রবীন্দ্রনাথের বংশধারা

কামাল আহমেদ | Nov 06, 2021 02:57 pm
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - ছবি সংগৃহীত

 

হাজার বছরেরও বেশি পথ পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষেরা বহু আরোহ-অবরোহ আর উত্থান-পতনের ইতিহাস মাড়িয়ে, ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই আপন অস্তিত্ব জিইয়ে রেখেছেন। বারবার হোঁচট খেয়েও দাঁড়িয়েছেন। তবে বেশির ভাগ সময়ই তারা রাজ-স্পর্শধন্য হয়েছিলেন; মুসলমান সম্রাটদের সংস্পর্শে স্বগোত্রীয় ভোগান্তিও কম হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের পরিচিতিবিষয়ক আলোচনা অনেকেই করে থাকলেও সাধারণ পাঠকের কাছে তা এখনো অনেকটা অজানাই। তাই বিভিন্ন উৎস থেকে গৃহীত তথ্যের আলোকে তার বংশের অতীত খানিকটা তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

বর্তমান খুলনার রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামে রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল। তৎকালীন পিঠাভোগের কুশারি বংশের ধারাবাহিকতার একটি অংশই হলো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। কুশারী বংশের ইতিহাস থেকে জানা যায়, অষ্টম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে আদিশুরের রাজত্বকালে কনৌজ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণ বঙ্গদেশে আসেন। তখন সনাতন ধর্মের বিস্তারে অন্যতম ব্রাহ্মণ ক্ষিতিশের ছেলে ভট্টনারায়ণ বঙ্গদেশে প্রতিষ্ঠিত হন। ভট্টনারায়ণের ছেলে দীননাথ শান্ডিল্য গোত্রীয় ব্রাহ্মণ মহারাজ ক্ষিতিশুরের অনুগ্রহে পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলার ‘কুশ’ নামক গ্রামের অধিকার পেয়ে কুশারী গোত্রভুক্ত হন। সেখান থেকেই কুশারী বংশের উৎপত্তি। পরবর্তিতে খুলনার পিঠাভোগ গ্রামে কুশারী বংশধারীদের বাসভূমি গড়ে উঠে। এক সময়ের প্রমত্তা ভৈরব নদের তীরবর্তী পিঠাভোগ গ্রামে রামগোপালের পুত্র জগন্নাথ কুশারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃকুলের আদি পুরুষ। জগন্নাথ কুশারীর পঞ্চম পুরুষ পঞ্চানন কুশারী জ্ঞাতী কলহের কারণে পিঠাভোগের যাবতীয় স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি তার ভ্রাতার অনুকূলে হস্তান্তর করে ভাগীরতী নদীর তীরবর্তী কলকাতার সুতানটির দক্ষিণ দিকের গ্রাম গোবিন্দপুরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। কথিত আছে, সেই সময় গোবিন্দপুরে বসবাস করত জেলে, মালো, কৈর্বত্য, পোদ, বণিক প্রভৃতি জাতি। এতগুলো জাতির মধ্যে পঞ্চানন কুশারীরা ছিলেন মাত্র একঘর ব্রাহ্মণ। ফলে এ অঞ্চলের লোকজন ভক্তিভরে পঞ্চানন কুশারীকে ঠাকুর বলে ডাকতেন। কালে একদিন পঞ্চানন কুশারীর পরিবর্তিত নাম পঞ্চানন ঠাকুর অভিহিত হয়। এ দিকে কলকাতার গোবিন্দপুরের বাসিন্দা পঞ্চানন ঠাকুরের পরবর্তী বংশধর নীলমনি ঠাকুর জোড়াসাঁকোয় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। জোড়াসাঁকোর এ বিখ্যাত ঠাকুর বংশে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

অন্য বর্ণনায় জানা যায়, একসময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে বঙ্গদেশের পূর্বাংশ ব্রাক্ষণশূন্য হয়ে পড়ে। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে হর্ষবর্ধনের ছেলে জয়ন্ত গৌড়ের সিংহাসনে বসেন। তিনি পূজা অনুষ্ঠান পালনে সুদূর কনৌজ থেকে ‘পঞ্চব্রাক্ষণের’ আমদানি করেছিলেন। পঞ্চ- ব্রাক্ষণের মধ্যে ক্ষিতীশের ছেলে ছিলেন ভট্ট নারায়ণ। তার রচিত বেণীসংহার নামক ষড়ঙ্ক নাটকটি সংস্কৃত সাহিত্যে প্রসিদ্ধ। ভট্টনারায়ণই ঠাকুর পরিবারের আদি পুরুষ ছিলেন।

