ঐতিহাসিক উপন্যাস বাদশাহ নামদার

Nov 28, 2019 04:19 pm
ঐতিহাসিক উপন্যাস বাদশাহ নামদার

 

হুমায়ূন আহমেদের ‘বাদশাহ নামদার’ একটি ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস। সম্রাট হুমায়ুনের জীবনকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি রচিত। ‘বাবরনামা’ বা ইতিহাসের সাথে এর তফাত হলো ইতিহাসে যেমন ঘটিত কাহিনীর বাইরে কিছু যোগ করা যায় না। কিন্তু ‘বাদশাহ নামদার’র মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ মূল কাহিনীকেই গল্পের ধাঁচে উপস্থাপন করেছেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে ‘ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস’ বলা চলে।

উপন্যাসটি ২০১১ সালে প্রকাশিত যা হুমায়ূন আহমেদের জীবনের শেষ সময়ের একটি সৃষ্টিকর্ম। কেউ কেউ এটাকে হুমায়ূন আহমেদের সেরা রচনা বলে জ্ঞান করেন। জোছনা ও জননীর গল্প, দেয়াল, ও মধ্যাহ্নের মতো ‘বাদশাহ নামদার’ উপন্যাসটি জানান দেয় হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠতম কথাশিল্পীদের একজন। বইয়ের প্রচ্ছদটা মুঘল আমলের চিত্রকলা থেকে নেয়া, যা ১৫৪৬ সালে কোনো এক শিল্পী এঁকেছিলেন।
সম্রাট জহির উদ্দিন বাবরপুত্র মির্জা হুমায়ুনকে নিয়ে চিন্তিত। হুমায়ুন খেয়ালি মানুষ, যুদ্ধ তার ভালো লাগে না। যুদ্ধ, খুন ও খাকের বদলে সে আফিম আর কবিতায় মত্ত।

দিগি¦জয়ের স্বপ্ন নিয়ে যার ইরান-তুরান ছুটে চলার কথা সে কিনা রংতুলিতে ছবি আঁকে। তবু হুমায়ুনকে সম্রাট বাবর তার যোগ্য উত্তরসূরি ভাবছেন। ছেলে উদারচিত্তের হলেও সাহসী। একদিন হুমায়ুন ছিনিয়ে আনেন কোহিনূর। বাবর হুমায়ুনের এই জয়ে পুলকিত হন। এই কোহিনূর সম্রাট আলাউদ্দিন প্রথম ভারতে এনেছিলেন। হুমায়ুনের এই কৃতিত্বে দরবারে মুখরক্ষা হয় সম্রাটের। হঠাৎ একদিন প্রাণপ্রিয় পুত্রের দুরারোগ্য ব্যাধি হলে পিতা নিজের জীবনের বিনিময়ে আল্লাহর কাছে ছেলের প্রাণভিক্ষা চান। ১৫৩০ সালে হুমায়ুন চোখ মেললে বাবর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বাবরের মৃত্যুর তিন দিন পর দিল্লিশ্বর হয়ে সিংহাসনে বসেন নাসির উদ্দীন হুমায়ুন।

প্রকৃতির প্রেমে ডুবে থাকা হুমায়ুন রাজকার্যে তেমন মনোযোগী ছিলেন না। অনুসন্ধিৎসু হয়ে তিনি পড়তেন বিজ্ঞান, জাদুবিদ্যা আর রন্ধন বই। খেয়ালি এই সম্রাটকে নিয়ে বিপাকে পড়েন বিচক্ষণ সেনাপতি বৈরাম খাঁ। হুমায়ুনের দুর্বলতার সুযোগে ভাই কামরান মির্জা ও শের খাঁ দিল্লি দখলের প্রস্তুতি নেন। নিজ ভাইদের বিদ্রোহ আর বহিঃশত্রুর চক্রান্তে তার রাজ্য শাসন স্থায়ী হয় না। কূটনীতির অভাবে শেরশাহের কাছে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন রাজ্যহারা হন। রাজ্যহারা সম্রাট হামিদা বানু নামে এক কিশোরীর প্রেমে পড়েন।

