একজন নাট্যশিল্পীর উপন্যাসিক হয়ে ওঠার গল্প

Sep 18, 2019 02:17 pm
আবুল হায়াত

 

মিষ্টভাষী এ মানুষটির সমালোচনা খুবই কম। বরং প্রশংসার দিকটিই বেশি। এ প্রশংসা দর্শক-পাঠক মন থেকেই করেন। মানুষ বড় হলে তার সীমাবদ্ধতা থাকে না। তিনি উত্তমের সাথে যেমন, অধমের সাথেও তেমনি চলতে পারেন। মানুষকে অকপটে গ্রহণ করতে পারেন। এ বিষয়েও আবুল হায়াতের পছন্দ উন্নত মানের

শেষ বিকেলেই দিয়েছি ফোনটি। মোবাইলে। কবার বেজে যেতেই রিসিভ করলেন তিনি - হ্যালো। সালাম দিয়ে বললাম-আমি জাকির আবু জাফর। কবিতা জগতের মানুষ। হেসে দিলেন তিনি। বললেন- একজন কবির সাথে কথা হচ্ছে তবে!
বললাম- কবিতা লিখি যেহেতু বলতেই পারেন কবি।
কিন্তু আমাকে স্মরণ করেছেন কেনো?

কেনো স্মরণ করেছি সে কথাটিই বলি- প্রতি বছর রমজানের ঈদ উপলক্ষে একটি ম্যাগাজিন বার করি আমরা। ৬শ থেকে সাড়ে ৬শ পৃষ্ঠা হয় এ ম্যাগাজিনের কলেবর। পুরোটাই চার রঙা। এ ম্যাগাজিনে উপন্যাস লিখতে হবে আপনাকে।
মনে হয় কিছুটা বিস্মিত হলেন তিনি। আমি তো ওই অর্থে লেখক না। আবার উপন্যাস লেখার চিন্তাও করিনি। নাটক লিখি। লিখতে হয়। নাটক আমার পেশা এবং নেশা বলে লিখি। কিন্তু উপন্যাস কি করে লিখবো।

বললাম- যেহেতু নাটক লেখেন নিশ্চয় উপন্যাসও হবে। লিখতে হবে আপনাকে। এবারের ঈদ ম্যাগাজিনে আবুল হায়াতের একটি উপন্যাস আমি ছাপবোই।
খুব হাসলেন তিনি। বললেন- জোর করেই নেবেন মনে হচ্ছে!
হাসলাম আমিও। বললাম- পছন্দের মানুষের সাথে জোর করা অবৈধ কিছু হবে না। আর ভালো কাজে জোর করাতো জরুরি।
বুচ্ছি তর্কে হারানো কঠিন। কিন্তু আমার উপন্যাস লেখা আরো কঠিন।
কঠিনেরেই জয় করতে হবে আপনার বললাম।
দম নিলেন খানিক। বললেন- একটি কাজ করা যায় অবশ্য। দেখুন আপনার পছন্দ হয় কিনা।
আনন্দের সাথে বললাম- বলুন হায়াত ভাই।

বললেন- আমার একটি বড় নাটক আছে। নাটকটিকে আমি উপন্যাসে রূপ দিতে পারি। আশা করি বিষয়টি মন্দ হবে না।
আমি সহসা বললাম- খুব সুন্দর প্রস্তাব। খুবই ভালো। আপনি তাই করুন। নাটক হয়ে যাক উপন্যাস।
তিনি বললেন- একটি পথ পাওয়া গেলো তবে।
দেখি চেষ্টা করে কি দাঁড়ায়।

