৫জি আমূল বদলে দেবে দুনিয়াকে

Oct 15, 2019 09:45 pm
৫জি

 

রেজিনা মিহিন্দুকুলাসুরিয়া

এটা এমন এক ইন্টারনেট যা আমরা আগে কখনো দেখিনি। এটা কেবল দ্রুত মুভি ডাউনলোড করার ব্যাপার নয়। আমরা মানবীয় ভুলের কারণে দুটি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়ানোর কথা বলছি। বলছি বড় বড় শহর থেকে শত শত কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত এলাকায় জটিল রিমোট সার্জারির কথা।

তারবিহীন কানেকটিভিটির পরবর্তী বড় বিষয় ৫জি নিয়ে বিশ্বব্যাপী কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে ‘৫জি’ জানতে গুগল সার্চে ৮৩৬ মিলিয়ন বার অনুসন্ধান করা হয়েছে, আর নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে মাত্র ১১৪ মিলিয়ন বার।
আর ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক মোবাইল কানেকশনের মাত্র ১৫ ভাগ ৫জির আওতায় আসবে জানার পরও এ নিয়ে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে, তার কারণ বোধগম্য।
আর এ কারণেই ৫জি সম্পর্কে আপনার যেসব কিছু জানা থাকা উচিত, তা বলা হচ্ছে।

৫জি বলতে কী বোঝেন?
‘জি’-এর মানে হলো ‘জেনারেশন’ (প্রজন্ম) আর ‘৫’ মানে হলো একটি সিরিজের ৫ম। দুটিকে একসাথে রাখলে ‘৫জি’-এর অর্থ দাঁড়ায় মোবাইল তারবিহীন যোগাযোগ্যবস্থায় সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠতম প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। এই প্রযুক্তি মোবাইল তারহীন যোগাযোগকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুততর করতে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রযুক্তি এর পূর্বসূরীদের (১জি, ২জি, ৩জি, ৪জি) চেয়ে অনেক বেশি করে মানুষের জীবনকে বদলে দেবে।

কল্পনা করে দেখুন : আপনি সকালের গাড়িতে প্রিয় গানে সুর তুলতে তুলতেই চলতে পারবেন, আপনাকে পথে ভয়ঙ্কর গর্তগুলো নিয়ে ভাবতেই হবে না। কারণ আপনার স্ব-চালিত গাড়িটি আপনার আগের গতির চেয়ে প্রায় ২৫০ গুণ বেশি গতিতে চলছে বর্তমানে আপনি যে ইন্টারনেট গতি ব্যবহার করছেন তার চেয়ে ২০ গুণ গতির ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

৪জি থেকে ৫জি এত পার্থক্য কেন?
শিল্প সংস্থা সেলুলার অপারেটর্স এসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার (সিওএআই) মহাপরিচালক রাজন ম্যাথুজের মতে, ট্রাফিকের ধরন, ট্রাফিকের কোয়ানটাম, অ্যাপ্লিকেশনের ধরন এবং আমাদের শিল্প যে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে- সবকিছুই ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবে।
৫জি নেটওয়ার্ক এই অত্যাবশ্যক প্রয়োজন পূরণ করবে। আর তা করবে ৪জির (বর্তমানে এটিই দ্রুততম। এর ফলে দ্রুত মুভি ডাউনলোড করা যাচ্ছে, ভিডিও কলগুলো হচ্ছে অনেক স্পষ্ট) ট্রান্সমিট কমিউনিকেশনের চেয়ে অনেক বড় ইলেকট্রম্যাগনেটিক তরঙ্গ ব্যবহার করে।

ফলে ৫জি কেবল আরো বেশি স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের ডাটা ব্যবহারের সমন্বয় সাধন করবে না, এটি ইতোপূর্বে কখনো ইন্টারনেট ব্যবহার করেনি, এমন অনেক সরঞ্জামকেও ডাটা ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে।
ম্যাথুজের ভাষায়, এখন আপনার ফ্রিজ কিছু বলবে, আপনার ক্যামেরা অন্য কিছু জানাবে।

এসব সরঞ্জাম ‘ইন্টারনেট অব থিঙ্কস’ নামে অভিহিত ইন্টারনেটের মাধ্যমে একে অপরের সাথে সংযক্ত থাকবে, কথা বলবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনার পানির মিটারের সাথে থাকা সেন্সরটি আরেকটি সেন্সরকে সতর্ক করে দেবে যখন খুব বেশি পানি ব্যবহৃত হবে, সরবরাহ বন্ধ করে দেবে, রিসোর্স ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়াবে, কিংবা কোনো ড্রোন সেকেন্ডের ব্যবধানে যেকোনো কিছুকে গুলি করে ভূপাতিত করতে পারবে।
এই ব্যবস্থায় সেন্সরগুলোর ডাটা স্থাপিত হবে ট্রাফিক লাইটে, থানায়, পাবলিক পার্কে। ফলে নগর ব্যবস্থাপনা হবে আরো সহজ।

৫জি এসেছে কোথা থেকে?
হ্যারি পটারের মতো জাদুদণ্ড নাড়ালেন আর সাথে সাথে ৫জি এসে গেল- বিষয়টি এমন নয়। অনেক বছরের সাধনায় এটি অর্জিত হয়েছে। ৫জির আগে ০জি (শূন্য প্রজন্ম), ১জি, ২জি, ৩জি, ৪জি এসেছিল।
০জির প্রযুক্তিটি ছিল ১৯৪০-এর দশকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের এই প্রযুক্তিকে ‘প্রাক-সেলুলার মোবাইল টেলিফোনি প্রযুক্তিও’ বলা হয়ে থাকে। ওই সময় ফোন কল করা বা গ্রহণের জন্য গাড়িতে মোবাইল ফোনের কাছাকাছি একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো।

