ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে প্রকৃতির নির্মল বাতাস উপভোগ করছে। মোবাইল ফোনটা নিয়ে সে নাড়াচাড়া করল। কিন্তু ফোন দেয়ার সাহস হলো না। প্রায় এক সপ্তাহ পার হলো জুলিয়ার সাথে তার যোগাযোগ নেই। অথচ কি আশ্চর্য! এই সাতসকালে ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে জুলিয়াকেই ফোন দিতে ইচ্ছে করাতে মিজান আবারো প্রমাণ পেল সে জুলিয়াকে ভালোবাসে। মিজান আনমনা হয়ে ওঠল। তালা ঝোলানোর সিদ্ধান্তটা তার ভুল নয়।

ধনুকের মতো পিঠকুঁজো ব্রিজের মাঝ বরাবর এসে মিজান স্থির হলো। এখানেই সে তালাটা ঝোলাতে চায়। পকেট থেকে সে তালাটা বের করল। মস্তবড় তালা। গতকাল সে বাজার খুঁজে সবচেয়ে দামি এবং সাইজে বড় তালাটা কিনেছে। পিতল রঙের তালাতে কালো কালি দিয়ে লিখলে লেখাটা পরিষ্কার ফুটে উঠবে। সে জন্য সে একটা মার্কারি পেনও কিনেছে। কলমটাও বের করল। উত্তর-দক্ষিণ নদীর ¯্রােত। সে উত্তর দিকে মুখ করে দাঁড়াল। নদী উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে বয়ে চলে। উত্তর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে তালার গায়ে দুটি নাম লিখতে পারলে সম্পর্কও নাকি নদীর ¯্রােতের মতো চলমান থাকবে। মিজান এই কাজটি করতেই এখানে এসেছে। একটি তালা তাদের সম্পর্ককে অটুট রাখতে পারবে এই বিশ্বাস মিজানের মধ্যে কিভাবে জন্মাল তা সে জানে না। এটি সে বিশ্বাস করে কি না সেটাও বোঝে না। হয়তো বিশ্বাস করে, হয়তো করে না। বিশ্বাসের ব্যাপারটি তার কাছে এরকমই মনে হয়।

তবে মিজান জেনেছে ইউরোপের ছেলেমেয়েরা তাদের প্রেমের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে একটি তালাতে দুজনের নাম লিখে সেই তালা ব্রিজের রেলিংয়ের সাথে আবদ্ধ করে রেখে চাবিটা নদীর পানিতে ফেলে চলে যায়। তাদের ধারণা এই তালার মতো তাদের প্রেম যুগ যুগ আবদ্ধ থাকবে, কখনো ভেঙে যাবে না। প্যারিসের শেন নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজের রেলিংএ নাম আঁকানো সেরকম শত শত তালা ঝুলতে দেখা যায়। তালার ভারে কোনো কোনো ব্রিজের রেলিং ভেঙে যেতেও দেখা গেছে। মিজান তালা ঝোলানোর আইডিয়াটা মূলত ইউরোপ থেকেই পেয়েছে। এটির কার্যকারিতা কতটুকু সেটা নিয়ে তার চিন্তা নেই। যেহেতু আইডিয়াটা একটু ব্যতিক্রম সেহেতু সেও এটি করতে মনস্থির করেছে। এটি নিছক একটি অনুকরণ। মিজান কখনোই ভাবেনি, যে ইউরোপ প্রেমের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে তালা সংস্কৃতি চালু করেছে সেই ইউরোপেই শত শত প্রেমের সংসার প্রতিদিন ভেঙে খান খান হয়ে যায়। তাদের বিবাহিত সংসার অল্পতেই ভেঙে যায় আবার গড়ে ওঠাটাও নিত্যনৈমিত্তিক। প্রেমও ভেঙে যায় বালুর বাঁধের মতোই। প্রেম ও বিয়ের ব্যাপারে তারা সাঙ্ঘাতিক উদার। এসবের ব্যাপারে তারা জাতপাত; কাল-সময় কিছুই মানেন না। স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কটাকে তারা ক্রীড়া-কৌতুকের সম্পর্কে নিয়ে গেছে। সে জন্য তাদের জীবনে হতাশা বেশি। ভেঙে যাওয়ার ভয় বেশি। এই হতাশা ও ভয় থেকে বের হওয়ার উপায় তারা খুঁজে পায় না। নিরুপায় হয়ে কোনো এক পাগলের আইডিয়াতে তালা সংস্কৃতি চালু করে নিয়েছে। ইউরোপের আধুনিক ছেলেমেয়েরা কতটা কুসংস্কারে বিশ্বাস করে এই তালা সংস্কৃতিই তার উদাহরণ। তালার কি এমন শক্তি থাকতে পারে যে, প্রেমের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবে? বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরাও গাছের শরীরে প্রেমিক-প্রেমিকার নাম প্লাস চিহ্ন ব্যবহার করে লিখে রাখে। এ সবই কুসংস্কার। অথচ তারা যুক্তি দিয়ে জীবনের অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে।

