ক্ষুদ্রঋণের আড়ালে যা হচ্ছে

Nov 23, 2019 04:32 pm
ক্ষুদ্রঋণের আড়ালে যা হচ্ছে

 

‘ক্ষুদ্রঋণ’ ও ‘দারিদ্র্যবিমোচন’ সাম্প্রতিক সময়ের খুব আলোচিত পরিভাষা। ক্ষুদ্রঋণ হচ্ছে দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে প্রদত্ত ঋণসুবিধা। বেকার, দরিদ্র উদ্যোক্তা এবং ‘দরিদ্রভাবে বসবাস করেন’ এমন জনগোষ্ঠী যারা সাধারণ ব্যাংকগুলোর ঋণের আওতায় আসতে পারেন না তাদের সহজ শর্তে বিনা জামানতে এই ঋণ প্রদান করা হয়ে থাকে (এমআরএ আইন, ২০০৬)। দারিদ্র্যবিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ কতটুকু সহায়ক, এ নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। দারিদ্র্যবিমোচন যদি নাই করে, তাহলে এই কার্যক্রম গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত কিভাবে বিস্তৃতি ঘটল? ২০ হাজার প্রতিষ্ঠান তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রামের ১১ কোটি নারী-পুরুষকে ঋণের জালে ‘আটকাল’ কিভাবে? উত্তর সহজ। স্বাধীনতা-উত্তরকালে শত শত এনজিও বিদেশের অর্থায়নে সেবাপ্রকল্প নিয়ে দেশে কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে তারা ক্ষুদ্রঋণের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এতে এনজিওগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। অপর দিকে গ্রামের দরিদ্র মানুষ বিনা জামানতে সুদের বিনিময়ে হাতে কিছু নগদ টাকা পায়। অথচ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে জামানতসহ পদ্ধতিগত জটিলতা থাকে। কিন্তু সচ্ছলতা অর্জনে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কিছু এনজিও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্য ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে বিনিয়োগ করে থাকে। এক কথায়, অভাবগ্রস্ত মানুষের দরিদ্রতাকে কাজে লাগিয়ে ঋণের মাধ্যমে লাভজনক ব্যবসা পরিচালনার নাম ‘ক্ষুদ্রঋণ’। ক্ষুদ্রঋণকে কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ ‘মৃত্যুফাঁদ’রূপে চিহ্নিত করেছেন।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রশ্ন তুলেছিলেন, যে দেশে ২০ হাজার প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণ দেয়, সে দেশে ছয় কোটি লোক কিভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে? এর মধ্যে আবার দুই কোটি লোক হতদরিদ্র। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতাদের ৭০ শতাংশই আজও দারিদ্র্যসীমার নিচে। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্যকে ‘জাদুঘরে পাঠানো’র ঘোষণা দেয়া হলেও তা আসলে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভেবে দেখার সময় এসেছে, ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্যবিমোচনে আসলেই ভূমিকা রাখতে পারছে কিনা। ঋণের চোরাবালিতে আটকে গেছে বহু মানুষ। ঋণের ফাঁদ ফিরে এসেছে। অনেকে আটকে যাচ্ছেন এ দুষ্টচক্রে। তিনি বলেছেন, ক্ষুদ্রঋণ এককভাবে কখনো দারিদ্র্যবিমোচন করতে পারে না। দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য প্রয়োজন মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান (ডয়চে ভেলে, ০৭ নভেম্বর, ২০১০; দৈনিক আজাদী, চট্টগ্রাম, ১৪ এপ্রিল, ২০১৮)।
দারিদ্র্যবিমোচনে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা নিয়ে আমাদের দেশে এবং বাইরে বেশক’টি গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ কর্তৃক ২০০৬-২০০৭ সালে পরিচালিত একটি গবেষণাকর্মে দেখা যায়, দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে যারা ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করে তাদের মাত্র ৭ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠতে পেরেছিল। অর্থাৎ, বাকি ৯৩ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে গেছে। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অনেক ঋণগ্রহীতা আগের মতোই রয়ে গেছেন। বাকিদের অবস্থা আরো খারাপ। এর মাধ্যমে পূর্ণ সফলতা এসেছে- এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি না’। যারা অন্তত ৪ বছর ধরে ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা ভোগ করছে এই গবেষণায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল (বিবিসি নিউজ, ২৭.০১.২০১১)। ২০১০ সালে ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘গ্লোবাল মাইক্রোক্রেডিট ক্যাম্পেইন’ নামের আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়কে ধারণ করে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ক্ষুদ্রঋণ নেয়া প্রায় ২৪ মিলিয়ন পরিবারের বিপুল গরিষ্ঠাংশ দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠতে পারেনি। মাত্র ৯ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠতে পেরেছিল। অপর একটি গবেষণা করেছে অভিজিৎ ব্যানার্জির নেতৃত্বে হার্ভার্ডের একটি প্রতিষ্ঠান। তারা ৭টি দেশে এ গবেষণা পরিচালনা করেন। দেশগুলো হচ্ছে- ভারত, মঙ্গোলিয়া, ফিলিপাইন, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, মরক্কো, ইথিওপিয়া ও মেক্সিকো। তাদের গবেষণার মূল বিষয় ছিল, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে দরিদ্র মানুষের কেমন অগ্রগতি হয়। দেখা গেছে, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে দরিদ্রতা তেমন হ্রাস পায়নি। আয় কিছুটা বাড়লেও দরিদ্ররা দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠতে পারেনি। এ ছাড়া ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়েনি। ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ বলেছেন, আমি নিজে একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, যারা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠেছে তাদের সেই অবস্থানও টেকসই নয়। যেকোনো সময় তারা পড়ে যেতে পারে (এম এ খালেক, যুগান্তর, ঢাকা, ১৩ এপ্রিল, ২০১৭)।
কুমিল্লা জেলায় ২০০২ সালে ক্ষুদ্রঋণের চালচিত্রের ওপর একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। স্কটল্যান্ডের স্টারলিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রবার্ট ই রাইট ও দীপক ঘোষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশন ও স্টারলিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত গবেষণায় কুমিল্লা জেলায় ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনের ‘উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখতে পাননি’। তারা উল্লেখ করেন যে, ক্ষুদ্রঋণ দেয়া হয় স্বল্প মেয়াদে। টাকা হাতে এলে পরিবারে কিছুটা সচ্ছলতা আসে, খরচ হয়ে গেলে অভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ক্ষুদ্রঋণ এজেন্সিদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এমন নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে যাতে দারিদ্র্যের হার সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসে।

