Installateur Notdienst Wien webtekno bodrum villa kiralama

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণে পাকিস্তান

Jan 29, 2020 09:30 pm
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণে পাকিস্তান

 

সম্প্রতি ইসলামাবাদ সফরকালে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী উপ আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিস ওয়েলস অভিযোগ করেছেন যে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরটি (সিপিইসি) প্রকল্পটিতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং তা পাকিস্তানের ঋণের বোঝা বাড়াবে। তার এই মন্তব্য জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন চীনা রাষ্ট্রদূত এবং পাকিস্তান সরকারও তা বিনীতভাবে অস্বীকার করে। এ ধরনের মন্তব্য এই প্রথম মিজ ওয়েলস করেননি। তাহলে এ ধরনের বিবৃতির উদ্দেশ্য ও কারণ কী?

যুক্তরাষ্ট্র কি পাকিস্তান-চীন কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে উদ্বিগ্ন? দেশটি কি মনে করে যে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত জোটকে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করবে এবং ওয়াশিংটনের স্বার্থহানি ঘটাবে? নাকি সত্যিকারভাবেই এমন উদ্বেগ রয়েছে যে সিপিইসি এমন মাত্রায় পাকিস্তানের রক্তক্ষরণ ঘটাবে যার ফলে আইএমএফের ঋণ পরিশোধে সমস্যার সৃষ্টি করবে, আন্তর্জাতিক অন্যান্য বাধ্যবাধকতা পূরণে অক্ষম করে তুলবে?
পাকিস্তানকে ওয়াশিংটন সিপিইসির বিকল্প কিছু দেয়ার ইচ্ছা আছে কি ওয়েলেসের? পাকিস্তান কি তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে যে পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক সহায়তা স্থগিত রয়েছে? পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতার আংশিক বিরতি সম্প্রতি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আবার শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে।

আর্থিক শর্তাবলী অনুমোদন করলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি কেনার ব্যাপারে পাকিস্তানের আগ্রহ রয়েছে। এ ব্যাপারে এফ-১৬ জঙ্গি বিমানের সাম্প্রতিক সংস্করণ, বিদ্যমান এফ-১৬ বিমানগুলোর আধুনিকায়ন সরঞ্জাম, হেলিকপ্টার, সামরিক যান, ইলেকট্রনিক ও অপটিক্যাল সিস্টেমের কথা বলা যেতে পারে।
সমস্যা হলো এই যে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি বেশি করে পাকিস্তানের ওপর অবরোধ আরোপ করে এবং এর ফলে দেশটি চীনের ওপর নানা দিক থেকে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। চীনা সামরিক হার্ড ও সফটওয়্যার সরবরাহই হয়ে পড়ে প্রধান উৎস।
পাকিস্তানের জন্য সিপিইসি কল্যাণগহুলো নানামুখী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর বিপুল অবকাঠামো বেলুচিস্তান প্রদেশের জন্য এবং সার্বিকভাবে পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর হবে। এটি ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্য নতুন নতুন অ্যাভেনিউ খুলবে। গোয়াদর বন্দরের উন্নয়নের ফলে সেটি চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সাথে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করবে, পশ্চিম চীনের অর্থনীতিতে বিপুল গতি সঞ্চার করবে।

অবশ্য গোয়াদর ও অন্যান্য বড় প্রকল্প পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগের উপযোগী হতে কিছু সময় লাগবে। ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের চীনা ঋণ পরিশোধ শুরু করতে হবে এবং তা নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য আরো বোঝার সৃষ্টি করবে। ওয়েলস এই পরিস্থিতির কথাই প্রকাশ করেছেন। তবে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে তাতে করে আশা করা যায় যে আগের অনেক ঘটনার মতো এবারো বেইজিং ছাড় দেবে। সিপিইসির ব্যাপারে চীন ও পাকিস্তান উভয় দেশেরই বিপুল স্বার্থ রয়েছে। এটাকে তারা ব্যর্থ হতে দেবে না।

চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক যে কত মূল্যবান তা বোঝা যায় এই বাস্তবতা থেকে যে এফএটিএফে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে চীন। তবে তাইা বলে তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের মতো মিত্রদের ভূমিকাকে খাটো করা হচ্ছে না।
এ ধরনের সম্পর্কে মান একটি বড় বিষয়। পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচির প্রতি যুক্তরাষ্ট্র খুবই বিরোধী। অন্যদিকে চীনা সহায়তায় চারটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য দেশগুলো যখন অবরোধ আরোপ করে, তখন চীনের কাছ থেকেই পাকিস্তানকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে হয়।
একসময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাকিস্তান বেশ ভালো পরিমাণ অস্ত্র পেত। কিন্তু সেই দিন আর নেই। তাছাড়া দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ আর এক মেরুতে অবস্থান করছে না।

ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন কাশ্মির ইস্যুর প্রতি ক্রমবর্ধমান হারে আগ্রহ দেখান, তখন পাকিস্তানি নেতাদের কানে তা মধুর সঙ্গীত মনে হতে পারে। কিন্তু ভারত চায় দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে এর সমাধান। ফলে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ তারা মানবে না।
আবার চীনও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে বিপুলভাবে উপকৃত হচ্ছে। এই সম্পর্কের প্রথম দিকে চীন অনেকটাই নিঃসঙ্গ ছিল, পাকিস্তান ছিল প্রধান মিত্র এবং বিশ্বের জানালা। গোয়াদর বন্দর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় চীন উপকৃত হবে। এই বন্দরের মাধ্যমে আরব সাগরে যেতে পারবে অনেক সহজে। তাকে আর মালাক্কা প্রণালী দিয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘ রুট পাড়ি দিতে হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র চায়, পাকিস্তান ও ভারত যেন কাশ্মির প্রশ্নে তাদের মতপার্থক্য নিষ্পত্তি করে ফেলুক এবং দুই দেশের মধ্যে একটি কাজ চালিয়ে নেয়ার মতো সম্পর্ক বিরাজ করুক, যাতে চীনের দিকে নজর দিতে পারে ভারত। কিন্তু পাকিস্তানের সাথে বৈরিতায় জড়িয়ে রয়েছে ভারত। এর ফলে চীনের পক্ষে ভারতের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কার্যক্রমকে বৈশ্বিক পর্যায়ের না ভেবে আঞ্চলিক পর্যায়ের ফেলা সহজ হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর চাপ তীব্র করে ও পাকিস্তানকে কাশ্মিরের বিদ্রোহীদের সমর্থন প্রদানের জন্য অভিযুক্ত করার মাধ্যমে পাকিস্তানের অর্থনীতির যতটা সম্ভব রক্তক্ষরণ করতে চাইছে ভারত। এই ফাঁদে না পড়াটা নিশ্চিত করতে হবে পাকিস্তানকে।
পাকিস্তানি নেতৃত্ব বৈশ্বিক শক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সম্পর্কে অবগত রয়েছে। সম্পর্কে উত্থান-পতন থাকা সত্ত্বেও কঠিন সময়েও সেতুবন্ধন গড়া সম্ভব। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বক শক্তি দিয়ে কোনো দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সক্ষমতাও সবার জানা বিষয।

অবশ্য দুই দেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে বেশ উন্নত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে পাকিস্তানের সমর্থনের বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জেনারেল বাজওয়া জোর দিয়ে বলছেন যে আফগান শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হওয়া উচিত। পাকিস্তান হলো দ্বিতীয় সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং এর শক্তিও আছে। অধিকন্তু, পাকিস্তানের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় আছে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। তাছাড়া মার্কিন পণ্যের বড় ধরনের বাজারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও আছে পাকিস্তানের।

ইরানের সাথে ওয়াশিংটনের বৈরী সম্পর্ক এবং মুসলিম রাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর অনিশ্চিত অবস্থান ও সেইসাথে পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানের কারণে দেশটিকে অগ্রাহ্য করতে পারে না যুক্তরাষ্ট্র।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সম্পর্ক পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক তাৎক্ষণিক মন্তব্য আর কখনো এত ভালো ছিল না। এমনকি তা যদি অন্তসারশূন্যও হয়, তবুও তাতে বড় ধরনের একটি পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করছে।

অনেক দিক দিয়েই পাকিস্তানের জন্য অনন্য সুযোগের সৃষ্টি সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রাখার জন্য। পাকিস্তানের রয়েছে এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও বিশ্বমানের কূটনীতিবিদ। এখন সময় হলো জাতির সর্বোচ্চ কল্যাণের জন্য তারা তাদের শক্তি প্রয়োগ করবেন।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল, পাকিস্তান সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় সরকারের সাবেক সচিব। তিনি পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিস বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

এক্সপ্রেস ট্রিবিউন