তেল ঘাম অশ্রু

Oct 20, 2019 04:46 pm
তেল ঘাম অশ্রু

 

অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

[তেলের দেশ ইরান। প্রকৃতি দেশটিকে দু হাত ভরে দিয়েছে এ মূল্যবান সম্পদ। ইরানের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে এই তেল। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী পাকিস্তান। বহুদিন ধরেই ধুঁকছে দরিদ্র এ দেশটির অর্থনীতি। দেশটি কার্যত বেঁচে আছে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর। যাহোক, ইরান থেকে বিভিন্ন ভাবে প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ লিটার তেল পাকিস্তানে চোরাচালানের মাধ্যমে প্রবেশ করে।। পাকিস্তান সরকারিভাবে যে তেল আমদানি করে, এ তেল তার বাইরে। এই তেল চোরাচালানের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকা। কিন্তু এ বেআইনি কাজেও রয়েছে বিরাট ঝুঁকি। এতে ঝরে রক্ত, ঘাম, অশ্রু। পাকিস্তানের ডন পত্রিকার এক সাংবাদিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে এ আখ্যান। ]


২০১৯ সালের মে মাস। রমজানের ষষ্ঠ দিন। বেলুচিস্তানের চাগাই জেলার সদর দফতর দালবান্দিনের মালেশা স্কোয়ারে আমাকে স্বাগত জানায় ২৬ বছর বয়স্ক খালো মামা। এটা তার আসল নাম নয়, ছদ্ম নাম। তার গায়ে একটি লাল কুর্তা, চালাচ্ছে হোন্ডা সিডি-৭০ মোটরবাইক।

খালো সম্প্রতি তেল চোরাচালানকারী হয়েছে। কয়েক মাস যাবৎ সূর্য তাপে পুড়ে তার গায়ের রঙ কালো হয়ে গেছে। মুখের এখানে সেখানে কালো দাগ। তবে এ নিয়ে মাথা ঘামায় না সে। তার মাথায় শুধু সংসার চালানোর জন্য টাকা আয়ের চিন্তা।
মা ও ছোট দু ভাইয়ের সাথে সে দালবান্দিনে বাস করে। সমতল, জনশূন্য, ধুলোভরা ও পেছনে পাহাড় সংবলিত দালবান্দিন কোয়েটা থেকে ৩৪০ কি. মি. দূরে চাগাই জেলায় অবস্থিত। চাগাই জেলা পশ্চিমে ইরানের সাথে পাকিস্তানের এ অংশের এক ত্রিকোণ সীমান্ত সৃষ্টি করেছে, তার উত্তর দিকে আফগানিস্তান। বহু শত কোটি ডলারের রেকো ডিক ও সাইনডাক প্রকল্প দুটি এ জেলাতেই অবস্থিত।

বেলুচিস্তানের খনিজ সম্পদের জাদুঘর নামে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও এ এলাকায় ব্যাপক বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বিদ্যমান। আয়তনের দিক দিয়ে চাগাই পাকিস্তানের বৃহত্তম জেলা হলেও এখানকার জনসংখ্যা খুব কম, সরকারী হিসেবে মাত্র দুই লাখ ২৬ হাজার। বেকারত্বের কারণে খালোর মতো যুবকরা পাকিস্তান-ইরান সীমান্তে পার্শ্ববর্তী ওয়াশুক জেলায় যায় চোরাচালান করা ইরানি তেল ও ডিজেল আনার জন্য। তেল চোরাচালানকারীদের বেশির ভাগই দালবান্দিনের বাসিন্দা।

