হজরত মহল : এক স্বাধীনতা যোদ্ধার অজানা কাহিনী

Sep 25, 2019 08:56 pm
হজরত মহল

 

বাগবাজারের আবদুল শামিমের বসার ঘরের দেয়ালে একসময় প্রচুর অলঙ্কার ও ঢিলেঢালা পোশাক পরিহিতা এক নারীর সাদা-কালো ছবি বাঁধাই করা ছিল।

‘দাদা, ইনি কে?’ শামিম প্রায়ই জানতে চাইতেন।
‘তিনি আমাদের রানি,’ শামিমের দাদা জবাব দিতেন।
কেবল বড় হওয়ার পরই শামিম জানতে পারেন, এই নারী হলেন বিখ্যাত বেগম হজরত মহল, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ত্রাস।

হজরত মহল ছিলেন বর্তমান উত্তর প্রদেশের একটি রাজন্য শাসিত রাজ্য আউধের রানি। তিনি ১৯৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন সিপাহি যুদ্ধে প্রবলভাবে অংশ নিয়েছিলেন।

ব্রিটিম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৫৬ সালে আউধের শাসক নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে কলকাতার বিলাসী জীবনে নির্বাসিত করেন। তার রানি বেগম মহল অবশ্য তাদের ১২ বছর বয়স্ক ছেলে বিরজিস কদরকে সিংহাসনে বসিয়ে দুই বছর ধরে বীর বিক্রমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। তারপর পালিয়ে গিয়ে নেপালে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তিনি একদল সাহায্যকারী ও সৈন্যদের নিয়ে নেপালে যান। এদের একজন ছিলেন শামিমের পূর্বসূরিরা।
শামিম বলেন, জং বাহাদুর রানা আশ্রয় দেন রানিকে। রানির সাথে আসা লোকজনকে বাগবাজার আর এর আশপাশের এলাকায় থাকতে দেয়া হয়। বেগম ইন্তিকাল করলে তাকে জামে মসজিদ প্রাঙ্গনে দাফন করা হয়। পরে তার ছেলে বিরজিস কদর ফিরে যান কলকাতায়।

কিন্তু বেগম ও তার ছেলের কাঠমান্ডুতে অবস্থান সম্পর্কে এটুকু তথ্যই জানতেন ৫১ বছরের শামিম।বস্তুত এমন অবস্থা কেবল শামিমের নয়। স্থানীয় অন্যরা, তা ৪৯ বছর বয়স্ক মনসুর হোসাইন, ৫৮ বছর বয়স্ক মকবুল হোসাইন বা ৮১ বছর বয়স্ক রাহাত খঅন, কেউই এর চেয়ে বেশি জানেন না। বস্তুত, কাঠমান্ডুর ছোট্ট মুসলিম সম্প্রদায়ের সব সদস্য- বেগম মহল ও বিরজিস কদরের ঘনিষ্ঠ সম্প্রদায়-এসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবন সম্পর্কে একই গল্পের সামান্য পরিবর্তিত রূপ বলতে পারেন।

কোনো কোনো ভাষ্যে বলা হয় বেগম মহল ছিলেন নেপালি। কুমার ঘিসিংয়ের দুন ঘাটি-নালাপানি ও অমৃতলাল নগরের গাদার কি ফুলে এই কাহিনীই বলা আছে।তারা দাবি করে থাকেন যে ওয়াজিদ আলী শাহের প্রাসাদে ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি হয়েছিলেন তিনি। পরে নবাব তাকে বিয়ে করেন। আর ছেলে সন্তানের জন্ম দানের পর নবাব তাকে বেগম উপাধিতে ভূষিত করেন। এই ভাষ্যে বলা হয়, বেগমের নেপালি শেকড়ের কারণেই তিনি আশ্রয়স্থল হিসেবে কাঠমান্ডুকে বাছাই করে নিয়েছিলেন।

