সাদেক হোসেন খোকার জীবনের নাটকীয় কয়েকটি ঘটনা

Nov 25, 2019 04:43 pm
সাদেক হোসেন খোকা

 

দীর্ঘ নয় বছর সংগ্রামের পর এক গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হয়। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। এভাবে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিরোধী তিন জোট যথাক্রমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট এবং বাম ঘরানার পাঁচদলীয় জোট পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে একমত হলে তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। বিএনপি তখন সাংগঠনিকভাবে তত শক্তিশালী নয়। তার পরও তারা এককভাবে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেন। বিএনপির তদানীন্তন মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার যুগ্ম আহ্বায়ক, একে ফিরোজনুন সদস্য সচিব এবং আমাকে প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব দেয়া হলো।

বেগম খালেদা জিয়া ঢাকায় সংসদের একটি আসনে নির্বাচন করার লক্ষ্যে ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর আসনকে বেছে নিয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যে ধানমন্ডিতে বিশিষ্ট আইনজীবী ও ভাষাসৈনিক কাজী গোলাম মাহবুবের বাড়িতে বেগম জিয়ার ঢাকাস্থ নির্বাচন অফিস নির্ধারণ করা হয়। দলীয় প্রার্থীদের সাক্ষাৎকারপর্বও ধানমণ্ডি অফিসেই অনুষ্ঠিত হয় '৯১ সালের জানুয়ারি মাসে। এবার চূড়ান্ত মনোনয়নের পালা। সূত্রাপুর কোতোয়ালি আসনে শেখ মুজিব ’৭০ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচন করেছিলেন। সেই সুবাদে শেখ হাসিনাও পুরান ঢাকার এই আসনে ‘নির্বাচন করবেন’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সবার দৃষ্টি সেদিকে। অব. লে. জেনারেল মীর শওকত তখন ঢাকা মহানগরী বিএনপির আহ্বায়ক। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তাকে প্রস্তাব করা হয়েছিল।

হাসিনা এই আসনে নিশ্চিতভাবেই জিতবেন এই ধারণা থেকেই শওকত এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অস্বীকার করলেন। সাদেক হোসেন খোকা তখন মহানগরী বিএনপির উদীয়মান নেতা। নির্বাচন করতে চান। এই আসনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো বিএনপিতে আর কোনো যোগ্য প্রার্থীও ছিলেন না। এই আসনে ‘নিশ্চিত’ পরাজয়ের জন্য খোকাকেই মনোনীত করার প্রস্তাবে বিএনপিতে কেউ কেউ উৎসাহী। ধরে নেয়া হয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানে ‘পরাজয় অবধারিত’।
প্রার্থী তালিকা ঘোষণার দিন বেলা ২টায় ধানমন্ডিস্থ নির্বাচন অফিসে একা বসে আছি।

একা টেলিফোন নিয়ে বসে আছি। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল, রিসিভার ওঠাতেই মির্জা আব্বাসের কণ্ঠ। তিনি বললেন, খোকাকে যেখানে পান, বনানী অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন। খোকার গোপীবাগের বাসায় জানিয়ে দিলাম এ খবর। সন্ধ্যার পর প্রার্থী তালিকা ঘোষণায় জানা গেল খোকাকে পুরনো ঢাকার ওই আসনেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। খোকার তো টাকা নেই। বিএনপির কর্মী ইঞ্জিনিয়ার নসরুল আহসান বলেন, নির্বাচন ক্যাম্পে খোকা দিতেন ৫০ থেকে ১০০ টাকা। পক্ষান্তরে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ক্যাম্পে দৈনিক খরচ দেয়া হতো এক হাজার টাকা। সে দলের কর্মীরা দুপুরে খেতেন বিরিয়ানি আর বিএনপির কর্মীরা খেতেন পুরি বা এ জাতীয় সস্তা কিছু। এভাবে প্রচারণা চালানো হলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেল ল্যাংড়া প্রচার সত্ত্বেও খোকাই শেখ হাসিনার মতো নেত্রীকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন। শেখ হাসিনা তেজগাঁও আসন থেকেও নির্বাচন করেছিলেন। সেখানেও এক অখ্যাত মেজরের কাছে তিনি হেরে যান। এরপর আজ পর্যন্ত ঢাকায় নির্বাচন করলেন না। এর পর থেকে তিনি বিশেষ এলাকায় নির্বাচন করে আসছেন। ’৯১ সালে খোকা জয়লাভ করার পর থেকে তার বিজয়ের ধারা অব্যাহত থাকে। যতবারই সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন তার জীবনে পরাজয়ের কোনো রেকর্ড নেই। ২০০২ সালে অবিভক্ত ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে একটানা ১০ বছর তিনি মেয়র ছিলেন। এর আগে আওয়ামী লীগের মরহুম মোহাম্মদ হানিফও একটানা দুই মেয়াদে ঢাকার মেয়র ছিলেন। একদিন খোকা ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা দু’জনই তো দুই মেয়াদ পার করা মেয়র। দু’জনের মধ্যে কে সিনিয়র? খোকা ভাই বললেন, হানিফ মেয়র ছিলেন ৯ বছর আর আমি ১০ বছর।