খালোর আর্থিক অবস্থা আগে ভালো ছিল। তার ফেসবুক পেজ এক সময় জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বেশ। সে ভালো পোশাক পরা অবস্থায় ও স্টাইল করা চুল নিয়ে ছবি দিত সেখানে। কিন্তু তার বাবা মারা যাওয়ার পর তাদের পারিবারিক ব্যবসাটা সে চালাতে পারেনি। ঋণে জর্জরিত হয়ে এক সময় ব্যবসা বন্ধ করে দেয়।
খালো বি.এ পাশ। চাকরির জন্য দরখাস্তও করেছিল অনেক। কিন্তু মেলেনি। তারপর তার শহরের অন্যান্য যুবকের মতো সেও তেল চোরাচালানকারী হয়ে যায়। সে হালকা গলায় বলে, আমি এখনো সহকারী পর্যায়ে আছি। আমার ওস্তাদ ইমরান আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট। ওস্তাদ ইরান থেকে তেল ও ডিজেল বহনকারী পিকআপ চালায়।

খালোর মোটরবাইকে আমরা ইমরানের বাড়ি গেলাম। এটা ইমরানের বাŸার বাড়ি। ইমরান বাড়ি ছিল না। তাকে ফোন করলে জানায় যে সে খুব ব্যস্ত। এখন বাজারে আছে। খালোকে সে রহিমের গ্যারেজে যেতে বলে। গ্যারেজটা বাজারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। গ্যারেজে সাতটি জামিয়াদ (স্থানীয়রা বলে জামবাদ) পিকআপ ট্রাকের একটি কনভয় জোদার পর্বতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। দালবান্দিনের বাইপাস এলাকায় গিয়ে আমাদের এ বহরের সাথে যোগ দিতে হবে।

এই পিকআপ ট্রাকগুলোর প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে তেহরানের জামিয়াদ কোম্পানি। এসব যানের জন্য কোনো শুল্ক দিতে হয় না। বেলুচিস্তানে হাজার হাজার জামিয়াদ পিকআপ ট্রাক রয়েছে। একটি পুরনো জামিয়াদ দুই লাখ রুপিতে পাওয়া যায়। তবে নতুন একটির মূল্য দশ লাখ রুপি পর্যন্ত হতে পারে। জামিয়াদগুলো বেলুচিস্তানে শুধুমাত্র তেল ও ডিজেল চোরাচালানের জন্য ব্যবহার করা হয়। পেছনে নীল রঙের তেলের ব্যারেল বোঝাই জামিয়াদ গোটা বেলুচিস্তানেই চোখে পড়ে।

ইমরান আসলে একজন কৈশোর পার হওয়া তরুণ। বয়স যাতে একটু বেশি দেখায় সে জন্য সে দাড়ি রেখেছে ও গোঁফ কাটছে না। তবুও তাকে বয়স্ক দেখায় না মোটেও। গত বছর সে ম্যাট্রিক পাস করেছে। কিন্তু তারপর পড়াশোনা করার বদলে সে হয়েছে ইরানি তেল চোরাচালানে ব্যবহৃত পিকআপের ড্রাইভার। কালো পোশাক পরা ইমরান আমাকে তেলের গন্ধ ছড়ানো জামিয়াদের ট্রাক-ক্যাবে তার পাশে বসতে বলে। আমার মুখ একটি সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় সে। এতে দালবান্দিনে কেউ আমাকে চিনতে পারবে না।
ট্রাকের টায়ার পরীক্ষা করে খালো এসে বসে আমার পাশে। আমরা রওনা হই দালবান্দিন বাইপাসের দিকে। সেখানে ছয়টি জামিয়াদের একটি কনভয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

খালো আমাকে বলে যে তারা সাধারণত ছয় থেকে সাতটি জামিয়াদের একটি বহর নিয়ে যাত্রা করে। এ সব জামিয়াদের মালিক দারবান্দিনের এক আরবাব। তার ২০টিরও বেশি জামিয়াদ আছে। আরবাবরা বালুচ। পাকিস্তান-ইরান সীমান্তের উভয় পারেই তাদের বসবাস। তাদের মধ্যে রয়েছে সরাসরি যোগাযোগ। যখন পাকিস্তানি আরবাব তার ইরানি অংশীদারের মাধ্যমে তেল আনার নির্দেশ পায়, তখন সে তার জামিয়াদগুলো সীমান্তে পাঠিয়ে দেয়। পাকিস্তানি আরবাব এক জামিয়াদ ভর্তি তেল বা ডিজেলের জন্য ৪০ হাজার রুপি পর্যন্ত পায়।

