যেভাবে সম্ভ্রম বাঁচাতে পারেন মুসলিম নারীরা

Sep 12, 2019 03:08 pm
যেভাবে সম্ভ্রম বাঁচাতে পারেন মুসলিম নারীরা

 

নবী সা:-এর আবির্ভাবের আগে জাহেলি যুগে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা বলতে কিছু ছিল না। ধর্ষণ ব্যভিচার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এ কারণে মান-সম্মান রক্ষায় কন্যাশিশুর জন্মের পর বাবা-মা তাদের আদরের মেয়েকে মাটির গর্তে জীবন্ত পুঁতে ফেলতেন। ইসলাম আবির্ভাবের পর সে বর্বর মানুষগুলো এমন নৈতিক মানে উন্নত হলো, এমন সব নিয়ম-নীতির অধীন হলো- যাতে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ওই সমাজ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হলো। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে আমরা যদি তাকাই তবে দেখব, উন্নত সভ্য জাতির দাবিদার আইনের কঠোরতা সত্ত্বেও ইউরোপ, আমেরিকার নারীরা যে পরিমাণে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়, মুসলিম বিশ্বে সে হার অনেক কম। ইসলামী অনুশাসন (যদিও ইসলামী অনুশাসন পূর্ণভাবে মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে মেনে চলা হয় না) কিছুটা মেনে চলাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি কম হওয়ার অন্যতম কারণ। তাই ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইসলামে বিয়ে বহির্ভূত যেকোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক ও অশ্লীলতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৩২)। তিনি আরো বলেন- ‘লজ্জাহীনতার যত পন্থা আছে, এর নিকটেও যেও না, তা প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক’ (সূরা আনআম, আয়াত-১৫১)। বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলাম ব্যভিচার রোধে যে সব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা না করা এর অন্যতম কারণ।

ইসলাম প্রতিরোধমূলক যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তার কিছু দিক আলোচনা করছি- জেনা, ব্যভিচার মহাপাপ, মৃত্যুর পর তার জন্য কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে যে সব বর্ণনা রয়েছে- শিক্ষক, ইমাম ও মিডিয়ার মাধ্যমে তা প্রচার করে ব্যভিচার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে হবে। দেখা থেকে কামনার সৃষ্টি হয়। এ জন্য ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে দৃষ্টি নত রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। সে জন্য মাহরাম (যাদের সাথে বিয়ে বৈধ নয়) তারা ব্যতীত বিনা প্রয়োজনে অন্যদের সাথে কথাবার্তা না বলা ও দেখা সাক্ষাত না করতে উৎসাহিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারকে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। নবী সা: বলেন, ‘নির্জনে কোনো নারী-পুরুষ একত্রিত হলে তাদের মধ্যে তৃতীয় জন হয় শয়তান’ (অর্থাৎ শয়তান তাদেরকে পাপের দিকে উৎসাহিত করে)। -তিরমিজি

দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যৌন হয়রানির ঘটনা প্রায় পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। পরিমল জয়ধরদের বিষয়টি যেমনি দেশের আলোচিত ঘটনা ছিল, তেমনি ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী যৌন হয়রানি ও পুড়িয়ে মারার ঘটনায় অধ্যক্ষ গ্রেফতারের ঘটনা সারা দেশের আলোচিত ঘটনা। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলছে। বাস্তবে সামান্য পরিমাণ প্রকাশিত হচ্ছে। প্রশ্ন হলো- এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে? তার সঠিক উত্তর নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকা। ইসলাম নারীদের কর্ম করাকে নিষেধ করেনি। দেশে মেয়েদের জন্য যে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা রয়েছে, সেখানে যদি শুধু মহিলা শিক্ষিকা থাকত, মহিলাদের জন্য আলাদা মহিলা বিশ^বিদ্যালয়, মহিলা মেডিক্যাল কলেজ থাকত, যেখানকার শিক্ষক-কর্মচারী সবাই যদি মহিলা হতো তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির যে ব্যাপকতা দেখা দিয়েছে, তা শূন্যের কোঠায় নেমে যেত। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ বৃদ্ধির ফলে দেশে স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে সহশিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে মেয়েদের আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মহিলা শিক্ষিকা দিয়ে পাঠদান সময়ের দাবি। শতকরা ৩০ ভাগ বা ৪০ ভাগ কোটার মাধ্যমে সব স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদের নিয়োগ দেয়ার চেয়ে মেয়েদের স্কুল-কলেজে শতভাগ মহিলা শিক্ষিকা, ছেলেদের প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পুরুষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে সমস্যা কোথায়? বিষয়টি রাষ্ট্র পরিচালকদের ভেবে দেখা দরকার। সহশিক্ষার কুফলে সহপাঠী কর্তৃক ধর্ষণের সেঞ্চুরি করার পরও সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালকের বোধোদয় না হওয়া আশ্চর্যজনক।

