সুরঞ্জনার চিঠি

Aug 17, 2019 05:06 pm
সুরঞ্জনার চিঠি

 

-তমালের ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলছে। কোনো সাড়া শব্দ নেই। সবাই মুষড়ে পড়েছে। নীরবতা ভাঙল খোকন। বলল, নে। তমাল সুরঞ্জনার চিঠিটা পড়া শুরু কর। দুঃখ দিয়ে দুঃখ জয় করি।

চমৎকার বলেছিস তো খোকন, ‘দুঃখ দিয়ে দুঃখ জয়। তাহলে আর দেরি কেন? নে শুরু কর, বিদীপ বলল। বুকপকেট থেকে চিঠিটা বের করে পড়তে শুরু করল তমাল।
তমাল ভাইয়া,
ভালো আছেন অবশ্যই। চিঠিটা পেয়ে হয়তো চমকে উঠেছেন। ভাবছেন প্রায় অচেনা একটা মেয়ে তাকে কেন লিখল? স্বীকার করছি আমি প্রায় অচেনা। আমার বিশ্বাস সুরঞ্জনা নামটি আপনার অচেনা নয়। সদ্য ইন্টারে পড়া একটি মেয়ে সৈয়দ বাড়ির ঘটককে সরাসরি না বলে দিলো! পাত্র সহকারী কমিশনার। ক’দিন পর ইউএনও, তারপর ডিসি হবে। তারপর! তার আর পর নেই। মসৃণ সিঁড়ি পেয়ে যাবে। সচিবের পদে এক্সটেনশন পাবে। রাজনীতিতে নাম লিখালে নিশ্চিত মন্ত্রী! সেই ছেলেকে সরাসরি না করে দেয়া মেয়েটি সুরঞ্জনা। তমাল ভাইয়া, আমার দৃঢ়বিশ্বাস সুরঞ্জনাকে আপনার ভোলা হয়নি। সত্যিকার অর্থে একজন পুরুষ তার পৌরুষত্বে আঘাত, ব্যক্তিত্বে আঘাত, সহজে ভোলে না। আপনি সুরঞ্জনাকে কেমন করে ভুলবেন? জেনে গেছি আপনার ভোলা হয়নি। এই ভুলতে না পারার কষ্টের দায় হয়তো আমারও। সেই দায় থেকে মুক্তি পেতে এবং আপনাকে মুক্তি দিতেই এই দীর্ঘ চিঠি।

তমাল ভাইয়া, সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি। বাবাকে বললাম একটা মোবাইল প্রয়োজন। আমি বাড়ির বড় মেয়ে, আমার প্রয়োজন এটাই শেষ কথা। বাবা বলল, ওকে ডিয়ার ফ্রেন্ড সন্ধ্যায় রেডি থেকো। হ্যাঁ তমাল ভাইয়া, আমি বাবা মা ছোট ভাই সবাই সবার বন্ধু। তবে বাবা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড- আমি বাবার। মোবাইল এলো। ভিন্ন ভিন্ন নম্বরের জন্য, মেসেজের জন্য আলাদা আলাদা রিংটোন সেট করে ঘুমিয়ে গেলাম। কাকডাকা ভোরে ওঠা হয় না কখনো। পরিবেশ কখনো বাধ্য করলে সারাটা দিন কাটে অমনোযোগিতায়। এর ব্যতিক্রম হলো পরদিন। মেসেজের মিষ্টি রিংটোনে ঘুম ভাঙল। সময়টা আমার জন্য অসময়। কিন্তু আমারই সেট করা রিংটোনের আওয়াজ আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। মোবাইল অন করে রীতিমতো চমকে উঠলাম- অচেনা নম্বর থেকে আসা। ভাবলাম ভুল পথের যাত্রী-পথ ভুল করেছে। না সে পথ ভুল করেনি- আমার নামের বানানে একটাও ভুল নেই। আমাকে উদ্দেশ করেই শব্দগুলো সাজানো। মনে হলো মেসেজের কথাগুলো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমার ভেতরটা গোলাপি আভায় উদ্ভাসিত হলো। আমি ডানামেলা গাংচিল হয়ে গেলাম- উড়তে থাকলাম সাগর জুড়ে। আমার কেবলি মনে হতে থাকল, ভরা জোছনায় ধলেশ্বরীর কাশবনে আমি জোছনাস্নান করছি। কে মেসেজ পাঠাল, কোথায় তার ঘর, সে কি হতে চায় বর- এমন কিছুই মনে এলো না। কেউ একজন আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে, আমাকে মেসেজ পাঠাবার তো সাহস দেখিয়েছে, সেটাই আমার আনন্দের কারণ। আমাদের ফ্যামিলির কারো সাথে কেউ কখনো সাহস দেখায় না। পর দাদা জমিদারি কেনার পর সেই শুরু। প্রভাব-প্রতিপত্তি মাঝে কিছুটা কমে এসেছিল। বাবা অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করার পর আবার আগের অবস্থায় ফিরেছে। বিষয়টি আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। আমাদের আলাদা আকাশ নেই, সাগরে ঢেউয়ের উত্তালতা নেই, সবার ভালোবাসার জোছনায় আমরাও নিজেদের হারিয়ে ফেলি, সবার দক্ষিণাই আমাদের শরীরের ক্লান্তি দূর করে। আমাদের মাটির সুধাগন্ধের সাথে অন্যদের মাটির সুধাগন্ধের কোনোই পার্থক্য নেই। তাহলে আমাদের এত অহঙ্কার কেন? আমাদের প্রতি এত সমীহ কেন? আমাদের হিসাবের ভেতরে অন্যদের রাখতে এত ভয় কেন? এ বিষয়টা ভেবে প্রায়ই আমি চমকে যাই, নানারকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমার চলার পথের মসৃণতা কেড়ে নেয়। আমার মাথায় এসব ধরে না। আমার আর দশটা বান্ধবী যেমন করে নীল আকাশের নিচে দল বেঁধে ছুটোছুটি করে, মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায় প্রজাপতির মতো, সেখানে আমার প্রবেশ নিষিদ্ধ কেন, আমি বুঝিনে। যে আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে সে আমাকে হিসেবের বাইরে রাখেনি, তার সমাজেরই একজন ভেবেছে-বিষয়টা আমাকে আন্দোলিত করল। মেসেজধারীকে আমি স্যালুট করলাম।