আমি বেশ আনন্দিত হলাম। ভাবলাম যেভাবেই হোক একটি উপন্যাস তো পাওয়া যাবে! কিছুটা শংকা যে ছিলো না এমন নয়। শংকাটি হলো- যদি উতরে না যায়? যদি সেটি নাটকের চরিত্রেই থেকে যায় কি হবে! এসব শংকা দ্বিধা ঝেড়ে ফেললাম অবশেষে। যা-ই হয় মন্দ হবে না- এইটুকু আসা করা যায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিকের ঈদ ম্যাগাজিন- যেখানে দেশের সব শ্রেষ্ঠ লেখকদের উপস্থিতি সেখানে কত কি ভাবতে হয়। ভাবছি আর নিজেকে শান্তনা দিচ্ছি। একরকম নিজেকে বোঝাচ্ছি যা হয় খারাপ হবে না।
সময়টি ২০০৮ সাল। রোজা শুরু হবার মাস দেড়েক আগের কথা। এই সময়টাই কথা হলো হায়াত ভাইয়ের সাথে। কদিন বাদে আবার ফোন দিলাম। দিলাম খবর নেবার জন্য। জিজ্ঞেস করলাম কতদূর এগুলেন?

বললেন- এখনো শুরুই করতে পারিনি। নাটকের স্যুটিং এ ব্যস্ত। তবে বিষয়টি আমি মাথায় রেখেছি।

বললাম- মাথায় রাখলেই হবে। কিন্তু আমাকে রোজা শুরু হবার আগেই দিতে হবে।
বললেন- আমার জন্য বিষয়টি খুব কঠিন। তবে আমি চেষ্টা করবো।
এভাবে গেলো আরো কটি দিন। তারপর আবার খবর নিলাম। আগের মতোই বললেন- শুরু করা যায়নি এখনো। তবে শুরু করবো খুব তাড়াতাড়ি। এদিকে রোজা কড়া নাড়ছে দরোজায়। সময় হাতে নেই মোটেই।
ঠিক দুদিন পরে ফোন দিলেন হায়াত ভাই। বললেন- একটি কাজ আমাকে করে দিন তো। কাজটি হলে আমার একটু সহজ হয়।

জিজ্ঞেস করলাম কি করতে হবে বলুন। নিশ্চয় করবো। বললেন- আমার স্ক্রিপটি একটু কম্পোজ করে দিন। চরিত্রগুলোর নাম এবং সময় ও উপকরণের যে বর্ণনা এগুলো কম্পোজ করার দরকার নেই। সংলাপগুলো কম্পোজ হবে। সেই সাথে আরেকটি কাজ করতে হবে- প্রতিটি সংলাপের নীচে একটু ফাঁকা রাখতে হবে। পারা যাবে না?
বললাম-আলবত পারা যাবে। স্ক্রিপটি কবে দেবেন?

বললেন- কাল সকালেই। গেটে সিকিউরিটির কাছে থাকবে। খামের উপর লেখা থাকবে আপনার নাম। বললাম ঠিক আছে তাই রাখুন। একজনকে পাঠিয়ে দেবো আমি।
পরদিন উদ্ধার হলো স্ক্রিপটি। এনেই দেয়া হলো কম্পোজে। জরুরি কম্পোজ। ফলে আমাদের কম্পিউটার বিভাগ দুতিন হাতে একদিনেই কম্পোজটি করে দিলো। একদিন পরেই ফোন দিলাম। হায়াত ভাই আপনার স্ক্রিপটি কম্পোজ হয়ে গেছে।
বেশ অবাক হলেন তিনি। এত দ্রুত কি করে সম্ভব!

বললাম- দৈনিক পত্রিকার কম্পোজ বিভাগ বেশ দ্রুততার সাথে কাজ করে। আপনারটি আরো দ্রুত হলো। আজই পাঠিয়ে দিচ্ছি আপনার বাসায়।

দিন পাঠিয়ে। আমি বাসায় আছি আজ। মনে হয় কাজটি এগিয়ে নিতে পারবো।
দ্রুত পাঠিয়ে দিলাম বাসায়। সাপ্তাখানিক পরেই ফোন পেলাম তার। ফোন রিসিভ করতেই বললেন- কাজটি হয়ে গেছে। লিখে ফেলেছি। পাঠিয়ে দিন কাউকে।
একটি বড়সড় খামে পাঠালেন উপন্যাসটি। যা একদা নাটক ছিলো। টেলিভিশনে প্রচারিতও হয়েছিলো। খামটি খুলে দেখি শিরোনাম বড় করে লেখা-‘আয়নায় মুখ।’

