Installateur Notdienst Wien hacklink

একাদশ সংসদ নির্বাচন : কী হয়েছিল সেদিন?

Nov 24, 2019 04:55 pm
একাদশ সংসদ নির্বাচন : কী হয়েছিল সেদিন?

 

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হচ্ছে দেখে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও চারদলীয় ঐক্যজোট নির্বাচন বয়কট করেছিল। ফলে একতরফা একটি নির্বাচনে প্রায় সকল আসনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ‘মহাজোট’ সরকার আবারো ক্ষমতাসীন হয়। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোটের দাবি ছিল- সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই ন্যায্য দাবিকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বাধ্য হয়ে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট নির্বাচন বয়কট করে এবং অন্যদেরও নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানায়।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে শতকরা মাত্র ৫-১০ ভাগের বেশি ভোটার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হননি। সরকারের ‘একান্ত বাধ্যগত’ নির্বাচন কমিশন সারা দেশে ‘ভুতুড়ে’ ভোটকে আমলে নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে। এতে দেশে একটি ভোটারবিহীন অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক পার্লামেন্ট গঠিত হয়। সেখানে জাতীয় পার্টির এক অংশকে ক্ষমতায় এবং অপর অংশকে বিরোধী দলে বসিয়ে জাতির সাথে তামাশা করা হলো। গায়ের জোরের জনবিচ্ছিন্ন সরকার তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সময়কালে দেশে নজিরবিহীন নৈরাজ্য, অপশাসন এবং বিরোধী দলের ওপর সীমাহীন নির্যাতন, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মিথ্যা, বানোয়াট ও ‘গায়েবি’ মামলা দিয়ে এবং ঢালাওভাবে গ্রেফতার করে বিএনপিকে দুর্বল করার সর্বাত্মক প্রয়াস চালায়।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে নির্বাচন থেকে পুনরায় দূরে রাখার অভিপ্রায়ে, কৌশল হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বানোয়াট ও মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তিনি যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, সেজন্য তার শাস্তি বৃদ্ধি এবং প্রাপ্য জামিন থেকে বঞ্চিত করা হলো।

দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শক্রমে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট দেশনেত্রীর মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিরোধী বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টির উদ্দেশে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ গঠিত হয়। ড. কামাল ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় ঐক্যফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। নেতৃত্বহীন ও লক্ষ্যহীন অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে সকল প্রার্থী ধানের শীষ মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ক্ষমতাসীন সরকার তার গণতান্ত্রিক চরিত্র ও মূল্যবোধের অভাবে বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেনি। জনগণ বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির গণভোট হিসেবে গণ্য করে এবং ধানের শীষের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থনের মাধ্যমে গণজোয়ার সৃষ্টি করেছে। সরকার স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে যে, জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। তাই ক্ষমতাসীন দল ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগের রাতেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়। তা এতটাই লাগামহীন ছিল যে, সারা দেশে বিএনপির মতো জনপ্রিয় দলকে ছয়টিসহ বিরোধী দলকে মাত্র আটটি আসন দিয়ে ক্ষমতাসীনেরা ২৯২টি আসন দখল করে নিয়েছে।

এমন একটি প্রহসনমূলক, নজিরবিহীন ও ভোট ডাকাতির কথিত নির্বাচনে আমি নিজে কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) এবং কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। বিরোধী দল নির্বাচনী চ্যালেঞ্জে অবতীর্ণ হবে, এমন ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশের মতো আমার নির্বাচনী এলাকায়ও শুরু হয়েছিল প্রশাসনকে ব্যবহার করে গায়েবি মামলা, হয়রানি ও গ্রেফতার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে নির্বাচনের মাঠ থেকে আমাদের নেতাকর্মীদের এলাকাছাড়া করে দেয়া হয়। বিনা প্রতিরোধে ‘ভোট ডাকাতি’র সব আয়োজন সম্পন্ন হলো। নির্বাচন কমিশন ও প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সাথে নির্বাচন-পূর্ব আলোচনায় নির্বাচনে ‘সমতল ভূমি’ সৃষ্টির যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, প্রশাসন যন্ত্রের মাধ্যমে এর সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। নির্বাচনের পর দেশী-বিদেশী মিডিয়া এবং গণতান্ত্রিক বিশ্ব বাংলাদেশের একাদশ নির্বাচনকে ভুয়া, অগ্রহণযোগ্য এবং ‘গণতন্ত্রের কফিনে সর্বশেষ পেরেক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গণতন্ত্রের কোনো মানদণ্ডেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়েছে বলে তারা তা মেনে নেননি।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে কী পরিমাণ কারসাজি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভোট ডাকাতি হয়েছে, তার নমুনা আমার দু’টি নির্বাচনী আসনের ফলাফল পর্যালোচনা করলেই দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। এ দু’টি আসনে ভোটের ফলাফলের একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো-