তমাল ভাইয়া মেসেজে একটাও ভালোবাসার শব্দ ছিল না। তবুও আমার কেবলি মনে হতে থাকল গভীর ভালোবাসার রঙে মাখানো প্রতিটা শব্দ। আমার ভেতরে অন্যরকম শিহরণ জাগাতে থাকল। আমাদের লনে প্রতিদিন হাজারো প্রজাপতি দখিনা হাওয়ায় পাখা মেলে উড়তে থাকে। আমি তাদের একজন হয়ে গেলাম। মেসেজের জবাব দেবো কি না ভাবতে ভাবতেই পরদিন সকালে একই নম্বর থেকে আবারও মেসেজ এলো। আসতে থাকল প্রতিদিন। আমি বিস্মিত, বিস্ময়বোধ করি। মেসেজের জবাবের প্রতীক্ষা না করে কেমন করে একজন দিনের পর দিন মেসেজ দিয়ে চলেছে! মেসেজেও একেক দিন একেক শব্দ। আগের দিনের মেসেজের সাথে পরদিনের মেসেজের কোনোই মিল নেই। আমি চমকিত হই। আমি আন্দোলিত হই।
প্রতিদিনের এই মেসেজ আমাকে নতুন একটি সকাল, নতুন একটি দিন উপহার দিতে থাকে। আমার দিন যেতে থাকল ভালোবাসায় মাখামাখি করে। সেই সাথে ভালোবেসে ফেলি অদেখা মেসেজধারীকে।

একরাতে আমার বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়। দেয়াল ঘড়িটা ঢংঢং করে রাত বারোটা বাজার সময় সঙ্কেত ঘোষণা করল। ঘণ্টা বাজার সঙ্কেত শেষ হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই মোবাইলে মেসেজ প্রবেশের রিংটোন বেজে উঠল। মেসেজ অন করতেই চোখে পড়ল, অ্যানিমেশন করা নৃত্যরত এক পুতুল। নিচে জন্মদিনের উইস। অন্যরকম একটা আনন্দে, আমার বুকটা ভরে গেল। কেমন করে আমার মোবাইল নম্বর পেয়েছিল, সেই রহস্যের সাথে নতুন আর একটা রহস্য যোগ হলো- আমার জন্ম তারিখ সে জানল কিভাবে!
তমাল ভাইয়া, অভূতপূর্ব এ মেসেজ পেয়ে সাথে সাথে মিউজিক সিস্টেম অন করে নাচলাম অনেকক্ষণ। সকালে উঠেই পিয়ানোতে ঝড় তুললাম। মার্কেটে গিয়ে অনেক কিছু কিনলাম। কী কিনলাম, কার জন্য কেনা হলো কেউ জানল না। আমিও জানলাম না। রাস্তায় পরিচিত যাকে পেলাম গাড়ি থামিয়ে তাকেই কিছু-না-কিছু উপহার দিলাম। যা কখনো করিনি তাই করতে থাকলাম। যেন সুরঞ্জনার মাঝে আমি নেই, হারিয়ে গেছি অন্য কোথাও। সবাই ভাবল জন্মদিন তাই এমনটা করছি। আমার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের খবর রয়ে গেল সবার অগোচরে। সারা দিনের ব্যস্ততার ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম বেশ আগেই। ঘুমও ভাঙল বেশ পরে। সকাল ৯টায় কাজের মেয়েটা বেড টি নিয়ে এসে ঘুম ভাঙিয়ে গেল। দু’পিস স্যান্ডউইচ, ক’টা চিপসের সাথে চা শেষ করতেই মনে হলো আজ মোবাইল অন করা হয়নি। মোবাইল অন করে হতাশ হতে হলো। মনিটরে কোনো মেসেজ আমার দিকে তাকিয়ে অনাবিল আনন্দে হাসছে না। বুক সেলফের ওপর মোবাইল রেখে খরগোশের মতো কান পাতলাম- মেসেজ টোনের অমৃত সুধা পান করতে। সময় চলতে থাকল সময়ের নিয়মে, আমার মেসেজ সুধা পান। করা হয় না।
শীতের আকাশ কুয়াশায় ঢাকা। সূর্যালোকের দেখা নেই। তাপমাত্রা ১৬-১৮ ডিগ্রির মধ্যে ওঠা-নামা করছে। সবার শরীরের উত্তাপের পারদ নি¤œমুখী। আমার ঊর্ধ্বমুখীÑ মোবাইলে মেসেজ আসছে না। উভ্রান্তের মতো সারা ঘরময় পায়চারি করতে থাকি। আমার গোসল হলো না, খাওয়া হলো না। কলেজে যাওয়া হলো না। বারবার মা খবর নিচ্ছিল শরীর খারাপ করেছে কি না। জীবনে প্রথমবারের মতো মাকে মিথ্যা বললাম, হ্যাঁ শরীর খারাপ করেছে।

কী যেন ভাবলাম। তারপরই নিজেকে খুব বোকা মনে হলো- আমি ডায়াল করছি না কেন? প্রথমে খুব সঙ্কোচ হলো কখনো ডায়াল করিনি তো।