উপন্যাস পড়ে নিলাম সহসা। পড়ে আমার মনে জেগে থাকা কিঞ্চিৎ দ্বিধা এবং ভয় উবে গেলো মুহূর্তে। সেখানে জায়গা নিলো ভালোলাগা। এক অন্যরকম গল্প। অন্যরকম কাহিনী। নিজস্ব ভঙ্গিতে বলা। প্রবাহিত নদীর মতো কাহিনী গতিমান। ভাষা ঝরঝরে। সংলাপ দ্বিধাহীন। লুকোচুরি নেই কোথাও। স্বচ্ছতার উচ্ছ্বাসে কাহিনী অগ্রসরমান।
সেই থেকে শুরু। আয়নায় মুখ দিয়ে বারবার নিজেকে দেখার আনন্দে প্রত্যেক বছর জন্ম নিতে থাকে উপন্যাসের। ২০০৯ সালে লিখলেন- ‘প্রশ্ন।’ ২০১০ এ ‘উজান পাখি।’ পরের বছর- ‘মোহ।’ তারপরের বছর ‘পলাতক।’ ‘শোধ’ লিখলেন ২০১৩ তে। ২০১৪ সালে ‘রসিয়া’। ২০১৫তে ‘জলডোবা’। এভাবে পর্যায়ক্রমে লিখলেন- সুরুজ, মিতুর গল্প, বর্ণালী একাকীত্ব। এ বছর ২০১৯এ লিখলেন- ‘আষাঢ়ে’।

২০০৮ থেকে ২০১৯ মোট বারটি সংখ্যা হয়েছে আমাদের। প্রত্যেকটি সংখ্যায় উপন্যাস লিখেছেন তিনি। বাদ যায়নি একটি সংখ্যায়ও। আঙুলের করে গুণে দেখলাম একদম ১২টি সংখ্যায় ১২টি উপন্যাস ছাপা হয়েছে তাঁর। আমি খানিকটা অবাক। অবাক কারণ ১২ বছর ১২টি সংখ্যা এবং সবকটি সংখ্যায় একজন লেখক লিখে যাওয়া খুব সহজ বিষয় কি? মোটেই না। একে অনেকটা কঠিন কাজই বলতে হবে। এই কঠিন কাজটি বেশ সহজেই করেছেন আবুল হায়াত। তার নাটকের অসম্ভব ব্যস্ততার ভেতর লেখালেখিকে সংগী করেছেন- তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারা যায় না।

দূর থেকে দেখা কাছের মানুষ আবুল হায়াত সত্যিই একদিন আমার কাছের হয়ে উঠলেন। উঠলেন এই লেখালেখির সূত্রে। আমি একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। দায়িত্বের খাতিরে পত্রিকার সব বিশেষ সংখ্যাগুলো আমাকেই সম্পাদনা করতে হয়। বিশেষ সংখ্যা মানেই বিশেষ আয়োজন। বিশেষ ব্যক্তিদের লেখায় সাজাতে হয়। এর মধ্যে ঈদ ম্যাগাজিন উল্লেখযোগ্য। ম্যাগাজিনে যারা লেখেন- প্রত্যেকে খ্যাতিমান। লেখক হিসেবে যেমন, তেমনি কর্মক্ষেত্রের ঔজ্জ্বল্যে।
আবুল হায়াত অভিনয় জগতের যেহেতু তারকা এবং তিনি নাটক লেখেন। পত্রপত্রিকায় নিবন্ধও লেখেন। আমার মাথায় এলো এমন করে তাকে দিয়ে উপন্যাস লেখানো সম্ভব। প্রস্তাব করি তাকে। তিনি বেশ সানন্দে গ্রহণ করলেন প্রস্তাবটি।

লিখলেন তিনি। এর আগে তিনি উপন্যাস লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই। তবে সম্ভবত আয়নায় মুখই তার প্রথম উপন্যাস। আমার প্রবল আকাক্সক্ষা থেকে শুরু হলো তার উপন্যাস লেখার যাত্রা এবং আমিই সেটি ছেপেছি। এভাবে তার উপন্যাস ভুবনের সমৃদ্ধি। নয়া দিগন্তের ঈদ ম্যাগাজিন মানে তার উপন্যাসের উপস্থিতি। তিনিও আন্তরিক বেশ। লেখালেখির বিষয়ে তার প্রবল ভালোবাসা লক্ষ করেছি। তিনি অভিনয় নিয়ে দারুণ ব্যস্ত সময় কাটান। বিজ্ঞাপনে মডেলিংও তার ব্যস্ততার আরো একটি কারণ।