খালো পিকআপের স্টেরিওতে জোরে বাজতে থাকা উর্দু গানের ভলিউম কমিয়ে বলে, দস্যুদের ভয়ে এবং বেলুচিস্তান প্রদেশের এই প্রত্যন্ত এলাকায় পানির অভাবের কারণে সব জামিয়াদ এক সাথে চলে।

দুই.

দুপুর হয়ে গেছে। আমরা দালবান্দিন থেকে প্রধান সড়ক লন্ডন রোড দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। এখানে কোনো রাস্তার নাম লন্ডন রোড হওয়া এক বিস্ময়কর ব্যাপার। জানা গেল যে এই সড়কটি কোয়েটা, চাঘি ও ইরানের মধ্য দিয়ে গেছে এবং পাকিস্তানকে লন্ডনের সাথে যুক্ত করেছে। রমজান মাস বলে সড়কে যানবাহন চলাচল নেই। আকাশে টুকরো টুকরো সাদা মেঘ থাকলেও তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গরমে প্রচণ্ড ঘামতে থাকি। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত বায়ু গোরিচের কারণে অবস্থার আরো অবনতি ঘটেছে। জামিয়াদের জানালা দিয়ে বাইরে মুখ বের করলেই গরম বাতাসের ঝাপটা মুখে লাগছে। কিন্তু এসিবিহীন জামিয়াদের ভেতরে আরো বেশি গরম বলে বারবার বাইরে মুখ বের করতে হচ্ছে। শেষে খালোর পরামর্শে আমি মুখে চাদর জড়িয়ে জানালা খোলা রাখলাম।

সীমান্তে মোতায়েন ফ্রন্টিয়ার কোরের (এফ সি) নিরাপত্তা রক্ষীরা এবং শুল্ক চেক-পোস্টের কেউ গাড়িগুলোকে থামাল না। খালো বলল, আমাদের ব্যবসাটা অনানুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃত। এফ সি রক্ষীদের দিকে হাত নাড়ল সে।

লন্ডন রোডে ৬০ কি. মি. পাড়ি দিয়ে আমরা ইয়াকমুক নামে একটি ছোট শহরে পৌঁছলাম। শহরে অসংখ্য খেজুর গাছ, তা কেটে লন্ডন রোড তৈরি হয়েছে। এটা ছিল আমাদের প্রথম বিরতি। এ শহরে কয়েকটি দোকান, হোটেল ও পেট্রোল পাম্প আছে।
বেকারত্বের কারণে খালো ও ইমরানের মতো বালুচ তরুণরা ইরানি তেল ও ডিজেল আনতে পাকিস্তান-ইরান সীমান্তে পাশ্ববর্তী ওয়াশুক জেলায় যায়। তেল চোরাচালানিদের বেশির ভাগই দালবান্দিনের অধিবাসী।
মুখে সাদা দাড়ি সংবলিত কিছু বয়স্ক চালক রোজা রয়েছে। কিন্তু খালো ও ইমরানের মতো যাদের বয়স তারা প্রায় কেউই রোজা রাখে না। তারা পকোড়া ও শরবত কিনে খায়। খালো তেল চোরাচালানে জড়িত হওয়ার আগে রোজা করত। সে বলে, রোজা করে কি হবে? সারা বছরই তো আমাদের ঠিকমতো খাবার জোটে না।

