চুলের যত্ন : ঘরে বসেই

Dec 30, 2019 03:18 pm
চুলের যত্ন : ঘরে বসেই

 

কিভাবে করতে হয় হেয়ার স্পা
এই শীতে বেশির ভাগ মেয়ের চুল পড়া বেড়ে যায় আশঙ্কাজনক হারে। এ ছাড়াও অনেকের চুল রুক্ষ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। বেড়ে যায় খুশকির উপদ্রবও। চুল নিয়ে মোটামুটি সব ধরনের সমস্যার একটি চমৎকার সমাধানের নাম হেয়ার স্পা। জেনে নিন কিভাবে ঘরে বসেই করে ফেলা যায় হেয়ার স্পা। লিখেছেন তাসফিয়া তাজিন

হেয়ার স্পা চুলের একটি পরিপূর্ণ ট্রিটমেন্ট যা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের সমন্বয়ে গঠিত। এই ধাপগুলোর একটিও বাদ দেয়া যাবে না। ঝলমলে সুন্দর চুল পেতে প্রতিটি ধাপ নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করতে হবে।
ধাপগুলো হলো :

মাথার ত্বক ম্যাসাজ করা : চুলের ট্রিটমেন্ট শুরু করার এটিই সর্বপ্রথম ধাপ। নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল হালকা গরম করে নিয়ে মাথার তালুতে ঘষে ঘষে লাগাতে হবে। এতে করে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং নতুন চুল গজায়। আপনার চুল তৈলাক্ত হলে আমণ্ড অয়েল বা আমলা তেল লাগাতে হবে। কারণ এই দু’টি তেল খুব হালকা। যদি আপনার চুল হয় স্বাভাবিক, আপনি বেছে নিতে পারেন নারকেল তেল, আমণ্ড অয়েল বা অলিভ অয়েল। আর আপনার চুল যদি হয় রুক্ষ বা শুষ্ক, আপনাকে কয়েকটি তেলের মিশ্রণ বানিয়ে চুলে লাগাতে হবে। নারকেল তেল, আমণ্ড অয়েল, অলিভ অয়েলের যেকোনো একটি বা দু’টির তেল একটি ছোট পাত্রে নিয়ে এর সাথে তিলের তেল বা ক্যাস্টর অয়েলের যেকোনো একটি মিশিয়ে চুলে ভালোমতো ঘষে ঘষে লাগিয়ে নিতে হবে।

স্টিমিং : হেয়ার স্পার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো স্টিমিং। দু’টি প্রক্রিয়ায় চুলে স্টিমিং করা যায়। চুল স্টিম করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি স্টিমার পাওয়া যায় বাজারে। এটি কিনে নিলে শুধু স্টিম তৈরি করে চুলে খুব সহজেই স্টিম দেয়া যায়। স্টিমার হাতের কাছে না থাকলেও কোনো সমস্যা নেই। ঘরে স্টিম করার আরেকটি পদ্ধতি আছে, যা খুবই সহজ ও সাশ্রয়ী। দুই লিটার পানি ফুটিয়ে নিন। এবার এই পানিতে একটি তোয়ালে ভিজিয়ে নিংড়ে নিন। খেয়াল রাখবেন যেন তোয়ালে গরম থাকে। এবার এই গরম তোয়ালে দিয়ে সারা চুল ও মাথার তালু পেঁচিয়ে ঢেকে রাখুন। ২ মিনিট পরপর তোয়ালেটি আবার গরম পানিতে চুবিয়ে নিংড়ে আবারো চুলে পেঁচিয়ে রাখুন। খেয়াল রাখবেন যেন সব চুল ও পুরো মাথা ঢেকে থাকে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চুলের গভীরে তেল পৌঁছে। ১৫-২০ মিনিট স্টিম দিতে হবে।

চুল ধোয়া : ঘরে হেয়ার স্পা করার সেরা দিকটি হলো আপনি প্রথম দু’টি ধাপ আগের রাতে করে পরের তিনটি ধাপ পরের দিন সকালে করতে পারছেন। এতে করে আপনার চুল সারারাত তেলের সব পুষ্টি পাবে। তাই চেষ্টা করবেন চুলে তেল দিয়ে ম্যাসাজ করা ও স্টিম দেয়ার কাজটি আগের রাতে করতে এবং পরের তিনটি ধাপ পরের দিন করতে। তৃতীয় ধাপে এবার শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুতে হবে। আপনার চুলে যে শ্যাম্পুটি সবচেয়ে বেশি সুট করে সেটা দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। যদি প্রথম ধাপ দুটো করার পরপরই শ্যাম্পু করেন তাহলে হালকা গরম পানি দিয়ে শ্যাম্পু করতে হবে, যদি সারারাত চুলে তেল রাখেন তাহলে নরমাল পানি দিয়ে শ্যাম্পু করে চুল ধুতে হবে।

কন্ডিশনিং : শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধোয়ার পর কন্ডিশনিং করতেই হবে। চাইলে কেনা কন্ডিশনার ব্যবহার করতে পারেন, অথবা ঘরেই প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে কন্ডিশনার বানিয়ে নিতে পারেন।

হেয়ার মাস্ক : এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ এটিই সব পুষ্টি চুলে লক করে দেয়। বাজারে বিভিন্ন ধরনের হেয়ার মাস্ক পাওয়া যায়। সেগুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় ঘরে তৈরি হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করলে। চুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করতে ও চুলের ড্যামেজ মেরামত করতে যে মাস্কটি ব্যবহার করবেন তা হলোÑ ২টি ডিম, ৩ টেবিল চামচ মধু, একটি কলা ও ৩ টেবিল চামচ নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল একসাথে ব্লেন্ড করে নিন।