এভাবে নারীদের কর্মক্ষেত্র আলাদা হলে সে কর্মক্ষেত্রের তত্ত্বাবধায়ক নারী হলে অথবা নারী-পুরুষ কর্মক্ষেত্র একত্রে হলেও তাদের তত্ত্বাবধায়ক পুরুষ না রেখে একই কর্মক্ষেত্রে নারীদের আলাদা ইউনিট করে তাদের তত্ত্বাবধায়ক নারী করা যেতে পারে। যদি নারীদের জন্য আলাদা যানবাহন হয়, সে যানবাহনে যদি কোনো নারী পর্দার সাথে ড্রাইভিং করে, কোনো নারী যদি হেলপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, সে যানবাহনে পুরুষদের বহন করা যদি নিষিদ্ধ থাকে, ইসলাম কি তাকে নিষেধ করবে? নারীরা কি তাতে অখুশি হবে? এভাবে পর্যায়ক্রমে সব ক্ষেত্রে করা হলে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা কমে গেলে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি অবশ্যই কমবে।

শালীন পোশাক ও পর্দা মেনে চলাচল ও ঘরের কাজের গুরুত্ব অনেক বেশি। ঘর গোছানো, রান্না করা, সন্তান মানুষ করা ইত্যাদি সুন্দরভাবে সুসম্পন্নে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। তাই নারীরা বাইরের কাজের চেয়ে ঘরের কাজে বেশি সম্পৃক্ততা থাকলে বাইরে গিয়ে নিগৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। নারীর বাইরে যাওয়া যদি বেপর্দা ও অশালীন পোশাক পরে হয়, তা যৌন হয়রানিকে উসকে দেয়। বোরকা হলো নারী দেহের সৌন্দর্য ঢেকে রাখার জন্য। কিন্তু বোরকা যদি আকর্ষণীয়, রঙ্গিন এবং তাতে শরীরের আকার আকৃতি বোঝা যায়, তা বোরকা না হয়ে হয়ে যায় ফ্যাশন। নারীদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শালীন পোশাক পরা দরকার। শালীন পোশাক পরাকে ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে শুধু তা নয়, অন্যান্য বিবেকবান মানুষ বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন।

ভারতের জগতগুরু মাতা মহাদেবী বলেছেন- মেয়েদের আরবদের মতো পোশাক (বোরকা) পরা উচিত। আধুনিকতার নামে যে পোশাক পরা হয়, তা পুরুষ ইভটিজিংয়ের পর্যায়ে পড়ে (সূত্র- ইনকিলাব, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। ভারতের কেরালা রাজ্যের এক খ্রিষ্টান যাজকের বক্তব্য- যার ভিডিও জেসমিন পিকে নামে এক নারী ফেসবুকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রচার করেছে। ওই খ্রিষ্টান যাজক বলেন- যে সব মেয়ে জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট পরে, তাদের পাথরের সাথে বেঁধে সাগরে ডুবিয়ে মারা উচিত। কারণ যারা মানুষকে পাপের দিকে ঠেলে দেয়, বাইবেলে তাদের এরূপ শাস্তির কথা বলা আছে। তিনি আরো বলেন, নারীদের এ ধরনের পোশাক পুরুষকে উত্তেজিত করছে। তাই এ সব নারী পাপ করছে। নারীদের উত্তম পোশাক হলো ওড়না। কিন্তু মেয়েরা ওড়না পরা ছেড়ে দিয়েছে। মন চায় লাথি মেরে ওই সব নারীকে গির্জা থেকে বের করে দেই (সূত্র- যুগান্তর ১ মার্চ ২০১৯)।

