সুপথে ফেরা

Sep 28, 2019 03:38 pm
সুপথে ফেরা

 

প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দেখে নিলো সুরুজ মিয়া। শূন্য মানিব্যাগের এককোণে একটি পাঁচ টাকার কয়েন পড়ে আছে।

অথচ সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তার একমাত্র মেয়ে, মিলি গরুর গোশত নিতে কেঁদে কেঁদে বলেছিল- এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে একটু সময় করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। রাস্তার পাশের টং দোকান থেকে এক খিলি পান কিনে নিয়ে মুখে পুরে তা চিবাতে চিবাতে মাছ বাজারের দিকে এগোতে থাকে সে।

বাজারে আজ খুব ভিড়। সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। সুরুজ মিয়া এদিক-ওদিক ভালো করে তাকিয়ে নিলো। শুক্রবার বলে কথা। বাজারে লোকে লোকারণ্য। কিন্তু এত মানুষ দেখেও সুরুজ মিয়ার মন ভরেনি। সে বিড়বিড় করে বলতে থাকে- বাজারে এত মানুষ! কিন্তু কাউকে দিয়ে আমার সুবিধা হবে বলে মোটেও মনে হচ্ছে না। বাজারের বেশির ভাগ ক্রেতাই গার্মেন্ট কর্মী। এদের পকেট মেরে তেমন সুবিধা হবে না। হঠাৎ গোশতের দোকানের দিকে চোখ পড়ল তার। সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত লোকটাকে দেখে খুশি মনে এগিয়ে আসে সে।

কাছে এসে লোকটার মুখের দিকে তাকাতেই আবার তার মন খারাপ হয়ে গেল।
বাজারের মসজিদের বড় হুজুর তিনি। পুরো এলাকার মানুষ তার অন্ধ ভক্ত। সবাই তাকে মন থেকে শ্রদ্ধা করে। কারো একটু অসুখ-বিসুখ হলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে ব্যর্থ হলেও হুজুরের কাছে গেলে কাজ হয়ে যায়। সুরুজ মিয়া মনে মনে ভাবতে লাগল- এ মুহূর্তে কী করা যায়! হুজুরের পকেট মারা ঠিক হবে না। কিন্তু আর সুবিধার লোক তো দেখছি না। ওইদিকে মেয়েটাও যেভাবে গোশতের জন্য কান্না করেছে- তাতে গোশত না নিয়ে বাসায়ও কেমন করে যাই!

এসব ভাবতে ভাবতে আস্তে করে হুজুরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সুযোগ খুঁজতে লাগল। হুজুর যখন গোশতের দাম জিজ্ঞেস করছেন, এমন সময় আলতোভাবে হুজুরের পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকা নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে আসে সে। হুজুর গোশত বিক্রেতাকে দুই কেজি গোশত মেপে দিতে বললেন।
গোশত ব্যাগে বুঝে নিয়ে পকেটে হাত দিয়ে বড় হুজুর লজ্জায় পড়ে যান। সবাই হুজুরের দিকে তাকিয়ে আছেন। সুরুজ মিয়াও। মুহূর্তে বড় হুজুরের মুখখানা মলিন হয়ে গেল। তিনি গোশত বিক্রেতাকে উদ্দেশ করে বললেন,

-ভাই, গোশত রেখে দিন। এখন নিতে পারছি না।
-কী হয়েছে, হুজুর?
-না, মানে, ইয়ে বাসা থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে বের হয়েছিলাম। এখন দেখছি পকেটে কোনো টাকা নেই। মনে হয় কোথাও পড়ে গেছে। থাক, গোশত পরে নেবো।
গোশত বিক্রেতা আগ্রহী গলায় বলল,
-হুজুর, আপনি গোশত নিয়ে যান। আমাকে পরে টাকা দিলে হবে।
বড় হুজুর ইতস্তত করে বললেন,
-না, আমি বাসা থেকে আসছি। টাকা দিয়েই গোশত নিয়ে যাবো। আপনি এগুলো আপনার পাশে রাখুন।
এ কথা বলে বড় হুজুর বাসার দিকে চলে গেলেন।

সুরুজ মিয়া মনে মনে খুশি হলো। এরপর গোশত বিক্রেতার কাছ থেকে দুই কেজি গরুর গোশত কিনে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দিলো।
বাবার হাতে গোশত দেখে সুরুজ মিয়ার ছোট্ট মেয়ে মিলির সে কী আনন্দ! সে নিজের হাতে করে তা মায়ের কাছে নিয়ে যায়। মেয়েকে এমন খুশিতে থাকতে দেখে বাবা-মায়ের মন ভরে যায়।

সুরুজ মিয়ার স্ত্রী সানজিদা আক্তার গোশত কুটে নিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দিলো। এই সুযোগে সুরুজ মিয়া আবার বাজারে গিয়ে লেবু কিনে আনল। সানজিদা আক্তার গোশতের পাতিলে বারবার দেখছে। কিন্তু গোশত চুলায় যেমন দিয়েছে, তেমনই আছে। অনেক সময় অতিবাহিত হলো, গোশত নরম হচ্ছে না। এমন কাণ্ড দেখে সানজিদা আক্তার চিন্তিত হয়ে পড়ল। চুলার আগুনও ঠিকমতো জ্বলছে। কিন্তু গোশত সিদ্ধ হচ্ছে না। এভাবে আরো আধা ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হলো। সুরুজ মিয়া স্ত্রীকে বলল,