লন্ডন রোডে ফিরে এসে আরো ৫৯ কি. মি. পথ পেরিয়ে আমরা গ্যাট নামক স্থানে পৌঁছি। এটা নাউকুন্ডি শহর থেকে ৫২ কি. মি. দূরে। সেখান থেকে আরো সামনে গিয়ে লন্ডন রোড ছেড়ে পশ্চিমে রওনা হলাম। এখান থেকে জোদার পর্যন্ত দুই শ’ কি. মি. রাস্তা কোথাও পাকা নয়। ইমরান বলে, আপনি যদি একজন দক্ষ ড্রাইভার হন তবেই শুধু এই কাঁচা, আঁকাবাঁকা ও ধুলোভরা রাস্তা দিয়েগাড়ি চালাতে পারবেন।

আড়াই ঘণ্টা গাড়ি চলার পর আমরা আমাদের দ্বিতীয় বিরতি স্থান কাটাগারে পৌঁছি। জায়গাটা শুধু নামেই, কাজের কিছু নয়। এই ভুতুড়ে শহরটি ওয়াশুক জেলায় অবস্থিত। এ জেলার সাথে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। মাশখেল ও জোদারের মাঝে এর অবস্থান। ওয়াশুক জেলার তহসিল মাশখেল ছাড়া মাইলের পর মাইল কোনো মনুষ্য বসতি নেই। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এখানে একটি প্রকৃতিক ঝরনা আছে। তাই আমরা আমাদের সাথে আনা পানি শেষ করে নতুন করে পানি ভরে নিলাম।
খালোকে জিজ্ঞেস করি-

: কাটাগারে মানুষ বাস করে না?
সে জবাব দেয়-
: না।
সে জরাজীর্ণ সাদা প্লাস্টিকের বস্তা দ্বারা নির্মিত একটি কুঁড়ে ঘর দেখায়। বলে-
: এটি একটি উজবেকি হোটেল। এ হোটেল ছাড়া এখানে কোনো মানুষ বাস করে না।
এ হোটেলটি মানুষ পাচারকারীদের একটি বিশ্রামস্থল। তবে রমজান মাসের কারণে এখন এটা বন্ধ। আফগান অভিবাসীরা ইরান যাওয়ার পথে এ হোটেলে আশ্রয় নেয়। কখনো কখনো জামিয়াদ চালকরা চা খেতে ও বিশ্রাম নিতে এ হোটেলে আসে। এখানে চা ও পানির দাম দ্বিগুণ রাখা হয়। কারণ, এ এলাকায় আর কোথাও তা মেলে না।

ইরান থেকে পিকআপ ও মোটর বাইকে করে তেল ও ডিজেল আনা হয়। প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ লিটার তেল ও ডিজেল পাকিস্তানে চোরাচালান হয়ে আসে
ধুলোময় বাতাসে আমাদের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে ওঠে। বাতাসে এতো ধুলো ওড়ে যে কনভয়ের বাকি অংশ চোখের আড়াল হয়ে পড়ে। চালকরা তাদের ট্রাকের হেডলাইট জ্বালিয়ে দেয়। অবশেষে ট্রাকগুলো থেমে যায় এবং বাতাস ও ধুলোর তীব্রতা হ্রাসের অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু প্রবল বাতাসের গতি আরো বাড়ে। আমরা জামিয়াদের ভেতরে আটক থাকতে বাধ্য হই।

এদিকে দিন শেষ হয়ে আসছিল। যারা রোজা ছিল তারা সবাই ট্রাকের পেছনে গিয়ে তেল ও ডিজেলের ব্যারেলগুলোর উপর বসে। এখানে কোনো মসজিদ থেকে আজান শোনা যায় না, কারণ কোনো জনবসতি নেই। এক গ্লাস শরবত দিয়ে ইফতার সারে রোজাদাররা।

রোজাদাররা নামাজ পড়ে যার যার ট্রাকে ফিরে আসে। এক ব্যক্তি প্রতিটি ট্রাকে গিয়ে বন্ধ জানালায় নক করে বার্তা পৌছে দেয় যে বাতাস যত প্রবলই হোক না কেন, আমাদের জোদার পৌঁছতেই হবে।
আধা ঘণ্টা ধরে চারপাশের কিছুই কারো নজরে আসছিল না। আমি ভাবছিলাম, এ অবস্থায় যদি কোনো অ্যাকসিডেন্ট ঘটে তাহলে কী হবে? সে কী বাঁচবে? আমার মনে হয়, না।

