প্রসঙ্গ খালেদা জিয়া : খাঁচা-বন্দী বাঘকে ছোকরারাও খোঁচা দেয়

Nov 20, 2019 04:31 pm
খালেদা জিয়া

 

বাংলা ভাষায় পরিহাসের গল্প অনেক। মনে পড়ছে শচীন সেনগুপ্ত রচিত ও বহুলালোচিত ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের শেষ দৃশ্য। নবাবকে আটক করার পর রাজধানী মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসা হয়। হত্যার পূর্বক্ষণে নবাবকে নিয়ে পরিহাসের আয়োজন করা হলো। তাকে অপমান-অপদস্থ করার সব আয়োজন করা হয়েছিল। একদল নিম্নস্তরের লোককে হাজির করা হয় তার দরবারি হিসেবে। অপমানজনক ধ্বনি দেয়া হয়- ‘কালকের নবাব, ভেগে-পড়া, বাংলা-হারা, সিরাজউদ্দৌলা বন্দী বাহাদুর।’ নবাবের সামনে তৈরি করা হয় কাঁটা দিয়ে তৈরি, ঘেটফুল দিয়ে সাজানো আসন। জুতার কারণে ধরা পড়েছিলেন বলে কেউ তার দিকে ছেঁড়া জুতা এগিয়ে দিয়ে উপহাস করেছে। নোংরা খাবার পরিবেশন করে তারা বলেছিল, ‘আপনার কপাল পোড়ার সাথে সাথে খিচুড়িও পুড়ে গেছে। তাই এটাই আপনার খানা।’ উত্তরে সিরাজউদ্দৌলা বলেছিলেন, ‘তোমাদের এই পরিহাস নির্মম, নিরর্থক নয়।’ নাটকে আবেগময় ভাষায় সিরাজউদ্দৌলা প্রজাদের অতীতের অর্জন, সফলতা এবং ত্যাগ-সংগ্রামের বর্ণনা করে প্রশ্ন করেন, ‘তারই পুরস্কার কি ওই কণ্টক আসন? তারই পুরস্কার কি ওই ছিন্ন পাদুকা? তারই পুরস্কার কি এই তস্করলভ্য লাঞ্ছনা?’

বিজয়ীরা ইতিহাস লিখে থাকেন, সে কারণে ইতিহাসের পাতায় পাতায় এ রকম অসংখ্য পরিহাসের বাস্তব কাহিনী রয়েছে। আগেকার দিনে যুদ্ধের মাধ্যমেই জয়-পরাজয় নিশ্চিত হতো। এখন রাজনীতির কূট ঘূর্ণাবর্তে দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ভোটযুদ্ধ অথবা নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতার অদলবদল হয়। তবে নেতানেত্রীদের কথামালা বা ঠাট্টা-পরিহাস আগের মতোই রয়েছে। তবে ইতিহাসের সেই কাঠিন্য আজ আর নেই।

শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি সাম্প্রতিক মন্তব্যকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ‘নির্মম পরিহাস’ বলেই মনে করেন। গত ১৫ নভেম্বর দলের ধানমন্ডি অফিসে সংবাদ সম্মেলনে তিনি ওই মন্তব্য করেন।

জনাব কাদের বলেন, ‘বিএনপি নেতারা বলেছেন তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে জেল থেকে বের করে আনবেন। তারা বারবার বলছেন, আইনি লড়াইয়ে খালেদার মুক্তি হবে না। আমরা তাদের দুর্বার আন্দোলন দেখার অপেক্ষায় আছি।’ জেলে অন্তরীণ বেগম জিয়াকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এ ধরনের মন্তব্য বা উপহাস নতুন নয়। বাঘকে যখন খাঁচায় বন্দী করা হয়, তখন ছেলে-ছোকরারাও খোঁচা মারে। তার কারণ সে বন্দী। / হুঙ্কার দিতে পারে, কিন্তু লৌহকপাট ভেদ করতে পারে না। বেগম খালেদা জিয়া এমন একজন মানুষ নন, যাকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, ঠাট্টাতামাশা করা যায়। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একাধিকবার। তিনি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির স্ত্রী। তার নিজের অর্জনও কম নয়।

সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘকালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সবচেয়ে সাহসী ও নিরাপস ভূমিকা পালন করেছিলেন। নীতিনিষ্ঠ দৃঢ়তা তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। ১/১১-এর কুশীলবরা তাকে দেশ থেকে বের করে দিতে চেয়েছেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই।’ এবারেও ১/১১-এর দোসররা চেষ্টা করেছেন নমনীয় করার। তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপমান-অপদস্থ করা হয়েছে। তার খাবার সীমিত করা হয়েছে। তার চিকিৎসা কোনো কোনো সময় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এসব জেনেছি আমরা সংবাদপত্র পাঠে। দেশের সাধারণ মানুষ এতে বিচলিত হয়েছে। কিন্তু তিনি থেকেছেন অনড়। তাকে যখন কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো, সেদিনের দৃশ্য স্মরণ করুন।

হাজারো মানুষ অনুগমন করেছে তাকে। আদেশের অপেক্ষায় লাখো মানুষ ছিল প্রস্তুত। কিন্তু তার কড়া নির্দেশ- কেউ যেন অগ্রসর না হয়। এর কারণ তিনি সরকারের পরিকল্পনা আঁচ করতে পেরেছিলেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল পুলিশের। নিঃশেষ হতে হতে বিএনপির যে জনশক্তি অবশিষ্ট আছে, তা সমূলে বিনাশ করার মতলব। আইনের শাসনে বিশ্বাসী খালেদা জিয়া। আইনের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় তিনি তার মুক্তি চেয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে কোর্ট-কাচারি ঘুরে ঘুরে অবশেষে তার আইনজীবীদের এই প্রত্যয় জন্মেছে যে, আইনি প্রক্রিয়ায় তার মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

ছলে-বলে-কলে-কৌশলে দীর্ঘ সময় ধরে নাটক কষছেন কুশীলবরা। বাংলাদেশে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে একমাত্র চ্যালেঞ্জ, জিয়া পরিবারকে যদি নিঃশেষ করা যায়, তাহলে ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ক্ষমতায় থাকা যাবে। মামলাগুলোর ধারাবাহিকতা এটাই প্রমাণ করে, ক্ষমতাবানরা লাজলজ্জা, সৌজন্য শুভেচ্ছার থোড়াই কেয়ার করেন। তাদের মনের কথা, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার খনি চাই।’ অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে মামলার পর মামলা এবং সাজানো অজুহাত দিয়ে খালেদার মুক্তিকে অসম্ভব করে তোলা হয়েছে।

বেগম জিয়া ২৩ মাস ধরে কারাগারে আটক। অসুস্থতার কারণে ১ এপ্রিল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ৩৬। মিলেছে জামিন ৩৪টি মামলায়। কয়েক দিন আগে ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি’ ও ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতে’র মামলা দু’টিতে তিনি জামিন পেয়েছেন। যে দুই মামলায় খালেদা জামিনের অপেক্ষায় আছেন তা হলো, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলা।

এ দু’টি মামলায় তার মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের সাজা হয় খালেদা জিয়ার। ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলে এই মামলায় তার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। আর গত বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। সবাই জানে, মামলাটি মিথ্যা। ১/১১-এর সরকার বেগম জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য এই মামলাসহ আরো চারটি মামলা করেছিল। একই সাথে, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও অভিন্ন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে তিন-চারটি মামলা দায়ের করা হয়।

এটি ছিল ‘মাইনাস টু’ থিওরির একটি অংশ। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো তিনি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়ায় বাতিল হয়ে যায়। একই ভাবে একই উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো ও ছিল প্রত্যাহারযোগ্য। অথচ ক্ষমতাসীন দল শুধু মামলাটি কার্যকরই করেনি, বরং ‘রূপ-রস-গন্ধ’ দিয়ে মামলাটি সচল করেছে। মামলার কার্যক্রম সম্পর্কে যারাই অবহিত তারা জানেন, শুরু থেকেই সরকার তার আইনি লোকজন দ্বারা অন্যায়ভাবে মামলাটি পরিচালনা করেছে। রায়ের কপি পেতে এবং তা কারাগারে পৌঁছতে অবিশ্বাস্যভাবে মাসখানেক সময় লাগানো হয়েছিল। দায়েরকৃত সবগুলো মামলাই জামিনযোগ্য। কিন্তু যতবারই মামলা মোকাবেলা করা হয়েছে, ততবারই নানা অজুহাতে মামলার কার্যক্রম ব্যাহত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে ‘কলঙ্কিত’ করার অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য আগামী ৪ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে একটি মানহানির মামলা করেছিলেন জননেত্রী পরিষদের সভাপতি। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার ধরন বোঝার জন্য এ মামলাই যথেষ্ট।