এত ব্যস্ততার ভেতর লেখালেখির পক্ষে সময় খরচ করা সত্যিই কঠিন বটে। এর জন্য প্রবল ভালোবাসা না থাকলে হয় না। হয় না কারণ লেখালেখি নিখাঁদ প্রেম দাবি করে। প্রেমে ঘাটতি হলে লেখালেখি হয় না। হবে না। হয়তো এমন অভিনেতা অভিনেত্রী আছেন যাদের অবসর সময় আছে। তারা সে অবসর সময় বিনা প্রয়োজনে খরচ করে ফেলে। আড্ডায় আসরে অথবা সপিং করে সময় লুটিয়ে দেয় অতীতের দিকে। আবুল হায়াত এখানে ব্যতিক্রম। আলাদা। আলাদা কারণ তিনি সুটিংয়ের মাঝেও সামান্য সময় পেলে সে সময়টুকু কাজে লাগানোর বিষয়ে সদা তৎপর। তিনি ভাবেন সময় তো হাত ফসকে চলেই যাচ্ছে। যে যাচ্ছে সে তো ফিরবে না। ছোট একটি জীবন। দেখতে দেখতে এর সমাপ্তি ঘটে যায়। সুতরাং সময়কে যতটা কাজে লাগানো যায় ততটাই আনন্দের। আসলে সময়ের সমষ্টিই জীবন। টিকটিক করে সময় খসে যাচ্ছে। ঝরে যাচ্ছে বৃষ্টির মতো। এ ঝরে যাওয়া সময়কে জমিয়ে রাখার একটিই পথ- কাজ আর কাজ। কাজের সমৃদ্ধির ভেতর সময় জমে থাকে। কাজ কথা বলে জীবনের পক্ষে। সত্যিকারার্থে কাজই জীবন।

কাজের সমষ্টিই জীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপ। সুতরাং সময়কে কাজের ফ্রেমে বন্দী করার কৌশলে যারা পোক্ত তাদের জীবন সার্থক। তারা কাজের ভেতর জীবনের শিল্প নির্মাণ করেন। কাজ তাদের পক্ষে জীবনের অর্থ হয়ে ওঠে।

আবুল হায়াত এ বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করেন। করেন বলেই তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি তার লেখকসত্তাকে জাগিয়ে তুলছেন। লেখক হয়ে বেঁচে থাকার সাধনা করছেন। তার বই বের হচ্ছে নিয়মিত। একুশের বইমেলায় প্রায় প্রতি বছর বই প্রকাশ হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই ছোট নয়। অনেকেই আছেন যারা শুধু লেখক হিসেবেই পরিচিত। অথচ এমন লেখকদেরও প্রতি মেলায় বই বের হয় না।

লেখালেখিটা অন্তরের গভীর টান থেকে হয়। হৃদয়ের একান্ত ভালোবাসা থেকে হয় এবং তীক্ষè অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের ভেতর দিয়ে হয়। এসব হয় মানুষের ভালোবাসা এবং সমাজের প্রতি দায় থেকে। জীবনের প্রতি বিশ্বস্ত মানুষ লেখক হতে পারেন। যারা জীবনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য অথবা নিজের প্রতি অবহেলার ঘোর তামাশা প্রদর্শন করেন, জীবনকে ইয়ার্কির বিষয় ভাবেন তাদের পক্ষে আর যাই হোক লেখালেখি সম্ভব নয়। আবুল হায়াত একে সম্ভব করে তুলেছেন।

যিনি লেখক ধরেই নিতে হবে তিনি জীবনকে জীবনের কাছে রাখতে চান। জীবনকে জীবন দিয়ে বুঝতে চান এবং জীবনের সাথে জুড়ে দিতে চান স্বপ্নের সীমাহীন সীমানা। আবুল হায়াত তেমনি একজন লেখক বলে আমার মনে হয়। তিনি সমাজের অসঙ্গতিকে নাটক ও উপন্যাসে তুলে আনেন। সমাজকে দেখিয়ে দেন- এই যে সমাজ দেখো তোমার শরীরে কী অসঙ্গতি। কী অনাচার। মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে মানুষ।