পারিবারিক অহঙ্কারের চীনা প্রাচীর, মনের আকাশছোঁয়া সঙ্কোচ দূরে ঠেলে ডায়াল করলাম। সংযোগ পাই না। আবার করলাম। বারবার করতে থাকলাম। ‘এই মুহূর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব নয়, দয়া করে কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন’ ভাঙা রেকর্ড বাজতে থাকল। আমার উত্তেজনা চরমে। কী করব ভেবে পাই না। অব্যক্ত ব্যথায় ছটফট করতে থাকি। মনের এই অবস্থা কারো সাথে শেয়ার করতে পারি না। ক্লান্ত অবসন্ন শরীর এলিয়ে দেই বিছানায়। সারা দিন-রাত এভাবে কেটে যায়। পাখির কলকাকলিতে বুঝতে পারি ভোর হতে দেরি নেই। ঠিক এ সময় মোবাইলের মেসেজ টোন বেজে ওঠে। বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে মেসেজ অপশন অন করি। মেসেজ পড়ামাত্রই আমার শরীরের সব অবসন্নতা, ক্লান্তি জানালার গ্রিল গলিয়ে নীল আকাশে মিলিয়ে গেল। মেসেজে লেখা- আজ বিসিএস পরীক্ষা শুরু, দোয়া চাইছি।
তমাল ভাইয়া, এত দিন জেনে এসেছি আনন্দেও মানুষ কাঁদে- দেখিনি কখনো। আজ দেখলাম নিজেকে, আনন্দের আতিশয্যে আমার কান্না। তমাল ভাইয়া, বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। বুঝতে পারলাম, আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। ভালোবাসার আবেগে উত্তাপে সময় বিবেচনা করা হলো না। বোকার খাতায় নাম উঠিয়ে তাকে ডায়াল করলাম। সংযোগ পেলাম সাথে সাথেই। কুশল বিনিময়ের ধারে কাছেও গেলাম না। ভাবলাম না, এটাই তার কাছে প্রথম ফোন। সরাসরি বললাম, আপনি যেই হোন, যেমন হোন, আমি আপনার মুখোমুখি হতে চাই। মুখোমুখি কথা বলতে চাই। জবাব পেলাম, আমিও মেসেজ অপশন থেকে বের হতে চাই। তোমাকে দেখার অপেক্ষা আমাকে কাতর করেছে। এই কাতরতা থেকে আমি মুক্তি চাই।
-তাহলে চলে আসুন আজই, সরাসরি আমার বাড়িতে।
-এখন তো সম্ভব নয়। বিসিএস শুরু আজ। পনের তারিখে শেষ হবে। ষোল তারিখে আসতে পারব।
আরো কিছু কথা হলো।

তমাল ভাইয়া, আপনি বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, ছেলেটার কথায় আমার মনে হলো আমি তার কণ্ঠ থেকে কোনো কথা শুনছিলাম না- আবৃত্তি শুনছিলাম। একটা ছেলের কণ্ঠ এতটা আবেদনময়ী, এতটা মনকাড়া, বুকের স্পন্দন বাড়াতে এতটা কার্যকর, আমার জানা ছিল না। এত পরিশীলিত ভাষায় এ যুগের ছেলেরা কথা বলে, আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। এ সময়ের ছেলেদের নিয়ে আমার ভাবনার চিত্র পাল্টে দিলো প্রিন্স। হ্যাঁ তমাল ভাইয়া, ওর নাম প্রিন্স।

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। প্রিন্সকে দেখলাম। কথা হলো এবং চলে গেল। এই চলে যাওয়া শুধুই দৃষ্টির আড়াল হওয়া। বুকের ভেতরে স্থায়ীভাবে ও আসন পেতে বসল। ওর সান্নিধ্যে প্রতিদিনই বদলে যেতে থাকল সুরঞ্জনা।
ইন্টার দিলাম। রেজাল্ট হলো। বাবার ইচ্ছায় ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। বাবা যা চেয়েছিল, তাই হলো। আইন অনুষদে চান্স পেলাম। নতুন সমস্যা দেখা দিলো। আমাদের ধানমন্ডির বাসা বিদেশী একটা মিশন ভাড়া নিয়েছে। সহসাই হলে সিট পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। মেসে উঠলাম। মেসের পরিবেশ এলাও করল না আমাকে। এ সময় প্রিন্স প্রস্তাব দিলো চল আমরা বিয়ে করে ফেলি। বিয়ের পর পড়তে অসুবিধা কোথায়? আজকাল বিয়ের পর অনেকেই পড়ালেখা করছে।
- তো আমার বাবা-মায়ের কাছে প্রস্তাব পাঠাও। পরেরটা আমি দেখব।
- পাগল হয়েছ! বেকার ছেলে, বিসিএসের রেজাল্ট হতে অনেকটা সময় চলে যাবে। এ সময় বিয়ের কথা তোলাই যাবে না।
-তো কেমন করে বিয়ে করব?
-আমরা দু’জনই অ্যাডাল্ট। কাজি অফিসে কিংবা কোর্টে বিয়ে করতে কোনো সমস্যা নেই। আর বিয়ে করে ফেললে বাবা-মা তেমন কিছু বলতে পারবে না।

তমাল ভাইয়া, প্রিন্সের ওপর আমি এতটাই দুর্বল হয়েছিলাম- ও যদি আমাকে লিভ-টুগেদার করতে বলত; আমি তাই করতাম। বিয়ের প্রস্তাব দেয়াতে ওর প্রতি আমার বিশ্বাস আরো বেড়ে গেল। প্রিন্স বেকার। আমার অ্যাকাউন্টে অনেক টাকা। বিয়েতে টাকার প্রয়োজন হবে। টাকার জন্য বাড়ি এলাম। ঠিক এ সময় আপনার বাবার পাঠানো ঘঠক এলো। এবার আপনি বলুন, এ সময়, এই পরিস্থিতে কোনো ছেলে বা কোনো মেয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি হবে! সরাসরি না বলে ঢাকায় চলে এলাম। আমার না জবাবে বাবা মা আপনারা যতটা চমকে গিয়েছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি চমকে গিয়েছিলাম আমি নিজে। আমার ভেতর এমন দৃঢ়তা এলো কোথা থেকে!