ছক-১ : একাদশ সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১ এবং ২ আসনের ভোটের ফলাফল
কুমিল্লা-১ :

কুমিল্লা-১ এবং কুমিল্লা-২ আসনের কথিত নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়, এ দুটো নির্বাচনী এলাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে ভোটের নামে কী পরিমাণ জালিয়াতি, কিভাবে ২৯ ডিসেম্বর রাতে বাক্স ভরে এবং পূর্বপরিকল্পিত ছকে অবিশ্বাস্য ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে।

নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিগত নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭০ শতাংশের কম। বাংলাদেশে কোনো জাতীয় নির্বাচনে এর বেশি উপস্থিতি অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য। ৭০ শতাংশের অতিরিক্ত ভোটার উপস্থিতি, সম্ভব ভোট ডাকাতি, একযোগে ব্যালটে সিল মেরে দেয়া বা আগের রাতে বাক্সে ভোট ভর্তি করে দেয়ার মাধ্যমে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে যে তাই ঘটেছে দেশ-বিদেশে সর্বজনস্বীকৃত। কুমিল্লা-১ আসন দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলা নিয়ে গঠিত। ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দাউদকান্দি উপজেলায় ৯২ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫৫টি ভোটকেন্দ্রে ৭০ শতাংশের কম ভোটার উপস্থিত হয়েছে, যা মোটামুটি স্বাভাবিক বলে গণ্য করা যায়। অবশিষ্ট ৩৭টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৭১ থেকে ১০০ শতাংশ। এটা সম্ভব হয়েছে আগের রাতে এবং ভোটের দিন সকালে কেন্দ্র দখল করে নৌকায় একতরফা সিল দেয়ার মাধ্যমে। হুমকি-ধমকি ও প্রশাসনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ভোটারগণ যে ৫৫টি ভোটকেন্দ্রে মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে পেরেছেন, সেখানে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছে মোট ৫৫৬৭১ ভোট এবং নৌকা পেয়েছে ২১৭৮১ ভোট। ৭১ শতাংশের ঊর্ধ্বে প্রাপ্ত ভোটের অবশিষ্ট ৩৭টি কেন্দ্রে ধানের শীষ পেয়েছে ২৭৩৭৮ ভোট এবং নৌকা পেয়েছে মোট ৫৪৬২৬ ভোট। উল্লেখ্য, ৯০ শতাংশের ঊর্ধ্বে প্রাপ্ত ভোটের ছয়টি কেন্দ্রে ধানের শীষকে দেয়া হয়েছে ১৭৯১ ভোট আর নৌকাকে দেয়া হয়েছে ১২৯০০ ভোট। কুমিল্লা-১ আসনের অপর উপজেলা, নদীবেষ্টিত মেঘনা উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের ভোটের আগের রাত থেকে ভোটকেন্দ্রের ধারে-কাছেও যেতে দেয়া হয়নি।