-কী ব্যাপার? আর কত সময় লাগবে? গোশত রাঁধতে কি এত সময় লাগে?
সানজিদা আক্তার স্বামীকে কাছে ডেকে বলল,
-আজ তুমি কার পকেট মেরেছ?
-কেন কী হয়েছে?
-কী হয়নি তাই বলো?
-এত প্যাচাল না করে যা বলার সরাসরি বলো।
-বলি কি তুমি দ্বিতীয়বার বাজারে যাওয়ার সময় চুলায় গোশত তুলেছি। এখন পর্যন্ত দেড় ঘণ্টার মতো সময় অতিবাহিত হলো। কিন্তু দেখো, গোশত চুলায় যেমন দিয়েছি তেমনই আছে। একটুও সিদ্ধ হচ্ছে না। আমার মন বলছে- আজ তুমি কোনো ভালো মানুষের পকেট মেরেছ। হয়তো তার বদদোয়ায় এমনটি হচ্ছে।
সুরুজ মিয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল।

সানজিদা আক্তার আবার বলল,
-কী হলো, কথা বলছো না যে?
এবার সুরুজ মিয়া আর্দ্রগলায় বলল,
-তুমি ঠিকই ধরেছ, সানজু। আজ বাজারে তেমন সুবিধার লোক পাইনি। আমাদের বাজারের মসজিদের বড় হুজুরকে দেখছিলাম গোশত কিনছেন। অমনি তার পকেট মেরে দিয়েছি।
-একি কথা বলছো?
- হ্যাঁ, শুধু তাই নয়। গোশত বিক্রেতার অনুরোধ সত্ত্বেও পকেটে টাকা ছিল না বলে বড় হুজুর গোশতও নেননি।
-তুমি বড় অন্যায় করেছ, মিলির বাপ। মানুষের পকেট মারা একটি খারাপ কাজ। তাই বলে বড় হুজুরের পকেটও মারতে হবে? তুমি এখনই হুজুরের কাছে যাও। হাত-পায়ে ধরে ক্ষমা চাও। নইলে আমাদের আরো বিপদ হতে পারে।
-হ্যাঁ সানজু, তুমি ঠিক কথা বলেছ। আমি এখনই বড় হুজুরের কাছে যাচ্ছি।
এ কথা বলে সুরুজ মিয়া ঘর থেকে বের হয়।

দুপুরের খাবার খেয়ে বড় হুজুর একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ সুরুজ মিয়াকে পেরেশানি হয়ে আসতে দেখে শোয়া থেকে উঠে বসলেন। সুরুজ মিয়া বড় হুজুরের পা ধরে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল,
-হুজুর, আমাকে মাফ করে দিন। আমি ভুল করেছি। এমন কাজ আমি আর কখনো করব না।
বড় হুজুর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-সুরুজ মিয়া, তোমার কী হয়েছে? তুমি কী এমন কাজ করেছ যে, এমন আচরণ করছো?

-হুজুর, আজ সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার মেয়ে মিলি গরুর গোশত খাবে বলে বায়না ধরেছিল। কিন্তু আমার কাছে তখন কোনো টাকা ছিল না। আমি আগে থেকেই মানুষের পকেট মারতাম। আজ বাজারে আপনি ছাড়া তেমন সুবিধার কাউকে না পেয়ে আমি আপনার পকেট মেরে দিয়েছি। তারপর সেই টাকা দিয়ে দুই কেজি গরুর গোশত নিয়ে বাসায় চলে যাই। গোশত দেখে আমার মিলির সে কী আনন্দ! আমার স্ত্রী সেই গোশত চুলায় তুলে দেয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টা পরও গোশত সিদ্ধ হয়নি। আমি বুঝতে পেরেছি, আপনার পকেট মারা আমার একদম ঠিক হয়নি। হুজুর, আপনি আমাকে মাফ করে দিন। গোশত কেনার পর আমার কাছে আরো ৮০০ টাকা আছে। এই টাকাগুলো নিন, হুজুর। বাকি টাকা আমি আগামী মাসে আপনাকে দিয়ে যাবো।
বড় হুজুর তাকে জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে বললেন,

-সুরুজ মিয়া, মানুষের পকেট মারা খুব খারাপ কাজ। এটা যে তুমি যে বুঝতে পেরেছ, তার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমি তোমাকে কোনো বদদোয়া না দিলেও তোমার কথায় মনে হচ্ছে তা লেগে গেছে। এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের খুব কষ্টের টাকা তোমরা পকেট মেরে দাও। তাদের বদদোয়া লাগলে জীবনে যতই চেষ্টা করো; সফল হবে না। শুধু দৌড়ের ওপর থাকবে। আমি বলছি, এই টাকা তুমি তোমার কাছে রেখে দাও। আর হ্যাঁ, আগামীকাল এসে আমার কাছ থেকে আরো কিছু টাকা নিয়ে যাবে। তুমি প্রয়োজনে ছোট্ট করে একটি পানের দোকান দাও। দেখবে ব্যবসা তোমার জীবন পাল্টে দেবে। মনে রেখো, হারামে আরাম নেই।

সুরুজ মিয়া বড় হুজুরের মুখের দিকে অবুঝ বালকের মতো তাকিয়ে রইল।