তর সইছিল না প্রিন্সের। আমারও। ভালো রেজাল্টের জন্য আমি বরাবরই প্রচুর পড়ালেখা করি। মেসে পড়ালেখার পরিবেশ আমার মতো ছিল না। এ কারণটা আমার ভেতর কাজ করছিল। এ ছাড়াও আমার ভেতরে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটা উত্তেজনা, শিহরন কাজ করছিল। তাতে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। হারিয়ে যাওয়া মনেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা। এক দণ্ডের জন্যও মনে হলো না, আমার বাবা মির্জা আহসান উল্লাহ অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করা অধ্যাপক। ভুলে গেলাম প্রতাপশালী জমিদার দীন মাহমুদের ফোর্থ জেনারেশন আমি। তমাল ভাইয়া, আমার পরিবারের কারো বিয়েতে পথের কাঁদামাটিও আনন্দে লাফায়। শহরের বিত্তশালীরাও একটা দাওয়াত কার্ডের প্রত্যাশা করে। সেই পরিবারের একজন হয়ে চুপিসারে কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে করলাম প্রিন্সকে।

আমি নিশ্চিত, তখন আমার ভেতরে সুরঞ্জনা ছিল না। কাজি সাহেব কী লিখলেন, কী বললেন বুঝতেও পারলাম না। একবার শুধু মনে হলো আমাকে কবুল বলতে বলছেন। আমি কবুল বলতে থাকলাম। কতবার বললাম, আমি জানি না। প্রিন্স হাত টিপে বলল, এতবার বলার প্রয়োজন নেই। প্রিন্স হয়তো ভেবেছিল, মনের খুশিতে আমি কবুল বলে চলেছি। আসলে সে সময় আমাতে আমি ছিলাম না।
তমাল ভাইয়া, নীরবে, নিঃশব্দে মেয়েদের জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা আমার জীবনেও ঘটে গেল। হেলিকপ্টার নয়, লেক্সাস নয়, পাজেরোও নয়, একটা সিএনজি চেপে শ্বশুরবাড়ি রওনা হলাম।
আমি শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। যেভাবে যাচ্ছি, এভাবে আমার বাড়ির দারোয়ানের মেয়েও যায় না। আমার পরিবারের কেউ স্বপ্নেও দ্যাখে না। যা স্বপ্নে কাছে আসতে ভয় পায় তাই ঘটল আমার জীবনে।
টাকার ব্যাগটি তুলে দিলাম প্রিন্সের হাতে। কোনো কথা বলতে ইচ্ছা হলো না। প্রিন্সের গায়ে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম।

চোখ বন্ধ করার পর প্রথম আমার ভেতরের আওয়াজ শুনতে পেলাম- তুমি ভুল করলে সুরঞ্জনা। ভুল করলাম! এ প্রশ্ন কেন? ভুল করতে যাব কেন? এমনভাবে হরহামেশাই বিয়ে হচ্ছে। তারা সুখী দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছে। আনুষ্ঠানিকতা হয়নি, তাতে কী? প্রিন্সের ডাকে, ভেতরের সাথে কথোপকথনের ইতি ঘটল। চোখ মেলেই চমকে উঠলাম জীর্ণশীর্ণ একটা ভবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সিএনজি। চারদিকে একই রকম সব ভবন। সরকারি কোয়াটার মনে হলো। প্রিন্স বলেছিল কাকরাইলে বিলাস টাওয়ারে তিন হাজার বর্গফুটের ছোট অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা তারা। আমি স্তব্ধ হলাম। প্রিন্সকে বললাম, তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে এলে! শীর্ণ কণ্ঠে প্রিন্স বলল, নামো। নামলেই বুঝতে পারবে।
তমাল ভাইয়া, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে প্রিন্সের পেছনে পেছনে অতি সাধারণমানের একটি কক্ষে ঢুকল সুরঞ্জনা। গা ঘিনঘিন করা উৎকট গন্ধে দম বন্ধ হয়ে এলো তার। দেখল একজন মহিলা তিনজন কিশোর-কিশোরী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের আকৃতি দেখে মনে হলো তারা প্রিন্সের মা ও ভাই-বোন। সবাই বিষণ্ন। এই বিষণ্নতার কারণ বুঝতে পারলাম না। সবার সাথে প্রিন্স পরিচয় করিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল।

আমার শাশুড়ি আমাকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিলো। তার চোখ ভেজা। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে তিনি বললেন, পোড়ামুখী রূপ। আর সুন্দর সুন্দর কথা শুনে পাগল হয়েছিস, না? ভদ্র আর সুন্দর চেহারার মাঝে কতটা কদর্যতা থাকতে পারে, ওই ইতরটা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। পেটে ধরেছি তাই ত্যাজ্য করতে পারিনি। ইতরটা বলেছে টাকার খনি পেয়েছে। টাকার লোভে বদমাশটা ফাঁদ পেতেছিল। ফাঁদ পাতাই ওর অভ্যাস। তবে তোমার মতো কেউ ওর ফাঁদে পা দেয়নি। এত বড় পরিবারের মেয়ে হয়ে কেমন করে ওর ফাঁদে আটকে গেলে মা? তবে মা, তোমাকে কথা দিচ্ছি, এ নরক থেকে তোমাকে আমি মুক্ত করব।
প্রিন্সের বোন বলল, তোমার সম্বন্ধে বলেছে তাতে কখনো তোমাকে ভাবী ডাকার যোগ্যতা অর্জন করব না। তোমাকে আপু ডাকব। জানো আপু ভাইয়ার কারণে বাবা মাথা উঁচু করে পথ চলতে পারে না। পথে বেরোলেই নানারকম কুৎসিত কথায় আমাদের কান গরম হয়ে যায়। ওরা আরো অনেক কথাই বলল।
তমাল ভাইয়া প্রিন্স সম্পর্কে ওরা যা যা বলল, তাতে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। অঝোর ধারায় আশু ঝরতে থাকল। মায়ের পরম যতেœ আমার শাশুড়ি তার আঁচল দিয়ে আমার চোখ মুছিয়ে দিতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। বললাম, মা এখন আমার কী হবে?

