Installateur Notdienst Wien hacklink

আতঙ্কে সিসি

Dec 04, 2019 02:36 pm
সিসি

 

মিসরের সংবাদমাধ্যমগুলোর এখন কঠিন সময় যাচ্ছে। শাসক দলের নির্দিষ্ট কয়েকটি পত্রিকা ও নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে দেশটিতে কয়েকটি সংবাদপত্র প্রকাশ হয়ে থাকে। সংবাদপত্রগুলোতে নিরাপত্তা সংস্থার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে সংবাদ প্রকাশ করতে হয়। শাসক দলের চাপে পত্রিকার শিরোনামগুলোও তাদের পছন্দমতো হতে হয়।

নভেম্বর পর্যন্ত মিসরের অনলাইন পত্রিকা ‘মাদা মাসর’ এর কর্মীদের বিস্ময়ের সীমা ছিল না! তারা ভাবত কেন তাদের এখনো গ্রেফতার করা হচ্ছে না! মাদা মাসর একটি ব্যতিক্রমী পত্রিকা। এটি মিসরের সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার বড় জায়গা।

যদিও সিসি সরকার এর ওয়েবসাইটটি গত দু’বছর ধরে বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু সাইটটিতে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) বা ফেসবুক দিয়ে ব্যবহার করা যায়। সরকার সম্ভবত আন্তর্জাতিক সুনামের কারণে এ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়নি। আরবি ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকাটি কূটনীতিক এবং বিশ্লেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার।

কিন্তু গত ২৩ নভেম্বর ভোরে পত্রিকাটির সম্পাদক সাদে জালাতকে কায়রোর নিজ বাসা থেকে সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। যদিও তাদের কাছে কোনো ওয়ারেন্ট ছিল না। এর পরের দিন পুলিশ মাদা মাসর পত্রিকাটির অফিসে অভিযান চালায়। এ সময় তিনজনকে আটক করে, যাদের মধ্যে প্রধান সম্পাদক লিনা আব্দুল্লাহও রয়েছেন, যদিও এই পুলিশি অভিযান পরিচালনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনজনকে ছেড়ে দেয়া হয়। আর সম্পাদক সাদে জালতকে একটি মহাসড়কের পাশে পাওয়া যায়। যদিও এই অভিযানটি ছিল একটি সতর্কতা, যার দ্বারা বোঝা যায় শাসকদল কতটা আতঙ্কে আছে।

মিসরের পাবলিক প্রসিকিউটর দাবি করেছেন, এ ওয়েবসাইটের সাথে নিষিদ্ধ ঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। এটা সহজেই অনুমানযোগ্য যে, মিসরের সব কিছুর জন্যই ব্রাদারহুডকে দোষ দেয়া হয়। মাদা মাসরের সাথে ব্রাদারহুডের সম্পর্ক একটি হাস্যকর ব্যাপার, কেননা পত্রিকাটি বামপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত। আর তারা ব্রাদারহুডকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও করে থাকে।

মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির বড় ছেলে মাহমুদ আল-সিসি সম্পর্কে সমালোচনামূলক রিপোর্ট করার ফলেই এ অভিযান চালানো হয়েছিল বলে মনে হয়। মাহমুদ সিসি জেনারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের (জিআইএস) মাধ্যমে দ্রুত ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন, এমন সংবাদ গোয়েন্দা সংস্থা সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে জানায়। তার পরেই মাহমুদ সিসিকে মস্কোয় মিসরের দূতাবাসে স্থানান্তর করা হয়।

মিসরের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে বরাবরই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের জিআইএসকে বিদ্রোহী খোঁজার জন্য ব্যবহার করতেন। আর সিসি তার অনুগতদের দিয়ে এ জিআইএসকে নিয়ন্ত্রণ করা চেষ্টা করছেন। সেখান থেকে অনেক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে যারা দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করছিল। সেখানে সিসির ছেলেকে উচ্চ পদে বসানো নিয়ে অন্য সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার কর্মকাণ্ড সন্তোষজনক ছিল না। এমনকি সে তার বাবাকেও প্রভাবিত করতে পারেনি।