বেগম যে নেপালি ছিলেন, তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। এ কারণে তার ও তার সন্তানের কাঠমান্ডু নিয়ে প্রচারিত তথ্য অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে। তার সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তা সত্ত্বেও হজরত মহল ভারতের স্বাধীনতা যোদ্ধা হিসেবে শ্রদ্ধেয়। কাঠমান্ডুতে তার ও তার ছেলের জীবন কাহিনী হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ শাসন বা প্রভাবে ঊনিশ শতকের দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি অধ্যায়।

বিস্মৃত কবর ও ইতিহাস
তবে ১৯৫০ সাল নাগাদ হজরত মহল ও তার ছেলের সম্পর্কে প্রামাণিক নথির অভাব অনুভূত হয়। ১৯৫০ সালে গদর কি ফুল নামের গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ সম্পর্কে মুখে মুখে প্রচারিত ইতিহাসের ভিত্তিতে। উত্তর প্রদেশের সাহিত্য ব্যক্তিত্ব অমৃতলাল নগর লিখেছেন যে ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ইতিহাস না থাকায় এই ইতিহাস লেখা হলো মৌখিক ঐতিহ্যের আলোকে।
বইটি প্রকাশিত হওয়ার কয়েক বছর পর একটি ঘটনা প্রকট করে দেয় কিভাবে সম্মিলিত স্মৃতি থেকে হজরত মহল বিস্মৃত হয়ে গেছেন। উত্তর প্রদেশ সরকার ১৮৫৭ সালের আন্দোলনের শতবর্ষ উদযাপনের সময় বেগমের সহযোদ্ধা নানা রাও, তাঁতিয়া টোপি ও রানি লক্ষ্মী বাইকে সম্মানিত করলেও এমনকি স্বাধীনতা যোদ্ধা হিসেবে হজরত মহলের নাম পর্যন্ত অন্তর্ভূক্ত করেনি।

বেগমকে স্বীকৃতি দিতে সরকারের অবহেলায় উদ্বিগ্ন হয়ে বিরজিস কদরের তিন নাতি আঞ্জুম কদর, কুতুব কদর ও নায়র কদর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহেরলাল নেহরুর সাথে সাক্ষাত করে হজরত মহলের ন্যায়সঙ্গত সম্মান দাবি করেন। পারিবারিক ওয়েবসাইটে কদরের বংশধরদের তালিকা সংরক্ষণ করা আছে। এতে আঞ্জুম কদর লিখেছেন, এই আলোচনার সময় উভয় পক্ষই একটি তথ্যে অবাক হয়ে যায় : সরকার বা বেগমের পরিবারের সদস্য- কেউ জানে না বেগমের কবর কোথায়।

হিন্দুস্তানি মসজিদের (বর্তমানে বাগবাজারের জামে মসজিদ, এটি কাশ্মিরি তাকিয়া নামে পরিচিত আরেকটি মসজিদের দক্ষিণে অবস্থিত) আঙ্গিনায় সমাহিত হওয়ার ৮০ বছর পর ভারত সরকার ও রানির পরিবার হজরত মহলের কবর অনুসন্ধান শুরু করে। নেহরুর নির্দেশনায় কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাস দ্রুত কবরটি শনাক্ত করে।
তারপর ১৯৫৯ সালে নায়ার কাঠমান্ডুতে যান সমাধিটি দেখতে। তিনি প্রধানমন্ত্রী বিপি কৈরালার সাথে সাক্ষাত করে স্থানটি সংরক্ষণের অনুরোধ করেন। তিনি স্থানীয় মুসলিমদের সাথেও সাক্ষাত করেন। তিনি আশা করেছিলেন, কাঠমান্ডুতে তিনি বেগমের জীবন সম্পর্কে কিছু জানতে পারবেন।
বিরজিস কদরের নাতির নাতি কলকাতাভিত্তিক মানজিলাত ফাতিমা আমাকে জানিয়েছেন যে তারা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি।