-পোড়ামুখী আমাকে মা ডাকলি। আমিতো মা নামের কলঙ্ক। না হলে প্রিন্সের মতো সন্তান কেন পেটে ধরব! মা যখন ডাকলি, তখন তোকে আল্লাহর রহমতে আমি রক্ষা করবই। মোবাইলতো আছে। ওই ঘরে গিয়ে বাবা-মাকে ফোন দে। সব কিছু খুলে বল। তারা এসে তোকে নিয়ে যাক। বদমাশটা রাতে মাতাল হয়ে ফিরলে অঘটন ঘটে যাবে। সর্বনাশের হাত থেকে তোকে বাঁচানো কষ্ট হবে। প্রিন্সের ছোট বোন বলল, হ্যাঁ আপু তাই করো। সে আমাকে পাশের ঘরে নিয়ে গেল। বলল, আমরা না বলা পর্যন্ত দরজা খুলবে না।
তমাল ভাইয়া কখনো শুনেছেন, একটি মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রথম দিন এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়! আমি হলাম। মাকে ডায়াল করলাম। আমার কিছুই বলা হচ্ছিল না। মা বারবার বলছিল, কী হয়েছে, খুলে বল। মায়ের কান্নার আওয়াজ পেলাম। কাঁদো কাঁদো করে সব বললাম। মা একটি কথাও বলল না। বুঝতে পারলাম, মোবাইলের লাউড স্পিকারে মা বাবাকে সব শোনাচ্ছে। আমি সেলফোন কানে বসে আছি। কেউ কথা বলছে না। ক্ষণিক বাদে বাবা বলল, যেমন আছো তেমনি থাকো, আমরা আসছি। বাবাকে লোকেশন বললাম। বাবা লাইন কেটে দিলো।

বদ্ধঘরে বসে আছি। জানালায় পুরনো মশারির কাপড়ের পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালাম। রেলওয়ের ওভার ব্রিজ দিয়ে মানুষ চলাচল করছে। স্পষ্ট কিছুই চোখে পড়ল না। ভাবলাম দিনের আলো আঁধারের চাদরে ঢেকে গেছে। শাশুড়ি ননদের ছোট ছোট কথার শব্দ ছাড়া অন্য কোনো সাড়া শব্দ কানে আসছে না। অজানা আতঙ্কে আমি দিশেহারা।

তমাল ভাইয়া, নরক যন্ত্রণা কাকে বলে জানি না। হয়তো কেউ জানে না-দেখেনিতো কেউই। আমার মনে হলো এই যন্ত্রণার চেয়ে কঠিন কিছু নরকেও নেই। সাড়ে তিন ঘণ্টা কি যে যন্ত্রণায় ছটফট করলাম, তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আমার শাশুড়ি আমাকে মায়ের মতো করে আশ্বাস দিচ্ছিলেন। তবু শঙ্কা কাটছিল না। যদি লম্পটটা মাতাল হয়ে চলে আসে, তা হলে কী হবে? সাড়ে তিন ঘণ্টা পর বাবা মাকে নিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ পর সিভিল ড্রেসে দু’জন মানুষ এলেন। তাদের কথায় বুঝতে পারলাম, তারা পুলিশের লোক। বড় কর্মকর্তা বলে মনে হলো। তারা বাবাকে বললেন, স্যার ভয়ের কিছু নেই। কাজি অফিস থেকে সব এভিডেন্স নিয়ে এসেছি। ময়মনসিংহ পর্যন্ত সব থানাকে বলে দিয়েছি। আপনারা পুরো রাস্তাই নিরাপদে যেতে পারবেন। তাদের কথায় আমার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি শ্বশুরবাড়ি ছাড়লাম। আমার শাশুড়ি, ননদদের দেখলাম। তাদের মুখেও হাসি ফিরে এসেছে। আমি শাশুড়িকে সালাম করলাম। তিনি ভারি কণ্ঠে বললেন, কুপুত্র পেটে ধরেছি, আমার এই অপরাধ ক্ষমা করো মা।
তমাল ভাইয়া বাবা-মা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। সেই ফ্রেন্ডরা ময়মনসিংহ আসা পর্যন্ত আমার সাথে একটা কথাও বলল না। মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে দেখছিলাম, টিসু পেপার দিয়ে বাবা-মা দু’জনই চোখ মুছছেন। তাদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে আসছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমরা তিনজন অচেনা বোবা মানুষ ভ্রমণ করছি- আমরা কথা বলতে জানি না। আমরা কারো কুশল মঙ্গল-অমঙ্গলের কথা ভাবি না। আমরা মানুষ না, ছায়ামাত্র।
মাঝ রাতে ময়মনসিংহ ফিরে এলাম। বাবা-মা ছাড়া বাড়ির কেউই জানল না মির্জা বাড়িতে কত বড় একটা অঘটন ঘটে গেল। সবাই জানল, ইউনিভার্সিটিতে সমস্যা হয়েছে, তাই এতরাতে আমার বাড়ি ফেরা। ক’দিন পর জানল, এ দেশে পড়ালেখার পরিবেশ নেই, আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি পড়তে। জন্মাত ওখানেই। দু’মাসের মধ্যেই চলে গেলাম। সবাই জানল পড়তে গেলাম। আমি জানলাম সুরঞ্জনা যাচ্ছে নির্বাসনে।
তমাল ভাইয়া, তিন মামার একমাত্র ভাগ্নে সুরঞ্জনা। সুরঞ্জনা ছিল বাড়ির আনন্দের উৎস। সুরঞ্জনা হাসলে সবাই হাসত। সুরঞ্জনা কাঁদলে সবাই কাঁদত। শুধু সুরঞ্জনাকে দেখতেই আমেরিকা প্রবাসী দুই মামা প্রতি বছর দেশে আসেন। স্থায়ীভাবে রাখার জন্য কয়েকবার নিয়েও গেছেন। বাবা ছাড়া আমার ঘুম হয় না। তাই আমেরিকা থাকা হয়নি আমার। সেই বাবাকে রেখে আমি নির্বাসনে পাড়ি জমালাম।