আগের রাতেই নৌকা সমর্থকরা ভোটকেন্দ্র দখল করে প্রায় সব ভোট নৌকায় সিল মেরে বাক্সে ভর্তি করে দেন। নির্বাচনের দিন সকালে ‘ভোট শেষ হয়ে গিয়েছে’ এই কথা বলে ভোটকেন্দ্র থেকে ভোটারদের সরিয়ে দেয়া হয় প্রশাসনের সহযোগিতায়। ফলে দেখা যায়, ৭০ শতাংশ ভোট প্রাপ্তির ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা মাত্র ১টি, যে কেন্দ্রে ধানের শীষ পায় ১৪৩২ ভোট এবং নৌকা পায় ৪৩৯ ভোট। জনগণ ভোট দিতে পারলে ফলাফলের ধরন এ রকম হওয়ারই কথা। কিন্তু প্রস্তুতকৃত ফলাফলে দেখা যায়, অবশিষ্ট ৩৫টি কেন্দ্রে ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে এবং এই ৩৫টি কেন্দ্রে ধানের শীষকে দেয়া হয় মোট ১০৬৫৬ ভোট, আর নৌকার ভোট দেখানো হয় মোট ৭৭২৬৩ ভোট। এই উপজেলায় একটি ভোটকেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি দেখানো হয়, যা কোনোক্রমেই স্বাভাবিক নয়। এ অবস্থায় কুমিল্লা-১ আসনের দাউদকান্দিতে আমি এগিয়ে থেকেও মেঘনা উপজেলায় ভোটের নজিরবিহীন কারচুপি এবং আগের রাতে ভোট ডাকাতি করে আমাকে এই আসনে ‘পরাজিত’ করা হয়েছে।

কুমিল্লা-২ আসনটি হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনে মরহুম এম কে আনোয়ার অতীতে সংসদ সদস্য ছিলেন। তার মৃত্যুর কারণে এই আসনে বিএনপি থেকে আমাকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। কুমিল্লা-২ আসনের তিতাস উপজেলাটি আগে দাউদকান্দি উপজেলার অংশ ছিল। দাউদকান্দি উপজেলায় গোমতী নদীর উত্তরে অবস্থিত ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকারের সময় তিতাস নামে একটি নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠা করেছি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৬ সালের ১৭ জানুয়ারি নবগঠিত তিতাস উপজেলার শুভ উদ্বোধন করেন। এ কারণে নতুন এ উপজেলার জনগণ দলমত নির্বিশেষে আমার শুভাকাক্ষ্মী, সমর্থক ও গুণগ্রাহী। নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে নবগঠিত তিতাস উপজেলাকে আমার নির্বাচনী এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে হোমনা আসনের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। ফলে তিতাসের জনগণ আমাকে ভোট দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিতাস উপজেলায় সর্বস্তরের মানুষ আমাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন প্রদান করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই আসনের হোমনা উপজেলা ‘বিএনপির ঘাঁটি’ হিসেবে সমধিক পরিচিত। ইতঃপূর্বে হোমনা আসনে ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু করে বিএনপি যতবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, ততবারই বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন (প্রথমে মর্তুজা হোসেন মোল্লা ও পরবর্তীতে চারবার মরহুম এম কে আনোয়ার বিজয়ী হন)। এই ধারাবাহিকতায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে হোমনা উপজেলার জনগণ আমাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন করেছেন। নির্বাচনে আমার জনপ্রিয়তা দেখে ভীত হয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ভোটের আগের রাতে (২৯ ডিসেম্বর) প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কুমিল্লা-২ আসনের উভয় উপজেলার ভোটকেন্দ্রগুলো চর দখলের মতো করে দখলে নিয়ে একতরফা নৌকায় সিল মেরে ভোটের অপমৃত্যু ঘটান।

কুমিল্লা-২ আসনের ঘোষিত ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হোমনা উপজেলার ৫৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে মাত্র তিনটি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ভোট ৭০ শতাংশের নিচে। বাকি ৫১টি কেন্দ্রে ৭০ শতাংশের ওপরে ভোট প্রাপ্তি দেখানো হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায়, ৭১ থেকে ৮০ শতাংশ প্রাপ্ত ভোটের ১৭টি কেন্দ্রে ধানের শীষে ১৯০৮ ভোট, আর নৌকায় ৩১৪৭৪ ভোট। ৮১ থেকে ৯০ শতাংশ প্রাপ্ত ভোটের ২৭টি কেন্দ্রে ধানের শীষ ১৩২৯ আর নৌকা মার্কায় ৬২৪৯৯ ভোট। ৯১ থেকে ১০০ শতাংশ প্রাপ্ত ভোটের সাতটি কেন্দ্রে ধানের শীষকে ২৪৮ আর নৌকা মার্কায় ১৭৫৯৯ ভোট দেখানো হয়েছে। হোমনার ৫৪টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে মোট ৪২১৮ ভোট এবং নৌকা মার্কায় মোট ১১৬৯৪৯ ভোট দেখানো হয়েছে। হোমনায় ভোটের নামে কী ধরনের অনৈতিক ও কদর্য কাণ্ড হয়েছে, তা এই পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন। একই ভাবে, কুমিল্লা-২ আসনের তিতাস উপজেলার ঘোষিত ফলাফল থেকেও একই চিত্র পাওয়া যায়। এ উপজেলার ৪৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৭০ শতাংশের নিচে প্রাপ্ত ভোটের কেন্দ্র মাত্র ৩টি। বাকি ৪২টি কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হিসাব ৭০ শতাংশের ওপরে।

