কিং ব্যাক মোনেম মুন্না : হি ওয়াজ মিস্টেকেনলি বর্ন ইন বাংলাদেশ

আরিফুল ইসলাম মোমিন | Feb 12, 2021 02:17 pm
কিং ব্যাক মোনেম মুন্না

কিং ব্যাক মোনেম মুন্না - ছবি : সংগৃহীত

 

ফুটবল গোলের খেলা। বিশ্বজুড়ে ৮ ফুট লম্বা ও ২৪ ফুট চওড়া পোস্টে লক্ষ্যভেদকারী স্ট্রাইকারদের নিয়েই যত উন্মাদনা।

এর ব্যতিক্রম যে নেই, তা বলা যাবে না। সে রকম এক ব্যতিক্রম ফুটবলারের ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল বাংলাদেশের ফুটবল আকাশে। যাকে নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক জার্মান কোচ অটো ফিস্টার বলেছিলেন -

‘হি ওয়াজ মিসটেকেইনলি বর্ন ইন বাংলাদেশ’— সেই অটো ফিস্টার, যিনি ঘানাকে বিশ্ব যুব কাপের শিরোপা এনে দিয়েছিলেন, সেই ফিস্টার যিনি আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত দেশ টোগোকে বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্তপর্বে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফিস্টারের প্রিয় সেই মোনেম মুন্না।

তিনি ছিলেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয় এক ফুটবলার। ১৯৯১ মৌসুমের দলবদলে তিনি আবাহনীতে খেলেছিলেন ওই সময়ের বিচারে অকল্পনীয় ২০ লাখ টাকা পারিশ্রমিকে, যা অনেক দিন পর্যন্ত বাংলাদেশেই শুধু নয়, গোটা উপমহাদেশেই ছিল এক অনন্য রেকর্ড, জাহিদ হাসান এমিলির ভাষায়, ‘ওই সময়ের ২০ লাখ টাকার তুলনায় এখনকার ৬০ লাখ টাকা কিছু না। এখন কোন ফুটবলার ৫০ লাখের বেশি পারিশ্রমিক পান, তা কেউ জানে না। কিন্তু মুন্না ভাইয়ের ২০ লাখ টাকা পাওয়ার খবর কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেও ছড়িয়ে গিয়েছিল। তখনকার দিনে এটা ছিল বিশাল এক ঘটনা।’

তার নেতৃত্বেই ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ মিয়ানমারে চার জাতি প্রতিযোগিতার শিরোপা জয় করেছিল। ওটাই ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রথম কোনো শিরোপা।
রক্ষণসেনা মোনেম মুন্না ছিলেন এক অনন্য দৃঢ় চরিত্রের ফুটবলার। পরিশ্রমী মুন্না ছিলেন আবাহনী ও জাতীয় দলের পরম নির্ভরতার প্রতীক। ফ্রি-কিক থেকে গোল করার অসামান্য ক্ষমতার অধিকারী মুন্না ছিলেন এক সেলিব্রেটি ফুটবলার। ক্রিকেট এ দেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠার আগে অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মোনেম মুন্না নামটি এদেশের করপোরেট বাণিজ্যেরও অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। 'সুস্বাস্থ্যকে রক্ষা করে লাইফবয়, লাইফবয় যেখানে স্বাস্থ্যও সেখানে'- জিংগেলটি যখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় জনপ্রিয় ছিল তখন প্রায় সমানতালে জনপ্রিয় ছিল ফুটবলও। ওই বিজ্ঞাপনের সুদর্শন মুন্নাই বাংলাদেশের ফুটবলে সর্বশেষ সফল সুপারস্টার। মোনেম মুন্না।

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইস্ট বেংগলে মোনেম মুন্না কিংবদন্তী। দুই মৌসুম মাত্র মুন্না খেলেছেন ইস্ট বেংগলের হয়ে। সেও আজ প্রায় সিকি শতাব্দী আগের কথা। কিন্তু কলকাতার মানুষের কাছে মুন্নাই এখনো বাংলাদেশের ফুটবল। এপার আর ওপার বাংলার একমাত্র অবিসংবাদিত সুপারস্টার।

আজ সবাই ক্রিকেটার হতে চায়। ক্রিকেটে টাকা আছে, গ্ল্যামার আছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা ক্রিকেটে সাকিব আল হাসানের মতো বিশ্বমানের আইডল আছেন, আছেন মাশরাফি মর্তুজার মতো অন্তরে আবেগের জায়গা করে নেয়া নেতা যার পিছনে দাঁড়িয়ে গোটা জাতি র‍্যালি করতে পারে। একটুও না বাড়িয়ে বলা যায়- মুন্না ছিলেন ফুটবলের জন্য দুটোই।১৯৯৭ সালে ইউনিলিভার এর ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হয়েছিলেন মুন্না। দেশের কর্পোরেট ক্রীড়ার ব্র্যান্ড এম্বাসেডরদের তালিকায় অবসরের আগেভাগেও ছিলেন শীর্ষে। মুন্নার পোস্টার বিক্রি হতো পুরাতন ঢাকার পথে ঘাটে।

খেলাধুলা প্রিয় সর্বশেষ প্রজন্ম না বললেও ৯০-এর দশকের তরুণ সমাজকে বলা যায় খেলাধুলায় আপামর অংশগ্রহনকারী শেষ প্রজন্ম। সেই প্রজন্ম মুন্নাকে স্থান দিয়েছিল আইডলের। আইকনের। অনুপ্রেরণাদায়ী রেফারেন্স পয়েন্ট হিসাবে। এই প্রজন্মের সামনে তেমন কেউ নেই। মাঠে দর্শক নেই। অনেকেই আংগুল তোলেন আকাশ সংস্কৃতির দিকে। কিন্ত প্রশ্ন থেকে যায়- বিশ্বমানের নৈপূণ্য যেখানে হাতের মুঠোয়, এটাই কী স্বাভাবিক নয় যে শুধুমাত্র অনুপ্রেরণাদায়ী কোন আইডল ই পারতেন স্থানীয় ফুটবলের দিকে তরুন সমাজের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে? শুধু ভুল দেশে নয়, হয়তো ভুল সময়েও জন্মেছিলেন মুন্না।

বাংলার ফুটবল ভক্তরা যেখানে পেলে, মেসি, রোনালদো, নেইমার বা ম্যারাডোনা নিয়ে মাত থাকে, সেখানে দেশের কীর্তিমান ফুটবলারদের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। রাত জেগে ইউরোপিয়ান লিগের খেলা দেখা তো একপ্রকার অভ্যাসই হয়ে গেছে আমাদের তরুণদের।

না, বাইরের ফুটবল দেখা, খোঁজখবর রাখার মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু নিজের দেশের ফুটবলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা জানাও তো আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে!

মোনেম মুন্নাকে শ্রদ্ধা জানাতে ধানমন্ডি ৮ নম্বর সড়কের সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে ‘মোনেম মুন্না সেতু’, রোজ সেতু দিয়ে পারাপার করলেও যা হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা।


 

ko cuce /div>

দৈনিক নয়াদিগন্তের মাসিক প্রকাশনা

সম্পাদক: আলমগীর মহিউদ্দিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সালাহউদ্দিন বাবর
বার্তা সম্পাদক: মাসুমুর রহমান খলিলী


Email: online@dailynayadiganta.com

যোগাযোগ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।  ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Follow Us