ব্রিটিশ সরকারের এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, দারিদ্র্য দূর করা ও নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্রঋণের ইতিবাচক ভূমিকা নেই। নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকার পক্ষে বহুল প্রচারিত সমীক্ষাগুলোকে নাকচ করেছে সমীক্ষাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল’ ও ‘অপর্যাপ্ত পরিসংখ্যানের’ ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা ‘কার্যকারিতার ভিত্তিহীন অনুমানের’ ফলে ক্ষুদ্রঋণ কার্যকর বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। এটি বলছে, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে যে গল্পগাথা তৈরি হয়েছে তার ভিত্তি ক্ষমতাশালী ক্ষুদ্রঋণ শিল্পের প্রচার করা ‘বিচ্ছিন্ন কিছু কাহিনী’। ‘এভিডেন্স অব দ্য ই¤প্যাক্ট অব মাইক্রোফিন্যান্স : অ্যা সিস্টেমেটিক রিভিউ’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা দিয়েছে ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয় (ডিএফআইডি), ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন ও ইউনিভার্সিটি অব অ্যাংলিয়া। এতে বলা হয়, ‘দৃশ্যত ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে এর ইতিবাচক প্রভাবের পক্ষে এখনো স্পষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি।’
ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচন হয় না; বরং তৃণমূল পর্যায়ে সুদের বিস্তৃতি ঘটে, তৈরি হয় নতুন ‘কাবুলিওয়ালা’। ২০১১ সালে ডেনমার্কের সাংবাদিক টম হাইনমান কর্তৃক নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ‘ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদ’ নামক প্রামাণ্যচিত্রে স্পষ্ট হয়েছে যে, ‘ক্ষুদ্রঋণ’ দারিদ্র্যবিমোচনে ব্যর্থ।

