কর্তারপুর সাহিব : শিখদের মহান তীর্থ

Oct 22, 2019 08:54 pm
কর্তারপুর সাহিব : শিখদের মহান তীর্থ

 

আমি ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের পশ্চিম পাঞ্জাবে আমার পূর্বপুরুষদের ভূমিতে ছিলাম। ৫০ বছর হওয়ার আগেই মাতৃভূমিতে যেতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেছি। এই ভূমিটি দেখার জন্য আমার পিতৃপুরুষেরা লালায়িত ছিলেন এ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকেই। দেশভাগের ওই সময়টাতে তারা তাদের বাড়িঘর ফেলে খালি হাতে চলে গিয়েছিলেন।

তারা যে ঘৃণা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যে হত্যাযজ্ঞের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যে জানমালের ক্ষতির শিকার হয়েছিলেন, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে আমার সাহসের প্রয়োজন ছিল।
আমার পরিবারের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সফরটি করেছিলাম। আমার ছেলে হতে পারে দ্বিতীয় ব্যক্তি। আর কখনো পাকিস্তান সফর না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কারণ বেদনা সহ্য করার মতো নয়। তবে ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যম অনেক কল্পকথা দূর করে দিযেছে, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারগুলো যে ঘৃণা জিইয়ে রেখেছিল, তা শিথিল করেছে। দুই লোক আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন : আমার পাঞ্জাবি ভাষাভাষী শিক্ষক ও গুরু অমরজিত চন্দন (অবিভক্ত পাঞ্জাবের শ্বাশত স্বপ্নবাজ), এবঙ আমার গ্রন্থের শাহমুখি সম্পাদক, লেখক, কবি ও পাঞ্জাবি ভাষার প্রতি আগ্রহী মাহমুদ আওয়ান।

স্বপ্নের মধ্যে হাঁটার মতো করেই লাহোর বিমানবন্দরে নিজেকে দেখেছিলাম। পরে লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসে (এলইউএমএস) প্রথমবারের মতো আয়োজিত পাঞ্জাবি সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নিয়েছি। আমার বইটির মোড়ক উন্মোচনের জন্য আমি আমন্ত্রিত ছিলাম। এটি ছিল বর্ণিল ও দ্বিভাষী লোককথা সংগ্রহবিষয়ক বই। শিশুদের জন্য পাঞ্জাবি ভাষায় (গুরুমুখি ও শাহমুখি) লেখা হয়েছে এটি। আরো কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পর আমার সারা জীবনে আকাঙ্ক্ষা পূরণ করি নানাকানা-সাহিব পরিদর্শন করে। এরপর যাই কর্তারপুর সাহিবে।
যেদিন পাকিস্তানের ভিসা পেয়েছিলাম, সে দিনটির কথা মনে আছে। আমি ছোট্ট মেয়ের মতো কাঁদছিলাম, লাফালাফি করছিলাম, উৎকণ্ঠিত ছিলাম, নার্ভাস ছিলাম, আর স্বপ্নের ঘোরেও ছিলাম। ওই দিনের পর নানকানা সাহিব ছাড়া অন্য কিছুর কথা চিন্তা করতে পারিনি। আমি সেখানে গিয়ে কিভাবে দাঁড়াব? বাবা নানকের জন্মস্থান দেখে কিভাবে নিজেকে সামাল দেব? কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর আমার স্বপ্ন আর প্রত্যাশা ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়।

মাত্রাতিরিক্ত নির্মাণ, জনাকীর্ণ শহর, নোংরা রাস্তাঘাট, নিরাপত্তার জন্য উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা জনম আস্তানকে শহর থেকে দেখাই যায় না বলা যায়। এটা শিখদের জন্য ভ্যাটিকান হবে বলে যে আশা করেছিলাম, তা নয় এটি। গাড়ি নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে থামলে আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে আমরা পৌঁছে গেছি। প্রাচীরের বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে সারা বিশ্বের ২৩ মিলিয়ন শিখ এই স্থানটি দেখার জন্য আকূল আগ্রহে রয়েছে। জীবদ্দশায় একবারের জন্য হলেও এই স্থানটি দেখার জন্য দিনে দুবার করে প্রার্থনা করে। এমনকি প্রাঙ্গনে প্রবেশ করেও ঐতিহ্যবাহী হলুদ ইটের ভবনে চুনকাম, চটচটে খান্দা পেইন্টিংস দেখে খুশি হতে পারিনি। মহারাজা রনজিত সিংয়ের নির্মিত বড় দারি বেশ কোণায় দাঁড়িয়ে আছে, গুঁড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়।