জীবনের বিরুদ্ধে খড়গ হয়েছে জীবন। পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে পরিবার। এভাবে সমাজ চলে না। চলতে পারে না। সমাজকে দায়বদ্ধ হতে হয় মানুষের কাছে। মানুষের কাছে মানুষের সম্মান অক্ষুণ্ন থাকতে হয়। এভাবে আবুল হায়াত সমাজের অসুন্দরকে সুন্দরের দিকে ডাকেন।

তার লেখার উপস্থাপনা তার মতোই নিজস্ব। তিনি কাহিনী বর্ণনা করেন সরাসরি। কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই। আড়াল নেই। কাহিনীর প্রয়োজনে এগিয়ে যায় কাহিনী। বর্ণনা মেদহীন। নিটোল এবং স্বচ্ছ। কথার বাহুল্য যেমন নেই। তেমনি নেই ঘটনার বাড়াবাড়ি। গল্পই পাঠককে টেনে নেয় সামনের দিকে। একটি গল্পে তার পর কী ঘটছে? এমন প্রশ্নে পাঠক একটি অনুমান করেন। যদি অনুমানের সাথে মিলে যায় তবে এখানে লেখক ব্যর্থ এবং পাঠকের আগ্রহও কমে যায়। পাঠক আগেই কল্পনায় কাহিনী পড়ে ফেললে লেখকের লেখা কেন পড়বে? হায়াত ভাইয়ের গল্পের এখানে মুনশিয়ানা রয়েছে। তার গল্পের কাহিনী আগাম কল্পনা করা যায় না। বরং তারপর কী তারপর কী এমন প্রশ্নে পাঠক কৌতূহলী হয়ে ওঠে। কল্পনার বাইরে যখন পাঠক কাহিনীটি আবিষ্কার করেন তখন আনন্দটা অন্যরকম হয়। লেখকের প্রতি শ্রদ্ধার ভারটি ভারী হতেই থাকে। এমন লেখকের আরো নতুন লেখার সন্ধান করেন পাঠক। আসরে আড্ডায় এ ধরনের লেখক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেন। হায়াত ভাই তেমনি একজন কাহিনীকার। যাকে নিয়ে আলোচনা করা যায়।

লেখালেখি কষ্টের কাজ। অনেক শ্রম ও মেধা বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে এখানে। গদ্য লেখার কাজটিতে শ্রম মেধার পাশাপাশি সময়ের পুঁজি লাগে বেশ। হায়াত ভাই এসব মেনেই তার লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। আরো উপন্যাস লিখেছেন তিনি। একটি উপন্যাস প্রকাশ করেছে প্রিয় বাংলা প্রকাশন। গল্পও লিখছেন তিনি। লিখছেন পত্রিকায় কলাম এবং নিবন্ধ। তার লেখালেখির এই জগৎটিও বেশ বড় হয়ে উঠছে। কাজের প্রতি এক ধরনের নেশা আছে তাঁর। সেই নেশাই তাকে এগিয়ে দিচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। যেমন অভিনেতা আবুল হায়াত তেমনি কথাশিল্পী আবুল হায়াত। তার এ লেখার স্রোতধারাটি বেগবান হবে আরো-এটাই কামনা করি।

২.
টেলিভিশনের পর্দায় প্রথম দেখা। দেখেই মনে হলো তিনি আমার চেনা জগতের কেউ। মনে হলো আমার সাথে যোগসূত্রের কোনো সেতুজুড়ে আছেন তিনি। কেন এমন মনে হলো? কোন সেতু তার সাথে আমার! আমি কবিতার জগতের মানুষ। তিনি অভিনয়ের। নাটকের। দু’টি শিল্পের দূরবর্তী কোনো বিন্দু হয়তো এক। এক বলেই তার অভিনয় আমাকে হৃদয়ের তীর থেকে দুলিয়েছে। আমি দুলেছি এবং আজো দুলছি। দুলতে দুলতে এমন এক আবেগ মথিত করে, যেখানে আমাদের আত্মার সম্পর্ক বেজে ওঠে।