তারপর ১৯৮০-এর দশকে ১জি নামে পরবর্তী প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর সাথে আসে বিশাল অ্যানালগ সেলফোন। এ দিয়ে ফোন করতে ব্যক্তি অপারেটরের সাহায্যের প্রয়োজন হতো।
এরপর ১৯৯০-এর দশকে টেলিযোগাযোগব্যবস্থা ২জির আবির্ভাব ঘটে। এটা ছিল আগেরগুলোর চেয়ে ভিন্ন। ২জি ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ফোন কল শূন্য ও এক সংখ্যায় পরিবর্তন করে আবার ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গে রূপান্তরিত করা হতো।

ডিজিটাল পদ্ধতি মানেই হলো একসাথে অনেক বেশি ভয়েজ কল করার সুযোগ সৃষ্টি। আর ডিজিটাল হওয়ায় ইমেইল বা এসএমএস করার সুযোগও ঘটে।
পরবর্তী পর্যায়ে আসে ৩জি। এর আগমন ঘটে ২০০০- এর প্রথম দিকে। এটি ছিল অনেক দ্রুত। বর্তমান প্রযুক্তি ৪জির সূচনা ঘটে ২০০৯ সালের শেষ দিকে। এটিই এখন সবচেয়ে দ্রুত।
এটি এতই দ্রুত যে কেবল তিন মিনিটের মিউজিক নয়, বরং তিন ঘণ্টার মুভিও কোনো বাফারিং ছাড়া সম্প্রচার করা সম্ভব হয়। ওলা, উবার, এয়ারবিএনবি, সুইগির মতো কোম্পানিগুলো এটি ব্যবহার করেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে নিচ্ছে।

আমরা এত প্রজন্ম কেন তৈরী করছি?
সিওএআইয়ের ম্যাথুজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, টেলিকম পরিষেবার গ্রাহক বাড়ছে, বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে আমরা এর সাথে তাল মেলাতে পারছি না।
ফলে আমাদেরকে অতিরিক্ত তথ্য পরিবহন করার প্রয়োজন হয়। সব তরঙ্গ একইভাবে কাজ না করায় এই খাতে নতুন নতুন উদ্ভাবনের প্রয়োজন হয়। ২০১৯ সালে বিশ্বের কোনো কোনো অংশে ৫জি ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে।

৫জি আবিষ্কার করেছে কে?
কোনো এক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ৫জি বা এর পূর্বসূরীদের আবিষ্কার করেনি। এসব প্রযুক্তি অনেক বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, প্রকৌশলী, টেলিকম কোম্পানির বছরের পর বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফসল।
জাপানি টেলিকম কোম্পানি নিপ্পন টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন ১৯৭৯ সালে ১জি নেটওয়ার্কে বল রোলিং স্থাপন করে।
মোটোরলায় মার্টিন কুপার ১৯৮৩ সালে বাজারজাত করা সত্যিকারের বহনযোগ্য মোবাইল ফোন আবিষ্কারের নেপথ্যে ছিলেন।

৪জি দ্রুত ডাটা পরিবহনের জন্য এমআইএমও (মাল্টিপল ইনপুট, মাল্টিপল আউটপুট) প্রযুক্তি ছিল অধ্যাপক অ্যারোজিয়াস্বামী পলরাজ।
আর ৫জি-সংক্রান্ত প্যাটেন্টের প্রায় ১৫ ভাগের মালিক হুওয়ে।
আবার এসব কাজ যিনি শুরু করেছেন তার কথা কিন্তু ভুলে যাবেন না। তিনি হলেন আলেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল। তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন টেলিফোন। আবার তারবিহীন যোগাযোগব্যবস্থার উদ্ভাবনে ছিলেন গুগলিলমো মার্কোনি।

৫জির মালিক কে?
আসলে কেউই ৫জির মালিক নয় বা ৫জির সবকিছুর মালিক একজন নয়। তবে এর কোনো কোনো আবিষ্কারের প্যাটেন্ট করা হয়েছে। এসব প্যাটেন্টকে এইপি (স্ট্যান্ডার্ড ইসেনশিয়াল প্যানেন্টস) হিসেবে অভিহিত করা হয়, তবে তা আরো ভালোভাবে বোঝানো যায়। এর কোনো একটি এসইপিকে ব্যবহার করার জন্য অন্যান্য কোম্পানিকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইপ্লাইটিক্সের মতে, হুওয়ে হলো ৫জির বৃহত্তম ঘোষিত এসইপি পোর্টফলিও। এরপর রয়েছে নকিয়া, জেডটিই, এলজি ও স্যামসং।

৫জি কোথায় থাকে?
৫জি থাকে দিল্লিতে।
এটা একটা কৌতুক। কারণ ঠিক কোনো একটি স্থানে থাকে না ৫জি। এসব নেটওয়ার্ক কোর নেটওয়ার্ক থেকে ছড়িয়ে পড়ে। এই নেটওয়ার্ক থেকেই প্রতিটি ব্যবহারকারীর কাছে, সেল টাওয়ারে, ব্যবহারকারীর ফোনে চলে যায়।
৫জি কোথায় থাকে, তা উল্লেখ করা জটিল ভিষয়। তবে ৫জি আশপাশে থাকলে আপনি জানতে পাররবেন। আপনা ফোনের স্ক্রিনের ওপরে নজর রাখুন, দেখুন তাতে ‘৫জি’ চিহ্ন ভাসে কিনা।

দি প্রিন্ট