অপ্রতিদ্বন্দ্বী খোকার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী ছিলেন না। সে কারণেই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘোষণা করছিল না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয় মেয়াদও পার হয়ে তৃতীয় মেয়াদে পদার্পণ করার অবস্থা। খোকার বিকল্প না পেয়ে সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। ‘বিশ্বের কোথাও সিটি করপোরেশন ভাঙার নজির নেই’ এই যুক্তি প্রদর্শন করে খোকাভাই সংবাদ সম্মেলন করে নিজে নির্বাচন না করার ঘোষণা দিলেন। তার কামনা, তবু সিটি করপোরেশন অবিভক্ত থাকুক। পরাজয়ের ভয় কাটল না। জনমতকে উপেক্ষা করে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করেই ফেলা হলো।

বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েও নির্বাচনের দিন কারচুপি, সন্ত্রাস, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া, একতরফা ব্যালট বাক্সে ঢুকানো, ব্যালট পেপারে সিলমারা ইত্যাকার অভিযোগে বেলা ১১টায় বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়।
স্বীয় বলয়ের বাইরে কোনো বিশিষ্ট লোক মারা গেলে শোক প্রকাশ বা শ্রদ্ধা জানানোর নজির আওয়ামী লীগের ইতিহাসে নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ খোকার মৃত্যুর পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শুধু শোক প্রকাশই করেনি, সিটি করপোরেশনে তার প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ একদিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের জন্য এটা দৃশ্যত ব্যতিক্রম। যা হোক, দলমত নির্বিশেষে সব স্তরের মানুষ খোকার জানাজা ও কুলখানিতে অংশগ্রহণ করেছেন।

মোহসিন হলের অনাবাসিক ছাত্র হিসেবে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতে অংশ নিতে ও মিটিং মিছিলে দেখেছি। বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে দেখেছি। সত্তর দশকে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে খোকা কমিশনার পদে নির্বাচন করেছিলেন। সে সময় আমি ওয়ারীতে থাকতাম। তখন খোকার মূল পরিচয় ছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সদস্য হিসেবে। এই পরিচয়েই তিনি নির্বাচন করে জয়লাভও করেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই খোকার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়।

১৯৮৮ সাল। তখনো আমি আমেনা বেগমের নেতৃত্বাধীন জাতীয় দলের সেক্রেটারি। বিএনপিতে যোগদান করার উদ্দেশ্যে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (মরহুম) মির্জা গোলাম হাফিজ ও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সাথে কথাবার্তা চলছে। এ সময় বেগম জিয়া গোলাম হাফিজের ধানমণ্ডির বাসায় বিকেলে বসতেন।

তখন একদিন রাত ১১টায় মির্জা গোলাম হাফিজ আমাকে ফোন করে বললেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বিএনপি নির্বাহী কমিটি ও ঢাকা মহানগরী কমিটি ভেঙে দিয়েছেন। মির্জা গোলাম হাফিজকে ঢাকা মহানগরী আহ্বায়ক নিযুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময় নিয়মিত মির্জা সাহেবের বাসায় বসতাম। খোকাও প্রায়ই সে বাসায় আসতেন। মহানগরী কমিটি ভেঙে দেয়ার পর মহানগরীর নেতারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে প্রত্যেকেই শঙ্কায় ছিলেন। আমিও মির্জা সাহেবকে অনুরোধ করেছি যাতে খোকা একটা ভালো অবস্থানে থাকেন। সাদেক হোসেন খোকা একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সব কর্মে মুক্তিযুদ্ধের ছাপ রেখেছেন। মেয়র হওয়ার পর তিনি ঢাকার বহু রাজপথ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতা ও হীনম্মন্যতা দেখাননি। ছাত্ররাজনীতির সময়কার কথা ভোলেননি। তাই রাশেদ খান মেননের নামেও রাস্তার নামায়ন করেছেন। প্রতি বছর স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের মিলন মেলা বসাতেন। কোনো মুক্তিযোদ্ধাই তার কাছে অবমূল্যায়িত হননি।

১৯৭২ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ব্রাদার্স ক্লাবের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি খোকার মমতা ছিল প্রশংসনীয়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের বিখ্যাত রূপকার মরহুম চাষী নজরুলের সাথে তার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। তিনি চাষী নজরুলকে একটি ফ্ল্যাট দিয়েছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তিতুল্য শ্রমিক নেতা কাজী জাফরের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এরশাদের বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করলে এরশাদ জাফরকে ৩০ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেদিলেন বলে পত্রপত্রিকায় দাবি করেন।

এ সম্পর্কে প্রকৃত ঘটনা উল্লেখ করে কাজী জাফর আমাকে বলেছিলেন, এরশাদের দাবি অতিরঞ্জিত। ৩০ লাখ টাকার মধ্যে পাঁচ লাখ দিয়েছেন এরশাদ। বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান দিয়েছেন সাত লাখ টাকা, বাকি ১৮ লাখ টাকাই দিয়েছেন সাদেক হোসেন খোকা। এভাবে খোকা বিএনপির বাইরেও অনেকের সাথেই যোগাযোগ রেখে সাহায্য করতেন। খোকা ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে বন্ধুবান্ধব শুভানুধ্যায়ীদের খোঁজখবর নিতেন।