Installateur Notdienst Wien webtekno bodrum villa kiralama

নেপাল : আশা জাগাল একটি শিশু

Jan 01, 2020 08:44 pm
নেপাল : আশা জাগাল একটি শিশু

 

খুব বেশি ছবি আমার জীবনকে বদলে দেয়নি, কিন্তু একটি আমাকে ব্যক্তি হিসেবে বদলে দিয়েছে, আরো ভালোর জন্য আশাবাদী করেছে।
আমি ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিলের কথা কখনো ভুলব না। ওই দিনেই আমি নেপালের কাঠমান্ডুতে আমার তখনকার বাড়িতে প্রথমবারের মতো ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা লাভ করি। অলস শনিবারে আমি ঘুমিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে জাগিয়ে দিয়েছিল। বাড়িটি নড়ছিল।

বাড়িটি যখন আরো বেশি করে নড়ছিল, তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দৌড়ানোর। আমরা ১২ তলা ভবনের ৬ষ্ট তলায় বাস করতাম। আমি কেবল পায়জামা পরে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম। নামার পথে সিঁড়ি কোঠার ধসে পড়া দেয়াল ও জানালা দিয়ে সুইমিং পুলে বড় ধরনের ঢেউ দেখতে পেলাম।
কী ঘটছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই আমি দৌড়াচ্ছিলাম। তবে রাস্তায় নেমে লোকজনের মুখে ভয় দেখতে পেলাম। আমি বুঝতে পারলাম, বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছৈ। ঠিক ওই মুহূর্তটাতে নেপালের ওই ভূমিকম্প কেবল ফটোগ্রাফের ইভেন্টই নয়, বরং আমি যে দেশটিকে ভালোবাসি তার একটি গল্প হয়ে ওঠল।
প্রথম কয়েক দিন আমি আরো অনেকের সাথে কাঠমান্ডু রাস্তায় ঘুমালাম। অনেকের বাড়ি ঠিক থাকলেও ভূমিকম্প-পরবর্তী শক-ওয়েভে ভয় পেয়ে রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। ওই দিনগুলোতে দুই নেপালি সহকর্মী- নিরি শ্রেষ্ঠা ও নভেশ চিত্রকর পরিবার সদস্য হয়ে ওঠেছিল। আমরা ধ্বংস্তুপের মধ্য দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেছি। আবর্জনার মধ্য দিয়ে লাশের গন্ধ বের হয়ে এসেছিল। যে রাস্তা ধরেই হেঁটেছি, সেখানেই লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখেছি, জীবনের সন্ধানে পুলিশ সদস্যদেরকে জঞ্জাল পরিষ্কার করতে দেখেছি।

দ্বিতীয় দিনে আমি ভক্তপুরের দিকে নজর দিয়েছি। কাঠমান্ডুর ঠিক বাইরে এটি অবস্থিত। কয়েক সপ্তাহ আগে বিসকেট যাত্রা নামের একটি উৎসবের ছবি তুলেছিলাম। কিন্তু ভূমিকম্পটির পর এখানকার রাস্তাগুলো যুদ্ধ এলাকা বলে মনে হচ্ছিল। রাস্তায় আবর্জনার স্তুপ। পরিবার সদস্যরা যাতে শনাক্ত করতে পারে, সেজন্য উদ্ধার করা লাশগুলো হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তারপর পরিবারের শেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