রাজবন্দী মুক্তির পথ দুটো। আইনি প্রক্রিয়ায় লড়াই করা অথবা প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে মুক্তি দিতে বাধ্য করা। আইনি প্রক্রিয়া কিভাবে বেহাত হয়ে গেছে উপর্যুক্ত আলোচনায় এবং গণমাধ্যমে তা প্রতিফলিত হয়েছে। এখন গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে তার মুক্তির বিষয়টি আলোচনা করা যাক। গণ-আন্দোলন পরিচালনা করে গণসংগঠন তথা রাজনৈতিক দল। বিএনপি নিঃসন্দেহে একটি গণভিত্তিক রাজনৈতিক দল। অতীতের আন্দোলন ও নির্বাচন তা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।

কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত গণ-আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিএনপির যোগ্যতা ও সক্ষমতা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। প্রথম পাঁচ বছর যেহেতু বিএনপি জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বলে পরিচিত ছিল, সে কারণে নির্যাতন-নিপীড়নের মাত্রা নিরঙ্কুশ হয়নি। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে পরিকল্পিতভাবে যখন বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়, তখন বিএনপি ‘বিরোধী দল’-এর পরিচিতিও হারিয়ে ফেলে। ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে বিএনপিকে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিত্বহীন করতে সক্ষম হলো। বোগাস নির্বাচনের প্রথম বর্ষ অতিক্রম করার সময় বিএনপি গণ-আন্দোলনের সূচনা করলে সরকার এই আন্দোলনকে সরকার জঙ্গি ও সহিংস প্রমাণ করার প্রয়াস পায়।

দুর্ভাগ্যক্রমে, সন্ত্রাসের কাতারে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যেরা বাসে আগুন দিয়ে বিরোধী দলকে দায়ী করার অনেক ঘটনা তখনকার দিনে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে জঙ্গিদের দৌরাত্ম্য থাকায় সরকার বিএনপিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে।

বিরোধীশক্তিকে নির্মূল করার জন্য জঙ্গিবাদের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ক্রমেই দেশে মৌলিক মানবিক অধিকারের ক্ষেত্র ও সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। সরকার শক্তি প্রয়োগকে বিরোধী দল দমনের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। এ সময়ে রাজনৈতিক হত্যা, গুম, খুন, জখম নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যতই দিন বাড়তে থাকে, ক্ষমতাসীন মহলের অন্যায়-অত্যাচার বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনের পূর্বক্ষণে গোটা দেশে কার্যত ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। নিবন্ধনকৃত দলগুলো নামেমাত্র বহাল থাকে। বাস্তবে এমন কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না যার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ‘এক নেতা এক দেশ’ নীতির বাস্তবায়ন ঘটেছে আবার। একটি পরিসংখ্যান মতে, বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার আর আসামি ২৫ লাখ।

সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। বিএনপি যতবারই জনসভা আহ্বান করেছে, ততবারই আওয়ামী লীগ ঢাকা শহরে ‘সরকারি হরতাল’ পালন করেছে। অন্য কোনো বিরোধী দলকেও তারা সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ করার সুযোগ দেয়নি। এমনকি মানববন্ধনের মতো নেহায়েত নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি গ্রহণ করতেও দেয়নি সরকার। অভিযোগ, বন্দুকযুদ্ধের নামে রাজনৈতিক বিরোধীদেরকেও হত্যা করা হয়েছে। এখনো নানা অজুহাতে হত্যা-গুমের তাণ্ডব বহাল রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে বাস্তবে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। এই তো সেদিন নামমাত্র অজুহাতে ‘আসক’-এর কার্যালয়ে সরকারি লোকজন পাঠানো হয়েছে।

