রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া : যা ভাবছে মিয়ানমার

Oct 18, 2019 07:01 pm
রোহিঙ্গা

 

মিয়ানমারে সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনঃবসতি স্থাপনবিষয়ক মন্ত্রী ড. উইন মিয়াত আয়ে ফিরে আসতে আগ্রহী রাখাইনের চার শতাধিক হিন্দু উদ্বাস্তুকে অবিলম্বে ফেরার সুযোগ দেয়া উচিত। তার মতে, এর মাধ্যমেই স্থবির হয়ে থাকা প্রত্যাবাসন কর্মসূচির সূচনা হতে পারে।
সাউথ এশিয়ান মনিটারকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকারে মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে তাদেরকে গ্রহণ করার জন্যও প্রস্তুতির প্রয়োজন।

তবে রাখাইনের ঘটনাবলীর ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখা অনেক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের মৌলিক প্রয়োজনগুলো এখনো পূরণ হয়নি।
মিয়াত আয়ে বলেন, আমরা আশা করছি না যে খুব শিগগিরই প্রত্যাবাসন শুরু হবে। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব তারা ফিরে আসুক। তবে প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বেচ্ছামূলক ও নিরাপদ।
আর এর জন্য বাংলাদেশ ও জাতিসঙ্ঘের সমর্থন প্রয়োজন মিয়ানমারের। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রক্রিয়াটি হতে হবে দ্বিপক্ষীয়।

তিনি বলেন, আগের বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের সাথে হওয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী আমরা গত বছরের জানুয়ারি থেকে উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়ে আছি।
পর্দার অন্তরালে চীন ক্রমবর্ধমান হারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তারা প্রায় দুই বছর আগে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে মূল দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে মধ্যস্ততা করেছিল। এর পর থেকেই তারা সবসময় পর্দার অন্তরালে রয়েছৈ। গত মাসে নিউ ইয়র্কে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক করার পর ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার সূচনা হওয়ায় তাদের ভূমিকা এখন অনেক বেশি স্পষ্ট হচ্ছে।

উইন মিয়াত আয়ে বলেন, চীনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা মিয়ানমারকে অনেক সহায়তা করতে চায়।
তিনি বলেন, তারা প্রত্যাবাসন শুরু করতে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করছে, তারা দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাকে উৎসাহিত করছে। আমরা আশা করছি, চিণারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে।
মন্ত্রী বলেন, জাতিসঙ্ঘের সম্পৃক্ততা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জাতিসঙ্ঘ ও মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকেরও প্রশংসা করেন। গত মাসে এটি সই হলেও মাত্র কয়েক মাস আগে তা তা নবায়ন করা হয়। তিনি বলেন, এত কিছু হওয়ার পরও প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া স্থবির হয়ে রয়েছে।

বর্ষাকাল শেষ হওয়ার ফলে প্রত্যাবাসন ইস্যুটি আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু না হলে বাংলাদেশ অবসবাসযোগ্য ভাসান চরে তাদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে।
২০১৭ সালের আগস্টে ব্যাপক সামরিক অভিযানের পর রাখাইন থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে।
জাতিসঙ্ঘের কয়েকটি প্রতিবেদনে এই সামরিক অভিযানকে ‘পাঠ্যপুস্তকে থাকা জাতিগত শুদ্ধি’ অভিযান হিসেবে অভিহিত করেছে। নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মানবাধিখার গ্রুপগুলো দাবি করছে, সেখানে গণহত্যা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ঘিঞ্চি ক্যাম্পগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস করছে। এদের অনেকে ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে এসেছে।

গত আগস্টেও চীনের মধ্যস্ততায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য অস্বস্তি সৃষ্টি করে কোনো উদ্বাস্তুই ফেরার জন্য তৈরী বাসে উঠেনি। এরপর থেকে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ চলছে।
মিয়াত আয়ে বলেন, আমরা বাংলাদেশকে দোষী করতে চাই না। তবে আমরা চাই, প্রক্রিয়াটি হোক সমন্বিত। আমাদের প্রয়োজন আলোচনা। তাদের দিক থেকেও কিছু সমস্যা আছে। আমরা চাই, তারা সহযোগিতা করুক।
আর বাংলাদেশ এজন্য মিয়ানমারকে দায়ী করছে।
কয়েক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্লামেন্টে বলেন, প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে উদ্বাস্তুদের বোঝাতে মিয়ানমারের ব্যর্থতার কারণেই উদ্বাস্তুদের ফেরানো যায়নি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দেখছি যে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি মিয়ানমার। আমরা প্রত্যাবাসনের পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলাম। কিন্তু প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারেনি। রোহিঙ্গারা তাদের বাড়িঘর, জমি ও অন্যান্য সম্পত্তি ফিরে পাবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
কিন্তু এর সাথে দ্বিমত পোষণ করে উইন মিয়াত আয়ে বলেন, বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের সাথে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী আমরা সত্যিই উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলাম।
মিয়ানমার সরকার চীন, ভারত ও জাপানসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় তাদের বসবাসের জন্য কিছু বাড়িও নির্মাণ করেছে। সরকার গ্রামগুলোতে ফিরে আসা লোকদের জন্য বরাদ্দ দেয়া ও সেখানে বসতি করার জন্য একটি পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে। সরকার কাজের বিনিময়ে টাকা কর্মসূচির মাধ্যমে ফেরত আসা লোকদের জন্য আরো বাড়িঘর নির্মাণ করবে।

মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার কেবল রাখাইন রাজ্য নিয়েই কাজ করছে না। পুরো দেশ নিয়েই তারা ভাবছে। রাখাইন, শান, কচিন, কিয়নকেও জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মন্ত্রীর এই মন্তব্যে সন্তুষ্ট নয়।

সরকার নিযুক্ত কফি আনান রাখাইন কশিশনের সদস্য লাইতিতিয়া ভ্যান ডেন আসাম বলেন, মিয়ানমার যদি প্রমাণ করতে পারত যে এখনো রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা দুই বছর আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে, তবে বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তুদের ফেরানোর কাজটি করা সহজ হতো।
তিনি বলেন, বরং পরিস্থিতির আরো অবনতিঘটেছে। ওই রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকা এখনো জাতিসঙ্ঘের নজরদারির বাইরেই রয়ে গেছে।
তবে মন্ত্রী বলেন, কিছু উদ্বাস্তু তো ফিরতেই চায়। চলতি বছরের প্রথম দিকে প্রায় ২০০ পরিবার নিজের ইচ্ছায় এসেছে। তাদেরকে পুনর্বাসন করার প্রক্রিয়া চলছে। তারা ফিরে এসেছে গোপনে। তারা তারা আশঙ্কা করছিল, তাদের ফেরার কথা প্রকাশ পেলে ক্যাম্প নেতারা বাধা দেবেন।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে ছয় পাতার একটি ব্রুশিয়ার প্রকাশ করেছে। এতে নিবন্ধন, শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তাদের মূল স্থানে বা বিকল্প স্থানে তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, তাদের বাড়িঘর অক্ষত থাকলে সেখানেই তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা-সংবলিত নতুন নতুন গ্রাম সৃষ্টি করা হবে।
কিন্তু বেশির ভাগ উদ্বাস্তুই মিয়ানমার সরকারের আশ্বাসে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারা আশঙ্কা করছে, তারা ফিরে গেলে আগেই অবস্থায় পড়তে হবে। তারা কোথায় যেতে পারবে না, স্বাস্থ্য পরিচর্যার সুযোগ পাবে না, সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারবে না।

নাগরিকত্বের গুরুত্ব
তবে অনেক রোহিঙ্গার কাছে নাগরিকত্বই প্রধান বিষয়। এক টেলিফোন সাক্ষাতকারে কুতুপালঙ উদ্বাস্তু শিবির থেকে সাত্তার ইসলাম এসএএমকে বলেন, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ছাড়া আমরা রাখাইনে ফিরে যাব না।
১৯৯২ সালে সাত্তারের বাবা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তারপর থেকেই তিনি বাংলাদেশে আছেন। তিনি স্বীকার করেন, রোহিঙ্গারা ফিরতে শুরু করলে তাদের নাগরিকত্ব লাভের রাজনৈতিক বিষয়টি দুর্বল হয়ে যাবে।

আরাকান প্রজেক্টের প্রধান ক্রিস লেওয়া এসএএমকে বলেন, কেবল নাগরিকত্ব নয়, আমাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে, কেমন নীতি প্রণয়ন করা হবে, কোন পরিবেশে ফেরানো হবে, তাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, মানবাধিকার ও জাতিগত অধিকারের নিশ্চয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নিরাপত্তা ইস্যু
তবে ভ্যান ডেন আসাম বলেন, মিয়ানমার সরকার এখন বলছে, ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা কতটুকু অধিকার পাবে, বিশেষ করে চলাফেরা করার ব্যাপারে, তা নির্ধারিত হবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
তিনি বলেন, এটি পরিস্থিতিতে আরো নাজুক করে তুলছে।