রাজনৈতিক দলের হালচাল

Jul 29, 2019 02:38 pm
রাজনৈতিক দলের হালচাল

 

প্রতিটি রাজনৈতিক সংগঠন মুখে এবং তাদের দলিলপত্রে এ কথাই বলে যে, তাদের লক্ষ্য, ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সঙ্কট মোচন করে তাদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করবে। এমন সব দল আছে যারা নিজেরাই বিশ্বাস করে, যারা তাদের সংগঠনের শক্তি সামর্থ্য এতকম যে, কস্মিনকালেও তাদের পক্ষে এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়া অসম্ভব। তারপরও তারা জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে উচ্চকণ্ঠ। এর কারণ, প্রতিশ্রুতির বন্যায় মানুষকে না ভাসালে প্রচলিত রাজনীতি করা যায় না। তাই সবাই মনে করে, এসব যতটা না আন্তরিক তার চেয়ে বেশি ‘রাজনৈতিক’।

আর তা ছাড়া, রাজনীতি হয়ে উঠেছে অনেকের পেশা। এ কারণে অন্য আর দশটি পেশার মতোই নিজের ভূত-ভবিষ্যৎ ভেবে সমৃদ্ধির পথকে নিষ্কণ্টক করে তোলাই হচ্ছে রাজনীতি পেশাজীবীর লক্ষ্য। আগের মতো রাজনীতি এখন আর জনাশ্রয়ী নয়, এটা বর্তমানে আত্মাশ্রয়ী। অতীতে উন্নত আদর্শ ও উত্তম কর্মপন্থা নিয়ে রাজনীতির চর্চা করা হতো। এখন এর লক্ষ্য হচ্ছে নিছক ক্ষমতা লাভ আর আত্মপ্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক বড় বড় সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে, এমন মানসিকতা পোষণ করা। এই রাজনৈতিক দূষণ আসলে নৈতিক অবক্ষয়ের পরিচায়ক এবং তা থেকে বাঁচতে হলে এসবের ঊর্ধ্বে উঠতে হবেই।

এমন অবাঞ্ছিত মানসিকতার কারণে এসব নেতার সাহচর্য যারা পেয়ে থাকে, তারাও লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। আর এদের ভূমিকার কারণেই সমাজজীবন কলুষিত হয়ে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এসব কারণে আমাদের সমাজে রাজনীতির সাথে সাধারণ মানুষের সাধারণত সংশ্রব নেই। রাজনীতি যে সমাজকে কল্যাণকর কিছু দিতে পারে, সে বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এমন ধারণা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়।

রাজনীতির সঙ্কটের যে চিত্র নিয়ে কথা বলা হলো, এর প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতর নানাভাবে পড়েছে ও পড়ছে। বিশেষ করে সুনীতির বোধ বিবেচনা রাজনীতিতে আর নেই। দলগুলো যখন গণতন্ত্রের কথা বলে, তখন মনে হবে তারা ‘গণতন্ত্রগত’ প্রাণ। কিন্তু দলের ভেতরে ও বাইরে তাদের আচরণ একটা থেকে আরেকটা ভিন্ন। জাতীয় সাধারণ নির্বাচনগুলোর সময় তাদের প্রকৃত আচরণ লক্ষ করা যায়। তখন দেখা যায়, গণমানুষের ভোটাধিকারের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র আস্থা বা শ্রদ্ধা নেই। যেনতেন প্রকারে নিজেদের বিজয়ী করতে কোনো নীতিবোধের তোয়াক্কা করে না এসব দল।