তবে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে আমাকে যেটি তা হলো, সেখানে এক মুহূর্তের জন্যও নির্জনতা নেই। নিরাপত্তার কাজ শেষ হওয়ার পরপরই কেয়ারটেকাররা আমাদেরকে ভেতরে নিয়ে গেল। আমরা তাদেরকে বোঝাতে পারলাম না যে আমরা এখানে ভিআইপির মর্যাদা লাভ কিংবা যাদুঘর দেখার জন্য আসিনি। বরং আমরা এসেছি বাবা নানকের আত্মাকে অনুভব করার জন্য। আমার অভিজ্ঞতাকে এভাবে অপদস্ত হতে দেখে আমি নিজেকে অপরাধী ভেবেছি। আমি কষ্টভরা মন নিয়ে লাহোরে ফিরে এসেছি। তবে তারপরও কর্তারপর সাহিব পরিদর্শন করার পরিকল্পনা বাদ দেইনি। ওই রাতেই ছিল ফ্লাইট।

ধন্যবাদ, কর্তারপুর সাহিব পরিদর্শন আমার জন্য আরেক অভিজ্ঞতা এনে দিলো।
অবতরণের পরপরই প্রত্যেকেই বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লাম, কোনো ধরনের গাইড ছাড়া, এমনকি কেউ কারো সাথে কথাও বলিনি। আমরা চেয়েছিলাম আমাদের বাবার সাথে একাকী সাক্ষাত করতে এবং পরিবেশ তা অনুমোদন করেছিল। গাছপালা, পাখি, টাটকা বাতাস, মাটির গন্ধ-সবই আমাদের টেনে নিচ্ছিল, আমরা পেছনের সময়ে চলে গিয়েছিলাম।

আমার পা ওই মাটিতে পড়ামাত্র আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। বাবা নানক প্রতিটি মাটি যেভাবে রেখেছিলেন, আমি তা অনুভব করলাম, স্পর্শ করলাম। আমি যখন আমার কপাল স্পর্শ করলাম, থখন চোখ দুটি ছিল ভেজা। আমার স্বপ্ন পূরণ হলো। দৃশ্যপট, গন্ধ, নীরবতা- সবই ছিল আত্মার অভিজ্ঞতা। আমরা কয়েক ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করলাম। আমরা বাবা নানকের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলাম।
বাবা নানকের মালিকানায় থাকা কয়েক শ’ একর জমিতে বিভাগ-পূর্ব গুরুদুয়ারা নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন ট্রাস্ট কিনে নিয়ে সেটিকে দেশি খেতি নামের অর্গ্যানিক ফামে পরিণত করেছে। এখান থেকৈই গুরুদুয়ারার লঙ্গরখানার খাবার সরবরাহ করা হয়। এই খামার দিয়ে হাঁটার মাধ্যমে বাবা নানকের উপস্থিতি অনুভব করা যায়, ভালোবাসার শ্রম (কির্ত), ভাগাভাগি (বন্দ চাকনা), ঐশী উপস্থিতির বার্তা (নাম) অনুভব করা যায়।
এখানে খাবার খেয়ে যত তৃপ্তি পেয়েছি, তা আর কখনো পাইনি। খেতের আখগুলো মনে হয়েছে অমৃত। ওই স্বাদ আমার জিহ্বায় স্থায়ীভাবে লেগে আছে।