মিজান তালাতে ওপরের দিক থেকে লেখা শুরু করল। প্রথমে তালার উপর দিকে সে জুলিয়ার নাম লিখল। সে ভাবল জুলিয়াকে সে ভালোবাসে, সেহেতু তার নামটিই ওপরে লেখা দরকার। জুলিয়ার নামের নিচে সে নিজের নামটা লিখল। এবার সে তালাটি দু-হাতে ধরে তালার ওপরে নামাঙ্কিত জায়গাতে অনেকক্ষণ ধরে চুমো খেলো। এ সময়টাতে মিজান নিজেকে একটু অবসন্নবোধ করল। তালার লেখাতে ঠোঁট লাগাতেই একটা আবেগ মিজানকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। জুলিয়ার এ নিরবতা অসহ্য; যন্ত্রণাদায়ক। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কি জুলিয়া বোঝে না?

মিজান এখন অনুভব করতে পারে প্রেম একটি হেঁয়ালির ব্যাপার। স্বার্থটাই পৃথিবীতে বড় বিষয়। একজনের কষ্ট আর একজন বুঝতে না পারলে কিসের প্রেম। সব মিথ্যা। কী এমন হয়েছে যে তার জন্য জুলিয়া যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। একসাথে চলতে গেলে তো একটু-আধটু ঠুং-ঠাং লাগবেই; তাই বলে সে এক সপ্তাহ যোগাযোগ বন্ধ রাখবে? এসব প্রেম-ট্রেম মানে নিজেই নিজের ভেতর অস্থিরতা বাড়ানো। জুলিয়াকে বিয়ে করলে কি হবে? সারাজীবন হয়তো সে ঘাড়ে চেপে তার নিজের বেঁচে থাকাকে স্বার্থক করে তুলবে। যদি সে নিজে রোজগারও করে, তবে সেই রোজগারের অহঙ্কারেও তো মেয়েরা সংসারকে তাতিয়ে তোলে। জুলিয়ার মধ্যেও সে এমন একটি ব্যাপার লক্ষ করেছে। তাহলে কিসের টানে সে জুলিয়াকে মিস করছে? মিজান ভাবে, এটি হয়তো নিছক তার বয়সের দোষ। এই বয়সে যেকোনো মেয়ের সান্নিধ্য এনজয় করে পুরুষেরা। সেটি হয়তো জুলিয়ার ক্ষেত্রেও তার হয়। সব মেয়েই ভাত-কাপড়ের জন্য পুরুষের ওপর নির্ভর করে। প্রেম সে তো মেয়েদের অভিনয়। ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা না পেলে মেয়েরা অন্যদিকে হাত বাড়ায়। যেখানে ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা রয়েছে সেখানেই মেয়েরা দৌড়াবে। জুলিয়াও দৌড়াবে। এই সাত-সকালে জুলিয়াকে ধরে রাখার জন্য ব্রিজে তালা ঝোলাতে সে এসেছে, এটাকেও সে হয়তো একদিন পাগলামি বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে। ডান কানের পাশটা মিজানের গরম হয়ে উঠল। পৃথিবীতে কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করে না। এই বোধোদয় মিজানকে এবার বিষণ্ন করে তুলল। সে দ্রুত তালাটা রেলিংয়ে ঝুলিয়ে চাবিটা হাতের মুঠোয় নিল। যা হবে, হবে! তালাটা তো সে ঝুলিয়েছে। জুলিয়ার নাম মনে মনে স্মরণ করে সে চাবিটা নদীর পানিতে ফেলে দিলো।