এই হেয়ার মাস্কটি সারা চুল ও তালুতে লাগান। ৩০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এই হেয়ার মাস্কটিই যে ব্যবহার করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনার চুলের ধরন ও প্রয়োজন বুঝে যে কোনো হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
ডাবল ক্লিনিং : হেয়ার মাস্ক লাগানোর ৩০ মিনিট পর আবারো শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুতে হবে। তবে এবার প্রথমে পানি দিয়ে ভালোভাবে চুল ধুয়ে চুল থেকে হেয়ার মাস্ক দূর করতে হবে। তারপর একদম অল্প পরিমাণ শ্যাম্পু ব্যবহার করে চুল ধুতে হবে যেন চুলে হেয়ার মাস্ক একটুও অবশিষ্ট না থাকে।
চুল শুকানো : চুল ধোয়া শেষে আলতো করে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে নিয়ে চুল ছেড়ে রাখুন যাতে চুল প্রাকৃতিকভাবেই শুকিয়ে যায়। হেয়ার স্পা যেদিন করবেন সেদিন ভুলেও হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকাবেন না। এতে চুলের ক্ষতি হয়।

কেমন চুলের জন্য কেমন হেয়ার মাস্ক?

এখানে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কিছু মাস্ক বানানোর পদ্ধতি দেয়া হলো। বেছে নিন আপনার চুলের প্রয়োজন অনুসারে সেরা হেয়ার মাস্কটি

কলার ডিপ কন্ডিশনিং মাস্ক : একটি ব্লেন্ডারে ১টি কলা, ১ টেবিল চামচ অলিভ অয়েল একসাথে ব্লেন্ড করুন। মাথার তালুতে এবং চুলে ঘষে ঘষে মাস্কটি লাগিয়ে ৩০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

টকদই ও মধুর ডিপ কন্ডিশনিং মাস্ক : ২ টেবিল চামচ টকদই ও ১ টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে মাস্ক তৈরি করুন। এই মাস্কটি লাগিয়ে ২০-২৫ মিনিট অপেক্ষা করে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

চুলের ড্যামেজ কন্ট্রোল করার হেয়ার মাস্ক : ১/৪ কাপ মেয়নিজ, ১/৩ কাপ আমণ্ড অয়েল, ২টি ডিম একসাথে ব্লেন্ড করে পেস্ট করে নিন। পুরো চুলে লাগিয়ে একটি শাওয়ার ক্যাপ বা তোয়ালে দিয়ে চুল ঢেকে রাখুন। ৩০ মিনিট পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে কন্ডিশনার লাগান।

চুল পড়া রোধ করার হেয়ার মাস্ক : ৫-৬ টি পেঁয়াজ ব্লেন্ড করে মিহি পেস্ট করে নিন। একটি ছাঁকনি দিয়ে পেস্টটুকু ছেঁকে রস বের করে নিন। এবার রসটুকু চুলের গোড়ায় লাগান। ইচ্ছে হলে রস না লাগিয়ে পেঁয়াজের পেস্ট সরাসরি মাথার তালুতে লাগাতে পারেন। ৩০ মিনিট পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাকটি চুল পরা রোধ করতে অত্যন্ত কার্যকরী এবং নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করে।

খুশকির জন্য মেথির হেয়ার মাস্ক : মেথি যে শুধু চুল সিল্কি করে তা-ই নয়, মেথিতে আছে ফাঙ্গাল ইনফেকশন দূর করার ক্ষমতা, তাই এই প্যাকটি খুশকি দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর। ৬ টেবিল চামচ মেথি সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে (চুল বেশি বড় হলে আরো বেশি মেথি নিতে হবে)। সকালে সেই মেথি পেস্ট করে সাথে ১ টেবিল চামচ লেবুর রস মিশিয়ে সারা চুলে এবং তালুতে লাগাতে হবে। আধাঘণ্টা রেখে ঠাণ্ডা পানি ও মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

হেয়ার স্পার উপকারিতা

ষ হেয়ার স্পা চুলের গোড়া থেকে অতিরিক্ত তেল নিঃসরণ কমায়, চুলের গোড়াকে ডিপ কন্ডিশনিং করে চুলকে স্বাস্থ্যবান করে তোলে। হেয়ার স্পা ট্রিটমেন্ট চুলকে ময়শ্চারাইজ করে, চুলের মধ্য পানির পরিমাণ বজায় রেখে চুলের রুক্ষতা দূর করে।
ষ হেয়ার স্পা ট্রিটমেন্ট খুব কম সময়েই খুশকি দূর করার ক্ষমতা রাখে।
ষ যেহেতু হেয়ার স্পা করতে সব প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করা হয়, এসব উপাদান চুলের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেলের জোগান দেয়, মাথার ত্বককে রাখে স্বাস্থ্যবান।
ষ চুল ও মাথার ত্বকের সব ধুলাবালি, ময়লা ও জীবাণু দূর করে চুল পরিষ্কার করে।
ষ চুলের ফলিকল ও চুলের গোড়াকে শক্তিশালী করে। চুল পড়া ও ভেঙে যাওয়া রোধ করে।
ষ হেয়ার স্পা ট্রিটমেন্ট ড্যামেজ হয়ে যাওয়া চুলের ড্যামেজড অংশগুলো মেরামত করে। সেই ড্যামেজ ছোট বা বড় যেটাই হোক, হেয়ার স্পা ট্রিটমেন্ট তা সারিয়ে তুলতে সক্ষম।
ষ মাথায় রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি করে।
ষ চুলের কোষের মেটাবলিজম বাড়ায়, ফলে চুল ভিটামিন ও মিনারেল ধারণ করতে পারে আগের চেয়ে বেশি।