তিনি আবুল হায়াত। একজন ওজস্বী অভিনেতা। বর্ষীয়ান নাট্যশিল্পী। প্রাণের গহিনে সাড়া জাগানোর মতো একজন তিনি। তাকে দেখে এ কথাটিই মনে হলো বারবার। অভিনয় তার রক্তের সাথে মিশে আছে। স্পন্দনের সাথে জড়িয়ে আছে। জীবন এবং অভিনয় জড়িয়ে মুড়িয়ে একাকার। এভাবে তিনি জীবনকে অভিনয়ের সাথে এবং অভিনয়কে জীবনের সাথে মাখামাখির আনন্দে জাগিয়ে তুলেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, অভিনয় শুধু শিল্প নয়- এ যে জীবনেরই আরেক রূপ। যদিও জীবন কোনো নাটক নয়। কিন্তু এ কথা তো সত্য, জীবন নিয়েই নাটক। যিনি নাট্যশিল্পী, তিনি জীবনেরই শিল্পী। জীবনকে শিল্পের রঙে রাঙান তিনি। আবুল হায়াত তেমনি একজন শিল্পী যিনি নাটকের রঙে জীবনকে রাঙিয়ে তোলেন।

আবুল হায়াতের অভিনয়ের যে দিকটি মুগ্ধতার, তা হলো সাবলীলতা। স্বতঃস্ফূর্ততা জীবন্ত এবং প্রাণবন্ত প্রকাশ। তার অভিনয় অভিনয়ের জায়গায় থাকে না। অভিনয় ছাপিয়ে সেটি হয়ে ওঠে শিল্পের অনুষঙ্গ। মনে হয় এ-ই তো বাস্তব। এ-ই তো জীবন। নাটক হয়ে ওঠে সত্য ঘটনার অনুরূপ। জীবনকে এভাবে জাগিয়ে দেয়ার কৌশল এবং অবাস্তব কল্পনাকে বাস্তবতার শিরায় স্পন্দিত করা খুব সহজ কাজ নয়। একজন শক্তিমান অভিনেতা না হলে এটি সম্ভব নয়। একজন প্রখর ধীমান অভিনেতা হলেই কেবল গোটা জীবনকে অভিনয়ের ভেতর দিয়ে নির্মাণ করা যায়।

প্রতিটি শিল্পের একটি গাম্ভীর্য থাকে। যেমন থাকে তার শৈল্পিক সৌন্দর্য। গাম্ভীর্য এবং সৌন্দর্য মিলে প্রস্তুত হয় শিল্পের আত্মা। এ আত্মা নির্মাণ করতে হয়। তাকে উপলব্ধির আওতায় আনতে হয়। শিল্পের আত্মাকে স্পর্শ করার মাধ্যমও মানবীয় আত্মা। খুব কম শিল্পীর পক্ষেই শিল্পের আত্মা নির্মাণ করা সম্ভব হয়। আবার সে আত্মাকে স্পর্শ করার আত্মাও থাকে না সব শিল্পীর। আবুল হায়াত সেই ভাগ্যবান শিল্পীদের একজন যিনি শিল্পের আত্মা নির্মাণ করেছেন এবং শিল্পের আত্মাকে আপন আত্মার স্পর্শে স্পন্দিত করেছেন। তার অভিনয়ে লোক দেখানো প্রবণতা নেই। আরোপিত বিষয় নেই। জোর করে অভিনয়ের চেষ্টা নেই। ফলে তার অভিনয় যে কারো হৃদয়ে লাগে। মনে টোকা দেয় এবং খুব সহজে দর্শক অভিনয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবতায় হাজির করে নিজেকে। তখন নাটককে নিজের জীবন অথবা দেখা জীবনের সাথে মেলাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে দর্শক। খুব কাছে ভাবে জীবনকে। বলে এইতো জীবন। এইতো জীবনের বাস্তবতা।

