Installateur Notdienst Wien webtekno bodrum villa kiralama

আবাসনে বিপ্লব ফিনল্যান্ডের

Jan 01, 2020 05:11 pm
আবাসনে বিপ্লব ফিনল্যান্ডের

 

ইউরোপের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবাসন সমস্যা নিয়ে বিশেষভাবে চাপের মুখে আছে ইউরোপের প্রায় সব দেশ। দেশগুলোর দাবি, আগের তুলনায় বিশেষ করে বিগত ১০ বছরে তারা অনেক বেশি আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। দাবিটি মিথ্যা নয়। কিন্তু এরপরও অবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি সমস্যাযুক্ত রয়ে গেছে। ইউরোপের গৃহহীনতা সমস্যায় অন্যতম প্রধান দুটি কারণ হলো- সরকারিভাবে এ ধরনের নির্মাণ একেবারেই কমে এসেছে। অন্য দিকে, বাড়ি বাড়ছে দ্রুত গতিতে। এর পেছনে অবশ্যই অন্যতম বড় কারণ হিসেবে থাকছে বিশ্বজুড়ে অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।

ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অস্ত্রব্যবসা জিইয়ে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ চলমান রেখেছে। এতে তারা যেমন কোটি কোটি ডলারের ফায়দা তুলে নিয়েছে ও নিচ্ছে, তেমনি জন্ম দিয়েছে অভিবাসী সমস্যার। ২০১১ সালে সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক, লেবানন, জর্দান, মিসর ও ইরাকে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গেছেন। সেই সাথে ইরাকসহ সঙ্ঘাতময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাজে পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে লাখ লাখ শরণার্থী। আবার এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকেও ইউরোপের পানে ছুটে চলা অভিবাসীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ইউরোপে গিয়ে এদের বেশির ভাগই কোনো বস্তিতে থাকছে অথবা ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে রাস্তার ধারের কোনো ঝুপড়িতে। ফলে নিজের জনগণের পাশাপাশি অভিবাসীদের আবাসন নিয়ে ইউরোপিয়ান দেশগুলো যথেষ্টই চিন্তাগ্রস্ত ও শঙ্কিত।

ইউরোপের দেশগুলোতে আবাসনের খরচ ক্রমেই বাড়ছে, আর তাতে বাড়ছে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা। ওই দেশগুলোর দুর্বল সামাজিক সেবার কারণে এ সমস্যা কমছে না। দেশগুলো এসব সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তাতেও এর মাত্রা সেভাবে হ্রাস পাচ্ছে না।

এ বিষয়ে ইউরোপের সাম্প্রতিক যে পরিসংখ্যানটি রয়েছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক ২০১০-১৮ সাল মেয়াদে ফরাসি সরকার তাদের জরুরি ব্যবস্থার পরিমাণ বাড়িয়ে এক লাখ ৪৬ হাজার মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই চাহিদা পূরণের আরো অনেক বাকি রয়েছে। স্পেনে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এ ধরনের আবাসনের ব্যবস্থা ২০ দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়েছে। গত এক দশকে নেদারল্যান্ডসে গৃহহীনের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। আয়ারল্যান্ডে গৃহহীনের সংখ্যা তিনগুণ বেড়েছে। জার্মান সরকার অভিবাসীদের জন্য দেখার মতো কাজ করেছে গত কয়েক বছরে। এ দিক দিয়ে তারা বেশ উদারতা দেখিয়েছে। তারপরও গত ২০১৮ সালে গৃহহীনের সংখ্যা চার শতাংশ বেড়ে ছয় লাখ ৭৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে, যাদের বেশির ভাগই অভিবাসী। বিষয়গুলো ইউরোপের দেশগুলোর সরকারকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।

ইউরোপের মধ্যে কেবল ফিনল্যান্ডই এ ব্যাপারে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটি গৃহহীন মানুষদের সহায়তা করতে ‘হাউজিং ফাস্ট’ নামে একটি প্রকল্প চালু করে, যার মাধ্যমে এ ধরনের সমস্যা সমাধানে তারা অনেকখানি সফল হয়েছে। ইউরোপের অন্য সব দেশে যখন গৃহহীন মানুষের সমস্যা ক্রমেই বেড়েই চলছে, তখন ফিনল্যান্ডে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান না হলে এ সমস্যা অন্তত বাড়ছে না। তবে দেশটিতে এখনো প্রচুর এশিয়ান ও আফ্রিকান অভিবাসী রয়েছে। তারপরও এ ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের আবাসন সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছে।