ভট্টনারায়ণ ও তার পাঁচ ছেলে একটি করে গ্রামের অধিকারী হন। ব্রাক্ষণরা যে যে গ্রাম পেয়ে বসতি স্থাপন করেন, কালক্রমে সেই গ্রামের নাম তাদের বংশীয় উপাধিতে পরিণত হয়। এভাবে ভট্টনারায়ণের এক ছেলে কুশারী গ্রাম পেয়ে কুশারী হিসেবে পরিচিত হলেন। ঠাকুর পরিবার এ কুশারী অংশ থেকেই এসেছে। জগন্নাথ কুশারী হচ্ছেন কুশারীদের বিশতম অধস্তন পুরুষ। খুলনার মুসলিম আধ্যাত্মিক সাধক ‘খান জাহান আলীর ‘মুঘল প্রশাসনে যোগসূত্র ছিল। গোবিন্দলাল রায় নামে তার একজন হিন্দু কর্মচারী ছিল। গোবিন্দলাল রায় মুসলিম ‘ভোজন-ঘাণে দুষ্ট হয়ে পীরালী মুসলিম হন। পিরালী মুসলমান গোবিন্দলাল রায়ের সাথে জগন্নাথ কুশারীর বিশেষ যোগসূত্র থাকায় তিনি ‘পিরালী ব্রাক্ষণ’ হয়ে যান সমাজচ্যুত হয়ে। এসব পীরালী ব্রাক্ষণরা হিন্দু ব্রাক্ষণ হলেও তাদের ছেলেমেয়দের বিবাহের জন্য পাত্র-পাত্রী পাওয়া যেতো না। কারণ কোনো ব্রাক্ষণই ‘পীরালী ব্রাক্ষণণের পুত্র-কন্যাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে নিজেরা ‘পীরালীব্রাহ্মণে’ পরিণত হতে চাইত না। দক্ষিণডিহির জমিদার শুকদেব রায়চৌধুরী কন্যাদায়ে বিব্রত ছিলেন। সেই সময়ে পিঠাভোগের তরুণ ব্রাহ্মণ কুমার জগন্নাথ কুশারী এক দুর্যোগময় ঝড়ের রাতে শুকদেবের গৃহে আশ্রয় নিলে শুকদেব সেই রাতেই জগন্নাথ কুশারীর সাথে নিজ কন্যার বিবাহ দিয়ে দেন। এ বিবাহের পরে পীরালী ব্রাহ্মণ সমাজচ্যুত জগন্নাথ কুশারী নিরুপায় হয়ে চেঙ্গুটিয়া পরগনার অধীনে শ্বশুরালয়ের আশেপাশেই বসবাস করতে থাকেন।

জগন্নাথ কুশারী যশোরের বর্ধিষ্ণু বংশের সন্তান। তিনি বিশেষ কার্যোপলক্ষে বজরায় করে নদীপথে যাচ্ছিলেন, পথে রাতে হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ে বিপদে পড়লে শুকদেব রায়চৌধুরীর গ্রামে-তারই পরিবারে আশ্রয় গ্রহণ করেন। শুকদেব কন্যাদায়গ্রস্ত ছিলেন। তিনি জগন্নাথ কুশারীর সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ বংশের পরিচয় পেয়ে স্বীয় কন্যার সঙ্গে বিবাহ দিয়ে দেন। ফলে বিবাহজনিত কারণে জগন্নাথ কুশারীও ‘পীরালী ব্রাহ্মণে’ পরিনত হন। ঘটনাটি ঘটেছিল ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে। বৈবাহিক কারণে জগন্নাথ কুশারী ‘পীরালী ব্রাহ্মণ’ হলে তাঁর উত্তর পুরুষরা একই ধারায় রূপান্তরিত হতে থাকেন।

রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষদের বসবাসের গ্রাম নির্ণয় নির্দিষ্ট না থাকলেও যশোর যে তাদের নির্দিষ্ট বসবাস ছিল এটা সুনিশ্চিত। এ সম্পর্কে তথ্যাদি বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যেমন- শ্রীসুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত রচিত ‘সংসদ বাংলা চরিতাবিধানে’ যশোর রূপদিয়া বারপাড়া এবং বাংলা একাডেমির ‘চরিতাবিধানে’- যশোরের পড়লী’ সমর্থন করেন। ‘নদীয়া কাহিনী’ ও ‘ঠাকুরবাড়ির কথা’ গ্রন্থে যশোর চেঙ্গুটিয়া পরগণার কথার উল্লেখ আছে। মূলত চেঙ্গুটিয়া পরগণার মধ্যে তাদের বসবাসের নির্দিষ্ট স্থান ধরা যেতে পারে। কারণ উল্লেখিত সব গ্রামই চেঙ্গুটিয়া পরগণার অন্তর্গত। জগন্নাথ কুশারী থেকে যশোর চেঙ্গুটিয়া পরগণায় বসবাস শুরু।

প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবিকথা’ থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীতে জগন্নাথ কুশারীর নবম ও দশম পুরুষ পঞ্চানন কুশারী আর তার ছেলে জয়রাম প্রথম ভাগ্যান্বেষণে গোবিন্দপুর এসে বসতি স্থাপন করেন। “গঙ্গারধারে গোবিন্দপুর গাঁয়ে যশোহর থেকে নৌকাকরে এলো কয়েকজন ব্রাহ্মণ। সে গাঁয় ব্রাহ্মণ নেই একঘরও জয়রাম ঠাকুর থেকেই অর্থাগমের শুরু হয়! তাদের প্রতিবেশী সবাই ছিল নিম্নশ্রেণীর হিন্দু। তারা পঞ্চানন কুশারী ও তার ছেলেকে তাদের ঠাকুর বলে সম্বোধন করে। ক্রমে ‘ঠাকুর’ তাদের বংশীয় পদবী হয়ে যায়। পঞ্চানন ও জয়রাম ঠাকুর কোম্পানির কর্মচারীদের সাথে পরিচিত হন। জয়রাম ঠাকুর কোম্পানির আমলাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে আমিনের চাকরি নেন। ওই অঞ্চলে পরিবারটি উত্তরোত্তর উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে থাকে। জয়রামের চার ছেলে আনন্দীরাম, নীলমণি, দর্পনারায়ণ ও গোবিন্দরাম। ১৭৫৬ খ্রি: জয়রাম মৃত্যু বরণ করেন, তার প্রথম ছেলে আনন্দী রামও অকালে মারা গেলে পরিবারের প্রধান হন ছেলে নীলমণি ঠাকুর।

১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করে দখল করলে নীলমণির পরিবার বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। পরের বছর ১৭৫৭ খ্রি: পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতন হয়। অতঃপর কলকাতা ধ্বংসের জন্য সিরাজউদ্দৌলার পক্ষ থেকে মির কাসিম কর্তৃক ক্ষতিপূরণ বাবদ যে বিপুল অর্থ কোম্পানিকে প্রদান করা হয়, তা থেকে নীলমণি বেশ কিছু অর্থ পান। নীলমনি আর তার ভাই দর্প নারায়ণ উত্তর সুতানটিতে ভূমি ক্রয় করে নতুন আবাসস্থল নির্মাণ করেন। সেটাই বর্তমানে পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়ি নামে পরিচিত।