নতুন সুরঞ্জনাকে দেখতে থাকল আমেরিকা। এ সুরঞ্জনা হাসতে ভুলে গেছে। হাসাতে ভুলে গেছে। এ সুরঞ্জনা পিয়ানোতে ঝড় তোলে না। মিউজিক সিস্টেম অন করে নৃত্য করে না। তার দিন কাটতে থাকে একটি টেলিফোনের অপেক্ষায়। টেলিফোন আসে না। হয়তো প্রায়শ্চিত্তের পালা তার শেষ হয়নি। তাই তার টেলিফোন আসে না। এমন ভাবতে ভাবতেই অপেক্ষার পালা শেষ হয়। অবশেষে কাক্সিক্ষত টেলিফোন এলো। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো যে কণ্ঠ। সে কণ্ঠের ডাক শুনতে, সুরঞ্জনা বিমান থেকে লাফিয়ে পড়তে দ্বিধা করবে না। উত্তাল সাগরে জলস্নান করতে ভয় পাবে না। সেই কণ্ঠ বলল, ডিয়ারেস্ট ফ্রেন্ড, মানুষই ভুল করে, মানুষই ভুল থেকে বেরিয়ে আসে। একটি ভুল কখনো কারো জীবন চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। মির্জা বাড়ির একটা মেয়ে এই সত্য জানে না। মির্জা বাড়ির একটা মেয়ের চিত্ত এতটা দুর্বল, আমি ভাবতে চাই না, বিশ্বাস করতে চাই না। পড়ালেখায় ফিরে যাও। ফরগেট পাস্ট, মেকস ফ্রেন্ড এগেইন।
তমাল ভাইয়া বুঝতে পারছেন এ কণ্ঠ কার? কে আমার এই বেস্ট ফ্রেন্ড- আমার বাবা। আনন্দে আমি লাফিয়ে উঠলাম। আমার কেবলি মনে হতে থাকল বাবা তার বন্ধুত্বের তালিকা থেকে আমার নাম কেটে দেয়নি। টেলিফোনের কথায় আনন্দে নেচে উঠলেও সারারাত আমি কেঁদেছি। সকালে আমার মনে হলো রাতের ঝরা অশ্রুতে, আমার ভেতর জমে থাকা সব গ্লানি কালিমা ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গেছে। চার পাশের সব কিছুকেই ভালো লাগতে শুরু করল। পুরনো সুরঞ্জনার প্রত্যাবর্তন ঘটল আমেরিকায়। বড় মামাকে বললাম, গ্র্যাজুয়েশন করব। কলেজে ভর্তি হলাম। সময়ের নিয়মে সময় চলতে থাকল। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলাম। জবও হয়ে গেল। এ সময় বাবা বলল, আমি আমার গ্র্যাজুয়েট ফ্রেন্ডকে দেখতে চাই। আমিও উন্মুখ হয়েছিলাম, বাবাকে দেখতে। মা বেশ ক’বার এসে আমাকে দেখে গেছে। তাই বাবার জন্যই ব্যাকুল ছিলাম।
ঠিক বাহাত্তর ঘণ্টা পর এয়ারপোর্টে বাবার বুকে মুখ রেখে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। এত বড় মেয়ে এভাবে কাঁদছে দেখে। অনেকেই চমকে গেল। তারা তো জানে না, বাবা-মেয়ে উভয়ে উভয়ের জন্য কতটা ব্যাকুল ছিল।
তমাল ভাইয়া, থাকলাম একমাস। ফেরার সময় হলো। আগামী পরশু রাতে সুরঞ্জনাকে নিয়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিশাল ঈগল পাখিটি শূন্যে ডানা মেলবে। নেকস্ট উইকে নতুন জীবনে প্রবেশ ঘটবে সুরঞ্জনার। যে জীবনের নাম কর্মক্ষেত্র।

তমাল ভাইয়া, কাল রাতে লাগেজ গোছাতে গিয়ে চোখ পড়ল পুরনো একটা ডায়েরিতে। এক সময় প্রতিদিন এ ডায়েরি আমাকে আলোড়িত করেছে। প্রতিটি দিন নতুন নতুন কথায় এ ডায়েরির পাতা ভরেছে। অন্য রকম একটা আনন্দে প্রিন্সের ম্যাসেজগুলো লিখেছি এর পাতায় পাতায়। কাল ডায়েরিটা আমাকে আলোড়িত করল না। কেমন একটা ঘৃণার উদ্রেক হলো। জ্বালিয়ে দিতে একটার পর একটা পাতা ছিঁড়তে থাকি। এক সময় একটি পাতার ওপর আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো। পুরো পাতা জুড়ে রয়েছে দুটো লাইন- সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তমাল। তার নিচে লেখা, সহকারী সচিব। প্রথমে নামটি কার মনে করতে পারলাম না। ‘সহকারী সচিব’ বিষয়ে চিন্তা করতেই মায়ের কথা মনে হলো। মা বলেছিল, ছেলে সহকারী সচিব। ক’দিন পর ইউএনও হবে। তারপর ডিসি হবে। সচিব হবে। সৈয়দ বাড়ির ছেলে। বংশমর্যাদায় তোদের চেয়ে কম কিসে? আপনার কথা আমার মনে হলো। অবচেতন মনেই লিখতে বসলাম। আমার ভাবা হলো না, আপনি কোথায়? কেমন আছেন। এ চিঠি আপনার হাতে যাবে কি না। কিংবা এ চিঠি পেয়ে আপনার রি-অ্যাকশন কেমন হবে। লেখার মাঝেই ছোট ভাই ইমতি এলো। ওকে বললাম, সার্কিট হাউজ এলাকার সৈয়দ বাড়ির তমাল নামের কাউকে চিনিস কি না? ইমতি লাফিয়ে উঠল। বলল, চিনি মানে! তমাল ভাইয়ার ছোট ভাই হিমেল তো আমার সাথেই পড়ে। চিঠিটা আপনাকে দিতে পারবে কি না বলতেই বলল, সরাসরি দিতে লজ্জা করবে। তবে হিমেলের মাধ্যমে দেয়া যাবে।