গণতন্ত্রের যে চেতনার অর্থ, মানুষের পছন্দ-অপছন্দের প্রতি শ্রদ্ধা বিশ্বাস দেখানো, তার বিন্দুমাত্র অনুশীলন এ দেশে লক্ষ করা যায় না। এভাবে ‘বিজয়ী’ হওয়ার পর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তারা যে আচরণ করে থাকে, তাতে কর্তৃত্ববাদিতা ছাড়া আর কিছু তেমন থাকে না। আর এটি নতুন কিছু নয়, বহুকাল থেকে এমনই লক্ষ করা যাচ্ছে অন্তত আমাদের বাংলাদেশে। এতে যে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় বিধিবিধান লঙ্ঘিত হয় আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে চুরমার হয়; আর শুধু তা নিয়ে দেশেই নয়, দেশের বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, সেটা তোয়াক্কা করা হয় না।

একটি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যদি অগ্রগতি হতে থাকে, সেখানে বহির্বিশ্বে যদি রাজনীতিকদের কারণে দেশ ও জাতির সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু হতে পারে কি? মানুষ এমন আশাই করে যে, নেতাদের আচরণ হওয়া উচিত পরিশীলিত। অথচ আজকের দিনে এমন আশা করাটা যেন স্বপ্নবিলাস। রাজনৈতিক নেতাদের বিবেচ্য একটাই- তার এবং তার সহযোগীদের প্রভাব প্রতিপত্তি সহায় সম্পদের সুরক্ষার, তথা তাদের ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের জন্য নিবেদিত হয়ে থাকা। বাংলাদেশে এটা সবারই জানা যে, এখানে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেসুমার।

এর কারণ দল গঠন করতে বিশেষ কোনো যোগ্যতা ও জনসমর্থনের প্রয়োজন হয় না। আর দল কোন পথে চলবে এবং কী তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য- এসবের কোনো বালাই নেই। এমন ফ্রি স্টাইলে দল পরিচালনা করার কারণ এই নয় যে, দেশের মানুষের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি আছে। উদ্দেশ্য নিছক সমাজে একটু নাম কেনা, ‘কেউকেটা’ হওয়া। আর ভাগ্যক্রমে যদি বড় দলের সঙ্গী হয়ে তাদের জোটে যাওয়া যায়, তবে তো কথাই নেই। তখন বড় পরিসরে ‘নামডাক’ হয়ে যাবে। দেশের রাজনীতিতে দলটার কিছু দেয়ার থাক আর নাই থাক, তাতে কিছু যায় আসে না।

এমন সব অন্যায় প্রবণতা রাজনীতির প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। এটা হলো রাজনীতির এক সঙ্কট। আরো সমস্যা হচ্ছে, বড় দলগুলোর ‘ফেউ’দের নিয়ে। কথায় আছে ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়’। বড় দলে এই ফেউদের ‘মাস্তান’ও বলা যেতে পারে। পরজীবী এসব মাস্তানের রা শব্দ, হাহুঙ্কার, চলন-বলন ও তর্জনগর্জন সমাজজীবনকে তটস্থ করে রাখে। প্রতিপক্ষের ওপর আক্রোশ মেটানোর কাজে এদের হরহামেশা বড় দলগুলো ব্যবহার করে বলে তারা আশকারা পেয়ে যায়। দলের ছত্রছায়া থেকে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। শুধু এতটুকুই নয়, চাঁদা ও টেন্ডারবাজি করে অনৈতিক পন্থায় এরা প্রচুর অর্থবিত্তের অধিকারী হয়।

এ দেশে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তারের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে বটে, কিন্তু এসব ক্ষমতাসীনদের পেটোয়াদের ভূমিকা দুর্নীতির প্রসার ঘটানোর জন্য অনেকাংশে দায়ী। অবাক হওয়ার বিষয় হলো, দেশে দুর্নীতি নিরোধকারী সরকারি সংস্থা থাকা সত্ত্বেও এর পাশাপাশি রয়েছে দুর্নীতিবাজদের সদম্ভ পদচারণা। দুর্নীতি নিরোধকারী সংস্থার পক্ষে বলা হচ্ছে, ছোটখাটো দুর্নীতিবাজদের শিকড় উপড়ানো যতটা সহজ, বড় দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারে কাজটা ততই কঠিন। কারণ সম্ভবত এসব বাঘা দুর্নীতিবাজের পেছনে শক্তিশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়া রয়েছে। তাদের ‘গোড়ায় পানি ঢালে’ শক্তিধরেরা।