১৭৬৪ সালে নীলমণি কোম্পানির দেওয়ান নিযুক্ত হন। সেই আমলে বাঙালিদের জন্য এই পদ ছিল অত্যন্ত উচ্চ এবং সম্মানজনক। বাঙালিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এ পদে অধিষ্ঠিত হন। এভাবে প্রচুর অর্থ উপার্জনের পথ সুগম হয়। তার তৃতীয় ভাই দর্পনারায়ণ ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। জীবনের প্রথম দিকে চন্দননগরে ফরাসি সরকারের অধীনে চাকরি করেন, পরে চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় মননিবেশ করেন এবং প্রচুর অর্থসম্পদের মালিক হন। আনুমানিক ১৭৮৪ সালে নীলমণি ঠাকুর কোম্পানির চাকরি থেকে অবসর নিয়ে পাথরঘাটার এজমালি বাড়িতে বসবাস করতে আসেন। কিন্তু অচিরেই বিষয়সম্পত্তি নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে নীলমণি ঠাকুর গৃহত্যাগ করেন। অতঃপর পারিবারিক সালিসের সিদ্ধান্ত অনুসারে দর্পনারায়ণ নীলমণিকে এক লাখ টাকা দিয়ে পাথরঘাটার বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি নিজের কবলায় আনেন। এ সম্বন্ধে ‘মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর’ জীবনী গ্রন্থের রচয়িতা ভবসিন্ধু দত্ত লিখেছেন, ‘তাহারা সালিসি করিয়া এই সিদ্ধান্ত করিলেন যে, দর্পনারায়ণ ঠাকুর, নীলমণি ঠাকুরকে এক লাখ টাকা প্রদান করিবেন। সেই সময়ে বৈষ্ণবদাস শেঠ নামে এক সমভ্রান্ত তন্তুবায় নীলমণি ঠাকুরকে মেছুয়াবাজারে বাটি নির্মাণের জন্য কয়েক বিঘা জমি প্রদান করেন। নীলমণি ঠাকুর ওই জমির ওপর বাটি নির্মাণ করিয়া বাস করিতে লাগিলেন।’ এই মেছুয়া বাজারের নাম পরবর্তীকালে হয়, ‘জোড়াসাঁকো।

নীলমণির পাঁচ ছেলে- রামতনু, রামরত্ন, রামলোচন, রামমনি ও রাম বল্লভ। তারা জোড়াসাঁকোর পৈতৃক ভিটায় একান্নভুক্তভাবে বসবাস করতেন। ১৭৯১ সালে নীলমণি মৃত্যুবরণ করেন। রামতনু ও রামরত্নের অল্প বয়সে মৃত্যু হলে তৃতীয় ছেলে রামলোচন পরিবারের কর্তা হন। রামলোচন ও চতুর্থভাই রামমনি দুই ভাই একই পরিবারের দুই সহোদরা বোনকে বিয়ে করেন। রামলোচনের স্ত্রীর নাম অলকা দেবী আর রামমনির স্ত্রীর নাম মেনকা দেবী। রামলোচন অপুত্রক ছিলেন, তার একটামাত্র কন্যা। রামমনির এক কন্যা জাহ্নবী ও দুই পুত্র রাধানাথ এবং দ্বারকানাথ। দ্বারকানাথ ১৭৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বারকানাথের একবছর বয়সে মা মেনকাদেবীর মৃত্যু হলে তাকে মাতৃসম মাসী লালনপালন করেন।

রামলোচন ১৮০৭ সালের ১২ ডিসেম্বর মারা যান। তার মৃত্যুর সময় দ্বারকানাথের বয়স ছিল ১৩ বছর। রামলোচন তার যাবতীয় বিষয়সম্পত্তি দ্বারকানাথের নামে উইল করে তা তত্ত্বাবধানের ভার অলকাদেবী ও দ্বারকানাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাধানাথ ঠাকুরের হস্তে অর্পণ করে যান। পরবর্তীকালে দ্বারকানাথ বৈষয়িক বিষয়ে রামলোচনের যোগ্য উত্তরসূরি হয়েছিলেন।