তমাল ভাইয়া ইমতির কাছে আপনার তথ্য পেয়ে দ্বিধায় পড়লাম, চিঠিটা পাঠাব কি পাঠাব না। যাকে রিজেক্ট করেছিলাম, তাকে দেখার একটা সাধও ভেতরে টের পেলাম। ইমতি বলল সরকারি কর্মকর্তা হলেও আপনি ভালো গল্প লেখেন। আমার কাহিনী তো একটা গল্প। ভাবলাম, আমার কাহিনী আপনার গল্পের প্লট হোক আর নাই হোক, অন্তত নিজ শহরের একজন জানুক মির্জা বাড়ির একটা ঘটনা। কেবল এ কারণেই সিদ্ধান্ত নিলাম, চিঠিটা পাঠাব, রেজাল্ট নিয়ে ভাবব না।
তমাল ভাইয়া, গত একমাসে একবারের জন্যও আমার লনে যাওয়া হয়নি। আমাদের লনটা খুব সুন্দর। বাইরে থেকে আনা সবুজ ঘাসের চাদর মোড়ানো। দেশ-বিদেশের হৃদয়ে স্পন্দন জাগানো ফুলের সমাহার তো আছেই। নগ্নপায়ে ওই সবুজ চাদরে কত হেঁটেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আপনি যদি আসেন, তাহলে আমার দুটো সাধ পূর্ণ হয়- আপনাকে দেখার, আপনাকে বিদায় জানানোর ফাঁকে লনে হাঁটার।
আসবেন কী?

সুরঞ্জনা।
চিঠি শেষ করল তমাল।

কবরের স্তব্ধতা নেমে এলো তমালের ড্রডিং রুমে। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। তাকানোর সাহস যেন সবাই হারিয়ে ফেলেছে। সবাই অশ্রুসজল। তারা অনুভব করছে তাদের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেছে। কথা বলা সহজ হবে না কারো জন্য।
নীরবতা ভাঙল খোকন। বলল, সুরঞ্জনার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল, আমরা কিছুই জানলাম না। অথচ আমরা সুরঞ্জনাকে নিয়ে সে সময় কত কিছুই না বলেছি। তমাল তুই কী সিদ্ধান্ত নিবি জানি না। আমার মনে হয় তোর যাওয়া উচিত। বয়সের একটা আবেগ আছে। সে আবেগে অনেকেই ভুল করে। সুরঞ্জনাও করেছে। তা ছাড়া মেয়েটাতো চলেই যাচ্ছে।

সত্যি কথা বলতে কি, সুরঞ্জনাকে দেখার আমারও খুব সাধ। তবে আমি একা যাব না, তোদের নিয়েই যাব। বিদীপ বলল, আমারও যেতে ইচ্ছে করছে। গেলে কালই যেতে হবে। সন্ধ্যার আগে কিন্তু পারব না। খোকন বলল, সন্ধ্যার আগে আমারও যাওয়া হবে না।
ঠিক আছে কাল সন্ধ্যায়ই যাবো। প্রোগ্রাম ফাইনাল, তমাল বলল।
লিভিং রুমে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে সুরঞ্জনার চিঠিটা কয়েকবার পড়ল তমাল। যতবার পড়ল ততবারই সে অশ্রুসজল হলো, কাতর হলো। তমাল বুঝতে পারল না অচেনা এই মেয়ের চিঠি পড়ে সে কেন কাতর হচ্ছে। তবে কি সুরঞ্জনার কথাই ঠিক, তার পৌরুষত্বে আঘাত দেয়াজনকে তার ভোলা হয়নি। সে সুরঞ্জনাকে ভুলতে পারেনি। চিঠিখানা নতুন করে তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। সুরঞ্জনার জন্য বুকের ভেতরে নতুন কিছু হচ্ছে। এই নতুন কিছু সুরঞ্জনার প্রতি করুণা না ভালোবাসা, তমাল বুঝতে পারল না।
সাতটা বাজার আগেই তমাল বিদীপ খোকন সুরঞ্জনার বাড়িতে পৌঁছাল। বাড়ি দেখে ওরা অবাক হলো। ময়মনসিংহ শহরে এত সুন্দর বাড়ি আছে, ওদের জানা ছিল না। বাড়ির গেটটা শত বছরের পুরনো। পুরনো গেটের পিলারে মোটামুটি নতুন। একটা পাথর বসানো। পাথরে রবীন্দ্র হরফে লেখা ‘সুরঞ্জনা’। সুরঞ্জনার নামেই বাড়ির নাম। মনের অগোচরেই সুরঞ্জনা লেখার ওপর হাত বুলাল তমাল। খোকন বলল, বুঝতে পেরেছি, হয়ে গেছে। খোকন কী বলতে চেয়েছে, তার অর্থ বুঝতে পারল তমাল। কিন্তু তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না। নিষ্পলক দৃষ্টিতে সুরঞ্জনাকেই দেখতে থাকল।

দারোয়ান ওদের ভেতরে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসতে বলে চলে গেল। ডয়িং রুমসহ আশপাশের সাজ-সজ্জা দেখে ওরা কিছুটা আশ্চর্য হলো। সবকিছুই অসম্ভব সুরুচিসম্পন্ন।
চটি স্যান্ডেলের মৃদু আওয়াজে তিনজনেরই চোখ ঘুরে গেল দরজার দিকে। বেশ লম্বা মোটামুটি ফর্সা হলেও অভূতপূর্ব সুন্দরী একটি মেয়ে রুমে প্রবেশ করল। এমন কমনীয় মুখের অধিকারী মেয়ে খুব একটা দেখা যায় না আজকাল। টানা ভ্রু। হরিণ কালো চোখ। কোমর গড়িয়ে হাঁটুতে পড়া চুল। তমাল বুঝতে পারল না, এ মেয়েটিই তার রাজশ্রী গল্পের নায়িকা, না ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, চোখ তার শ্রাবস্তীর কারুকাজ... এর বনলতা সেন! চেহারা সাক্ষ্য দিচ্ছে। মেয়েটি ব্যক্তিত্বশীল।
মেয়েটি মুখ খুলল। বলল, স্যরি আপনাদের বসিয়ে রেখেছি। আমার অপরাধ নেবেন না।
Ñ না না আপনার কোনো অপরাধ হয়নি। আমরাতো মাত্রই এলাম। খোকন বলল।
ঠোঁটে হাসি মেখে মেয়েটি বলল, পরিচয়টা হয়ে গেলে কথা বলায় সুবিধা হয়।
আপনি ঠিকই বলেছেন, পরিচয়টা আগে হওয়া উচিত। আমি বিদীপ, ও খোকন, ও তমাল।
থ্যাঙ্ক ইউ এভরি বডি। আমি সুরঞ্জনা।