এদের হৃষ্টপুষ্ট করে রাখার আরো একটি প্রধান কারণ হচ্ছে- ক্ষমতায় রাজনীতিতে বহাল থাকতে এদের ‘সাহায্য’ বিশেষ প্রয়োজন। এ দেশের জাতীয় নির্বাচনগুলোর দিকে যদি তাকানো যায় তবে ক্ষমতাসীনদের জন্য এদের অপরিহার্যতা কত বড়, তা বোঝা যায়। বেশি দূরে নয়, গত বছর ডিসেম্বর মাসে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেখানে বিজয়ী হওয়ার জন্য কার্যত জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এসব পেটোয়ার কৌশলেও মদদে ভোট ব্যতীত দল বিশেষের বিজয় হয়েছে। যারা এমন নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে সাহায্য-সহযোগিতা করে, তাদের প্রয়োজন নীতিহীন রাজনৈতিক দলের কাছে কতটা জরুরি তা সহজেই বোঝা যায়। বাংলাদেশের রাজনীতি যে কী পরিমাণ পঙ্কিল হয়ে পড়েছে, এসব তার প্রমাণ মাত্র।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এখানে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেসুমার। কিন্তু যদি এ ব্যাপারে সঠিক মূল্যায়ন করা হয়, তবে এই সংখ্যা গোটাকতকে নেমে আসবে। আর যদি দলের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করা হয়, তবে এই সংখ্যা মাত্র গোটা চারেকে নেমে আসবে। বিশেষ করে সাংগঠনিক বিস্তর ও সক্ষমতা, নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হওয়া, জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলা, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করা- এসব কিছু ধরে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে হবে যে, দলের সংখ্যা চারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

আর বেশি দলের বিদ্যমান থাকাটা অধিকতর গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচায়ক, এটা মনে করা যায় না। আবার মাত্র কয়েকটি দলের অবস্থান মানে এমন নয় যে, এ দেশে গণতন্ত্রের ঘাটতি রয়েছে। প্রতিটি দলের স্বতন্ত্র মেজাজ, নীতি, আদর্শ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকতে হবে। আর এ থেকেই জনগণ যে সংগঠনের সাথে নিজের মত ও পথের সামঞ্জস্য পাবে, তাকেই গ্রহণ করবে। এটাকে গণতান্ত্রিক পছন্দ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। শুধু বাংলাদেশেই প্রকৃত দলের সংখ্যা কম, তা নয়। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতেও মূল স্রোতের দলের সংখ্যা খুব সীমিত। অথচ এ তিনটি দেশই গণতান্ত্রিক দিক থেকে আদর্শের অবস্থানে বিরাজ করছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূল স্রোতের যে চারটি রাজনৈতিক দলের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে ক্ষমতাসীন আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, প্রধানবিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও জনসমর্থনের বিচারেই এ দলগুলো এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারায় দলগুলো তাদের শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখে চলছে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও সামাজিক আন্দোলন সংগ্রামে তারা যথেষ্ট অবদান রেখেছে। এ কারণে দেশের মানুষের কাছে তারা সমাদৃত। তবে হালে এই চারটি দল নানা সঙ্কট মোকাবেলা করে চলছে।

বিশেষ করে ক্ষমতার বাইরে যে তিনটি দল রয়েছে, তাদের সমস্যার চরিত্র ভিন্ন এবং এ নিয়ে দলগুলো খারাপ সময় অতিবাহিত করছে। এই সমস্যা নানা কারণে, তা নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে।
আওয়ামী লীগের অন্যতম সমস্যা, ক্ষমতায় থাকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এ দল ক্ষমতায় থাকায় কর্মী-সমর্থকেরা মনে করেন যে, সব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাদের হাতেই। এই মানসিকতা থেকে এসব ব্যক্তি প্রশাসনের সর্বত্র হস্তক্ষেপ করছেন। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এখন দলীয় শাসনের আওতার মধ্যে। তাতে বিবেচ্য বিষয় আর সব মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ নয়, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অভিলাষের কাছে তা আত্মসমর্পণ করে আছে। তাতে বেশির ভাগ মানুষের কোনো হিত হোক আর না হোক, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকেরা সমাজের একটা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হিসেবে তৈরি হচ্ছেন।

