যেভাবে সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাদশাহ আবদুল আযীয আল সউদ

Sep 23, 2019 12:58 pm
বাদশাহ আবদুল আযীয আল সউদ

 

আধুনিক সউদী আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আযীয বিন আবদুর রহমান বিন ফয়সাল বিন তুর্কি বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ আল সউদ হিজরী ১২৯৩ সালের ১৯ জিলহজ রাতে (১৪-০১-১৮৭৬ ঈসায়ী) রিয়াদের রাজ প্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা তাঁকে সঠিক ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন। ছয় বছর বয়সে তিনি বিখ্যাত শাইখ আবদুল্লাহ আল-খুরাইজির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১১ বছর বয়সেই কুরআন হিফজ সমাপ্ত করেন। পরবর্তীকালে তিনি বিভিন্ন আলেমের কাছ থেকে তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ, তাওহীদ, আরবী ভাষা, সীরাতুন্নাবী ও ইসলামের ইতিহাস ইত্যাদি অধ্যয়ন করেন।

লেখাপড়ার পাশাপাশি আবদুল আযীয তার পিতার সাথে বিভিন্ন সভা-সমিতি, বৈঠক ও সফরে যেতেন ও সেখানে বিভিন্ন বৈষয়িক বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। সাথে সাথে অশ্ব চালানো ও যুদ্ধ কৌশলও রপ্ত করেন। তার পিতার সাথে কুয়েতে অবস্থানকালে তৎকালীন কুয়েতের রাজা মুবারক আছছবাহর (১৩০৯ হি.) কর্মকাণ্ড, শাসনকার্য ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

পরবর্তীতে তিনি শাইখ আবদুল্লাহ আবদুল লতিফ আল-আশ-শায়েখের নিকট থেকে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর পরিবার কুয়েত থেকে ফেরার পথে মুররাহ উপজাতির সাথে অবস্থান করার সময় প্রায় সাত মাস অশ্ব চালানো শেখেন। সেখানে তিনি ১০ বছর অবস্থান করেন। সউদী আরব নামক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তিনি অদম্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। রাজ্যগুলো একত্রকরণে তিনি ছিলেন আদর্শ ব্যক্তি। সেটির জন্য তিনি অব্যাহতভাবে সংগ্রাম করেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ, মজলিসে শূরা, ট্রাস্টি পরিষদ ও অন্যান্য প্রশাসনিক দফতর গঠন করেন। বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও স্বাধীনতাকে রক্ষা করেন। যা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। নিকটতম আরব রাষ্ট্র ইরাক, ইয়েমেন, মিসরসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ থেকে তিনি তার রাজ্য চালনায় দৃঢ় সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন। বাদশাহ আবদুল আযীয যুদ্ধক্ষেত্র অত্যন্ত ধার্মিকতা ও বদান্যতার পরিচয় দেন বিধায় তিনি শত্রুদের পরাজিত করতে সক্ষম হন। তাদেরকে বের করে দেয়ার পরিবর্তে তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করেন। হিজাযের অধিবাসীদেরকে তিনি স্বাধীনতা ও নিজস্ব বিষয়ে শাসন করার ক্ষমতা প্রদান করেছেন।

একজন বুদ্ধিমান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি প্রথম সউদী রাষ্ট্রের ভুলগুলো বুঝতে পারেন। এ কারণে তাঁর রাজ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় ঝুঁকি নিতে হয়নি। সউদী আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আযীয বিন আবদুর রহমান আল সাউদ যখন ১৩৪৩ হিজরীতে হিজায তথা বর্তমান মক্কায় প্রবেশ করেন তখন তিনি দেখলেন, হারামে মাক্কীতে কয়েকটি সালাতের জামায়াত হয়। প্রথম জামায়াতে ইমামতি করেন শাফেয়ি মাযহাবের ইমাম। দ্বিতীয় জামায়াতে ইমামতি করেন হানাফি মাযহাবের ইমাম। তৃতীয় জামায়াতে ইমামতি করেন মালিকী মাযহাবের ইমাম এবং চতুর্থ জামায়াতে ইমামতি করেন হাম্বলি মাযহাবের ইমাম। এরপর ১৩৪৫ হিজরীর ২০ রবিউল আখের নাজদ ও হিজাযের উলামাদের একটি দলের সাথে বৈঠক করেন। সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে মসজিদে হারামে শুধু একটি জামায়াত হবে। প্রতি মাযহাব থেকে তিনজন ও হাম্বলি মাযহাব থেকে দুইজন ইমাম নির্বাচন করেন। যারা পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ইমামতি করবেন। এভাবেই আল্লাহ তায়ালা মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক কাবাকে হেফাজত করেছেন।

বাদশাহ আবদুল আযীয এবং তেল যুগ
ঊনবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের শুরুর দিকে সউদী রাষ্ট্রের অর্থনীতি কঠিন অবস্থার দিকে গিয়েছিল। সেটি কয়েক বছর স্থায়ী ছিল। ব্যক্তিগত আয় ছিল নি¤œমানের এবং রাষ্ট্রের আয় ছিল স্বল্প। সরকার ঋণী হয়ে পড়েছিল। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দেয়া সম্ভব ছিল না। আবদুল আযীয এবং তাঁর উপদেষ্টারা এটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং এ সঙ্কটের সমাধান খুঁজছিলেন। তারা খনিজ সম্পদ ও তেল অনুসন্ধানের চিন্তা করলেন।

দীর্ঘ সময়ব্যাপী অভিজ্ঞ লোকজনদের সাথে আলোচনার পর ১৯৩৩ সালে সউদী সরকার ক্যালিফোর্নিয়া স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির সাথে প্রায় ৪৯৫ হাজার ৫০০ বর্গমাইল এলাকার তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদনের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন। রাজ্যের পূর্ব উপকূল থেকে তেল অনুসন্ধান কার্য শুরু হয়। ১৯৩৪ সালে দাহরান এলাকার সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। প্রথম অপরিশোধিত তেল জাহাজের মাধ্যমে বাহরাইনে রফতানি করা হয় এবং ১৯৩৯ সালে বাদশাহ আবদুল আযীযের উপস্থিতিতে রা’স তান্নুরা বন্দর থেকে তেল ট্যাংকারে করে রফতানি করা হয়। এ আবিষ্কার ছিল জমিন এবং সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক গ্যাস আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ১৯৪৪ সালে পূর্বের নাম পরিবর্তন করে অ্যারাবিয়ান আমেরিকান তেল কোম্পানি করা হয়।

রাজ্য শাসনের মূলনীতি
তিনি সাতটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে রাজ্য শাসন করতেন। ১. আল্লাহর কিতাব ও নবী মুহাম্মাদ সা:-এর সুন্নাহ অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করা ২. বিদআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ৩. পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টাকারী, পাপাচারী অপরাধীকে শাস্তি প্রদান ৪. জনগণের সামাজিক দায়-দায়িত্ব গ্রহণ ৫. জনগণের সম্মানজনক জীবনযাত্রার পথ সহজীকরণ ৬. অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরাপত্তা সংরক্ষণ ৭. কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনুপ্রবেশ না করা।

মৃত্যু
বিশ্বকাঁপানো আরব বাজপাখি নামে খ্যাত ইতিহাস সৃষ্টিকারী বাদশাহ আবদুল আযীয ১৩৭৩ হিজরী সালের ২ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১৯৫৩ সালের ৯ নভেম্বর সোমবার সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তায়েফস্থ তাঁর প্রাসাদে ইন্তেকাল করেন।