প্রভাব খাটিয়ে তাকে বিয়ে করেন। নিজ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি বৈরাম খাঁর সাথে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান। শেরশাহের রাজনৈতিক কূটকৌশল বুঝিয়ে দেয় কত কঠিন ছিল ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার লড়াই। প্রথাগত রাজ-দাম্পত্যের বিপরীতে প্রেমময়, সহজ, সুন্দর দাম্পত্যের নিদর্শন হামিদা বানু চরিত্রটি। বিশ্বাসঘাতক হরিশংকর, ক্ষমতালোভী যুবরাজদের দেখে সম্রাট বাবরের সেই বাণী মনে পড়ে : সম্রাটের কোনো পুত্র থাকে না, স্ত্রী থাকে না,আত্মীয়-পরিজন থাকে না, সম্রাটের থাকে তরবারি।

এদিকে হিন্দুস্থানের নানা কাহিনী সম্রাট হুমায়ুনের চোখ থেকে লেখক হুমায়ূন দেখেছেন এভাবে,

হিন্দুস্থানের নাগা সন্ন্যাসী আর সতীদাহ প্রথার মতো নরকের বর্বরতা এখানে। সম্রাট হুমায়ুন একদিন শহরের বাইরে ঘোড়া ব্যবসায়ীর বেশে বাইরে ঘুরতে বেরিয়েছেন। গগনবিদারী চিৎকার তার কানে এলো- সতী মাই কি জয়ঃ

হুমায়ুন জানতে চাইলেন এটা কি? সঙ্গীরা বললেন শ্মশানে সতীদাহ। বৃদ্ধের মৃত্যুর পর কিশোরী স্ত্রীকে জীবন্ত দাহ। হুমায়ুন হুংকার দিয়ে বললেন, আমার রাজ্যে এসব কী করে হয়? সঙ্গীরা বলল, আপনার প্রজারা সব হিন্দু তারা এসব মানবে না! হুময়ুন বললেন, তবে এই মেয়েটিকে আমি বাঁচাতে চাই। সম্রাট হুমায়ুন মেয়েটির সাথে কথা বলবেন এই নিমিত্তে ফৌজে শ্মশান ঘিরে ফেলল। হুমায়ুন কৌশল করে ঘোষণা দিলেন- মেয়েটি আমার হাতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পানি পান করেছে। বিধর্মীর হাতে পানি পান করায় তার জাত গেছে, সে এখন মুসলমান। আমার আইনে কোনো মুসলমান মেয়ে সতী হিসেবে দাহ করা যায় না।

মেয়েটিকে নিয়ে সম্রাট শিবিরে ছুটলেন। পিছু পিছু মাতাল ডোম আর পুরোহিতরাও। তীরন্দাজদের তীরে কয়েকজন পুরোহিত মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বাকিরা উল্টো দিকে পালাল।

সতীদাহ থেকে ফেরা মেয়েটির নাম অম্বা। বয়স আর কত হব ১৫-১৬! হুমায়ুন কন্যা আকিকার সমবয়সী। অম্বার পরিণতি হুমায়ুন কন্যার মতো। রাজ্যহারা হুমায়ুনের কানে তার কন্যা আকিকার আত্মচিৎকার যেন পাঠকের কানেও পৌঁছে যায়।

এমন রাজ্যহারা রাজার ঘরে জন্ম নেয় এক সন্তান। নাম তার জালালউদ্দীন আকবর। এই সময়ে বৈরাম খা সৈন্য সংগ্রহের জন্য পারস্য যান। হুমায়ুন আর বৈরাম খাঁর অসামান্য উপাখ্যানের সমাপ্তি ঘটে শেরশাহ পুত্রকে পরাজিত করে দিল্লির মসনদে বসার মধ্য দিয়ে।
১৫৫৬ সালের জানুয়ারি মাসে সম্রাট হুমায়ুন তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে ইন্তেকাল করেন। সম্রাটের মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই আফগান শাসক আদিল শাহের হিন্দু সেনাপতি হিমু দিল্লি আর আগ্রা থেকে শুরু করে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মুঘল শহরগুলো দখল করে নিতে থাকে। চিরকৃতজ্ঞ বৈরাম খাঁ একহাতে নাবালক আকবর ও অন্য হাতে মুঘল সাম্রাজ্যেকে সুরক্ষা দেন।

কালক্রমে জালালউদ্দিন আকবর দিল্লির সম্রাট হন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতায় সৎ সেনাপতি বৈরাম খাঁকে তিনি মক্কায় ‘স্বেচ্ছায়’ নির্বাসনে পাঠান। যাত্রাপথে সম্রাট আকবরের গুপ্তচররা বৈরাখ খাঁকে হত্যা করে।

‘বাদশাহ নামদার’ যেন পাঠক মনে প্রশ্ন জাগিয়ে গেল, মহামতি আকবর নায়ক না খলনায়ক?