অভিনেতা আবুল হায়াতের মতো ব্যক্তি আবুল হায়াতও স্বতঃস্ফূর্ত। যতদূর দেখেছি তিনি অকপট। তিনি ভনিতার আশ্রয় নেন না। ভেতরটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন না। তিনি জীবন নিয়ে অভিনয় করেন। কিন্তু জীবনের সাথে অভিনয় থেকে দূরে থাকেন। শঠতা কপটতা এবং স্বার্থপরতায় ডুবে আছে আমাদের সমাজ। লোভের লালায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখে মানুষ। সমাজের এসব দুর্বলতা এবং আত্মঘাতী প্রবণতার বিষয়ে তিনি সচেতন। এসব নিয়ে আছে তার অন্তর্জ্বালা। তিনি এসব থেকে সমাজের মুক্তি চান। মানুষ যেন মানুষের মতো বেঁচে থাকার সুযোগ পায়- এমন কামনাই তার। সমাজের দুর্বৃত্তপনা এবং অবিচারী মনোভঙ্গীর ঘোরতরো বিরুদ্ধে তিনি।

মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ এবং মানুষের কল্যাণ কামনা করার সুন্দর মন তাকে দিয়েছে অনন্যতা। আমাদের শিল্পাঙ্গনে খ্যাতিমান যারা তাদের এক ধরনের অহঙ্কার থাকে। যদি সে অহঙ্কার শিল্পের প্রয়োজনে হয়, সেটি জরুরি এবং সুন্দর। কিন্তু অহঙ্কার যখন খ্যাতির নকশাকে জ্বলন্ত করে, তাকে অসুন্দর বিনে আর কী আখ্যা দেয়া যায়! আমাদের শিল্পীরা এ অহঙ্কারে নিজেদের চার পাশে তুলে রাখে উন্নাসিকতার দেয়াল। যে দেয়াল ভেদ করা সাধারণের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবুল হায়াত এসব অসুন্দর অহঙ্কারের দেয়াল থেকে মুক্ত। তিনি মূলত এসবের ঊর্ধ্বে উঠে অভিনয় শিল্পকে নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন।

আবুল হায়াত একজন অমায়িক মানুষ। মিষ্টিভাষী এবং কোমল। ছোট থেকে বড় সবার সাথে প্রায় সমান ব্যবহার করার সৌন্দর্য তাকে দর্শকপ্রিয়তা দিয়েছে অধিক। তিনি মানবিক। মানুষের পক্ষে তার উচ্চারণ। জীবনকে খুব সিরিয়াসলি যেমন গ্রহণ করেন না, তেমনি জীবন যে হেলাফেলার বিষয় নয় সে উপলব্ধিও তার পুরোমাত্রায়। ফলে জীবন ও অভিনয়ের মাঝে একটি ভারসাম্য রেখে পথ চলছেন তিনি।

যতদূর জানি পরিবারেও তিনি একজন আদর্শ স্বামী। আদর্শ পিতা। আমাদের অভিনয়শিল্পী, চিত্রশিল্পী এবং কবি-সাহিত্যিকদের বেশির ভাগের পরিবার থাকে না। যদিও থাকে অশান্তিতে ভরা। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাটি, অবিশ্বাস, সন্তানদের অসম্মানভরা দৃষ্টি এবং প্রতিবেশীর ঘৃণা ও অবহেলায় জর্জরিত। আবুল হায়াত এসব দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত। এটি জীবনের একটি নিবিড় আনন্দ, যা একজন শিল্পীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপনে সহায়তা দেয়।

আবুল হায়াত যেমন অভিনেতা, তেমনি নাট্যকার। তার নাটক রচনার কৌশলও তার নিজস্ব। তিনি সহজ সরল সংলাপে জীবনের কঠিন বাস্তবতা তুলে আনেন। সহজে জীবনের গভীরতা দেখিয়ে দেয়ার শক্তি সব নাট্যকারের থাকে না। তার আছে এবং এটি তার সহজাত। গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখার প্রবণতা তাকে সহজ করে তুলেছে। জীবন যতই দুরূহ হোক তিনি জীবনকে সহজে গ্রহণ করেন। সহজে উপস্থাপন করেন। প্রকাশ করেন সহজেই। দর্শক তাই তার হাসির সাথে হাসে। কান্নার সাথে কেঁদে ফেলে। হাসি আর কান্নার সহজাত বিষয় যখন নাটকের অনুষঙ্গ হয়, সে নাটক দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। আবুল হায়াত রচিত নাটকগুলো তেমনি দর্শকপ্রিয়তায় ঋদ্ধ।