ভাগ্য ভালো। এক পসলা বৃষ্টি হতেই চারপাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। থেমে যায় ঝড়ো বাতাস। আমাদের পথ থেকে কয়েক কি. মি. দূরে ইরানি নিরাপত্তা চেক-পোস্টের আলো চোখে পড়ে। খালো বলে-

: এই যে চেক-পোস্টগুলোর আলো দেখছেন এগুলো সীমান্ত বরাবর অবস্থিত। ইরানি চেক-পোস্টগুলো সামরিকীকৃত ও কোনো কোনো জায়গায় দেয়াল দিয়ে ঘেরা।
প্রায় তিন শ’ কি. মি. পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পাকিস্তানের জোদার চেক-পোস্টে পৌঁছি। এখানে একটি ছোট ভবন, তাতে কয়েকটি ঘর আছে। দেয়ালে লেখা- এফ সি উইং ৭৩। সাথেই রয়েছে একটি হেলিপ্যাড। কিন্তু খালো ও ইমরান জানায়, তারা কখনো এখানে হেলিকপ্টার নামতে দেখেনি।

ইতিমধ্যেই জামিয়াদের লাইন দীর্ঘ হতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত জামিয়াদ আসতেই থাকবে। তবে এ তিন ঘণ্টাই শুধু জামিয়াদ ঢুকতে দেয়া হয়। ইমরান তার ট্রাকের পেছনে একটি মাদুর বিছাতে বিছাতে বলে-
: কয়েক মাস আগে এফ সি’র লোকেরা জোদারে ঢুকতে দেয়া বাবদ প্রতিটি জামিয়াদের নিকট থেকে চার হাজার রুপি করে নেয়। কিন্তু এফ সি’র গোয়েন্দারা বিষয়টি জেনে যায়। তারপর থেকে জামিয়াদগুলোর নিকট থেকে এফ সি’র লোকদের টাকা নেয়া কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সে কারণে তারা আমাদের সারা দিন চেক-পোস্টে অপেক্ষায় রাখে।
তবে জোদারে প্রবেশের জন্য জামিয়াদ চালকদের আরেকটি গোপন পথ জানা আছে। অন্ধকারের মধ্যে হেডলাইট না জ্বালিয়ে তারা সেই পথে চলে আসে। কাছে আছে ইরানি চেক-পোস্ট। একটি এফ সি ক্রুজার এ পথে টহল দেয়। যদি এফ সি ক্রুজার কোনো জামিয়াদ চালককে ধরে ফেলে, তাকে নির্মম ভাবে পেটানো হয়।

তিন.

জোদার এখন গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। হঠাৎ একটি জামিয়াদকে নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। লাইন থেকে সরে যাওয়ায় ফ্রন্টিয়ার কোরের (এফ সি) একটি ল্যান্ড ক্রুজার পিক আপ সেটিকে ধাওয়া করে। খালোকে জিজ্ঞেস করলে জানায়, একটি জামিয়াদের চালক চেক-পোস্টে লাইনে না দাঁড়িয়ে জোর করে জোদারে ঢুকে পড়তে চাইছিল। সে বলেÑ
ঃ প্রতিবারই এ রকম ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো গোঁয়ার চালকের ধৈর্য একেবারেই নেই। তারা এফ সি ক্রুজারগুলোকে পাত্তা দিতে চায় না। কেউ কেউ সফল হয়, আবার কেউ কেউ ধরা পড়ে। এফ সি কোনো কোনো সময় চালকদের আচ্ছা করে পিটিয়ে তাদের জামিয়াদ বাজেয়াপ্ত করে।