তিনি চট্টগ্রাম, দিনাজপুর ও সাভারের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখেছেন গরিব নারী-পুরুষ গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাকসহ একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারেনি। সব সংস্থা নানা প্রলোভন দিয়ে এবং ‘মিথ্যা’ স্বপ্ন দেখিয়ে দরিদ্র জনগণকে ঋণ নিতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। ঋণের টাকা কোথায় ব্যয় হয় সে খবর কেউ রাখে না। অনেকে ঋণের টাকায় যৌতুক, সন্তানের পড়ালেখা, ধারদেনা শোধ ও গৃহস্থালী আসবাবপত্র কেনায় খরচ করে ফেলে। সুদে আসলে এই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। ঋণগ্রহীতার জীবনযাত্রার মানে উন্নয়ন ঘটেনি। এদিকে, স্বামীর অগোচরে ঋণ নেয়ায় তালাক ও আত্মহত্যা পর্যন্ত ঘটেছে। যারা হাঁস-মুরগি পালন করত তারা বড় খামার করতে পেরেছে এমন নজির নেই।

প্রামাণ্যচিত্রটিতে দাবি করা হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন গ্রামীণ ব্যাংককে দাতাদের দেয়া সাহায্য থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলার নিয়ম ভেঙে সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণে স্থানান্তর করা হয় দাতাসংস্থা ‘নোরাড’কে না জানিয়ে। ক্ষুদ্রঋণের ধারণাটি নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে প্রথম চালু করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘গ্রামের দরিদ্রদের ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্য কমানোর লক্ষ্যে ৩০ বছরেরও বেশি আগে অধ্যাপক ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু করেন।’ ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থাপনা এবং চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়া নিয়ে কাজ করে থাকে ব্রিটিশ সরকারের ডিএফআইডি।

‘ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব নিয়ে এ পর্যন্ত চারটি উল্লেখযোগ্য পর্যালোচনা হয়েছে’- একথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘নানা গল্পগাথার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে যে, ক্ষুদ্রঋণ মানুষের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন আনতে পারে।’ তবে ক্ষুদ্রঋণের প্রভাবের ধরন, পরিধি ও ভারসাম্য বিষয়ে গবেষণা অপর্যাপ্ত ও অসম্পূর্ণ। ‘সর্বোপরি, ক্ষুদ্রঋণ প্রবল প্রভাব রাখে- এমনটা প্রমাণ করার মতো কোনো বহুল প্রচারিত গবেষণা যে নেই তা অনেকেই স্বীকার করেছেন।’ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ক্ষুদ্রঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (আশা), গ্রামীণ ব্যাংক ও ব্র্যাক। প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের হার ৯৮ শতাংশ, যা বিস্ময়কর। সমালোচকরা অভিযোগ করে থাকেন, ঋণ আদায়ের জন্য গ্রামবাসীকে হয়রানি করা হয়। কেউ কেউ বলে থাকেন, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে মানুষ দ্রুত ঋণের চক্রে ডুবে যেতে পারে।
ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থা বিশেষত এক হাজার এনজিও ‘জমজমাট ব্যবসা’ চালিয়ে যাচ্ছে এবং সুদের বিস্তৃতি ঘটছে তৃণমূল পর্যায়ে। গ্রামীণ ব্যাংক ২৫৬৮টি শাখার মাধ্যমে দেশের ৮১ হাজার ৩১৭টি গ্রামে ৮৪ লাখ সদস্যকে ঋণের জালে আটকে ফেলেছে বলে কথিত আছে।

এ খাতে গ্রামীণ ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ আট হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ২০১০ সালে তারা গ্রাহকের কাছ থেকে সুদ আদায় করেছিলেন ৭৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তবে গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের উচ্চ হার বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়েও বেশি।

ব্র্যাকের ২০১২ সালের প্রতিবেদনে জানা যায়, ব্র্যাক ২,৬৬১টি ফিল্ড অফিসের মাধ্যমে ছয় জেলার ৫০৯টি উপজেলায় দুই হাজার ৮৮০ কোটি টাকা ক্ষুদ্রঋণ খাতে বিনিয়োগ করেছে। ১১ কোটি ৩০ লাখ দরিদ্র মানুষ ঋণচক্রে আটকা পড়ে। ক্ষুদ্রঋণ চালু হওয়ার ৪৩ বছর পরও এমন কোনো প্রমাণ নেই, যাতে বলা যেতে পারে ক্ষুদ্রঋণ গরিবদের দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে পারে। ডেনমার্কের সাংবাদিক টম হাইনমান গ্রামীণ ব্যাংকের প্রথম ঋণগ্রহীতা, চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার জোবরা গ্রামের সুফিয়া খাতুনের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। চিকিৎসার টাকা জোগাতে তার পরিবারের সদস্যরা দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করেন।