ফিনল্যান্ডের এ পদ্ধতি কিন্তু তাদের দেশে প্রথম শুরু হয়নি। ১৯৯০ সালে উত্তর আমেরিকার কয়েকটি দেশে এ হাউজিং ফাস্ট পদ্ধতি চালু হয়েছিল। এ পদ্ধতিতে সামাজিক সেবা এজেন্সিগুলোকে গৃহহীনদের বাড়ি প্রদান করে। ব্যক্তির আচরণগত পরিবর্তনের (যেমন- মাদকাসক্তি, ছোটখাটো অপরাধ বা মানসিক অসুস্থতা) শর্ত পূরণ করলেই তাদের বাড়ি দেয়া হয়। তারা নিজস্ব একটি ছাদের নিচে ঘুমানোর সুযোগ পায়। ফিনল্যান্ডের এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বেশ কিছু অর্থ খরচ হলেও তারা বেশ কিছু বিষয়ে উপকার পেয়েছে। কারণ, যে সব শর্তে এ গৃহহীনদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাতে মাদকাসক্তিসহ ওসব সমস্যায় সরকারের যে অর্থ খরচ হতো, তা থেকে সরকার মুক্তি পেয়েছে।

২০০৮ সাথে ফিনল্যান্ডই ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে হাউজিং ফাস্ট প্রকল্প চালু করে। এতে দীর্ঘমেয়াদে দেশটি গৃহহীনের সংখ্যা ২১ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়। ক্রমান্বয়ে গৃহহীন লোকদেরকে তাদের নিজেদের ঘরে পাঠাতে সক্ষম হয় দেশটি। সরকার এক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করে। অন্য দিকে, তাদের পেছনে সরকারের যে ব্যয় হতো, তা থেকে ব্যক্তিপ্রতি ১৫ হাজার ইউরো ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়। যখন এ বিষয়টি নিয়ে আমেরিকান ও কানাডার শহরগুলোতে কাজ করতে শুরু করা হয়েছিল, তখন দেখা গিয়েছিল, এ প্রকল্পের মাধ্যমে পুলিশ, কারাগার, আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেশ অর্থ সাশ্রয় হয়েছিল।

ফিনল্যান্ড এমন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কয়েক শ’ সমাজকর্মীকে বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়ে আসে। তারা ২০১৭ সালে নিম্নআয়ের লোকজনের জন্য সাত হাজারের বেশি হাউজিং প্রকল্প তৈরি করে। যদিও দেশটিতে এখনো দরিদ্র বা গৃহহীন লোক রয়েছে, তবুও বলা যায়, ফিনল্যান্ডের এ সমস্যা আপাতত শেষ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের অন্যসব বড় দেশ কি এ ধরনের পন্থা গ্রহণ করতে পারে? প্যারিসের জাতীয় ইমার্জেন্সি শেল্টার হটলাইনে প্রতিদিন সাহায্য চেয়ে কল করে ২০ সহস্রাধিক লোক। একটি জরিপে দেখা গেছে, প্যারিসের রাস্তায় সাড়ে তিন সহস্রাধিক লোক ঘুমায়। আবাসনের ব্যয় বৃদ্ধি এবং চাকরির অনিশ্চয়তা এসব লোককে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। তাদের দুর্ভোগ কমাতে প্রতি বছর প্যারিসে ১ নভেম্বর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভাড়াটে উচ্ছেদে বাড়ির মালিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। এই বছর শহরটিতে অতিরিক্ত সাত হাজার শীতকালীন আশ্রয়স্থল তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন এনজিও জানিয়েছে, এ সংখ্যাটি ১০ হাজার হওয়া উচিত ছিল।

প্যারিসের মেয়র আন্নে হাইডেলগো প্যারিসের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করেছেন। তার এ ব্যবস্থাটি গৃহহীনদের পক্ষে সাময়িকভাবে স্বস্তিদায়ক হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। কারণ, এ অবস্থায় ডেভেলপাররা নতুন করে বাড়ি তৈরিতে অনুৎসাহিত হবে। এ শহরে এক বছরে সাত হাজার ৫০০ নতুন ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যার তুলনায় এ সংখ্যাটি খুবই কম। জার্মানি এ দিক দিয়ে ফ্রান্স থেকে অনেক এগিয়ে আছে। কিন্তু এরপরও অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। কারণ, দেশটিতে সরকারি সহায়তায় বানানো ভবনগুলো নির্মাণের ৩০ বছর পরই কেবল স্বাধীনভাবে ভাড়া দেয়া বা বিক্রি করা যায়। বার্লিনে ১৯৯০ সালে যেখানে তিন লাখ ৬০ হাজার সোস্যাল হাউজিং ইউনিট ছিল, ২০১৯ সালে এসে তার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে এক লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। আর গত এক দশকে ভাড়া বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ।

সব মিলিয়ে ইউরোপের বর্তমান যে অর্থনৈতিক অবস্থা, তাতে খুব বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসা বা বড় ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেয়া কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আবাসন সমস্যা যে দিন দিন আরো বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে তারা ফিনল্যান্ডের পদ্ধতিটিকে ভালোভাবে প্রয়োগ করে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো যায় কি না তা দেখতে পারে।