গভীর রাতে আমরা তিন গ্রুপে ভাগ হয়ে গেলাম। তিনটি পৃথক পাত্র থেকে আমরা সবাই আহার করলাম। কোনো প্লেট ছিল না খাওয়ার জন্য। খালো বলল, মুরাদ নামের এক লোককে জোদার আসার আগের দিন টাকা দেয়া হয়েছিল। সে তার বাড়ি থেকে খাবার রান্না করে জোদারে নিয়ে এসেছে।

পিকআপ ট্রাকগুলো ছাড়া চারপাশে আর কিছু নেই। আকাশ বা জামিয়াদ ছাড়া আর কোনো ছাদ নেই মাথার উপর। শুয়ে পড়লাম। খালো তার কম্বলটি আমার সাথে ভাগ করে নেয়। কিন্তু ঘুম আসার আগে শুরু হয় বৃষ্টি। সে সাথে বজ্র ও বিদ্যুতের ঝলকানি। সারারাত ধরে চলল তা। ট্রাকে ফিরে এসে নির্ঘুম রাত কাটে সবার।
ভোর ৬টার দিকে খালো জাগিয়ে দেয় আমাকে। বলে-
: শিগগির উঠুন। এফ সি চেক-পোস্ট খুলেছে। দেরি হলে আরো এক দিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।
এক এক করে আমাদের সবার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে অবশেষে আমরা জোদার সীমান্তে পৌঁছতে সক্ষম হই।

জোদার পাকিস্তান-ইরান সীমান্তের একটি শহর। সীমান্তের পাকিস্তান অংশে মাত্র একটি গ্রাম রয়েছে। সেখানে শিবানি নামে একটি বালুচ উপজাতি বাস করে। একদিকে বহুদূর প্রসারিত বিশাল কালো রঙের জোদার পাহাড়, এদিকে শুকিয়ে যাওয়া জোদার নদীখাত গোটা পাহাড়কে কয়েক ভাগে ভাগ করেছে। এ নদী মানুষ ও প্রাণীদের পানির উৎস।
এই জোদার সীমান্ত পয়েন্ট থেকেই গোটা বেলুচিস্তান প্রদেশ, করাচির অংশ বিশেষ, দক্ষিণ পাঞ্জাবের অংশ বিশেষ এবং আফগানিস্তানের কোনো কোনো এলাকায় তেল চোরাচালান করা হয়। এটি হচ্ছে তিনটি প্রধান স্থানের একটি যেগুলো দিয়ে ইরানি ও পাকিস্তানিরা তেল ও ডিজেল চোরাচালান করে। আরবাবরা বেলুচিস্তান ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তেল বিক্রি এবং এ বাবদ অর্থ সংগ্রহ করে।

এফ সি’র কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে আমরা আশরাফের গিদান বা কুঁড়ে ঘর বা খড়ে ছাওয়া ঘর জাতীয় হোটেলের দিকে হাঁটতে থাকি। প্রতিদিন শত শত লোক এই হোটেলে সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবার খায়। আশরাফের হোটেলে খাবারের আগে পরিশোধ করতে হয় তার মূল্য। এক পট চা ৫০ রুপি। নিজেই বানিয়ে নিতে হয় চা। ইমরান দাম পরিশোধ করে আর খালো চা বানিয়ে পটে ঢালে। এটাই নাশতা- বলে সে।
সকাল ৯টা বাজে। আমি একটি পাহাড়ের মাথায় বসে। কবে যেন ইরানি মর্টারের গোলা কালো পাহাড়ের গায়ে এক সাদা গর্ত তৈরি করেছে। ইরান প্রায়ই বেলুচিস্তান সীমান্তের শহরগুলোতে গোলা বর্ষণ করে। জোদারেও।