তিতাসের ৪৫টি কেন্দ্রে ধানের শীষের পক্ষে মোট ১৬২০৫ ভোট এবং নৌকার ৮৯৩৪৯ ভোট দেখানো হয়েছে। উল্লেখ্য, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী একজন বড় ব্যবসায়ীর স্ত্রী। তিনি হোমনা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোনো পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কখনো সম্পৃক্ত ছিলেন না। নির্বাচনে আগে হোমনার কেউ তার নাম পর্যন্ত জানত না। এ অবস্থায় ভোটের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে সহজেই বোঝা যায়, সারা দেশের মতো কুমিল্লা-২ আসনের হোমনা ও তিতাস উপজেলার জনগণ ভোট দিতে পারেননি। প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্র ২৯ ডিসেম্বর রাতে এবং ভোটের দিন সকালে দখল করে ব্যালটে নৌকায় সিল দিয়ে বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই আসনে ৯০ শতাংশ ভোটারকে ভোটে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। নৌকার প্রার্থী ও সমর্থকরা ধানের শীষের জোয়ার দেখে বুঝতে পেরেছিল, জনগণকে তাদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ দিলে নৌকার নিশ্চিত ভরাডুবি হবে। তাই সরকারি দল প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ভোট ডাকাতির মতো ঘৃণ্য, অনৈতিক ও জঘন্য কাজটি করে বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতির এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে।

কুমিল্লা-১ এবং ২ আসনের মতোই আগের রাতে ভোট ডাকাতির ঘটনা সমগ্র বাংলাদেশেই ঘটেছে। দেশ-বিদেশের সবার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও এ অনৈতিক এবং নজিরবিহীন অপকর্মের নগ্নচিত্র ফলাওভাবে প্রচার করা হয়েছে। এ সত্ত্বেও সরকার প্রধান জোরগলায় বলেছেন, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েই তাকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। এ ধরনের মন্তব্য ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত জনগণের সাথে তামাশা মাত্র। গায়ের জোরের সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে এক ভয়ঙ্কর চরিত্রে রূপ ধারণ করেছে। দেশে চলছে শাসক দলের নেতাকর্মী আর প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের লুটতরাজ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্যাসিনোবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি। নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ও সামাজিক প্রচারমাধ্যমে প্রতিদিন এসব খবরের বড় শিরোনাম হচ্ছে। সরকারের অনৈতিক ও স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডে লুণ্ঠিত হয়েছে শেয়ারবাজার, ব্যাংক ও সরকারি কোষাগার। দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত; আইন-বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত। পেঁয়াজসহ জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর মূল্যনিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দলীয়করণের মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারখানায় পরিণত করা হয়েছে। মেধাবী সোনার ছেলেরা কেউ দানবে পরিণত হচ্ছে এবং তাদের তাণ্ডবে অনেক সোনার ছেলে প্রাণ দিচ্ছে। দুঃশাসনে রাষ্ট্রের উচ্চ থেকে নি¤œ পর্যায় পর্যন্ত পচন ধরেছে, বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আর এসব কিছুই হচ্ছে দেশে গণতন্ত্রের অভাবে। তাই দেশ এবং জনগণকে রক্ষা করতে হলে দেশের সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই সত্যটি যতদ্রুত উপলব্ধি করা হবে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল হবে।

লেখক : সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সদস্য, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিএনপি এবং সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়