অবশ্য নিরাপত্তার নামে কাঁটা তারের বেড়া, উঁচু প্রাচীর চোখে লেখেছে। আবার দরবার সাহিব সাজাতে ব্যবহার করা সস্তা প্লাস্টিকের ফুলও ভালো লাগেনি। তবে এগুলো সংশোধন করা যায়। ফলে ফেরার সময় আমি কৃতজ্ঞই থেকেছি।
কর্তারপুর করিডোর খোলার খবরকে ভারত বা ভারতের বাইরে থাকা শিখেরা স্বাগত জানিয়েছে।


তবে মনে রাখতে হবে, আমরা শিখেরা আমাদের বেশির ভাগ ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো খুইয়েছি স্থাপত্যগত সংরক্ষণের পরিকল্পনার অভাবে, দূরদর্শিতার অভাবে, বিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাবে। পূর্ব পাঞ্জাবের সব গুরুদুয়ারা ধ্বংস হয়ে গেছে। গুরু আমলের সব স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে পাকিস্তান ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর কল্যাণে এখনো অনেক কিছু অটুট রয়েছে।
শিখেরা সাধারণভাবে চায় না যে কর্তারপুর সাহিবও অমৃতসরের দরবার সাহিবের মতো পর্যটকের ভিড়ে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ুক। রাবি নদী, গাছপালা, খামার, নির্জন প্রাঙ্গনে বাবা নানকের উপস্থিতিই কাম্য। এসবের উপস্থিতিতেই কর্তারপুর সাহিব অনন্য হয়ে আছে, এটিকে সেভাবেই রাখতে হবে।
পাকিস্তান সরকারের এখন কী করা উচিত? ইকো-পর্যটনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিচে বর্ণিত কাজগুলো করা যেতে পারে।

১. দেশি খেতির হাতে যে খামার আছে, সেটিকে সেভাবেই রাখা যেতে পারে। শত শত একর জমির পুরোটাই প্রকৃতির কোলে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। এর অর্ধেকে বন সৃষ্টি করা যেতে পারে। গুরু আমলের ফুল-ফলে ভরে থাকতে পারে এলাকাটি।

২. বর্তমানে থাকা স্থাপনাগুলো অটুট রাখতে হবে। নতুন কোনোটি নির্মাণ করতে হলে সেটিকে পরিবেশের সাথে মানানসই হতে হবে।

৩. ধর্মীয় পর্যটকদের জন্য নির্মিতব্য নতুন নতুন স্থাপনা হতে হবে সরল ও প্রতিবেশবান্ধব। এগুলোর নকশা হতে হবে গুরু আমলের মতো। কোনোভাবেই আধুনিক বিলাসবহুল আকাশচুম্বি ভবন নির্মাণ করা যাবে না। আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে তা করতে হবে অনেক দূরে, যাতে এখানকার প্রতিবেশব্যবস্থায় কোনো প্রভাব না পড়ে।

৪. প্রতি দিন কতজন পর্যটক আসবে, তা নিয়ন্ত্রিত করা উচিত। পায়ে চলাকে উৎসাহিত করতে হবে। প্রতিবন্ধি ও বয়স্ক পর্যটকদের জন্য ইলেকট্রিক ট্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। করিডোরে কোনো ব্যক্তিগত পরিবহন অনুমোদন করা যাবে না।

৫. ভারতীয় এলাকায় থাকা দেরা বাবা নানকের জন্যও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
এই দুই স্থানের জন্য অমৃতসরের গুরু নানক ইউনিভার্সিটি আলাদা আলাদা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে। আর কর্তারপুরকে যাতে পর্যটকেরা গার্বেজে পরিণত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য প্লাস্টিক ব্যাগ, বোতল, প্যাকেটজাত খাবার, স্ন্যাকস নিষিদ্ধ করতে হবে। স্থানীয় লোকজনের তৈরী খাবারই কেবল অনুমোদন করতে হবে।

দয়া করে কর্তারপুরকে তার নামে মধ্যেই বাঁচতে দিন, স্বর্গে সে বসবাস করুক।
লেখক : লেখক, ফ্যাসিনেটিং ফোকটেলস অব পাঞ্জাব, শিক্ষাবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট। তিনি বসবাস করেন আটলান্টায়।
ডন