যে কোনো কারণে- সে সুন্দরবন রক্ষা অথবা কুরআন অবমাননার প্রতিবাদে মিছিল হলেই হামলা। সম্প্রতি ভোলায় নিরীহ মানুষের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। সুতরাং গণ-আন্দোলনের সম্ভাবনা যে সুদূরপরাহত, তা স্পষ্ট। এর মাঝেও গণ-আন্দোলনের উদ্যোগ যে নেয়া হয়নি, তা নয়। শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কিভাবে দমন করা হয়েছে তা সবাই জানে। সুতরাং আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদেরের বিএনপির নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন দেখার খায়েশ একটি ‘নির্মম পরিহাস’ মাত্র।

সিভিল সোসাইটি যদিও বিভক্ত ও সুবিধাবাদে আক্রান্ত, তবুও একজন শামগুল হুদা অথবা একজন ফরহাদ মজহার উদ্যোগী হয়েছিলেন। কী পরিণতি হয়েছিল তাদের- গণমাধ্যমের বদৌলতে মানুষ তা জানে। ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী একজন নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা। ’৭১-এর রক্তঝরা দিনগুলোতে তিনি রণাঙ্গনে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছিলেন। বিজয় অর্জিত হওয়ার পর গণমানুষের জন্য বিন্দু বিন্দু ঘামের বিনিময়ে গড়ে তুলেছেন গণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়। সেটি কয়েক মাস আগে নিকৃষ্টভাবে আক্রান্ত হয়েছে, দখল হয়েছে। কারণ, তিনি বর্তমান সরকারের সমর্থক নন।

যেখানেই যেকোনো ব্যক্তি বা সংগঠন আকারে ইঙ্গিতে ও শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করেছে, তাদেরকেই জেল খাটতে অথবা সাজা পেতে হয়েছে। বহু ভিন্নমতাবলম্বী বিদেশে গিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। গণমাধ্যমের দায়িত্ব পালন করার উপায় সীমিত। ভিন্নমতের একজন বহুল আলোচিত সম্পাদককে ধরার জন্য ভিলেজ পলিটিক্স কায়দায় তাকে খুনের আসামি করার চেষ্টা চলছে বলে জানা যায়। দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অনেক আগেই। আরো দুটো দখল হয়েছে। ব্যাংক ও বীমা দখলদারি থেকে মুক্ত নয়। সুতরাং কিভাবে ওবায়দুল কাদের আশা করেন, ‘লোহার খাঁচা’ থেকে মানুষ বেরোতে পারবে? এ শুধুই নির্মম পরিহাস নয় কি?

অনেকবার এই অবস্থাকে বুদ্ধিজীবীরা হাত-পা বেঁধে দৌড়ানোর আদেশের সাথে তুলনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ‘ভীতির রাজত্ব’। ব্যক্তি, সংগঠন, পেশাজীবী নেতৃত্ব কেউ নিরাপদ নয়। একটি উদ্বেগজনক খবর হলো বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতা। ভিসিদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্ব্যবহার অতিষ্ঠ করে তুলেছে শিক্ষার্থীদের। আর ‘সোনার ছেলে’দের তাণ্ডবে শিক্ষাঙ্গন দিশেহারা। সরকার এই অপ্রিয় বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এটিকেও রাজনৈতিক লেবাস দেয়ার চেষ্টা করেছে। তা অন্যায়, অবাস্তব ও দুর্ভাগ্যজনক।

মাঝে মধ্যেই শাসকনেতারা গণ-আন্দোলন প্রসঙ্গে আইয়ুব খান এবং এরশাদের আমলের উদাহরণ দিয়ে থাকেন। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে গুলি চালানো হয়েছে। দেখামাত্র গুলির আদেশ ছিল না। ’৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে গুলি হয়েছে। পাইকারি গুলির আদেশ ছিল না। শাসকদলের নেতৃত্ব এই নিশ্চয়তা যদি দেয় যে, মিছিলে গেলে গুলি খেতে হবে না। তাহলে তারা গণ-আন্দোলন আবার দেখতে পাবেন। আর সে আন্দোলন হয়তো হবে ’৭০-এর জলোচ্ছ্বাসের মতো। জাতির এ মুহূর্তের একটি আবেদন, ‘ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার’।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]