তমাল লক্ষ করল মেয়েটি শুধু সুন্দরী নয়, কথাবার্তা বেশ-ভূষায় নিরহঙ্কারী ও। আরো লক্ষ করল, কণ্ঠ যেমন মিষ্টি, কথা বলার ধরনও তেমন চমৎকার। মুখ খুলল তমাল- আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে যতটা আপনার ভালো থাকার কথা, ততটা আপনি ভালো নেই। কেন?
Ñ বাঙালি মেয়ে তো! দেশ ছেড়ে, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কিছুটা হলেও খারাপ লাগা স্বাভাবিক। তাই নয় কী? তো এই মুহূর্তে ভালো ফিল করছি, আপনারা এসেছেন তাই। আমি তো ভেবেছিলাম আসবেন না।
Ñ কাল কি সত্যিই চলে যাচ্ছেন? শুধালো তমাল।
সত্যি-মিথ্যার কি আছে। যেতেতো হবেই। তা ছাড়া না যাওয়ার পেছনে কোনো কারণতো ঘটেনি।
Ñ যদি ঘটে। সে কারণ যদি দু’হাত প্রসারিত করে আপনার পথ আগলে দাঁড়ায়। তো কি করবেন?
Ñ সেই প্রসারিত হাতের বাধাকে অভিবাদন হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছি যে।
Ñ মানুষের জীবনটা অতটা ছোট নয়, যতটা আপনি ভাবছেন। বয়স এবং আবেগের বশবর্তী হয়ে মানুষই ভুল করে। সেই ভুল কখনো জীবনের পরিণতি হতে পারে না।
Ñআপনি তো ঠিক বাবার মতো বললেন। বাবা কালও এ কথা বলেছে।
Ñ শুধু আপনার বাবা কিংবা আমি নই, সবাই এ কথা বলবে। ভেবে দেখুনতো, গোলাপ ছিঁড়তেও কাঁটা ফোটে। রজনীগন্ধা তুলতে হাতে কষ লাগে। এগুলো স্বাভাবিক হিসেবে নেয়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ।

Ñকখনো বুদ্ধিমান ছিলাম না তো। তাই বুদ্ধি খরচ করে গোলাপ তুলতে হবে, রজনীগন্ধা তুলতে হবে, তা ভাবা হয়নি। গোলাপের কাঁটা আছে, রজনীগন্ধার কষ আছে, এ বিষয়টা সহজ সত্য। কঠিন হলো গোলাপ যখন তার কাঁটা লুকিয়ে রাখে তখন। লুকিয়ে রাখা কাঁটা দেখার চোখ সবার থাকে না। সবার দৃষ্টি এতটা ধারাল নয়। সে জন্যই তো চলে যেতে হচ্ছে।
Ñযদি বলি যেতে নাহি দেবো। তমালের দৃঢ়কণ্ঠ।
তমালের দৃঢ়তায় চমকে উঠল সুরঞ্জনা! তার দেহ-মনে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলো। প্রতিধ্বনি হতে থাকল, তমালের বলা শেষ বাক্যটি যদি বলি যেতে নাহি দেব, যেতে নাহি দেব...।’ অবাক বিস্ময়ে চোখ রাখল তমালের চোখে। সুরঞ্জনার মনে হলো সাগরের গভীরতা ওই চোখে। ওই গভীরতায় কোনো নাবিক পথ হারায় না, নিরাপদে সাগর পরিভ্রমণ করে। কিছু বলা হয় না সুরঞ্জনার।

প্লিজ চুপ করে থাকবেন না। তমালের কথার জবাব দিন। বলল, খোকন। বিদীপও একই কথা বলল। খোকন বিদীপকে দেখল সুরঞ্জনা। দেখল তমালকে। তিন জোড়া চোখই ছলছল করছে। এ চোখগুলোর ভাষা বুঝতে পারল সুরঞ্জনা। তার রক্তের প্রতিটি কণায় ঢেউ খেলে গেল। শিহরিত হলো সে। ড্রয়িংরুমের চার দেয়ালের ভেতরে তার বসে থাকা হলো না। একা একাই বেরিয়ে এলো লনে। বাইরে জোছনার ঢল নেমেছে। জোছনায় লনের ঘাসগুলো আরো সবুজাভ, রাতে গোলাপগুলো কালচে দেখানোর কথা- কিন্তু দিনের আলোর গোলাপের সাথে এই গোলাপের কোনো পার্থক্য করতে পারল না সুরঞ্জনা। মাথা ঘুরিয়ে দেখল চারদিক- সবকিছুই যেন অভাবনীয় মনকাড়া, অভূতপূর্ব স্পন্দন জাগানো। মনে হলো লনের এই দৃশ্য তার প্রথম দেখা। চাঁদের পানে তাকালো, তারদিকে তাকিয়ে চাঁদ যেন হাসছে। এই হাসির অর্থ তার বোধগম্য হলো না। আবৃত্তির ইচ্ছা হতেই মনে পড়ল তার প্রিয় কবিতাটি। চাঁদের পানে চেয়ে সেই কবিতাটি আবৃত্তি করতে থাকল- ‘আমার চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে। আমি চোখ মেললাম আকাশে, জ্বলে উঠল আলো পুবে-পশ্চিমে ... আবৃত্তি শেষ হলো না। একাধিক পদশব্দে পেছনে তাকাল। দেখল, তমাল বিদীপ খোকন এসে লনে দাঁড়িয়েছে।