আবুল হায়াতকে টিভির পর্দায় দেখে বেশ আপন মনে হলেও তার এত কাছে আসব এটি ভাবিনি। ভাবা কি আর যায়? জীবনের ঘটনাচক্র কাকে কোথায় হাজির করে, কাকে কোন পথে দাঁড় করিয়ে দেয় কে বলতে পারে! জীবন তো অনিশ্চিত ভ্রমণ। এর স্টেশন কেবলি অচিন। এর নিজস্ব ঠিকানাও কি আছে? কে দেবে ঠিকানা? কার কাছে থাকে এই ঠিকানার হদিস। অচেনা স্টেশনের যাত্রী হয়ে ছুটতে হয়। কেবলি ছোটাছুটির খেলা। ছুটতে ছুটতে কোনো কোনো পথের বাঁকে সাক্ষাৎ ঘটে কারো। সেই সাক্ষাতে কেউ কাছের হয়ে ওঠে। কেউবা দূরে থেকে যায়। কেউ চির চেনার মতো আপন হয়ে ওঠে। কেউ ফের চির অচেনার দিকে থেকে যায়। চেনা অচেনার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে জীবন ঘোরে এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে।

চলতে চলতে জীবনের ঘূর্ণি জাগে। এ ঘূর্ণির তোড়ে অনেক কাছের মানুষ দূরের হয়ে ওঠে। আবার অনেক দূরের মানুষ হয়ে যায় কাছের একজন। মানুষের জীবনে এমন ঘটনাই বেশি ঘটে যা মানুষ ভাবে না। অথবা ভাবতে পারে না। কিংবা ভাবার মতো অবকাশও থাকে না।
মিষ্টভাষী এ মানুষটির সমালোচনা খুবই কম। বরং প্রশংসার দিকটিই বেশি। এ প্রশংসা দর্শক-পাঠক মন থেকেই করেন। মানুষ বড় হলে তার সীমাবদ্ধতা থাকে না। তিনি উত্তমের সাথে যেমন, অধমের সাথেও তেমনি চলতে পারেন। মানুষকে অকপটে গ্রহণ করতে পারেন। এ বিষয়েও আবুল হায়াতের পছন্দ উন্নত মানের।

তিনি একজন রুচিবান মানুষ। চলনে বলনে পরিমিত। পোশাকে আশাকে নান্দনিক। ব্যবহারে নম্র এবং আচরণে ভদ্রতার সৌন্দর্য কারো চোখ এড়ায় না। এক ধরনের নির্ভেজাল জীবনযাপন করেন তিনি। মানুষকে অমানুষ হতে দেখলে ভীষণ কষ্ট পান। ভদ্র পোশাকধারী মানুষগুলো যখন অভদ্রতার অসুন্দরে মেতে ওঠেন কষ্ট পান। সুশীল সমাজের লোকেরা যখন কুশীল হয়ে ওঠেন খুব কষ্ট পান। একজন মানুষ যখন ভেতর থেকে মানবিক হন তখন এ কষ্ট অনুভব করেন। আবুল হায়াত একজন মানবিক মানুষ।

কারো প্রতি বিদ্বেষ অথবা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেন না তিনি। ঈর্ষায় কাতর হতেও দেখিনি তাকে। ঘৃণা ছড়ানো থেকে বিরত থাকেন। পরচর্চার মতো অসুন্দর তার কাছে নেই। তিনি যতটা সম্ভব কোমলতার ভেতর নিজের আনন্দকে জাগিয়ে রাখতে চান। তার আছে নিজস্ব জগত। যে জগৎ তাকে পরিশীলিত পরিমার্জিত ও নান্দনিক করে তুলেছে। যে জগত তাকে করেছে একজন অনুকরণীয় শিল্পী। যেখানে ছড়িয়ে আছে তার নিপুণ সৌন্দর্য।