মোহাম্মদ আলী : সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ

Oct 13, 2019 07:21 am
মোহাম্মদ আলী : সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ

 

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’- মোহাম্মদ আলীর সর্বোত্তম স্বীকৃতি এটিই। তিনি ছিলেন মুষ্টিযুদ্ধের অবিংসবাদিত চ্যাম্পিয়ন। যে খেলায় প্রয়োজন হয় পাশবিক শক্তি, তিনি সেটিকেই পরিণত করেছিলেন মহান শিল্পে। রিংয়ে প্রজাপতির মতো নৃত্য করে এবং মৌমাছির মতো হুল ফুটিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিদের পর্যুদস্ত করতেন। তিন তিনবার হেভিয়েট শিরোপা জয়ের রেকর্ড গড়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে সনি লিস্টনকে হারিয়ে নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমিই বিশ্বের সম্রাট’। শোম্যান, বিদ্রোহী, মুসলমান, মানবাধিকার কর্মী, কবি- সবকিছুই ছিলেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে তিনি বিস্ময়কর ব্যক্তি, মহামানব। বিশ্বের ইতিহাসে এত ভূমিকায় এখন পর্যন্ত কোনো ক্রীড়াবিদকে দেখা যায়নি।

তিনি ছিলেন চরম আত্মবিশ্বাসী। তিনি তার জীবনীকার টমাস হাউসারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কখনো কি এমন কোনো যোদ্ধা ছিল যে কবিতা লিখত, রাউন্ডের ভবিষ্যদ্বাণী করত, সবাইকে হারাত, লোকজনকে হাসাত, কাঁদাত এবং আমার মতো এত লম্বা ও এত সুন্দর ছিল? পৃথিবীর ইতিহাসের সূচনা থেকে কখনো আমার মতো কোনো যোদ্ধার আবির্ভাব ঘটেনি।’

ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য মাত্রায় ফিট। যেকোনো কঠিন আঘাতও সহ্য করতে পারতেন। অবশ্য এ কারণে তাকে পরবর্তীকালে মূল্যটা দিতে হয়েছে বেশ চড়া। পারকিনসনস ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে তিনি অতীতের ছায়া হিসেবে বেঁচে ছিলেন শেষ জীবনে। কিন্তু অসহায় অবস্থাতেও নানা কাজের মধ্য দিয়ে তিনি শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে গেছেন।

আলী মানেই প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে নতুনত্বকে আহ্বান করার নাম। সনি লিস্টনকে হারানোর পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, নতুন নাম হয় মোহাম্মদ আলী (লুইসভিলে জন্মের সময় তার নাম রাখা হয়েছিল ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে।)। আমেরিকায় তখন শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিস্ট ধর্মের জয়জয়কার। বর্ণবাদ সুগভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে তিনি খ্রিস্টধর্মকে ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণকে অভিহিত করলেন, ‘মূলে’ ফিরে যাওয়া হিসেবে। তিনি তার পূর্বের পরিচয়কে দাসত্বের দাসখত হিসেবেও অবহিত করলেন। তিনবার হেভিওয়েট শিরোপা জয়ের চেয়ে এটা কম কিছু ছিল না।

আলী রিংয়ের বাইরেই সবচেয়ে বড় লড়াই করেছেন। ১৯৬৬ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করা সামান্য ঘটনা ছিল না। ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করার জন্য তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বলা হলো। তিনি ঘোষণা করেন, “তারা কেন আমাকে উর্দি পরে বাড়ি থেকে এক হাজার মাইল দূরে যেতে বলবে, বাদামি লোকদের উপর বোমা ও বুলেট ফেলতে বলবে যখন লুইসভিলে তথাকথিত নিগ্রো মানুষদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করা হচ্ছে? ভিয়েতকংয়ের সাথে আমার কোনো বিবাদ নেই। কোনো ভিয়েতনামি আমাকে কখনো ‘নিগার’ বলে ডাকেনি।”

আলীকে প্রথমে নিজ দেশে নিষিদ্ধ করা হলো। তবে তিনি টরন্টো, ফ্রাংকফ্রুট, লন্ডনে (দুবার) শিরোপা রক্ষা করলেন। এতে তার লাভই হলো। তার ফ্যানের সংখ্যা বহির্বিশ্বে বাড়তেই থাকল। কিন্তু দেশে তিনি এমন সমস্যায় পড়লেন, যা তার কখনো কোনো ক্রীড়াবিদ পড়েননি। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকান হিসেবে তার অবস্থান পরাশক্তিটির জন্য ছিল মহা অস্বস্তিকর ব্যাপার। এক কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান তরুণ বিশ্বের অন্যতম পরাক্রমশালী, শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান দেশটির সমালোচনা করবে, আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করবে, তা কোনোমতে সহ্য করা যায় না। তাই সামরিক বাহিনী তাকে যুদ্ধে পাঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলো, আইনজীবীরা তাকে কারারুদ্ধ করার ফন্দি আঁটল, মিডিয়া তাকে তরুণ আমেরিকানদের জন্য সবচেয়ে কদর্য উদাহরণ হিসেবে চিত্রিত করল। অবশ্য ফাঁকে ফাঁকে লোভনীয় নানা প্রস্তাব দিয়ে তাকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টাও কম করা হয়নি। সামরিক বাহিনী থেকে এমন প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল, আলী যদি কেবল নাম লেখান, তবেই যথেষ্ট। তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করতে পারবেন, প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে পারেন, চাইলে পেশাদার লড়াইয়েও নামার সুযোগ আছে। কিংবা অসুস্থতার ভান করে দুই কূলই রক্ষা করতে পারেন।

কিন্তু আলীর সেই এককথা, ‘যুদ্ধ করা আমার জন্য কোনো ব্যাপার নয়। আমার বিবেক সায় দিলে আমি সহজেই রণাঙ্গনে যেতে পারি।’ তিনি বললেন, ‘তারা যখন লুইসভিলের নিগ্রোদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করছে, তখন কেন আমাকে ভিয়েতনামের বাদামি মানুষের বিরুদ্ধে বোমা আর বুলেট বর্ষণ করতে বলছে? আমি আমার বিশ্বাস আর অবস্থানে অটল থেকে কিছুই হারাব না। আমি চার শ’ বছর কারাগারে থাকতে পারি।’ তার এই প্রত্যয়ে তার নিজের ভবিষ্যতই ফ্যাকাসে বলে মনে হলো। তিনি শিরোপা হারালেন, কারারুদ্ধ হলেন, কোটি কোটি ডলার খোয়ালেন। মনে হলো, আলী একটি বিস্মৃত নাম। কিন্তু তা তো হবার নয়। পরে আলীর কথাই ঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন যে ভুল ছিল, তা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। আর তিনি ফিরেছেন রাজসিকভাবে। এটা যে কত বড় জয়, তা এককথায় কি প্রকাশ করা যায়?

আলীর মুষ্টিযুদ্ধ জীবনকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটিকে ধরা যেতে পারে, মুষ্টিযুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে অলিম্পিক স্বর্ণলাভ এবং হেভিওয়েট শিরোপা বিজয়। তার পরের ধাপটি হলো মানবতাবাদী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এ পর্যায়ে তিনি বিশ্ব জয় করেছেন, মূলে প্রত্যাবর্তন করেছেন, যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা পালন করেছেন তথা সর্বগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন। তারপর তৃতীয় পর্যায়ে তিনি হৃতসম্মান পুনরুদ্ধার করেন, নতুন যোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আর সব শেষে তিনি বিশ্ব নাগরিকের দায়িত্ব পালন করছেন।