জোদার সীমান্তের সবখানে জামিয়াদ ট্রাক। পাহাড়ের মাথা থেকে নিচে সেগুলোকে দেখতে পিঁপড়ার মতো লাগে। দামাগ পয়েন্ট থেকে ইরানি পিকআপ ও মোটর বাইকে করে তেল ও ডিজেল আনা হয়। প্রতিটি পিকআপের পেছনে থাকে প্লাস্টিকের ট্যাংক ভর্তি তেল বা ডিজেল। ট্রাক চালকদের কাছে জানা যায়, প্রতিটি প্লাস্টিক ট্যাংকে ৩৭ থেকে ৪৫ ব্যারেল তেল বা ডিজেল থাকে। আর প্রতি ব্যারেলে থাকে ৬০ লিটার।

জোদারে বিকেলে ভীষণ গরম পড়ে। সারা শরীর ঘামে ভিজে যায়। চা- এর পর চা খেয়ে আশরাফের হোটেলে বসে আমি সে গরম থেকে বাঁচার চেষ্টা চালাই। সালিম হোটেলের সামনে তার জামিয়াদ পার্ক করে রেখেছে। দু’দিন ধরে সে এখানে আছে, অপেক্ষা করছে তার ট্রাক তেলে ভর্তি করার পালা কখন আসে। সে কয়েক দশক ধরে তেল চোরাচালানের সাথে যুক্ত। যদি জোদার সীমান্ত বন্ধ হয়ে যায় তাহলে অন্য ট্রাক ড্রাইভারদের মতো সেও সংসারের খরচ চালাতে বিপাকে পড়বে। ট্রাক চালিয়ে প্রতি ট্রিপে তিন হাজার রুপি পায় সে, তার সহকারী পায় দুই হাজার রুপি।

সীমান্তে আগে নিয়ম ছিল সপ্তাহে ছয় দিন তেল চোরাচালান হবে। একদিন বন্ধ থাকবে। ছয় দিনের মধ্যে ইরান থেকে তিন দিন তেল ও ডিজেল আসবে পিকআপ ট্রাক ও মোটর বাইকে, বাকি তিন দিন আসবে গাধার পিঠে। এভাবে প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ লিটার তেল ও ডিজেল ইরান থেকে চোরাচালান হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষ এখন আর গাধার পিঠে তেল বহন করতে দেয় না। তবে আরবাবরা তেল বহনের জন্য এখনো গাধা ব্যবহার করে।

সপ্তাহে তিন দিন পিকআপ ট্রাক ও মোটর বাইকে করে ইরান থেকে পাকিসÍানে তেল আনা হয়। বাকি তিন দিন আনা হয় গাধার পিঠে চাপিয়ে....
তেল চোরাচালানের ব্যবসা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে ইরান থেকে প্রতিদিন এক হাজার ২০০ পিকআপ ট্রাকে তেল আসত ও তা জোদারসহ পাকিস্তান অংশের বিভিন্ন ডিপোতে জমা হতো। কিন্তু সম্প্রতি ইরানিরা তেলপাচারে কড়াকড়ি করায় দিনে চার শ’র বেশি পিকআপ ট্রাক আসে না।

জোদারের বিপরীতে ইরানি অংশে ল্যান্ড মাইন পাতা আছে। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতের লাশ দেখে আহাজারি করে স্বজন, চোখ বেয়ে নামে অশ্রুর ঢল।
রাতে জোদার চেক-পোস্টে সবাই যখন হাসি-গল্পে মশগুল তখন খালো আমাকে জানায় যে সারাদিনে ইরান থেকে মাত্র দুই শ’ পিকআপ তেল ও ডিজেল এসেছে।

চার.

