তিনি অমর

Dec 26, 2019 07:23 am
স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন

 

জীবনের রঙ্গমঞ্চে নিজের বুকের কষ্ট বুকের মধ্যেই চেপে বিশ্বের আপামর মানুষের মুখে হাসি ফুটাতেন তিনি। জীবনের চরম সত্য উপলব্ধি করাতে তিনি বলেছিলেন, “আমার সব থেকে ভালো বন্ধু হলো আয়না, কারণ আমি যখন কাঁদি তখন সে হাসে না ”। তিনি আর কেউ নন, আমাদের সকলের প্রিয় মূকাভিনেতা স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন। সারা বিশ্ব যাকে চেনে চার্লি চ্যাপলিন নামে। যদিও তাকে বিশ্বব্যাপী ‘শার্লট’, ’কার্লিটোস’, ‘দ্য লিটল ট্র্যাম্প (ভবঘুরে)’ ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। ১৯৭৭ সালের বড়দিনে সকলকে বিদায় জানিয়ে এই অবিস্মরণীয় মানুষটি বিদায় নেন।

চার্লি চ্যাপলিনের জন্মতারিখ ও জন্মস্থান নির্ভুলভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে ঐতিহাসিকদের ধারণা, ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল লন্ডনের ওয়ালউওর্থে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। অবশ্য তার মৃত্যুর অনেক পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি যে চার্লি চ্যাপলিন ব্রিটেনেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার জন্মস্থান ফ্রান্সও হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। আবার, ২০১১ সালে উদ্ধারকৃত একটি পুরোনো চিঠিতে পাওয়া তথ্যমতে, ইংল্যান্ডের স্ট্যাফোর্ডশায়ারের একটি ক্যারাভ্যানে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন।

চরম অভাব-অনটন ও নিদারুণ কষ্টের মাঝে কেটেছিল তার শৈশবের দিনগুলো। তার বয়স তিন বছর হওয়ার আগেই বাবা-মা আলাদা বসবাস করা শুরু করেন; যদিও তাদের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়নি। শিশু চ্যাপলিন তার মায়ের সাথে থাকতেন। সঙ্গে ছিলেন তার সৎ ভাই সিডনি চ্যাপলিন। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই তার মা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে চ্যাপলিন অসহায় হয়ে পড়েন। তার ভরণপোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্বে কেউ না থাকায় তাকে প্রাথমিকভাবে লন্ডনের একটি অনাথাশ্রমে এবং পরবর্তীকালে অসহায় ও দুঃস্থ শিশুদের জন্য তৈরী ‘সেন্ট্রাল লন্ডন ডিস্ট্রিক্ট স্কুল’-এ পাঠানো হয়। তার বয়স তখন মাত্র সাত বছর।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার মা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। এরপর চ্যাপলিনকে কিছুদিনের জন্য তার বাবার কাছে পাঠানো হয়, যিনি তখন ছিলেন মদ্যপ। সেখানে বেশি দিন ঠাঁই হয়নি বালক চ্যাপলিনের। বাবা-মা দুজনের পেশাই মঞ্চের সাথে জড়িত হওয়ার সুবাদে চার্লি চ্যাপলিন নিজেও এদিকটায় ঝোঁকেন। অভাবের তাড়নায় ও মঞ্চে অভিনয় করার আগ্রহ থেকে মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি যুক্ত হন ‘দ্য এইট ল্যাঙ্কাশায়ার ল্যাডস’ নামক একটি যাত্রাদলের সাথে।

মূলত এখান থেকেই তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। প্রথম থেকেই বালক চ্যাপলিনের অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়তে শুরু করে। এরপর চ্যাপলিন ছোটখাট আরো নানা মঞ্চে, নানা প্লাটফর্মে অভিনয়ে অংশগ্রহণ করে সুনাম কুড়াতে থাকেন। ফলস্বরূপ তৎকালের কিছু নামকরা চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। শুরু হয় তার জীবনের নতুন ও কর্মব্যস্ত এক অধ্যায়। এরপর এই দুঃখী বালকটিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি বলতেন, “আমি বিশ্বাস করি, যেদিন আমি কোনো কাজ করবো না, সেদিনের রাতের খাবারটা আমার প্রাপ্য নয়।”

১৯০৮ সাল। তার বয়স সবে আঠারো পেরিয়েছে। যোগ দেন ‘দ্য কার্নো কোম্পানিতে। এটা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রথম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তখনকার দিনে ব্রিটেনের এই স্বনামধন্য কোম্পানিটি হাস্যরসাত্মক নাটক তৈরি করতো ও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে সেগুলোর প্রদর্শনী করে বেড়াতো। এই কোম্পানিতে যোগদান চ্যাপলিনকে নিজেকে প্রমাণ করার ও বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে মেলে ধরার একটি বড় সুযোগ এনে দেয়। তার অসাধারণ স্টেজ পারফর্মেন্সে মুগ্ধ হয়ে ১৯১০ সালে তাকে মঞ্চনাট্য প্রদর্শনীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ করে ‘দ্য কার্নো কোম্পানি’। এরপর সাপ্তাহিক ১৫০ ডলারের বিনিময়ে তিনি ‘কিস্টোন স্টুডিও’তে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। এই স্টুডিওর অধীনেই তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘মেকিং এ লিভিং’ (১৯১৪) মুক্তি পায়।

এরপর অনেক গল্প। তখন তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ‘ফার্স্ট ন্যাশনাল’ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি এবং তাদের সহায়তায় নিজস্ব স্টুডিও তৈরি করে তিনি আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে শুরু করেন। অবশেষে ১৯১৯ সালের চার্লি চ্যাপলিন আরো কয়েকজন অংশীদারকে সাথে নিয়ে গড়ে তুলেন ‘ইউনাইটেড আর্টিস্টস’ নামক চলচ্চিত্র-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। তার পরবর্তী কাজগুলো এর অধীনেই হয়েছিলো। তার বিখ্যাত কয়েকটি সিনেমা হল মেকিং এ লিভিং (১৯১৪), দ্য কিউর (১৯১৭), দ্য অ্যাডভেঞ্চারার (১৯১৭), এ ডগ’স লাইগ (১৯১৮), দ্য কিড (১৯২১), দ্য গোল্ড রাশ (১৯২৫), দ্য সারকাস (১৯২৮), সিটি লাইটস (১৯৩১), মডার্ন টাইমস (১৯৩৬), দ্য গ্রেট ডিক্টেটর (১৯৪০)। কিছু সিনেমা বাদে তার বাকি সবগুলোই ছিল নির্বাক কমেডি চলচ্চিত্র। তিনি মূলত হাস্যরসাত্মক ঘরানার সিনেমা বানালেও, পরবর্তীতে তার চলচ্চিত্রে অন্যান্য মাত্রা অর্থাৎ ট্রাজেডি, রোম্যান্স ইত্যাদি যোগ হতে থাকে। তার একটি বিশেষ কৃতিত্ব ছিল, তিনি অভিনয় শিল্পকে রাতারাতি থিয়েটারের মঞ্চ থেকে টেলিভিশনের পর্দায় নিয়ে এসে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা রাখতেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় তাকে নিয়ে ব্রিটেনব্যাপী প্রথম রাজনৈতিক সমালোচনা শুরু হয়। তিনি নিজের মাতৃভূমির পক্ষে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় তীব্র সমালোচনা করা হয় তার। শুধু তাই নয়, ১৯৩৬ সালে ‘মডার্ন টাইমস’ প্রকাশিত হওয়ার পরও তিনি তুমুল রাজনৈতিক সমালোচনার শিকার হন। একইসাথে তিনি রাজনীতিবিদদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। এখানেই শেষ নয়, এরপর ১৯৪০ সালে প্রকাশ পায় ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’। এতে তিনি হিটলারকে ব্যঙ্গ করেন এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। এতে মার্কিনীরা ‘বামপন্থা’ খুঁজে পান এবং তার দিকে অভিযোগের তীর আরও দৃঢ়ভাবে নিবদ্ধ হয়।

বিবাহিত জীবনেও তাকে ঘিরে বহু বিতর্ক রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে উঠে আসে তার অস্থিতিশীল ও বহু নারীঘটিত সম্পর্কের বিষয়। যার মধ্যে কয়েকটি সম্পর্কের পরিণতি ছিল ভয়াবহ এবং সেগুলোর মীমাংসা আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছিল। মিল্ড্রেড হ্যারিস নামক এক ১৬ বছর বয়সী মার্কিন অভিনেত্রী দাবি করেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা এবং তার সন্তানের পিতা চার্লি চ্যাপলিন। আইনী ঝামেলা এড়ানোর জন্য তিনি ১৯১৮ সালে তাকে অনেকটা গোপনেই বিয়ে করে ফেলেন। অবশ্য পরবর্তীতে জানা যায়, মিল্ড্রেড হ্যারিস গর্ভবতী ছিলেন না। যদিও এ বিয়েটা তার স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। পরে এই হ্যারিসের গর্ভেই চার্লি চ্যাপলিনের সর্বপ্রথম সন্তানকে জন্মদান করেন। কিন্তু সেই সন্তান জন্মের তিন দিন পরই মারা যায় এবং চার্লি ও হ্যারিসের সংসারও বেশি দিন টেকেনি। ১৯২১ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।

এরপর ১৯২৪ সালে ঠিক একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এবারো লিটা গ্রে নামক এক ১৬ বছর বয়সী মেয়ে দাবি করেন, তিনি চার্লির সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন। এবারও চার্লি আদালত এড়াতে লিটা গ্রেকে বিয়ে করতে বাধ্য হন। আগের মতো এবারও তাদের সংসার টেকেনি। লিটা গ্রে চার্লির বিরুদ্ধে ভয়ানক কিছু অভিযোগ করেন, যা চার্লির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং তাকে খুব অস্বস্তিকর ও লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। এরপর ১৯৩৬ সালে তিনি তৃতীয় বিয়ে করেন অভিনেত্রী পলেট গডার্ডকে। এই বিয়েটিও টিকেছিল মাত্র ৬ বছর। তবে এবারের বিচ্ছেদটি সংঘটিত হয় শান্তিপূর্ণভাবে ও উভয়ের সম্মতিতে। অবশেষে ১৯৪৩ সালে চার্লি থিতু হন উওনা চ্যাপলিনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে এবারে তার সংসার টিকেছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। চার্লির ভাষ্যমতে, উওনা ছিলো তার জন্য আদর্শ জীবনসঙ্গিনী, যে তাকে সুখে রেখেছিলো এবং সব পরিস্থিতিতেই তার পাশে ছিল।

তীব্র বেদনাদায়ক শৈশব চার্লি চ্যাপলিনকে জীবন সম্পর্কে অন্যভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল। চার্লি নিজেকে নিয়ে ভাবতেন, নিজের চারপাশের মানুষ নিয়ে ভাবতেন এবং সমাজকে এক বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন। সমাজ সম্পর্কে তার দর্শন ছিল অতি সাধারণ। অথচ তার পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত গভীর। চার্লির জীবন সম্পর্কে জানলে দেখা যায়, তার প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জীবনদর্শন ও পর্যবেক্ষণ কোনো না কোনোভাবে উঠে এসেছে। তার সর্বপ্রথম সন্তানটি জন্মের পর বেঁচে ছিলো মাত্র তিন দিন। তার প্রথম সন্তানের মৃত্যুর দুই বছর পরই মুক্তি পায় ‘দ্য কিড’ চলচ্চিত্রটি। যেখানে দারিদ্র্য, বাবা-মা’র বিচ্ছেদ ও এক শিশুর অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়। স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা থেকেই অনুধাবন করে নেয়া যায়, এই চলচ্চিত্রটির অণুপ্রেরণা চার্লির শৈশব ও পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেয়া তার সন্তানের স্মৃতি থেকেই এসেছে।

তার জীবনী থেকে আমরা একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের শিক্ষা পাই। প্রাচুর্য ও সফলতার শীর্ষে আরোহণ করেও তিনি তার শৈশবের স্মৃতিকে ভুলে যাননি। এজন্য প্রচুর অর্থবিত্তের মাঝে থেকেও তিনি বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেননি। হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি হাল ছেড়ে দেননি, জীবনকে তিনি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি বলতেন, “আমি বৃষ্টিতে হাঁটতে ভালোবাসি, কারণ বৃষ্টিতে চোখের পানি দেখা যায় না”। দিনটা ১৯৭৭ সালের ২৫শে ডিসেম্বর। ভোরে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তার নিজ বাড়িতে মৃত্যুকে বরণ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। ২৭ ডিসেম্বর তার ইচ্ছা অনুযায়ী তার শেষকৃত্য ছিল ছোট ও ব্যক্তিগত অ্যাঞ্জেলিক আয়োজন। চ্যাপলিনকে কর্সিয়ের-সুর-ভেভি সমাধিতে সমাধিস্ত করা হয়। তিনি বহুবার উল্লেখ করেছেন, তার মা ই তার অনুপ্রেরণার উৎস।

চলচ্চিত্র পরিবার থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে পরিচালক রনে ক্লেয়া লিখেন, “তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রের একটি স্তম্ভ, সকল দেশের এবং সকল সময়ের… তাঁর অন্যতম সুন্দর উপহার হল আমাদের জন্য রেখে যাওয়া তাঁর চলচ্চিত্রসমূ।” পরনে জরাজীর্ণ কোট-টাই, ঢিলেঢালা মলিন প্যান্ট, মাথায় কালো রঙের ডার্বি হ্যাট, হাতে একটি ছড়ি, পায়ে পুরোনো এক জোড়া বুট এবং ঠোঁটের উপর খাটো অথচ প্রশস্ত একটুখানি টুথব্রাশ গোঁফ – এক শতাব্দী পূর্বে তার অমর কাজগুলো আজকের দিনেও আমাদের বিনোদনের খোরাক জোগায়, আজও আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে। বিশ্বের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ও সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিদের তালিকা করা হলে নিঃসন্দেহে চার্লি চ্যাপলিনের নাম একদম উপরের দিকেই থাকবে।