কষ্ট আর হতাশা আমার চিন্তাকে দখল করে নিয়েছিল। বিবাহ অনুষ্ঠান উপলক্ষে ২২ মে আমার ফ্রান্সে যাওয়ার কথা ছিল, কোনোভাবেই তা বিলম্ব করার উপায় ছিল না। কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে ফ্রান্স থেকেও আমি নেপালে আমার বন্ধুদের থেকে খবর পাচ্ছিলাম। আন্তর্জাতিক মিডিয়া অবশ্য নেপালকে ভুলে যেতে বসেছির।
এক মাস পর আমি যখন কাঠমান্ডুতে ফিরে এলাম, তখন মনে হলো, ভূমিকম্পটি এখনই হয়েছে। তবে কিছু পরিবর্তন হচ্ছিল। আবারো আশা জাগছিল, স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসছিল, পুরো দেশ থেকে শোনা যাচ্ছিল : আমরা আমার জেগে ওঠব।
আমার মনে হলো, নেপালের জনগণ জীবন সম্পর্কে বিশ্বকে একটি শিক্ষা দিতে চাইছিল। তবে কেউ শুনছিল না। আমি এই গল্পটি বলতে চাই। ধীরে ধীরে এটি একটি প্রকল্পে, একটি ব্যক্তিগত সফরে পরিণত হলো, আমি এটাকে বলি ‘সহিষ্ণুতা’ (এন্ডুরেন্স)।

আমি সাত মাস ধরে ‘সহিষ্ণুতার’ ছবি নিলাম। অবশ্য প্রকল্পটির স্থায়িত্ব হয়েছিল চার বছর। আমি হাজার হাজার ছবি তুলেছি, তবে মাত্র একটিই আমার হৃদকম্প এখনো বাড়িয়ে দেয়- একটি ছেলে খোলার প্রথম দিনেই হেঁটে স্কুলে যাচ্ছিল।
স্কুলে যাওয়ার জন্য এই ছেলেটিকে ভক্তপুর স্কয়ার অতিক্রম করতে হতো। এখনে ভূমিকম্পে ভবন চাপায় ২৭ জন নিহত হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে, এই ছবিটি নেপালি জনগণের শক্তির ছবিই তুলে ধরেছে- বিপর্যয়ের জঞ্জালের মধ্য দিয়ে পূর্ণ আশার পথে হাঁটছে। ওই স্কয়ারের এক বাবা আমাকে নেপাল পুনর্গঠনে তার ছেলের ভূমিকার যে কথা বলেছিলেন, সেটিই ধরা পড়েছে।

ভক্তপুর স্কয়ার
ভক্তপুর স্কয়ার আমার প্রকল্পের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আমি সেখানকার লোকদের ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ি, তাদের কাহিনী শুনি। ভূমিকম্পের আগে এটি ছিল অন্য সব স্কয়ারের মতো। শিশুরা এখানে খেলত, প্রবীণেরা গল্প করত। কিন্তু ভূমিকম্পের কয়েক মাস পরও জঞ্জাল ছাড়া এক মিটার জায়গাও পাওয়া যাচ্ছিল না। লোকজন তাদের বাড়িঘরের জঞ্জাল যতটুকু পারছিল, সরাচ্ছিল। দিনের পর দিন আমি দেখতে লাগলাম, লোকজন কঠোর পরিশ্রম করছে, কর্তৃপক্ষের সাহায্য না আসায় তারা হতাশও হয়ে পড়ছিল। তবে বসে থাকার সময় ছিল না। প্রতিবেশীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিধ্বস্ত বাড়িঘরের দিকে হাত বাড়িয়েছিল। নেপালের প্রয়োজন ছিল পুনঃগঠনের।

একদিন আমি যখন সিগারেট টানছিলাম, দেখলাম এ লোক একটি ছোট গর্তের মধ্য থেকে বের হয়ে আসছে। তার বাড়ির ধ্বংসস্তুপে তৈরী হয়েছে এই গর্ত। বাকি বাড়িটিও যেকোনো সময় পড়ে যেতে পারে। কিন্তু তিনি তারপরও ওই বাড়িতে ঢুকতেন, বের হতেন নানা কিছু নিয়ে আসছে। বিশেষ করে বই, কাগজ, কলম ইত্যাদিই আনতে মূলত। আমি তাকে বিপদ সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিতে গেলে তিনি শান্তভাবে বললেন, নেপালকে গড়ে তুলতে হবে, সবাই এখন পুনর্গঠনে নজর দিয়েছে। কথাটা ভুল। নেপালের অনেক সমস্যা আছে। ভূমিকম্প এগুলোর মাত্র একটি। তবে আমরা যদি দেশকে গড়ে তুলতে চাই, তবে আমাদের প্রয়োজন শিক্ষার।