বাল্যকাল থেকেই দ্বারকানাথ অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তৎকালীন রীতিঅনুযায়ী তিনি প্রথমে আরবি ও ফার্সি ভাষা শেখেন। অতঃপর শেরবোর্ন স্কুল থেকে ইংরেজি ভাষায় বুৎপত্তি লাভ করেন। নিজ প্রতিভায় ইংরেজ কোম্পানির দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভালো চাকরি পান। ১৫ বছর বয়সে যশোর নরেন্দ্রপুর গ্রামের মেয়ে দিগম্বরীকে বিবাহ করেন। ১৮১৮ সালে ২৪ বছর বয়সে চব্বিশ পরগনার কালেক্টর অফিসের সেরেস্তাদার পদে নিযুক্ত হন। ১৮৩২ সালে কোম্পানির নেমক মহলের দেওয়ান হন। ১৮২৯ সালে আরো উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হন। এই বছরেই ১৭ আগস্ট স্বীয় চেষ্টায় ইউনিয়ন ব্যাংক স্থাপন করেন। দ্বারকানাথ উচ্চপদস্থ ইংরেজদের সাথে যেমন সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন, তেমনি এদেশীয় উচ্চ গন্যমান্য ব্যক্তিদের সাথেও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৮৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজা রামমোহনের সাথে মিলিতভাবে ৫৫ নম্বর চিৎপুর রোডে ব্রাহ্মণ সমাজের নিজস্ব বাড়ি স্থানান্তরিত করেন। ১৮৩৪ সালের ১ আগস্ট কোম্পানির চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরু করেন। অজিত কুমার চক্রবর্তীর বর্ণনায়- ‘তিনি ‘কার-ঠাকুর কোম্পানি’ নামক এক কোম্পানি খুলিলেন। কয়েকজন অংশীদার মিলিয়া ‘ইউনিয়ন ব্যাংক’ নামে এক ব্যাংকও গঠন করিলেন। শিলাইদহে নীলকুঠি, কুমারখালিতে রেশমের কুঠি, রাণীগঞ্জের সব কয়লাখনি এবং রাম নগরের সব চিনির কারখানা কিনিয়া তাহা যোগ্যতার সহিত চালাইয়া তখন হু-হু- করিয়া রাজশাহীতে, পাবনায়, রংপুরে, যশোহরে জমিদারি কিনিয়া তিনি বাঙ্গালাদেশের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ জমিদার হইয়া বসিলেন।’

১৮৩০ সালের মহা মন্দায় ইউরোপের ও বাংলার বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ধস নামলে তিনি এর বিপর্যয়ের শিকার হন। এমন পরিস্থিতিতে দ্বারকানাথ ঠাকুর তার প্রায় সমুদয় সম্পত্তি হারান। ফলে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাকে ঋণমুক্ত করেন তার পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সূর্যাস্ত আইনের অধীন রাজস্বঋণ পরিশোধের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে কিছু সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করেন। পরিবারকে ঋণমুক্ত করতে তার সারা জীবন কেটে যায় তার।

১৮৪০ সাল হতে ঠাকুর পরিবার জমিদারি, সরকারি চাকরি এবং সৃষ্টিশীল কাজে আত্মনিয়োগ করেন। দেবেন্দ্রনাথের পুত্র অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই- সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম ভারতীয় সিভিলিয়ান। তিনি ১৮৬৪ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য হন। ১৮৫৭ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার ভাই জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম ছাত্র। তিনি তত্ত্বাববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং হিন্দুমেলা সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যতীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একাধারে লেখক, শিল্পী, সুরকার, গীতিকার এবং নাট্য ব্যক্তিত্ব। তিনি অসংখ্য নাটক লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন এবং অনেকগুলোতে তিনি অভিনয় করেছেন। সব পরিচয়কে ছাপিয়ে মূলত একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে সমধিক পরিচিত। ১৯১৪ সালে লন্ডনে তার নির্বাচিত চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনী হয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, সুরকার, সম্পাদক ও চিত্রকর। তিনি ১৯০২-০৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দীর্ঘকাল আদি ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক (১৮৬৯-৮৮) এবং ব্রাহ্মধর্মবোধিনী সভার সম্পাদক ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষেরা রাজন্য আনুকূল্য পেয়ে এসেছেন। পরবর্তীতে তারা আধুনিক সভ্যতার সহযোগে নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই এশিয়া মহাদেশে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান এবং নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি বাংলা ভাষাকে বিশ্বে একটি সম্মানজনক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।


 

ko cuce /div>

দৈনিক নয়াদিগন্তের মাসিক প্রকাশনা

সম্পাদক: আলমগীর মহিউদ্দিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সালাহউদ্দিন বাবর
বার্তা সম্পাদক: মাসুমুর রহমান খলিলী


Email: online@dailynayadiganta.com

যোগাযোগ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।  ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Follow Us