বাংলাদেশের হতদরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ৬৭ শতাংশই ব্যয় করে অনুৎপাদনশীল খাতে, যা তাদের দারিদ্র্যবিমোচনে কোনো ভূমিকাই রাখে না। সম্প্রতি দেশের দুর্যোগপ্রবণ আট জেলার খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি পরিচালিত জরিপের প্রতিবেদনে এ তিক্ত সত্য ফুটে উঠেছে। দুর্যোগপ্রবণ রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় এ জরিপ চালানো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এ জরিপ প্রতিবেদনে ‘দারিদ্র্যবিমোচনে দরিদ্র ব্যক্তিদের সম্পদ প্রদান’র ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বলা হয়, হতদরিদ্র ব্যক্তিদের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। এদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষই দেনাগ্রস্ত শুধু স্থানীয় মুদি দোকানগুলোর কাছে। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ২৯ শতাংশ হতদরিদ্র চিকিৎসাবাবদ খরচ করে এবং ১৭ শতাংশ দৈনন্দিন খাবার কেনে। এছাড়া ক্ষুদ্রঋণের ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় মৃতের সৎকার, বিয়ে ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং জরুরি সঙ্কট মোকাবেলায়। হতদরিদ্রের ঋণের উৎস স¤পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬০ শতাংশ মানুষই আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ঋণ নেয়। দাদনের ঋণ নেয় ১০ শতাংশ। এ ছাড়া ১৪ শতাংশ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে, ৭ শতাংশ ব্র্যাক থেকে, ১২ শতাংশ বিভিন্ন এনজিও থেকে এবং মাত্র ১ শতাংশ সাধারণ ব্যাংক থেকে।

এনজিওদের অর্থের জোগানদাতা যে শক্তি, পৃথিবীর সর্বত্র তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিকাশ, খ্রিষ্টধর্ম প্রচার, ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন মুৎসুদ্দী শ্রেণী তৈরি করে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পুঁজি পাহারা’ দেয়া এনজিওদের লক্ষ্য বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। বিগত ২৫ বছরে ঋণ বা সাহায্যের নামে এ দেশে এসেছে ৫০ হাজার কোটি টাকা, তার ৭৫ ভাগ অর্থাৎ ৩৭.৫০ কোটি টাকা ‘তারাই নিয়ে গেছে’, বাকি ১২.৫০ হাজার কোটি টাকা এ দেশে একটি ধনিক শ্রেণী গঠনে খরচ হয়েছে। সরকারি তালিকাভুক্ত এনজিওর সংখ্যা বাংলাদেশে দুই হাজার ৩৭টি।

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্যবিমোচন করে না বরং সামন্ত সমাজের ভূমিদাসের মতো এ যুগের মানুষকে গ্রামীণ ব্যাংক এক ধরনের ঋণদাসে পরিণত করছে। দারিদ্র্যবিমোচনের এই পথ অনুসরণ করার ফলে আমাদের উন্নতির কোনো দিশা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই সংখ্যালঘুর ধনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠের গরিব হওয়ার প্রক্রিয়া নিহিত। এই গরিব করা ও গরিব রাখার ব্যবস্থা বহাল রেখে গরিবদের ঋণ দিয়ে ও উচ্চহারে সুদ নিয়ে কিভাবে গরিবি মোচন হবে? এই অস্বাভাবিক ও বিকৃত চিন্তাকেই আমরা সদলবলে লালন করে আসছি। অথচ এই আসল কথা না বলে এখন যার যার স্বার্থ অনুযায়ী কেউ ড. ইউনূসকে গালি দিচ্ছি, আর কেউ তাকে দেবতার আসনে চিরদিন অধিষ্ঠিত রাখার মিথ্যা চেষ্টা করছি।’

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বাংলাদেশ দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। তাহলে এনজিও কার্যক্রমের সুফল কোথায়? সর্বশেষ সরকারি তথ্যানুযায়ী দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা তিন কোটি ৮৫ লাখ। এর মধ্যে এক কোটি ৫৭ লাখ ‘অতিদরিদ্র’। বিশ^ব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশে হতদরিদ্রের সংখ্যা দুই কোটি ৪১ লাখ। দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে বড় বাধা আমাদের সামর্থ্যরে সীমাবদ্ধতা এবং পালাক্রমে ক্ষমতাসীনদের নজিরবিহীন দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাট ও বিদেশে অর্থপাচার। গরিব মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, রাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগকে সমন্বিত করা গেলে দারিদ্র্য সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসতে পারে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
ওমরগণি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম।