সেই প্রেমিকা হঠাৎ লাইমলাইটে

Dec 03, 2019 08:14 pm
সেই প্রেমিকা হঠাৎ লাইমলাইটে

 

ব্রিটিশ ইন্ডিয়া আর্মির কাছ থেকে পাওয়া এক ভারতীয় সৈনিকের পুরনো সাদা-কালো ছবিতে ইতালির কোথাও তার প্রেমিকাকে বিশেষ ভঙ্গিমায় দেখা যাচ্ছে। এর সাথে থাকা ক্যাপশন থেকে জানা যায়, ওই সৈনিক (তিনি একজন ফুটবল খেলোয়াড়ও) একটি টুর্নামেন্টে খেলতে ইতালি গিয়েছিলেন, সেখানেই ওই নারীর সাক্ষাত পান এবং তার প্রেমে পড়েন। তবে সৈনিকটির বাবা এই প্রেমের বিরোধিতা করেন, তাতে ওই নারীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বলেন তাকে। এই ছবি ওই বিচ্ছিন্ন দম্পতির স্মৃতি ধরে রেখেছে। এই ট্রাজিক লাভ ‘ব্রাউন হিস্টরি’ নামে অভিহিত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ২০ হাজারের বেশি লাইক পেয়েছে।

ব্রাউন হিস্টরি পেইজে (ইনস্টাগ্রামে ২০১৯ সালের মার্চে এটি খোলা হয়েছে) এ ধরনের ব্যক্তিগত অনেক ইতিহাস পাওয়া যাচ্ছে। মন্ট্রিলভিত্তিক ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিার আহসান জাফরের পরিচালনায় থাকা অ্যাকাউন্টটিতে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের অপেক্ষাকৃত কম জানা ভাষ্য শেয়ার করে থাকে। পোস্ট ও সাদা কালো ছবিগুলো ফলোয়ারদেরকে পারিবারিক অ্যালবাম থেকে তাদের নিজস্ব সামগ্রী পাঠানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়। ফলে আর্কাইভটি বাড়ছে।

অনেক ইতিহাস

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের দিকে তাকানোর জন্য ব্রাউন হিস্টরিই একমাত্র ইনস্টাগ্রাম পেইজ নয়। আরো অনেক পেইজের সাথে কয়েকটির নাম হলো Gulf ⇄ South Asia, SOAS Postcards, Indian History Pictures। অনলাইনে ব্যক্তিগত ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
গুনিতা সিং ভালা 1947 Partition Archives নামের ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা করেছেন। আট বছরে এখানে ভারতবর্ষ বিভক্তির পর জীবিত থাকা লোকদের অডিও-ভিডিওর বলা যায় একটি সমুদ্র জোগার হয়েছে। এতে আট হাজার গল্প, ৪০ হাজার পুরনো ছবি ও নথিপত্র জমা হয়েছে। এটি এখন ইনস্টাগ্রামসহ প্রতিটি সামাজিক মিডিয়া প্লাটফর্মে দেখা যাচ্ছে।

ভাল্লা বলেন, আর্কাইভ ফরম্যাটের প্রতি বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হতে পারে বলে আমরা এগুলো এভাবে উপস্থাপন করেছি। ফলে লোকজনের মনে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। লোকজন এগুলো থেকে নতুন কিছু শিখতে পারে। সম্প্রতি এতে গায়ক বিলায়েত খানের একটি গল্প আর্কাইভ করা হয়েছে। ভারত ভাগের সময় তিনি পাঞ্জাবের গোসলান গ্রাম ছেড়ে পাকিস্তানের সাগোদায় অভিবাসন করেছিলেন। তিনি এই ঘটনায় এতটাই মুষড়ে পড়েছিলেন যে গান গাওয়ার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছিলেন। ১০ বছর পর তার বাবা ও তিনি ভারতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তারা পৈত্রিক গ্রামে আবার বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিলায়েত আবার গান গাইতে শুরু করতে পেরেছিলেন। তিনি দাদ্দি মিউজিকে বিখ্যাত হয়েছিলেন, অনেক পুরস্কার জিতেছিলেন।

আমি তাকে চিনি

দি সিটিজেনস আর্কাইভ অব ইন্ডিয়া আকার নেয় ২০১৬ সালে। এতে স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে জন্মগ্রহণকারীদের অডিও-ভিডিও কাহিনী জড়ো করা জয়। এরপর থেকে তিন বছরে অনলাইনে ২১০ নগারিকের কাহিনী সংগ্রহ করা হয়েছে, সাক্ষাতকার আছে ৩৪০ ঘণ্টার, প্রায় ১,৩০০টি আইটেম রয়েছে।
আয়েশা সালদানহা বেড়ে ওঠেছেন যুক্তরাজ্যে। পরে তিনি বাহরাইন পাড়ি জমান। তিনি দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যকার দীর্ঘ অভিন্ন ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী।

তিনি বই, গবেষণাপত্র, আর্কাইভ সামগ্রী সবই Gulf ⇄ South Asia –এ পোস্ট করছেন। তিনি বলেন, আমি লোকজনকে তাদের কাহিনী বলতে উৎসাহিত করছি। আর এ কাজে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট খুবই ভালো। অনেক ফলোয়াড় ব্যক্তিগত ছবি ও কাহিনী পাঠিয়েছেন। আর সালদানহাও আরবি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে অনুবাদ পোস্ট দিয়েছেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় উপসাগরীয় আরবের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত নথিপত্র ও ছবি শেয়ার করছেন।
SOAS Postcards পরিচালনা করেন ইমিলি স্টিভেনশন ও স্টিভেন হিউ। লন্ডনের স্কুল অব অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের ডিপার্টমেন্ট অব অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড সোসিওলজি থেকে তারা এই কাজটি করেন। তারা ১৯৯০-এর দশকের চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুতে হওয়া পোস্টকার্ড প্রদর্শনী থেকে এই কাজে উৎসাহিত হন। এখন তারা উপনিবেশ ভারতের পোস্টকার্ডগুলো ইনস্টা অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন।

অনেক সময় কার্ডের পিঠে যদি পেইন্টার, বক্তব্য ও প্রেরকের নাম থাকে, তবে তারা বেশ ভালোভাবে পরীক্ষা করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৩০-এর দশকের পোস্টকার্ডে প্রকাশকের ঠিকানা চিনতে পেরে ফলোয়াড়রা উদ্দীপ্ত হয়েছিল। কারণ স্বাধীনতা যোদ্ধা ও গুজরাটি লেখক লীলাবতী মুনশির কার্ড ছিল এটি।

নতুন যুগের সূচনাকারী শট

আরেকটি অ্যাকাউন্টের নাম বলা যায়। এটি হলো Indian History Pictures। এটি নতুন যুগের সূচনাকারী ঘটনাবলী তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতে প্রথম প্রজতন্ত্র দিবস প্যারেড, ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, নিউ ইয়র্কে হেলেন কেলারের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজ্ঞানীদের ষাঁড়ের গাড়িতে করে ভারতের প্রথম যোগাযোগ উপগ্রহ বয়ে নেয়া ইত্যাদি।

অবশ্য, কেউ পাঠালেই তারা তা পোস্ট করেন, তা নয়। তারা প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করেন। ইন্ডিয়ান মেমোরি প্রজেক্টের অনুশা যাদব বলেন, হাজার হাজার আগ্রহী ফলোয়াড়কে উদ্দীপ্ত রাখতে তাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত তার প্রকল্পটি অডিও-ভিজুয়াল পোস্টের দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

দি আর্কাইভের মাধ্যমে ভিজিটরেরা ভারত বিভক্তি, বাংলার দুর্ভিক্ষ, নারী ক্ষমতায়ন আন্দোলন ইত্যাদি সম্পর্কে বক্তব্য সহজেই পাঠ করতে পারে। যাদব বলেন, নিজের মনে করে ধারণাটি খুবই প্রবল। এই ধারণা কখনো বিদায় নেয় না। আর উপমহাদেশের এসব কাহিনী খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দি হিন্দু