তিনি বলেন, আমি আমার পরিবার, বাড়ি হারিয়েছি। ভূমিকম্পে সব খুইয়েছি। তবে আমার ৯ বছরের একটি সন্তান আছে। সেই নেপালের ভবিষ্যত। এই দেশ পুনর্গঠনই হলো তার শিক্ষা এবং বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাড়ির ভেতর থেকে বইপত্র বের করা। এই দেশ কেবল ইট দিয়ে তৈরী হবে না। নেপাল নতুন করে তৈরী হবে শিক্ষা দিয়ে।

জঞ্জালের মধ্য দিয়ে স্কুলে যাওয়া
২০ জুলাই ভক্তপুরের অন্তত দুটি স্কুলে আবার খোলে। ফলে নীরব থাকা রাস্তাগুলো আবার স্কুলে যেতে প্রস্তুত শিশুদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে।
স্কুলমুখী শিশুদের ছবি আমি তুললাম। শেষ পর্যন্ত খুশি হওয়ার মতো ছবি পাওয়া গেল। যখন মনে হলো, আমার কাছে পর্যাপ্ত ছবি আছে, তখন আমি কাঠমান্ডু ফেরার আগে কফি পান করতে ড্রাইভারকে নিয়ে স্কয়ারে গেলাম। তখনই কিছু একটা আমাকে থামিয়ে দিলো।
সাত বছরের একটি ছেলে তার ব্যাকপ্যাক নিয়ে শান্তভাবে স্কুলের পথে চলছিল হেঁটে। স্কয়ারে সে ছিল একা। তার শান্ত পদক্ষেপে কিছু একটা ছিল। আমার চোখে মনে হলো, স্কুল আবার খোলায় সে প্রতিনিধিত্ব করছিল নেপালিদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া সুখ আর আশার। সেই আমাকে মনে করিয়ে দিলো, শিক্ষার মাধ্যমে এক বাবার নেপাল পুনর্গঠনের কথা। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে প্রচণ্ড বাধা সত্ত্বেও নেপাল আবার জাগছে। আমি ছবি তুলতে কয়েক মিটার পর্যন্ত ছেলেটির পিছু নিলাম।

এরপর আমি তার চেহারা দেখতে চাইলাম। এর একটি কারণ হলো, আমি আশ্বস্ত হতে চাইছিলাম যে আমি আর সে- দুজনের জন্যই সবকিছু ঠিক আছে তা দেখাতে। এ কারণে আমি দৌড়ে তার সামনে গিয়ে হাসলাম। তখনই আমি ছবি নেইনি, তবে তার সুন্দর হাসিটি কখনো ভুলব না।
এখন আমি আমার ডেস্কের ওপর এই ছবির একটি কপি রাখি, যাতে আমি এ কথা ভুলে না যাআ যে জীবনের অনেক সমস্যা সত্ত্বেও কখনো যেন আশা না হারাই। সে আমাকে দেখাল, কিভাবে হাসতে হয, কিভাবে সামনে এগুতে হয়। আমি সবসময় তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

নেপালিদের যে আশা ছিল তা রাজনীতিবিদেরা চুরি করেছে। সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নেপালিদের অনেকে তা পায়নি। লোকজনের কাছে আজ টাকা আছে, আরো ভালো বাড়ি আছে, কিন্তু গরিবেরা সবকিছু হারিয়েছে। ওই বাবা আমাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, নেপালের স্বপ্ন নিহিত আছে শিক্ষায়। আমি আশা করছি যে শিশুরা আবারো দেশকে সবার জন্য আরো ভালো দিকে নিয়ে যাবে।

আল জাজিরা