অর্থ, সাফল্য, শক্তি- সব ছেড়েই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন মেলানিয়া জর্জিয়াস

Dec 01, 2019 02:16 pm
মেলানিয়া জর্জিয়াস

 

তার দু’টি গান সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ২০০৮ সালে। আর তার অন্যতম সফল বছর এটি। ওই একই বছরে এমটিভি ইউরোপীয় সঙ্গীত পুরস্কারে ভূষিত হন সেরা ফরাসি শিল্পী হিসেবে। পাশাপাশি এনআরজেড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন সেরা শিল্পী, সেরা অ্যালবাম, সেরা সঙ্গীত ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে। বিশ্বের কালচার বা কালচার ওয়ার্ল্ডের এমন কৃতিত্বের অধিকারীর নাম মেলানিয়া জর্জিয়াস। তবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ডিয়ামস নামেই। কারণ, তিনি ছিলেন ফ্রান্সের প্রথম র‌্যাপ সিঙ্গার। তার প্রায় চার মিলিয়ন রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে। সঙ্গীতের জগতে ভালো কোনো শিল্পীর প্রসঙ্গ উঠলে সবার মুখে চলে আসত মেলানিয়া জর্জিয়াসের নাম।

তার একক বেশ কিছু অ্যালবাম ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ২০০৭ সালের দিকে। নানা পরিবর্তন দেখা যায় এ সংক্রান্ত রেকর্ড বোর্ডেও। এসব কারণে তার অর্থবিত্ত, সাফল্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদির যেন কোনো অভাবই ছিল না। ওই সময়ে ডিয়ামস মনে করতেন এসবই তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং আরো সফলতার পাথেয় বা অবলম্বন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি দেখেন, মৃত্যুর পর এসব গুণ সামান্যতমও কাজ দেবে না, বরং সমস্যাই করবে। তার অন্তরে ক্রমেই ঢুকে পড়ে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ইসলামের নানা রীতিনীতির বিষয়। এখন তিনি পরেন বোরকা, হিজাব, নেকাব ইত্যাদি ইসলামী পোশাক। সব কিছু তার মনের ভেতর এমনভাবে নাড়া দিয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং এ সালটি হচ্ছে ২০০৮।

তবে তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি কোনো সাদামাটা ঘটনা থেকে ঘটেনি। তার সৌসৌ নামের এক বান্ধবীর মাধ্যমে জীবনে এমন সুন্দর পরিবর্তন আসে। জর্জিয়াস যখন সৌসৌর বাড়িতে বেড়াতে যান, তখন সৌসৌর ধর্মীয় (ইসলাম) নানা কাজকর্ম তাকে আকৃষ্ট করে। জর্জিয়াস দেখেন, সৌসৌ যেসব কাজ করে তার সবগুলোই সুন্দর, যা জর্জিয়াস আগে তেমনভাবে দেখেননি। অর্থাৎ তার ওপর প্রভাব আসে সৌসৌর কাজকর্মের।

একপর্যায়ে সৌসৌ জর্জিয়াসকে তার সাথে নামাজ আদায়ের আহ্বান জানান। জর্জিয়াস তার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারলেন না। অর্থাৎ প্রার্থনায় যোগ দেন বান্ধবীর সাথে। অবশ্য কিভাবে মুসলমানরা নামাজ আদায় করেন তা জানা ছিল না জর্জিয়াসের। আর সে কারণেই ইবাদতে জর্জিয়াস সৌসৌকে অনুসরণ করতে লাগলেন। তা দেখে সৌসৌর মন যেন ভরে যায়। অর্থাৎ সেটাই ছিল জর্জিয়াসের জীবনের প্রথমবারের মতো নামাজের উদ্দেশে সিজদা করা। এতে জর্জিয়াস আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমি যখন আমার বান্ধবী সৌসৌর সাথে নামাজ আদায় করছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল, মহান আল্লাহর সাথে আমার অলৌকিক বা স্বর্গীয় যোগাযোগ ঘটেছে। এখন আমার মনটা খুবই ভালো লাগছে। তার তাতেই মনে হলো, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহর অস্তিত্ব রয়েছে এবং মহাজাগতিক সব কিছুই তিনি পরিচালনা করছেন। অবশেষে নিজে নিজেই সিজদা করতে শুরু করেন নামাজে।

বান্ধবী সৌসৌ একদিন জর্জিয়াসকে পবিত্র কুরআনের একটি কপি উপহার দেন। এতে জর্জিয়াস আরো খুশি হন। জর্জিয়াস বিভিন্ন ভাষায় তা পড়তেও শুরু করেন। জর্জিয়াস বলেন, কুরআন যত বেশি পড়ি, ইসলামের প্রতি আমার আগ্রহ যেন ততই বাড়তে থাকে। এক সময় জর্জিয়াসকে মরিশাসে ভ্রমণে যেতে হয়েছে। তখন তিনি সাথে নিয়ে যান কুরআন। যখনই সময় পান তখনই বসে পড়েন কুরআন শরিফ নিয়ে। তার এসব ভালো কাজ দেখে তার আশপাশের মানুষ রীতিমতো অবাক হতেন। জর্জিয়াস বলেন, আমি যখন মনে মনে বা কার্যক্ষেত্রে খ্রিষ্টান ছিলাম তখন এ রকম একটা সুন্দর জীবনের কথা ভাবতাম। আর তা উপহার দিয়েছে ইসলাম ধর্ম।

ইসলাম গ্রহণের পর জর্জিয়াসের কথাবার্তায়ও পরিবর্তন আসে। তার পোশাক, কথাবার্তা ইত্যাদি দেখলে ও শুনলে কারো বিশ্বাস হওয়ার কথা নয় যে; এক সময় তিনি র‌্যাপ বা জমকালো গায়িকা ছিলেন। তাকে যেন আগের মতো বেশি দেখতেও পারে না তার ভক্তরা। কারণ, তিনি অনেকটাই চলে যান মানুষের দৃষ্টির আড়ালে। এমনকি আড়ালে যায় সব ধরনের গানের দৃশ্যও। তিনি সবচেয়ে বেশি আড়ালে থাকেন ফটোগ্রাফারদের। একদিন জর্জিয়াস বের হচ্ছিলেন ফ্রান্সের জেনিভিলিয়ার্সের একটি মসজিদ থেকে। হিজাব, নিকাব, বোরকা ইত্যাদি দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন পুরো শরীর। এ অবস্থায় কোনো এক ফটোগ্রাফার এলে তিনি দ্রুত সেই জায়গা ত্যাগ করেন। তার মধ্যেই ফটোগ্রাফার কৌশলে তার কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দী করেন। তা প্রকাশ পায় প্যারিস ম্যাচ ম্যাগাজিনে।

সেগুলো দেখে সব শ্রেণীর মানুষ (ফ্রান্সের) রীতিমতো অবাক হয়ে যায়। এর কারণ আছে। হিপ হিপ গানের আইকন হিসেবে তাকে চিনত ফরাসি সমাজ। যিনি নানা অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরে। উল্লেখ্য, ওই সময় উন্মুক্ত জায়গায় বা পাবলিক প্লেসে (ফ্রান্সে) হিজাব পরিধানে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। তার ছবিগুলো নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি আরোপকে রীতিমতো শিথিল বা হালকা করিয়ে দেয়। আর তখনই নানা মহল থেকে প্রশংসা আসতে থাকে। আসতে থাকে রক্ষণশীল মহলের কট্টর সমালোচনাও। এমনকি একপর্যায়ে জর্জিয়াস পড়ে যান জনবিদ্বেষের রোষানলে। এতে তিনি পিছপা হননি, বরং সাহসের সাথে এগিয়ে যান। কারণ, এতে তিনি নানা মহলের সমর্থনও পান।

