জলের গ্রাম অন্তেহরি

এহসান বিন মুজাহির | Oct 19, 2019 02:34 pm
জলের গ্রাম অন্তেহরি

জলের গ্রাম অন্তেহরি - ছবি : নয়া দিগন্ত

 

হজরত শাহজালাল (রহ.) এর পুণ্যভুমি সিলেট বিভাগে রয়েছে হাওর-বাঁওড়, পাহাড়-নদী, নানা রকমের বৃক্ষরাজি আছে জলবন এবং সোয়াম ফরেস্ট। সিলেট বিভাগের প্রতিটি জেলা এবং উপজেলায় প্রকৃতি দু’হাতে তার রূপ বিলিয়ে দিয়েছে। মানুষের মন ও চরিত্রের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করছে এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কবি আহসান হাবিবের ভাষায়- ‘বাড়ি বাগান, পাখ-পাখালি সব মিলে এক ছবি, নেই তুলি, নেই রঙ, তবুও আঁকতে পারি সবই’। অপরূপ সৌন্দর্য এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদেরও মুগ্ধ করে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকা বিভিন্ন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এমনি একটি উপজেলা মৌলভীবাজারের রাজনগর।

রাজনগর উপজেলায় অপরূপ সৌন্দর্যেভরা একটি গ্রাম ‘অন্তেহরি’। ছয় মাস পানির ওপর ভেসে থাকা এই গ্রামটি ‘সোয়াম ভিলেজ অন্তেহরি’ নামে পর্যটকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ১ নং ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই গ্রামটি। মৌলভীবাজার জেলা শহর থেকে অন্তেহরি গ্রামের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বছরে ৬-৮ মাস পানির নিচে থাকে গ্রামটি। জলের গ্রাম হিসেবে অন্তেহরি নিজেকে এ সময় পূর্ণ রূপে আবিষ্কার করে। তখন অন্তেহরি গ্রামের রূপ পাল্টে মোহনীয় হয়ে ওঠে। খাল, বিল, পুকুর কিংবা গ্রামীণ রাস্তাঘাট সব একাকার হয়ে যায় হাওরের পানিতে।

গোছালো জলারবনে ভেতর নৌকায় করে পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়ানো যায়। গ্রামের মেঠোপথ বর্ষায় জলপথে রূপ নেয়া চির সবুজের বুক চিরে চলে নৌকা। চলতে চলতে চোখে পড়ে ডানে-বামের সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবন চিত্র। পুরো গ্রামই পানির ওপর ভাসমান। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির যাতায়াতের মাধ্যম শুধুই নৌকা। এ যেনো একটি বাড়ি একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির বাঁকে বাঁকে মাছ শিকারের নানা আয়োজন। এমন দৃশ্য দেখতে দেখেতে হঠাৎ আপনি প্রবেশ করতে পারবেন বিশাল কাউয়াদিঘি হাওরে। হাওরে পাখিদের বিচরণ প্রকৃতিকে করে তুলে আরো মোহনীয়। নীড়ে ফেরা ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা বকের উড়ে চলা। সব মিলিয়ে এ যেন পাখিদেরও স্বর্গরাজ্য। প্রকৃতি যেন তার অপার রূপলাবণ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে সবার মাঝে।

রাজনগরের সবচেয়ে বড় জলাভূমি কাউয়াদিঘি হাওরকে কেন্দ্র করে অন্তেহরি গ্রামের লোকবসতি গড়ে ওঠার ইতিহাস কত দিনের তা বলা মুশকিল। তবে প্রায় শত বছর আগে বটেই। এই গ্রামের জনবসতি পাঁচ সহস্রাধিক। এই গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। তবে মৎস্যজীবীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। বর্ষা মওসুমে জলই সেখানকার জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান মাধ্যম। বিকেলেই অন্তেহরির মানুষের জীবন আর জীবিকার দৌড়ঝাঁপ একটু বেশি প্রত্যক্ষ করা যায়। জলারবনের মাঝখান দিয়ে টলটলে জলের ওপর দিয়ে ছুটে চলে মাঝির ডিঙি নৌকা। চলার পথে কোথাও চোখে পড়বে নৌকার ওপর জাল টানছেন জেলেরা। আবার কোথায় শিশুরা শাপলা কুড়াচ্ছে, কখনো বা দেখা যায় বাড়ির উঠানে কৃষাণীর বিরামহীন পরিশ্রমের দৃশ্য। চার পাশে বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে ছোট ছোট ঘরবাড়ি। জলের উপর ভাসমান হিজল, তমাল, করচ গাছের সারি।

সবুজ গাছে গাছে পাখির কলতান। আর জলে ভাসা নানা রঙের শাপলা ফুলের দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। এই গ্রামের মোহনীয় দৃশ্য অবলোকন করতে দূর-দূরান্ত থেকে সৌন্দর্যপিপাসুরা প্রতিনিয়তই ঘুরতে আসেন। কেউ কেউ বলেন পানির সাথে লড়াই করে আবার কেউ কেউ বলেন পানির সাথে মিতালি করে ‘অন্তেহরি’ গ্রামের মানুষের বসবাস।
পুরো গ্রামই পানির ওপর ভাসমান ঠিক যেমন ভেসে আছে শাপলাসহ নানা জাতি প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির বাকে বাকে নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, যা এক অন্য রকম মোহনীয় দৃশ্য। এই গ্রামেই আছে সোয়াম ফরেস্টে হিজল-তমাল-করছসহ বিভিন্ন গাছ-গাছালির সমন্বয়ে এখানে তৈরি হয়েছে।

অন্তেহরি ছাড়াও আশেপাশের অনেকগুলো গ্রামে জলারবন রয়েছে। বড়ই অদ্ভুত এই গ্রামগুলোর দৃশ্য। কোনো গাছের হাঁটু পর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে। একটু ছোট যেগুলো, সেগুলো আবার শরীরের অর্ধেকই ডুবিয়ে আছে জলে। কোথাও ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন অন্ধকার লাগবে পুরো বনটা। আবার কোথাও একেবারে ফাঁকা শুধু তই তই পানি। মাঝে মধ্যেই গাছের ডালপালা আটকে দিবে পথ। হাত দিয়ে ওগুলো সরিয়ে তৈরি করতে হবে পথ। গাছের ডালে বাসা বেঁধেছে নানা প্রজাতির পাখি।

আবার অনেক গাছে আশ্রয় নিয়েছে অনক প্রজাতির বন্যপ্রাণী। বর্ষায় লোকালয় পানির নিচে চলে যায় তাই এসব বন্যপ্রাণী উঠে পড়ে গাছের ওপর। শীতকালে এখানে দাপিয়ে বেড়ায় বনবিড়াল, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। পুরো গ্রাম পানির নিচে থামলেও ছোট একটি বাজার আছে অন্তেহরি গ্রামে। ডিঙি নৌকা নিয়ে সেই বাজারে যাতায়াত করেন আশপাশের গ্রামবাসী। মনে হবে পানির ওপর ভাসমান কোনো এক জাহাজ।


 

ko cuce /div>

দৈনিক নয়াদিগন্তের মাসিক প্রকাশনা

সম্পাদক: আলমগীর মহিউদ্দিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সালাহউদ্দিন বাবর
বার্তা সম্পাদক: মাসুমুর রহমান খলিলী


Email: [email protected]

যোগাযোগ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।  ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Follow Us