মাদা মাসরির সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট সিসির সন্তান ও ক্ষমতাধর জেনারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের (জিআইএস) শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা মাহমুদ আল সিসিকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মাহমুদ সিসি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছিল না। যার ফলে তা সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল।

প্রেসিডেন্টের পুত্রকে সরিয়ে দেয়ার পরামর্শটি মিসরের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের কাছ থেকেও এসেছিল। তারাও মাহমুদ আল-সিসির ভূমিকা রাষ্ট্রপতির জন্য ক্ষতির কারণ বলে মনে করতেন।

জিআইএস থেকে সরিয়ে দেয়ার পর মাহমুদ আল-সিসিকে মস্কোয় পাঠানো হয়। সেখানে তার মেয়াদ কতদিন তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। এটি দীর্ঘমেয়াদীও হতে পারে, যা কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর ধরেও থাকতে হতে পারে।

সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাহমুদ আল-সিসির জিআইএস থেকে অপসারণের অর্থ এই নয় যে, প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে প্রভাবশালী ছেলেকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। বরং নতুন করে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ভূমিকা রাখতে তাকে মস্কো পাঠানো হয়েছে। মস্কোয় মিসরীয় কূটনৈতিক মিশনে তাকে সামরিক দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে বলে জানা গেছে।

সিসি সরকার বরাবরই দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোকে সরকারের সাথে অসহযোগিতার অভিযোগ করে থাকে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভের নেপথ্য নায়ক ছিলেন মোহাম্মদ আলী নামের একজন নির্বাসিত ব্যবসায়ী। যিনি ঠিকাদার ও অভিনেতা মোহাম্মদ আলী প্রেসিডেন্ট সিসি ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে মিসরিয়দের কট্টর এ একনায়কের হাত থেকে দেশকে রক্ষার আবেদন জানিয়েছিলেন।

তিনি অনলাইনে ভিডিও প্রকাশ করে এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট সিসি ও সেনাবাহিনী কিভাবে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজেদের জন্য বিলাসবহুল প্রাসাদ, হোটেল ও বাড়ি নির্মাণ করছেন তা মিসরিদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। আর এসব অপকর্মের সাথে মাহমুদ আল সিসি জড়িত বলে মনে করা হয়।

প্রথমে ছোট আকারে প্রতিবাদ শুরু হলেও এক সপ্তাহের মধ্যেই তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। এতে শাসক গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়। চার হাজারের বেশি মানুষ গ্রেফতার করা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতের সংখ্যা প্রতিবাদকারীর চেয়ে বেশি বলে মনে করা হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে পুলিশ কায়রোর বিভিন্ন এলাকার মানুষের মোবাইল ফোন চেক করে বিক্ষোভের সাথে কোনো সম্পর্ক আছে কি না যাচাই করত। এসব কারণেই বিক্ষোভ আরো জোরদার হয়েছিল।

মিসর সরকার সব সময়েই ভিন্ন যেকোনো মতের মানুষদের দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। এ মাসে পুলিশ একজন কপটিক অ্যাক্টিভিস্ট র‌্যামি কামেলকে গ্রেফতার করেছিল। তাকে খ্রিষ্টানদের ওপর হামলার অভিযোগ করা হয়েছিল। তা ছাড়া যদি কোনো অর্থনীতিবিদ দেশটির সরকারি কোনো ভাষ্যের সমালোচনা করেন তবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

মাহমুদ যদিও চলে যাচ্ছে না, তারপরেও তিনি তার নতুন কাজে নেমে পড়েছেন। তবে এভাবে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেয়া ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতাকেই মনে করিয়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট সিসি কয়েক বছর ধরে অশান্ত অবস্থায় চলা মিসরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ আনতে চান। শক্ত হাতে বিশৃঙ্খলা দমন করে সামনে চলতে চান তিনি। তিনি তার পূর্বসূরীদের মতো ভুল পথেই হেঁটেছেন। তার ছেলের ক্রমাগত ভুল কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি জনগণের নজর এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করতে চাচ্ছেন।