আকাশে কোনো মেঘ নেই। হঠাৎ পাহাড়ের ওপর দিয়ে অনেক দূরে আলোর ঝলকানি দেখতে পেলাম আমরা। একটি আওয়াজও হলো। কয়েকজন চালক তাদের গাড়ি স্টার্ট দিতে চেষ্টা করে, তারা ছুটে যায় এফ সি চেক-পোস্টের দিকে। কয়েক ঘণ্টা পর আসল খবর জানা যায়। একটি গাধা দুটি তেলের ব্যারেল নিয়ে একটি মাইনের ওপর পা ফেলায় তা বিস্ফোরিত হয়েছে।

এতেঠ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে বিস্ফোরণের খবর শোনার পর খোলা আকাশের নীচেই ঘুমিয়ে পড়ি।

ভোর ৬টায় আমাকে জাগিয়ে দেয় খালো। আশরাফের হোটেলে নাশতা করে ফিরে আসি আমরা। খালো জানায়, গত রাতে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের ফলে তাদের তেল পরিবহনের পালা কয়েক দিন পিছিয়ে যাবে।

তেল চোরাচালানের পিকআপগুলো যারা চালায় তাদের মধ্যে ব্ল্যাক ২ডি অন্যতম সেরা চালক। তার বয়স তিরিশের ঘরে। এক দশক ধরে তেল চোরাচালানের ট্রাক চালাচ্ছে সে। তার এ অভিনব নামের কারণ তার গায়ের রং ভীষণ কালো এবং সে টয়োটা করোলা ২ডির মতো একটি জামিয়াদ পিকআপ ট্রাক চালায়। সে গাড়ি চালানোতে এতোটাই দক্ষ যে পেছনে ৬০ ব্যারেল ভর্তি তেল বহন করেও সে সবার আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
জোদারে আরো দুই দিন কাটে আমাদের। খালো ও তার ওস্তাদ ইমরান বুঝতে পারছে না যে কবে তাদের তেল বহনের পালা আসবে। ল্যান্ড মাইনে গাধাটির মৃত্যু সব কিছু ওলটপালট করে দিয়েছে।

সন্ধ্যার আগে ব্ল্যাক ২ডি ও তার সহকারী চেক-পোস্টে ইফতারির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। খালো ও ইমরান রোজা না থাকলেও তারা রোজা রাখে। পরদিন ব্ল্যাক ২ডি ট্রাক নিয়ে দালবান্দিন রওনা হবে। ইফতারের পর খালো অনুরোধটা জানায় তাকে। সে যেন আমাকে সাথে নিয়ে যায় যাতে সেখান থেকে আমি কোয়েটা চলে যেতে পারি।
রাজি হয় ব্ল্যাক ২ডি।

আমি সেখানে বসে অন্য চালকদের সাথে তার গল্প শুনতে থাকি। তারা কিভাবে রাতের আঁধারে ইরানি সীমান্ত রক্ষী ও এফ সির লোকদের নাকের ডগা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যায়, তারা ধাওয়া করেও তাদের নাগাল পায় না- এ সব। এগুলো সত্য না মিথ্যা তা আমি জানি না। ব্ল্যাক ২ডি তার গল্পের উপসংহার টানে এভাবে আমার আরবাব চাইলে প্রতিবারই এফ সি’র চোখে ধুলো দিতে পারি, কিন্তু তিনি অনুমতি দেন না।

পরদিন ব্ল্যাক ২ডি-এর সাথে দালবান্দিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। তার ট্রাকে তেল ও ডিজেল ভর্তি ব্যারেল। পাঁচ ঘণ্টা লাগে আমাদের পৌঁছতে। শহরে পৌঁছে দেয়ার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। পরস্পরকে বিদায় জানাই আমরা।

চার দিন পর মাশখেল থেকে খালো ফোন করে আমাকে। সেখানে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক আছে। আমাকে বিস্মিত করে সে জানায় যে সে ও ইমরান খালি ট্রাক নিয়ে দালবান্দিনে ফিরে আসছে। কারণ জোদারে তাদের ট্রাকে তেল বোঝাই করার পালা আসেনি। এক সপ্তাহের বেশি সেখানে নিষ্ফল কেটেছে তাদের।

তেল নিয়ে এলে দুই হাজার রুপি পেত খালো। কিন্তু এখন কিছুই পাবে না। সে জানে না আবার জোদার থেকে তেল নিয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত দিনগুলো তার সংসার কিভাবে চলবে।