ভার্জিনিয়ার সেনানদহ ন্যাশনাল পার্ক ও স্কাইলাইন ড্রাইভ

Aug 17, 2019 05:15 pm
ভার্জিনিয়ার সেনানদহ ন্যাশনাল পার্ক ও স্কাইলাইন ড্রাইভ

 

পাহাড় আর অরণ্যানীর সবুজ মিতালির এক অনন্য নিদর্শন ভার্জিনিয়া। ওপরের দিকে তাকালে ব্লুরিজ পর্বতমালার নয়ন-লোভন ইশারা আর নিচের দিকে ঘন শ্যামলীমায় ছাওয়া প্রাণ জুড়ানো বনভূমি। এই দুইয়ের সুন্দর সমন্বয়ে ভার্জিনিয়া অপরূপ এক ভালো লাগার নগরী। ব্লুরিজ পর্বতমালার কোলেই সেনানদহ ন্যাশনাল পার্কটি গড়ে উঠেছে এক লাখ ৯৫ হাজার একর বনভূমি এবং ১০৫ মাইল দীর্ঘ একটি আকাশপথ নিয়ে।

ব্লুরিজ পর্বতমালা অনেক প্রাচীন। এটি প্রায় পাঁচ শ’ মিলিয়ন বছরের পুরনো। ঢেউ খেলানো। খাঁজকাটা এই সুপ্রাচীন পর্বতশ্রেণী নাকি আগে পানির তলদেশে ছিল। নদীর গহিন তলদেশের সোহাগ থেকে বিছিন্ন হয়ে মিলিয়ন বছর ধরে পানির উপরের জগৎটাকে দেখার বাসনায় উঁকি মেরে মেরে এর শৃঙ্গগুলো সব পানির ওপরে চলে এসেছে। প্রবল স্রোত ও বাতাসের ধাক্কা খেতে খেতে এর মাথাগুলো অমন খাঁজকাটা ও ঢেউ খেলানো হয়ে পড়ছে। ব্লুরিজ পর্বতমালার বুক কেটে কেটে ওপরে উঠে যাওয়া স্কাইলাইন ও সেনানদহ ন্যাশনাল পার্কের অনেক গল্প শুনে মনের মধ্যে খুব বাসনা ছিল জায়গা দু’টি নিজ চোখে দেখার। বড় ছেলে রানার সাথে প্রোগ্রাম করে তাই একদিন ভার্জিনিয়ায় রওনা হলাম। বিখ্যাত লুরে কেভান দর্শন করে প্রকৃতির অপূর্ব লীলাখেলায় বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি। এবারে চললাম প্রকৃতি ও প্রযুক্তির অপূর্ব সমন্বয়ে সৃষ্ট সেনানদহ ন্যাশনাল পার্ক ও স্কাইলাইন ড্রাইভ দেখতে।

ভার্জিনিয়া শহরের উপকণ্ঠে ব্লুরিজ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত সেনানদহ ন্যাশনাল পার্কটি একটি নয়নজুড়ানো হৃদয় ভরানো আকর্ষণীয় পার্ক। সেনানদহ নদী থেকেই পার্ক এ নামটি গ্রহণ করেছে। ব্লুরিজ পর্বতমালা এখানে পূর্ব দিকের অংশে যে ছোট পাহাড়ের আকৃতি ধারণ করেছে, তা অ্যাপলিকিয়ান পরিচিত। এই পর্বতমালা পেনসিলভানিয়া ও জর্জিয়ার মাঝখানে দিয়ে চলে গেছে। আর ভ্যালির পশ্চিম দিকে হচ্ছে সেনানদহ নদী। আর এই নদীর উত্তর ও দক্ষিণে ম্যাসাগুটেন নামে চল্লিশ মাইল দীর্ঘ এক পর্বতমালা আছে। পার্কের সাথে হাত ধরাধরি করে চলে গেছে ব্লুরিজ পর্বতমালার বুক চিরে একটি চমৎকার আকাশপথ, যার নাম স্কাইলাইন ড্রাইভ (ঝশু খরহব উৎরাব)। ব্লুরিজ পর্বতমালার বেশির ভাগ পাথরই গ্রানাইট পাথর। এগুলো আগ্নেয়গিরির প্রস্তর খণ্ডের রূপান্তরিত রূপের। অনেক পাথরের বয়স এক বিলিয়ন বছরও ছাড়িয়ে গেছে। মোটামুটিভাবে এই সেনানদহ একালাটিতে মানুষের পদচিহ্ন পড়ে প্রায় ১১ হাজার বছর আগে। যদিও আমেরিকান অধিবাসীরা বহু বছর ধরে এখানে বসবাস করত। কিন্তু তারা খুব কম নিদর্শন রেখে গেছে তাদের অবস্থানের। ১৭১৬ সালে ব্লুরিজ পর্বতমালা জনসাধারণের সামনে আত্মপ্রকাশ করলে এখানকার স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ইউরোপিয়ানরা পেনসিলভানিয়া নগরী থেকে এখানে আসে এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে বসতি স্থাপন করে। ১৮০০ সালের মধ্যে নিচ সমতল ভূমিগুলোতে চাষাবাদ শুরু হয়ে যায়।