তবে বেগমের কবর আবিষ্কৃত হওয়ায় কাঠমান্ডুতে হজরত মহলের সাথে কাঠমান্ডুর সম্পর্ক থাকার বিষয়টি নতুন করে সামনে চলে আসে। সেইসাথে রানি ও তার ছেলের জীবনের অজানা অধ্যায় সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি করে।
সাংঘর্ষিক বিবরণ
ইতিহাসবদিদের মধ্যে সামান্যই সন্দেহ আছে যে রানি সাথে করে যে অলঙ্কার সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তার বিনিময়েই জং বাহাদুর তাকে আশ্রয় ও মাসিক ভাতা দিয়েছিলেন।
তবে, হজরত মহল কোথায় বাস করতেন, তা অনিশ্চিত। তিনিই হিন্দুস্তানি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়ে গেছে। এটি এখনো কাঠমান্ডুর সবচেয়ে বড় দুই মসজিদের একটি এবং কাঠমান্ডুর মুসলিম সম্প্রদায়ের কেন্দ্র।

বলা হয়ে থাকে, বার্ফবাগে হজরত মহলকে বসবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন জং বাহাদুর। পুরুষোত্তম এসজেবি রানার শ্রী তিন হারুকো তাথিয়া বৃত্তান্ত গ্রন্থে হজরত মহলের বাসস্থান হিসেবে দিকিনাকানিরার কথা বলা হয়েছে। স্থানটি থাপাথালি দরবারের প্রাঙ্গনে অবস্থিত। আবার কাজিম রিজভির ‘মিজারেবল কন্ডিশন অব দি গ্রেভ অব এ ওয়ারিয়র লেডি’ (মিলি গ্যাজেটে প্রকাশিত) প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে তিনি নিজেই ইমামবারার (শিয়া দরগা) কাছে নিজের প্রাসাদ ও একটি মসজিদ (হিন্দুস্তানি মসজিদ) নির্মাণ করেছিলেন।

রানার বর্ণনাটিই সত্য বলে মনে হয়। কারণ তার বক্তব্য লেখা হয়েছে খোদ জং বাহাদুরের অনুমোদনে লিখিত ইতিহাসের আলোকে। তবে বার্ফ বাগ স্থায়ী না অস্থায়ী আবাস ছিল তা বলা হয়নি। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে বার্ফ বাগে ছিল তার অস্থায়ী বাসভবন। পরে তিনি নিজের জন্য আলাদা বাসভবন গড়ে নিয়েছিলেন।

আরেকটি প্রশ্ন আছে। তিনি কি হিন্দুস্তানি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন না স্রেফ সংস্কার করেছিলেন? একটি সংস্করণে বলা হয়, শিয়া মুসলিম হিসেবে বেগম ইমামবারার কাছে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। রিজভি তার প্রবন্ধে লিখেছেন, প্রিন্স আঞ্জুম কদর আমাকে বলেন যে নেপালে অস্থানে সময় বেগম তার নিজের অর্থে একটি প্রাসাদ, একটি ইমামবারা ও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। অন্যান্য ভাষ্যে বলা হয়, ১৮৪৭-১৮৮৮ সময়কালে সুরেন্দ্র বিক্রম শাহের আমলে সরকারের দেয়া স্থানে তিনি এসব স্থাপনা নির্মাণ করেন। মৌখিক ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্রুনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আলফিয়ানি ফাদজাকিরের পিএইচডি থিসিস ‘দি মুসলিমস অব কাঠমান্ডু: অ্যা স্টাডি অব রিলিজিয়াস আইডেন্টিটি ইন এ হিন্দু কিংডম’ ও ইতিহাসবিদ প্রকাশ উপাধ্যায়ের গ্রন্থ সোস্যাল এনথ্রোগ্রাফি অব হিল মুসলিম অব নেপাল এ তথ্য দিচ্ছে।
দ্বিতীয় ভাষ্যে বলা হয়, সুধিন্দ্র শর্মার প্রবন্ধ ‘হাউ দি ক্রিসেন্ট ফেয়ারস ইন নেপাল’-এর তথ্য, শিয়া মুসলিমেরা নেপারে আসে প্রতাপ মাল্লার (১৬৪১-১৬৭৪) সময়কালে। তাদের কাশ্মিরি তাকিয়ার দক্ষিণে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে দেয়াহয়। ফলে বেগমের আসার আগেই হিন্দুস্তানি মসজিদটি অস্তিত্বশীল ছিল। বেগম এটির সংস্কারকাজ করেছিলেন। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের মুফতি সরফরাজ আলী শাহ, তিনি রানির সাথেই নেপালে প্রবেশ করেছিলেন, কাঠমান্ডুর শিয়া মসজিদটিকে সুন্নি মসজিদে রূপান্তরিত করেন।

