আবিষ্কার বেগমের হাহাকার

Dec 01, 2019 02:21 pm
আবিষ্কার বেগম

 

‘আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়, পারে লয়ে যাও আমায়, পারে লয়ে যাও আমায়’- গানের রচয়িতা বাউল সম্রাট লালন সাঁই যথার্থই বলেছেন। গানটির তাৎপর্য এবং গভীরতা অনেক হৃদয়বিস্তৃত যা মানুষের মনকে ছুঁয়ে দেয় হৃদয়কে করে শীতল। আমাদের চারপাশে এমনই অনেক প্রবীণ মানুষ অপার হয়ে বসে আছেন। পরিবারে এরা অনেকাংশেই নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অবাঞ্চিত মানুষ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকেন। এমনই এক অপারের কাণ্ডারি হয়ে বসে থাকা আমাদের সমাজের অন্যতম একজন প্রবীণ নারী আবিস্কার বেগম।

আবিস্কার বেগম ৮০ বছরে পা রেখেছেন। তিনি মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার আঙ্গারিয়া (আবাসনের-২) এর বাসিন্দা । স্বামীর কোনো জায়গা জমি না থাকায় বর্তমানে আঙ্গারিয়া আবাসনে (২) বসবাস করছেন। স্বামী মৃত আফছার আলী ১৯৭১ সালে অসুস্থতার কারণে মারা যান । বাবার বাড়ি ঘিওর উপজেলার হাট ঘিওরে। তার দুই মেয়ে ছিল রেলিয়া ও রেজিয়া। ছোট মেয়ে রেজিয়া ১৬ বছর আগে মারা যায়। আর রেলিয়ার বিয়ে হয় মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকায়। রেলিয়ার এক ছেলে হওয়ার পর স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না করতে পেরে তাকে ছেড়ে দিয়ে বিদেশ চলে যায়। আবার একটা বিয়ে করে রেলিয়া বেগম। পরের স্বামীর আয় রোজগার ভালো না থাকায় ছেলেকে মায়ের কাছে রেখে বিদেশ চলে যায়। রেলিয়া বেগমের ছেলের বয়স ১৭ বছর , একটা খাবার হোটেলে কাজ করে। যতটুক রোজগার করে. তা বন্ধুবান্ধব নিয়েই খরচ করে। বৃদ্ধ নানীর দিকে কোনো খেয়াল নেই তার। নানীর কোনো কাজে সাহায্যই করে না। রেলিয়া বেগম যা আয় করেন তা স্বামীকে দেয় আর মাকে চিকিৎস বাবদ মাঝে মধ্যে কিছু টাকা দেয়।

এ বয়সে (আবিস্কার বেগম ) রান্নাবান্না করে খাওয়া তার জন্য খুব কষ্টকর। তাকে দেখার মতো এবং দুবেলা রান্না করে দেয়ার মতো কেউ নেই। তাই এই বয়সে সারা শরীর ব্যথা নিয়ে, হাত পুড়ে রান্না করে খেতে হয় তাকে। আর দুঃখ কষ্টে সারাক্ষণ বলতে থাকেন ‘আল্লাহ আমায় নিয়ে যাও’।

তার সাথে একান্তভাবে কথা বলে জানা যায়, পরিবার ও সামাজিকভাবে তেমন কোনো সহযোগিতা ও স্বীকৃতি তার কপালে জোটেনি। আশ্রয়ন কেন্দ্রে বারসিকের কাজের মধ্য দিয়ে তিনি বয়স্কভাতা পান। এটি দিয়ে কোনোমতে ওষুধ কিনে ও চারপাশের আপন জালা শাকসবজি বিক্রি করে জীবনযাপন করেন। আবিস্কার বেগমের পাশে কোনো সদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি এগিয়ে এসে সহযোগিতা করে, তাহলে এই বৃদ্ধার জীবনে বড় উপকার হতো। এখনো তিনি নিজেই সব কাজ করেন, কারো উপর নির্ভরশীল না থেকে যা পান তা দিয়েই কোনোমতে দিনাতিপাত করেন। স্বনির্ভর এক জীবনই তিনি পরিচালনা করে আসছেন। তবে জীবন সায়াহ্নে এসে তিনিও কারো কারো সহযোগিতার প্রয়োজনবোধ করেন। আসুন আমরা তার পাশে দাঁড়াই। যতটুকু পারি সহযোগিতা করি এই সংগ্রামী বৃদ্ধা নারীকে।