চাষাবাদ করতে গিয়ে জমি কম পড়ে যাওয়ায় ক্রমে ক্রমে তারা পাহাড়ের দিকেও হাত বাড়াল। পাহাড়ের ঢালুতে জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানেও চাষ শুরু করল। বিংশ শতাব্দীর মধ্যে এখানে আসত অধিবাসীরা তাদের নিজস্ব একটি সাংস্কৃতিক জীবনধারা গড়ে তুলল। অন্যান্য লোকালয় থেকে দূরে পাহাড় ও জঙ্গলের মধ্যে বড় হয়ে এবং বসবাস করে তারা এক ভিন্ন মানসিকতার অধিকারী ছিল। তবে তারা অনেক বলিষ্ঠ ও সাহসী ছিল। এই পাহাড়ি কৃষকেরা পাহাড়ের গাছপালা পরিষ্কার করে জমি বানাত চাষের উদ্দেশ্যে। তারা বন্যপ্রাণী শিকার করত। এভাবে বনজঙ্গলের সাথে সাথে বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও কমে যেতে শুরু করল। তবে এখানকার অধিবাসীরা বেশি দিন এই পাহাড় ও জঙ্গলের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে পারেনি। সমতল ভূমির খোঁজে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়েছে।
১৯২৬ সালের আমেরিকান কংগ্রেস সেনানদহ ন্যাশনাল পার্কের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। ভার্জিনিয়ার গণপ্রতিনিধিরা ওই এলাকায় ২৮০ স্কয়ার মাইল জমি কিনে ফেডারেল সরকারকে দান করে। এরই মধ্যে এলাকার প্রায় অর্ধেক অধিবাসী অন্যত্র চলে গিয়েছিল। বাকি যারা ছিল, তারাও তাদের অধিকৃত জমি সরকারকে ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে গেল। ১৯৩৬ সালে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট পার্কের নামে পুরো এলাকা উৎসর্গ করে দেয়।

প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আগে প্রেসিডেন্ট হোভার স্কাইলাইন ড্রাইভ তৈরির প্রচেষ্টায় সহায়তা করেন। যদিও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তখন খুব সুবিধার ছিল না। দেশে অর্থনৈতিক মন্দাভাব ও রুক্ষ্মতা বিরাজ করছিল। বহু লোক কর্মহীন অবস্থায় ছিল। ১৯২৯ সালের হেমন্তকালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোভার তার ফিশিং ক্যাম্প থেকে পাহাড় পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণের অনুমতি দেন এবং রাষ্ট্রের রিলিফ ফান্ড থেকে রাস্তা খরচের ব্যয়ভার বহন করতে নির্দেশ দেন। ১৯৬১ সালে ১০৯ জন স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগ করেন রাস্তায় কাজে। এক বছরের মধ্যে শ্রমিকের সংখ্যা ৩০০ হয়। রাস্তার দৈর্ঘ্যও ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেনানদহ ন্যাশনাল পার্ক তখনো প্রতিষ্ঠা পায়নি। পাহাড়ের পাশের জমিগুলো কিনে নিয়ে অথবা দীর্ঘমেয়াদি লিজ নিয়ে রাস্তার কাজ এগিয়ে যাচ্ছিল। যদিও প্রেসিডেন্ট হোভারের ওই কাজ মুরিজ পর্বতমালার অনেক পরিবারকে সাহায্য করছিল। কিন্তু তার কাজ জাতীয় মর্যাদা পায়নি। তিনি ১৯৩২ সালে প্রেসিডেন্ট পদ হারান এবং রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। রুজভেল্ট ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যেই এফডিআর (ঋউজ) এখানে একটি বেসামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। ১৯৩৩ সালের মধ্যে এখানে পাঁচটি ক্যাম্প স্থাপিত হয়। অনেক বড় এলাকা লিজ নিয়ে বাউন্ডারি দিয়ে সেনানদহ ন্যাশনাল পার্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এক হাজার যুবক শ্রমিককে নিযুক্ত করা হয় পার্কের কাজে। ১৯৩৪ সালের মধ্যে ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ এক লাখ ৭৯ হাজার একর জমির দখলদার হয়। তার পরের আট বছর ধরে প্রায় ১০ হাজার তরুণ শ্রমিক অক্লান্ত পরিশ্রম করে ওই পার্ককে সর্বাঙ্গ সুন্দর করে গড়ে তুলে। তারা রাস্তা তৈরির সাথে পার্কেরও উন্নতি সাধন করে। এখানে সুন্দর বনভোজন কেন্দ্র গড়ে ওঠে, রাস্তার বাঁকে বাঁকে ঘুরানো জায়গা তৈরি হয়, যেখানে দাঁড়িয়ে দূরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। পানি ও পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩৯ সালে স্কাইলাইন ড্রাইভ তৈরি সম্পন্ন হলে রাস্তার ধারে ওক হিকোরি এবং অন্যান্য দামি দামি গাছ লাগানো হয়।