একটি সময়ে জর্জিয়াস মনে করেন, ইসলামের প্রতি তার মনোনিবেশের বিষয়টি ভক্তদের সাথে সুন্দরভাবে শেয়ার করা দরকার। এদেরকেও জানান দেয়া দরকার, কী করলে বা কোন পথে চললে জীবন সুন্দর হয় তা তিনি জানান দেন গানেরই মাধ্যমে। তবে সেটি কোনো রক বা র‌্যাপ সং নয়। ‘মরুভূমির শিশু’ বা ‘চিলড্রেন অব দ্য ডেজার্ট’ শীর্ষক দুঃখের গান সেটি। গানে বিশ্বসমাজের অসহিষ্ণুতার কথা বলেন তিনি। তিনি এ সংক্রান্ত আরো বিষয় তুলে ধরেন। সেগুলো হলো, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর সমাজ তাকে কিভাবে মূল্যায়ন করছে। একজন মুসলিম নারী বা নও মুসলিম হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময় তার মনে কী অনুভূতি দেখা দিয়েছে, তারও বর্ণনা দেন।

জর্জিয়াস বলেন, ইসলাম গ্রহণের কারণে সামাজিকভাবে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও সমস্যার চেয়ে শান্তিই পেয়েছি বেশি। তিনি আরো বলেন, বড় কোনো অর্জনের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা আসতেই পারে। এসব সমস্যা ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাকে। তারই ফলে পত্রিকায় প্রকাশিত হয় আমার হিজাব পরিহিত ছবি। যখন জর্জিয়াস মক্কায় ছিলেন তখন তিনি আরব নিউজকে বলেন, আমি প্রকৃত সুখ-শান্তি খুঁজছিলাম, তা আমি পেয়েও গিয়েছি। এখন আর আমি একাকী নই, ব্যথিতও নই। সব সময় আমি ভাবতাম, কেন আমি এই পৃথিবীতে এসেছি এবং কী নিয়ে আমাকে এখান থেকে যেতে হবে। আমি এক সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসী।

জর্জিয়াস এফটিআই বা ফ্রান্স টিভি স্টেশনে ড্রাগস, নারকোটিক্স (নেশাজাতীয় জিনিস) ইত্যাদি বিষয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, এসব আমাদের সমাজে রীতিমতো ধ্বংস ডেকে আনছে। এসব খারাপ দিক থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইসলাম হচ্ছে বন্ধুত্ব ও সহিষ্ণুতার ধর্ম। ইসলাম খুনখারাবির বিরুদ্ধে কথা বলে।

মেলানিয়া জর্জিয়াসকে অনেকে ডিয়ামান্ট বলেও ডাকে। তার জন্ম সাইপ্রাসের নিকোসিয়া নামক স্থানে ১৯৮০ সালের ২৫ জুলাই। সেই হিসাবে তার বয়স এখন প্রায় ৩৯ বছর। তার স্বামীও ফ্রান্স-তিউনিসিয়ার একজন নামকরা র‌্যাপ শিল্পী ছিলেন। নাম ফৌজি তরখানি। একপর্যায়ে জর্জিয়াস তার স্বামীর সাথে সৌদি আরব চলে আসেন ২০১৭ সালে। মূলত ফ্রান্সে ইসলাম-সংক্রান্ত নানা সমস্যা বা দুঃখ-কষ্টের কারণেই তারা সৌদিতে চলে আসেন। সেখানে তারা বাড়ি তৈরি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

সৌদিতে থেকে সাংসারিক নানা কাজকর্মের পাশাপাশি লেখালেখিতে মনোযোগী হয়েছেন। সৌদিতে বসবাসের পাশাপাশি নানা রকম জনহিতকর কাজকর্মও করে যাচ্ছেন তিনি। তার নিজের একটি প্রকল্প রয়েছে। এর নাম বিগআপ প্রজেক্ট। প্রকল্পটির মাধ্যমে জর্জিয়াস আফ্রিকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনের মানোন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সুবিধাবঞ্চিত অনেক নারীও তার কাছে আসেন নানা সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য।
মেলানিয়া জর্জিয়াস বলেন, এসব কাজ নিয়ে সময় কাটাতে পারায় আমার এখন বেশ ভালোই লাগছে।