স্বাধীনতা যোদ্ধার অপরিমেয় উদ্দীপনা
আরো একটি প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়নি। তা হলো, কাঠমান্ডুতে আশ্রয় নেয়ার পরও কি বেগম তার হারানো রাজ্য ব্রিটিশদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

ব্রিটিশদের হারানোর দুই বছরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর হজরত মহল তার শেষ উপায় হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন।
এদিকে বেগমকে আশ্রয় দিয়ে জং বাহাদুর ব্রিটিশদের ক্রোধ ডেকে আনেন। তবে তিনি উপনিবেশ শক্তিকে এই বলে শান্ত করেন যে আশ্রয় প্রার্থীকে আশ্রয় না দেয়াটা হিন্দু মূল্যবোধের পরিপন্থী। তিনি বেগমকে এই শর্তে আশ্রয় দেন যে তিনি সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকবেন।
কিন্তু এটা কি রানির মধ্যে থাকা যোদ্ধাকে সত্যিই থামাকে পেরেছিল? তিনি কি ভারতবর্ষের অন্যান্য বিদ্রোহ থেকে দূরে ছিলেন?
বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিখ সাম্রাজ্যের রানি জিন্দ কাউরের সাথে তার যোগাযোগের বিষয়টি অগোচরেই রয়ে গেছে। স্বামী মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের মৃত্যুর পর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করে কাউর দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। পরে তাকে গ্রেফতার ও বন্দী করা হয়। তবে তিনি পালিয়ে গিয়ে নেপালের রানা ও শাহ শাসকদের সাথে জোট গঠন করতে ১৮৪৯ সালে কাঠমান্ডু আসেন। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য চৌতারিয়া পুস্কর শাহের ছেলে অমর বিক্রম শাহের বাড়িতে বসবাস করেন। পরে তিনি জং বাহাদুর রানার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তত দিনে হজরত মহল ১০ বছর নেপালে বসবাস করে ফেলেছেন।

উভয় নারীই অভিন্ন চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হলেও তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল কিনা তা এখনো অস্পষ্টই রয়ে গেছে।

আউধের শেষ নবাবের অজানা জীবন
আরেকটি অজানা বিষয় হলো কাঠমান্ডুতে বিরজিস কদরের জীবন। আউধের দৃশ্যমান উত্তরসূরী হিসেবে বিরজিস কদর যখন কাঠমান্ডুতে নির্বাসিত হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। এখানেই তিনি তার প্রায় পুরো জীবন কাটিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও তার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় সামান্য কিছু।
১৮৬৯ সালে বিরজিস বিয়ে করেন নওয়াব মেহতাব আরা বেগমকে। তিনি ছিলেন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নাতি। বাহাদুর শাহ জাফরের ওই ছেলেও কাঠমান্ডুতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। গদর কি ফুলে নগর লিখেছেন যে এই দম্পতির আট সন্তান ছিল। পরিবারটি কলকাতায় পাড়ি জমানোর আগেই তাদের পাঁচজন মারা গিয়েছিলেন।

কবি হিসেবে বিরজিস রানির সঙ্গীদের মধ্যে থাকা কবিদের নিয়ে মেহফিলের আয়োজন করতেন। এতে কাঠমান্ডুর স্থানীয়রাও অংশ নিতেন। ৮৬ বছর বয়স্ক খাজা মোহাম্মদ মোয়াজ্জাম শাহ রাজা নিয়াজি তার নানার নানার লিখিত একটি হাতে লেখা ডায়েরি সংরক্ষণ করছেন। তিনিও ছিলেন মেহফিলে অংশগ্রহণকারীদের একজন্য। এতে বিরজিসের গজলগুলো রয়েছে। কিন্তু তার প্রবাস জীবন সম্পর্কে বলতে গেলে তেমন কিছুই নেই এতে।