বর্তমানে প্রায় ৯৫ শতাংশ পার্ক নানা গাছগাছালিতে ভরা। এখানে প্রায় ১০০ প্রজাতির গাছ আছে। গাছের সংখ্যা এমনভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে যে, ১৯৭৬ সালে পার্ক কর্তৃপক্ষ পার্কের একটি অংশকে আদি অকৃত্রিম বনজঙ্গল রূপে ঘোষণা দেয়। জঙ্গল পরিষ্কার করা শুরু হলে যেসব বন্যপ্রাণীরা অন্যত্র ভেগে গিয়েছিল, তারা আবার ফিরে আসতে শুরু করল। ভাল্লুুকসহ হরিণ ও অন্যান্য প্রাণীদের দেখা মিলতে লাগল। পাখির রাজ্যে প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে এ পর্যন্ত।
সেনানদহ ন্যাশনাল পার্কে বসন্ত শুরু হয় মার্চ মাস থেকে। মার্চ মাসে লাল মেপলের উচ্ছলতায় বনভূমি নতুন রূপ বদলায়। এপ্রিল ও মে মাসে বন্য ফুলেরা বিকশিত হয়ে ওঠে নানান রঙের বৈচিত্র্যে। গোলাপি রঙের আজালিয়া ফুল পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে রঙের উজ্জ্বল্য ছড়ায়। অতিথি পাখিরা বেড়াতে এসে এই রূপের কাছে আটকে পড়ে। বিকশিত পুষ্পগুচ্ছের পাশে পাশে অগণিত ছোট প্রজাতির পাখিকে মনের আনন্দে উড়ে বেড়াতে দেখা যায়। গ্রীষ্ম আসার সাথে আরো বন্যফুলের সমাহার দেখা যায়। ফুলেরা রঙ বদলায়। তারপর শীতের আগমনে প্রকৃতি আবার সাজ বদল করে। এবার আর ফুল নয়- গাছের পাতারা অপূর্ব বর্ণ ধারণ করে। অক্টোবর মাসে অনেক পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন প্রকৃতির এই বর্ণিল রূপসুধা উপভোগ করতে।

মোট কথা, বছরের যে সময়েই আসা যাক না কেন, স্কাইলাইন ড্রাইভ ও সেনানদহ ন্যাশনাল পার্ক সব সময়ই দর্শকের মন কেড়ে নেয়। স্কাইলাইন ড্রাইভ ও পার্কের ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে সমতল ভূমি, রুপালি স্রোতের ঝরনাধারা আর নয়নজুড়ানো শ্যামলীমা।
এখানে আসার আগে ভেবেছিলাম একটি পার্ক আর পাহাড়ি রাস্তা দেখতে কেন সারা দিন সময় লাগবে? কিন্তু কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেল টেরও পেলাম না। পার্কের বড় গাছের ছায়ায় ঘাস মাড়িয়ে হেঁটে বেড়াতে প্রশান্ত। হাঁটা পথও আছে বনের ভেতর দিয়ে। স্কাইলাইন ড্রাইভ ঘুরতে ঘুরতে ওপরের দিকে উঠতে উঠতে মনে হচ্ছিল যেন আকাশটা এখনই হাতের মুঠোয় চলে আসবে। উঁচু রাস্তা ধারে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালে এখনো কোথাও কোথাও ইন্ডিয়ানদের অবস্থান নজরে আসে। সত্যি ভালো লাগল, বিশেষ করে স্কাইলাইন ড্রাইভটা। ব্লুরিজ পর্বতমালা এতকাল আমার কাছে শুধু ইতিহাস হয়েই ছিল। আজ তার হৃদয়ে ছুঁতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। দূরগামী ওই অস্তায়মান সূর্যের ম্লান আলোকের রঞ্জিত বিটপি বহুল পার্ককে পেছনে ফেলে আবার ঘুরে নেমে এলাম সমতল ভূমির ওপরে। এবার ফেরার পালা।