আরসিইপি ও ভারতের আশঙ্কা

Nov 12, 2019 09:22 am
আরসিইপি ও ভারতের আশঙ্কা

 

রিজিওন্যাল কম্প্রেহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগ না দেয়ার ভারতের সিদ্ধান্তে এই অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপের ব্যাপারে দেশটির দোদুল্যমনতার বিষয়টিই ফুটে ওঠেছে। বিশ্বের বৃহত্তম অবাধ বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। তবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যা-সংবলিত অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতি এতে সামিল হতে রাজি হয়নি।

অবাধ বাণিজ্য চুক্তিতে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে নয়া দিল্লি বলেছে যে আরসিইপি চুক্তিটিতে ভারতের বিবদমান ইস্যু ও উদ্বেগগুলো সন্তোষজনকভাবে সমাধান করা হয়নি।
সম্প্রতি থাই রাজধানী ব্যাংককে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানের ৩৫তম শীর্ষ সম্মেলন ও ইস্ট এশিয়া সামিটে আরসিইপি চূড়ান্ত অবস্থায় উপনীত হয়।
আরসিইপি হলো ২০১২ সালে আসিয়ানের সূচিত বৃহত্তম আঞ্চলিক বাণিজ্যচুক্তি। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য কাঠামো, ভূ-রাজনৈতিক চিত্রে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকবে। বস্তুত, ২০১২ সাল থেকে আরসিইপি আলোচনা বেশ কয়েকবার বিলম্বিত হয়েছে ভারতের পেছন দিতে হাঁটার কারণে।

এই ইস্যুতে দোটানায় থাকা ভারত আঞ্চলিকরণ ও বিশ্বায়ন থেকে উপকৃত হয়েছে এবং দেশটি বহুপক্ষীয় সহযোগিতার রক্ষক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তনের কাজ করছে সক্রিয়ভাবে। নয়া দিল্লি কেবল লুক ইস্ট নীতিকে হালনাগাদ করে অ্যাক্ট ইস্টই করেনি, সেইসাথে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে আরো বেশি প্রভাব ফেলতে চাচ্ছে।

ভারত সরকার আশঙ্কা করছে, আরসিইপি ভারতের ভঙ্গুর ম্যানুফেকচারিং শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। নিম্নমুখী ধাক্কায় ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে। মোদি সরকার যদিও ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, কিন্তু আরসিইপিতে যোগ দিলে তিনটি বিশ্বমানের মেনুফেকচারিং শক্তির (চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) সামনে ভারতের দুর্বলতা প্রকট হয়ে পড়বে। ছোট ছোট কারখানা, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সামান্য উদ্যোগুলো বিধ্বস্ত হয়ে যাবে, এমনকি ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়বে।

দীর্ঘ দিন ধরেই ‘কূটনৈতিক ধারা-সংবলিত শক্তিশালী দেশে’ পরিণত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে ভারত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দেশটি কূটনীতিতেও বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আরসিইপিতে ভারত যোগ দিলে দেশটি চীন ও জাপানের পেছনে চলে যাবে। কারণ অর্থনীতিতে দেশ দুটি বেশ এগিয়ে আছে। সেক্ষেত্রে ভারত নিজেকে কঠিন অবস্থায় দেখতে পাবে।

বিশ্বায়ন ও আঞ্চলিকরণের প্রবণতা অনিবার্য বিষয়। বহুপক্ষীয়বাদ ও অবাধ বাণিজ্য ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ সৃষ্টি করেছে। অবশ্য জাতীয়তাবাদ ও লোকরঞ্জকবাদ এমন এক সংরক্ষণবাদের দিকে নিয়ে যায়, যা হয় সংকীর্ণ মানসিকতার। এতে কেবল আশু লাভটিই বিবেচনা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
এটা স্পষ্ট যে আরসিইপির অগ্রগতি বিশ্বায়ন ও বহুপক্ষীয়বাদ অনুসরণের ক্ষেত্রে অবাধ বাণিজ্যের জন্য একটি বড় বিজয়। বর্তমানে আরসিইপিতে ভারতের যোগ না দেয়াটা প্রমাণ করে যে দেশটি বহুপক্ষীয়বাদের উপকার ভোগ করা অব্যাহত রাখতে চাইলেও একইসাথে সে সংরক্ষণবাদকে উৎসাহিত করে, এমন দেশকেও চটাতে চায় না।
বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ভারতের উচিত হবে তার দায়িশীলতাকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা। অবশ্য দেশটি বারবারই তার নিজের স্বার্থে আরসিইপিকে বাধা দিতে ও প্রতিবন্ধকতা আরোপ করতে অভ্যস্ত। নতুন যুগে বৈশ্বিক বহুপক্ষীয়বাদ সূচনা করা নিয়ে আরসিইপির আশাবাদ বিপুল। কিন্তু আরসিইপিকে সমর্থন না করে ভারত এর অগ্রগতিই বিলম্বিত করছে।

বলা হয়ে থাকে, গাছেরটা খাওয়া আর তলারটা কুড়ানোর কাজ একসাথে চলতে পারে না। কিন্তু ভারত দুটিই করতে চায়। কিন্তু এর ফলে দেশটি তার নিজের তৈরি উভয় সঙ্কটের মধ্যেই দেখতে পাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে উন্নয়নের যে সুযোগ হাতে এসেছে, দেশটি তা হারাবে। একইসাথে দেশটি সংরক্ষণবাদের কল্যাণ থেকেও সুবিধা আদায় করতে পারবে না।

গ্লোবাল টাইমস