নতুন সমীকরণে এরদোগান ও পুতিন!

Sep 11, 2019 05:13 pm
নতুন সমীকরণে এরদোগান ও পুতিন!

 

কূটনৈতিক সভাগুলোতে আলাপ-আলোচনার সময় নেতারা সতর্কতার সাথে যেসব কথা বলেন, সেসব কথার চেয়েও নেতাদের শারীরিক ভাষা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আগস্ট মাসের শেষের দিকে তুরস্ক ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সেটাই প্রতীয়মান হয়েছে। সিরিয়া নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের আমন্ত্রণে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান এক দিনের সফরে মস্কোয় গিয়েছিলেন। প্রভাবশালী দুই দেশের প্রেসিডেন্টের ওই বৈঠক ও তাদের শারীরিক ভাষা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের ইঙ্গিতবহ।

সিরিয়ার ইদলিব এবং ইউফ্রেটিসের পূর্ব দিকের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, সে ব্যাপারে যখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ- তখনই প্রেসিডেন্টদ্বয় মস্কোয় এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেনুতে উভয় নেতা মতবিনিময় করেন। আসতানা শান্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুই নেতা কাছাকাছি আসার সুযোগ পেয়েছেন এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্ক সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুতিন এবং এরদোগান বহু বিদেশী নেতার চেয়েও অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে পরস্পর সাক্ষাৎ ও বৈঠকে মিলিত হয়েছেন।

এবার তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড স্পেস ফেয়ার ম্যাকস ২০১৯-এর সাইড লাইনে সাক্ষাৎ করেন। এ মহাকাশ মেলা ম্যাকসে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের নতুন পণ্যগুলো প্রদর্শন করা হয়েছে। উভয় নেতা এমন পণ্য ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামগ্রীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং ঐক্য ও আন্তরিকতার প্রতীক হিসেবে ছবির জন্য পোজ দেন। ওই মেলা চলাকালীন সময়ে পুতিন এরদোগানকে এসইউ-৫৭ ও এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেএ-৫২ অ্যাটাক হেলিকপ্টার, এমআই-৩৮ হেভি হেলিকপ্টার এবং কেএ-৬২ মাঝারি হেলিকপ্টারগুলো দেখান এবং অ্যাভিয়েশন ও মহাকাশ শিল্পের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন। তিনি গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেন, এরদোগানই হচ্ছেন প্রথম বিদেশী নেতা, যাকে রাশিয়ার ‘মোস্ট পারফেক্ট এয়ারক্র্যাফট’ দেখানো হলো।

উভয় নেতা তাদের শারীরিক ভাষাকে যে খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে, সে ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। সে সময় তারা আনন্দঘন পরিবেশে আলাপ-আলোচনা করেন। এরদোগান সিইউ-৫৭ কিনতে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত করলে পুতিন বলেন, আপনি এটা কিনতে পারেন। এরপর উভয় নেতা ক্যামেরার সামনে উচ্চস্বরে হাসেন। উল্লেখ্য, সিইউ-৫৭ হচ্ছে আমেরিকান এফ-৩৫এর বিকল্প। উভয় নেতার সিইউ-৫৭ এর সামনে দাঁড়ানো উদ্দেশ্যমূলক। এটা উপলব্ধি করা কঠিন নয় যে, দুই নেতার এই প্রদর্শনী পশ্চিমা রাজধানীগুলোর জন্য বিশেষভাবে ওয়াশিংটনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও একটি বলিষ্ঠ বার্তা। সিরিয়া এবং অস্ত্র তথা প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে যখন উত্তেজনা বিরাজমান তখন এ ধরনের শক্তির প্রদর্শনীতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

এরদোগান ও পুতিন সিরিয়া নিয়েই প্রধানত বৈঠকে বসবেন বলে আশা করা হলেও বৈঠকের ভেনুটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভেনুর কারণেই দুই দেশের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকেই সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। নেতৃবৃন্দ বিমানটি ভালোভাবে দেখার পর এক ঘণ্টারও বেশি সময় তারা এক রুদ্ধদার বৈঠকে মিলিত হন এবং পরবর্তীকালে তারা এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।

অন্য দু’টি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা সভাকে প্রভাবিত করে। প্রথমটি হলো রুশ মহাকাশ সংস্থা প্রেসিডেন্ট এরদোগানের কাছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) তুরস্কের একটি নভোযান বা মহাকাশচারী পাঠানোর প্রস্তাব দেন। দ্বিতীয়টি হলো উভয় নেতা একে অপরকে ‘প্রিয় বন্ধু এবং ভাই’ বলে সম্বোধন করেন এবং পুতিন একটি লোকাল স্ট্যান্ড থেকে ভ্যানিলা ও চকলেট আইসক্রিম কিনে দু’জনে মজা করে খান। তাদের মধ্যকার ওই দৃশ্যটি খুবই উপভোগ্য হয়ে ওঠে। রুশ বিশেষজ্ঞ ম্যাক্সিম সুকোভ দুই নেতার মধ্যকার বৈঠকের ব্যাপারে বলেন, এরদোগান মস্কোতে একমাত্র আইসক্রিমই বিনামূল্যে পেয়েছেন। অন্য কোনো জিনিস নিতে হলে এর জন্য তাকে হয়তো মূল্য পরিশোধ করতে হবে, দর কষাকষি করতে হবে অথবা যে দাম তাতে সম্মত হতে হবে।
জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে তুরস্ক-রাশিয়া সম্পর্ক যে ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে- সে ব্যাপারে কোনো কিছু না বললেও চলে। কিন্তু সিরিয়ার ব্যাপারে এখনো তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। সিরিয়ার কারণে আঙ্কারা-মস্কো সম্পর্ক যেকোনো মুহূর্তে আবার পাল্টেও যেতে পারে।

নির্ভেজাল বাস্তবতা, পারস্পরিক জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা স্বার্থ এবং অভিন্ন হুমকির ভারসাম্য হচ্ছে তাদের মধ্যকার সম্পর্কের মূল কথা। গত ১০ বছরে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে বহু উত্থান-পতন দেখা গেছে।

রাশিয়া ম্যাকস (এমএকেএস) ২০১৯ প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে ন্যাটো দেশের একজন নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। অপর দিকে, এরদোগান প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগদান করে তার ন্যাটো মিত্রদের কাছে আবারো দেখালেন যে, তুরস্কের কাছে বিকল্পও আছে। রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দ্বিতীয় চালান তুরস্কের কাছে সরবরাহ করার প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক বিশেষভাবে ইঙ্গিতবহ।

আসতানা শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এরদোগান আসছে ১৬ সেপ্টেম্বর ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে সাথে নিয়ে পুনরায় পুতিনের সাথে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। আসন্ন ওই সভা সিরিয়া নিয়ে উচ্চকণ্ঠে বক্তব্য রাখার অপর একটি সুযোগ।