অপরাধীর যথাযথ বিচার হওয়া-অপরাধীরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী হলে অনেক সময় প্রশাসন তাদের রক্ষা করতে চেষ্টা করে, যেমনি সোনাগাজীর অধ্যক্ষকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এ জন্য অপরাধীকে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
দাম্পত্য জীবনে যৌন সম্পর্ককে অবহেলা না করা- দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের চাহিদার প্রতি লক্ষ রাখা। অতৃপ্ত দাম্পত্য জীবন হলে পরকীয়া বা অবৈধ কাজে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য নবী সা: বলেছেন, ‘কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে বিছানায় আহবান করে আর স্ত্রী যদি (শরিয়ত সমর্থিত ওজর ব্যতীত) ডাকে সাড়া না দেয়, ফেরেশতারা তাকে লানত করতে থাকে।’

সঠিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন- গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকলে কোনো নেতাকর্মী মনে করে আমি দলের জন্য অনেক কিছু করেছি। আমি দু’-একটি ধর্ষণ, যৌন হয়রানি করলে দল আমাকে রক্ষা করবে।
অভিভাবকদের সচেতন থাকা- সন্তানের আচরণ প্রত্যক্ষ করা, কোনো পরিবর্তন দেখলে তার কারণ খুঁজে বের করা, কারো প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ছে কি না, পড়লে কেন পড়ছে, কারো সাথে নির্জনে বা একাকী কক্ষে বা একাকী বেড়াতে দিতে বুঝে শুনে দিতে হবে। সন্তানকে বুঝাতে হবে, তোমার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাদের কাছে চাইবে, অন্যের কাছ থেকে আমাদের অগোচরে কোনো কিছু নেবে না। যৌন হয়রানির বিষয়গুলো বন্ধুর মতো সন্তানকে বোঝাতে হবে। কেউ এ ধরনের আচরণ করলে কিভাবে তা প্রতিরোধ করতে হয় সে কৌশল শেখানো। এ ধরনের কোনো কিছুর সম্মুখীন হলে লজ্জায় তা গোপন না রেখে বাবা-মাকে জানাতে হয়- তা সন্তানকে বুঝিয়ে বলতে হবে।

দারোয়ান, ড্রাইভার, শিক্ষক তারা অতি আদর করলে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। নির্জনে তাদের কক্ষে যেতে না দেয়া। ছাত্রছাত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের সংসারের তেমন কোনো দায়িত্ব থাকে না। তাদের বিনা প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার করতে না দেয়া। বয়ঃসন্ধিকালে তাদের ভালোভাবে খেয়াল রাখা, বাবা-মা তাদের কল্যাণকামী এ ধারণা তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া, আবেগের বশবর্তী হয়ে যারা বাবা-মাকে না জানিয়ে কোথাও গিয়ে দুঘর্টনার শিকার হয়েছে সে উদাহরণগুলো তাদের সামনে তুলে ধরা।

প্রচার মাধ্যম ও শিক্ষক, ইমাম, খতিবদের ভূমিকা- নাটক-সিনেমার মূল বিষয় থাকে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের প্রেম, এ অবস্থান থেকে সরে এসে নির্মাতাদের সামাজিক কাহিনীনির্ভর নাটক-সিনেমা তৈরি এবং ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কাহিনীনির্ভর নাটক তৈরি করা। নারীদের প্রতি পুরুষদের ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা। নারী-পুরুষ সবাই মানুষ, আল্লাহর সৃষ্টি, একে অপরের পরিপূরক এ ধারণা গড়ে তুলতে নাটক-সিনেমা, ইমাম, শিক্ষকদের ভূমিকা রাখা। গুগল, ইউটিউবে যে সব অশ্লীল সাইট রয়েছে, তা বন্ধ করা। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক, ইমাম, খতিবদের যেভাবে কাজে লাগানো হয়েছে- ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধেও তাদের কাজে লাগানো। সর্বোপরী ইসলামী ও নৈতিক শিক্ষাকে সম্প্রসারিত করে মানুষের নৈতিক মানকে উন্নীত করার মাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিরোধসহ অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা এবং ন্যায়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক : ফুলগাঁও ফাজিল মাদরাসা, লাকসাম