ছিন্ন যোগাযোগ
ভারতের শ্রদ্ধেয় এক স্বাধীনতা যোদ্ধা ও তার ছেলের কাঠমান্ডুর জীবন কিভাবে হারিয়ে গেল? ওই সময় তারা অবশ্যই নেপালি রাজধানীতে আলোচিত ছিলেন। কিন্তু পরে স্থানীয় মুসলিমরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারা হারিয়ে যান। এমনটাই মনে করেন শামিম।

তবে ফাতিমা বলেন, কলকাতায় আসার কয়েক মাস পরেই বিরজিস কদর ও তার সন্তানেরা (তার গর্ভবতী স্ত্রী ও এক মেয়ে ছাড়া) খুন হয়ে যান। এর ফলেই কাঠমান্ডু কানেকশন হারিয়ে যায়।
বিরজিসের বাবা ওয়াজিদ আলী শাহ মারা যান ১৮৮৭ সালে। একই বছর রানি ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে বিরজিসকে ক্ষমা করে ব্রিটিশ সরকার। ১৮৯২ সালে নবাব আগমন করেন কলকাতা। ১৮৯৩ সালের আগস্টে পারিবারিক ভাষ্যে দেখা যায়, কদরের স্বজনেরা (তার বাবার পেনশনের ওপর তার দাবির কারণে এসব লোক হুমকি মনে করেছিলেন) তার ও তার সন্তানদের জন্য এক ভোজসভার আয়োজন করেন। এখানে তাদের বিষপ্রয়োগ করা হয়। তার গর্ভবতী স্ত্রী ও এক মেয়ে ভোজসভায় হাজির হননি অসুস্থতার কারণেই। তারাই বেঁচে গিয়েছিলেন।

ফাতিমা বলেন, মেহতাব আরা ও তার সন্তানদের জীবন স্পষ্টভাবেই হুমকির মুখে ছিল। তারা আক্ষরিক অর্থেই পরের কয়েক দশক স্বজনদের কাছ থেকে পালিয়ে ছিলেন। মেহতাব তার সন্তানদের সতর্কভাবে লালন করেছিলেন। তিনি বেগম বা বিরজিস কদর সম্পর্কে তেমন তথ্য দিতেন না। কারণ এতে তার সন্তানদের জীবন বিপদগ্রস্ত হতে পারত। ফলে আরো অনেক তথ্য হারিয়ে যায়।

ফাতিমা ও তার ভাইবোনেরা ২০১৭ সালের এপ্রিলে কাঠমান্ডু ছিলেন হজরত মহলের ১৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য। তিনি স্থানীয় মুসলিমদের সাথে কথা বলেন, রানি সম্পর্কে তারা কিছু জানে কিনা জানতে চান।
তিনি বলেন, কিছুই পাওয়া যায়নি। কেউ মনে হয় তেমন কিছুই জানে না।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ভারতের বিখ্যাত এক স্বাধীনতা যোদ্ধা ও তার ছেলের (আউধের শেষ নবাব) কয়েক দশক নেপালে অবস্থানের তথ্য সত্যিই হারিয়ে গেছে?
ফাতিমা বলেন, এমনটা কখনো বলা যায় নঅ। বেগমের কবর দীর্ঘ দিন বিস্মৃত ছিল। এমনকি পরিবার সদস্যরা পর্যন্ত আট দশক পর সেটি খুঁজে পেয়েছে। নথিপত্র, মৌখিক ইতিহাস, টুকটাক তথ্য ইত্যাদি আকরে হয়তো তাদের কাহিনী এখনো টিকে আছে। তবে সেগুলো প্রকাশিত ও নথিবদ্ধ হওয়ার অপেক্ষা করছে।

কাঠমান্ডু পোস্ট