ফলে ক্ষমতাসীনেরা এখন আর সর্বশ্রেণীর মানুষের দল বা সরকার হিসেবে পরিচিতি হারিয়ে ফেলছেন। দলের মানুষেরা নিছক নিজেদের স্বার্থে অন্ধ থাকায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বঞ্চনার শিকার যা মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। এমন স্বজনপ্রীতির ফলে আওয়ামী লীগ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আস্থা ও সমর্থন হারাচ্ছে। আর এ অবস্থায় মানুষের সমর্থন পাওয়ার আশা ছেড়ে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে উৎরে যাওয়ার জন্য অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। একাদশ সংসদের গত নির্বাচনে বিজয়ী হতে তারা কারসাজি করে তাদের ক্ষমতায় ফেরার বাঞ্ছনা পূরণ করেছে।

এজন্য যে দেশে গণতন্ত্রের বিনাশ ঘটছে, তার তোয়াক্কা করা হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুগপৎ বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হলেও তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এই কৌশলপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হয়েছে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের সব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছে। এমন একদলীয় সংসদের পক্ষে সরকারের জবাবদিহি নেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এ কারণে প্রশাসনের নির্বাহীরা লাগামহীন স্বাধীনতা পেয়ে গেছেন। এমন প্রশাসনিক অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি অতীতের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

এটা শাসক দলের জন্য অশনি সঙ্কেত। আওয়ামী লীগের আরেক সঙ্কট হচ্ছে, সহযোগী অঙ্গ সংগঠনগুলো। বিশেষ করে তাদের ছাত্র সংগঠনের ওপর মূল দলের দৃশ্যত নিয়ন্ত্রণ নেই। সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে তাদের জন্য সহানুভূতি নয়, ভীতি রয়েছে। তারা নীতি আদর্শের দ্বারা দলের সংহতি অটুট রাখতে সমর্থ না হয়ে নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষ-সঙ্ঘাতে লিপ্ত। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এবং তার বাইরের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হচ্ছে। তা ছাড়া, ক্ষমতাসীন দলের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গী এমন হওয়া উচিত যে, মানুষের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন এবং গণতান্ত্রিক আচরণ করা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে- এমনটি তারাও বাস্তবে করছে না। প্রতিপক্ষের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি নেই।

দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঐতিহ্যবাহী জননন্দিত রাজনৈতিক সংগঠন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সৃষ্ট এবং তার রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পতাকাবাহী এই বিএনপি। আওয়ামী লীগের মোকাবেলায় একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে দেশের মানুষের কাছে হাজির হয়েছিলেন শহীদ জিয়া। এই দর্শন অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে মানুষ গ্রহণ করে দলটিকে বৃহৎ দল হিসেবে স্বীকৃতি ও জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান বিএনপি দিয়েছে। দেশে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল বিএনপি।

এরপর বহুদল বিকশিত হয় এবং সংবাদপত্র সত্যিকার স্বাধীনতা পেয়েছিল বিএনপির শাসনামলেই। এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। বিএনপির শাসনামলে অধিকতর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা হিসেবে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এ ছাড়া নির্বাচনকে কলুষমুক্ত করার জন্য দলটি ক্ষমতায় থাকার সময় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিভিন্ন সময় কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি আন্দোলন করেছে। কিন্তু কখনো কোনো চাপ বা লোভের বশবর্তী হয়ে গণ-আন্দোলন থেকে পিছু হটে যায়নি।

এ দলটি এমন আপসহীন সাহসী পথ ধরে চলার দরুন তাদের নেতা-নেত্রীরা এখন হাজারো নির্যাতনে নিপতিত। দলের প্রধানসহ বহু নেতাকর্মী প্রতিহিংসামূলক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারা অন্তরালে রয়েছেন। তা ছাড়া নানা ‘গায়েবি’ মামলা এবং হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে আছে বিএনপি। রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালনার যে সাংবিধানিক অধিকার, তা থেকে তারা বঞ্চিত। গত সংসদ নির্বাচনে তারা অংশ নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, প্রশাসনের কূট ভূমিকার কারণে তাদের সেখান থেকে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছে।

এসব অঘটনের পর তাদের ওপর সৃষ্টি করা হয়েছে নানামুখী প্রচণ্ড চাপ। নির্বাচনে তারা যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিল, তা শুধু দল হিসেবে তাদের একক সঙ্কট ছিল না। বরং তা দেশের গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এর ফলে সাধারণ মানুষ ভোটব্যবস্থার প্রতি বিমুখ হয়ে পড়েছে। বড় দলগুলোর মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠন হচ্ছে জাতীয় পার্টি। সাবেক প্রধান সেনাপতি ও রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ এ দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং একচ্ছত্র নেতা ছিলেন। জাতীয় পার্টি এ পর্যন্ত নিজেদের স্বাধীন-স্বতন্ত্র নীতি গ্রহণ অবস্থান করতে সক্ষম হয়নি। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে এ দলের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করে নেয়া হয়।

ফলে তাদের নিজস্ব সত্তায় বিকাশ ঘটা সম্ভব হয়নি। আর জাতীয় পার্টি এখন পর্যন্ত দেশের একটি অঞ্চলের সংগঠন হিসেবেই গণ্য হয়ে আসছে। সারা দেশে দলটির কোনো শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো নেই। তা ছাড়া জাতীয় পার্টি যতটা অবস্থান তৈরি করেছে এটা আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরতার ফলেই হয়েছে, আর তাই দলটির ওপর আজকের ক্ষমতাসীনদের প্রভাব অনেক। আওয়ামী প্রভাব বলয়ে থেকে জাতীয় পার্টি এ যাবৎ বের হতে পারেনি, ভবিষ্যতেও তা সম্ভব হবে না। দলের প্রধান এরশাদ জীবিত থাকাকালে তার একক সিদ্ধান্তে সংগঠনটি চলেছে। এখন এরশাদবিহীন পার্টি গভীর সঙ্কটে পড়তে চলেছে। ইতোমধ্যে বেগম এরশাদের সাথে তার ভাই জি এম কাদেরের দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল শুরু হয়েছে। তাই জাতীয় পার্টির জন্য সামনের দিনগুলো কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ হতে পারে।

দেশের অপর বড় দল জামায়াতে ইসলামী। পাকিস্তান আমল থেকে এই দল সক্রিয়। কিন্তু এখন নানা সরকারি চাপে থাকায় দলটি তাদের স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে না। জামায়াত দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচন ও অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তারা অংশ নিয়ে আসছে। সুশৃঙ্খল ও ক্যাডারভিত্তিক এ দলের নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সঙ্কট বা অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যায় ভুগতে হয় না। রাষ্ট্রীয় পরিসরে জামায়াত যেমন পরীক্ষিত গণতান্ত্রিক শক্তি, তেমনি দলের নীতিনির্ধারণে এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে সব সময় গণতান্ত্রিক চেতনার আলোকে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। তাদের কঠোর নীতিনিষ্ঠার জন্যই কোনো সাংগঠনিক সঙ্কট সৃষ্টি হয় না। ইসলামী জীবনব্যবস্থা কায়েমের স্থায়ী লক্ষ্য ও নীতি নিয়ে জামায়াত আপসহীনভাবে চলছে। কিন্তু এখন সরকারি চাপে দলটির অবস্থা মোটেও ভালো নয়।

[email protected]