নজিরবিহীন নির্বাচনে অনিয়মের খনি

Aug 01, 2019 06:51 pm
নজিরবিহীন নির্বাচনে অনিয়মের খনি

 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই শতাধিক কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলছে। নির্বাচনের ছয় মাস পর কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি কলঙ্কজনক ঘটনা। নির্বাচনের ইতিহাসে এই কলঙ্ক দীর্ঘদিন থাকবে। বাংলাদেশে এ যাবৎকাল যত নির্বাচন হয়েছে তার কোনোটিতেই শতভাগ ভোট পড়ার নজির নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, প্রকাশিত ফল তাকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে।

আর স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকদের মতে, এ নির্বাচন অনিয়মের খনি। একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ নির্বাচনে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, যা কোনোক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। ৯৬ থেকে শতভাগ ভোট পড়েছে এক হাজার ৪১৮টি কেন্দ্রে। ভোটের জন্য নির্ধারিত সময়ে শতভাগ ভোটপড়া সম্ভব কি না সেই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।

গত ডিসেম্বরে এই জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়। আর নির্বাচন কমিশন চলতি মাসে প্রতিবেদন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসির তথ্যানুযায়ী ২০১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার এই ঘটনা আজো বিতর্কের জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। যখনই কোনো এলাকায় ভোট হচ্ছে তখনই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘটনা উদাহরণ হিসেবে আসছে। ফলে ইসির তথ্যই এখন ইসিকে বিব্রত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধানে অস্বাভাবিকতা রয়েছে। অনেক কেন্দ্রে অস্বাভাবিক হারে বাতিল ভোট পড়েছে। ব্যালট পেপারে ভোট নেয়া কেন্দ্রগুলোর তুলনায় ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা কেন্দ্রগুলোতে কম ভোট পড়েছে। মানুষের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এখন পুরোপুরি যদি ভেঙে যায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধিক হারে ভোট পড়াকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন। অনেকের মতে, নির্বাচনের দিনের ভোটের চিত্রের সাথে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়াও স্বাভাবিক ঘটনা নয়।


ইসির তথ্য ও সুজনের বিশ্লেষণ থেকে, সংসদীয় তিনশ’টি নির্বাচনী এলাকার ৪০ হাজার ১৫৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। আর ৯৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১২৭টি কেন্দ্রে, ৯৮ শতাংশ ভোট পড়েছে ২০৪ কেন্দ্রে, ৯৭ শতাংশ ভোট পড়েছে ৩৫৮ কেন্দ্রে এবং ৯৬ শতাংশ ভোট পড়েছে ৫১৬ ভোটকেন্দ্রে। অর্থাৎ ৯৬ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ ভোট পড়েছে এক হাজার ৪১৮টি ভোটকেন্দ্রে। তবে ৯০-৯৫ শতাংশ ভোট পড়েছে ৬ হাজার ৪৮৪টি কেন্দ্রে, ৮০-৮৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১৫ হাজার ৭১৯টি ভোটকেন্দ্রে এবং ৭০-৭৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ১০ হাজার ৭৩টি কেন্দ্রে। আসনভিত্তিক সর্বোচ্চ ৯৪.৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে গোপালগঞ্জ-১ আসনে। আর আসনভিত্তিক সবচেয়ে কম ৩৯.১৭ শতাংশ ভোট পড়েছে গাইবান্ধা-৩ আসনে।

শতভাগ ভোটপড়া কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে, রংপুর-৫ আসন। সর্বোচ্চ ৯টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ৮টি, চট্টগ্রাম-৮ ও রংপুর-২ আসনে ৭টি করে, লালমনিরহাট-৩ ও রংপুর-৬ আসনে ৬টি করে, চট্টগ্রাম-৫, কক্সবাজার-৩, ময়মনসিংহ-২, ময়মনসিংহ-১০, দিনাজপুর-১, গাইবান্ধা-৪, নওগাঁ-৩ ও সিলেট-৪ আসনে চারটি করে ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। দলভিত্তিকভাবে ২১৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮১টি (৮৪.৯৭ শতাংশ) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে বিজয়ী ৯০ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকাভুক্ত। এ ছাড়া ২১টি (৯.৮৫ শতাংশ) জাতীয় পার্টি থেকে বিজয়ী ১০ জন সংসদ সদস্যের, ৮টি (৩.৭৫ শতাংশ) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে বিজয়ী একজন সংসদ সদস্যের, ২টি (০.৯৩ শতাংশ) বিকল্প ধারা বাংলাদেশ থেকে বিজয়ী ১ জন সংসদ সদস্যের এবং ১টি (০.৪৬ শতাংশ) জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে বিজয়ী ১ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী আওতাভুক্ত।


ইসির তথ্যানুযায়ী, ওই নির্বাচনে ইভিএম কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৮৪৫টি। সেখানে গড় ভোট পড়েছে ৫১.৪২ শতাংশ। আর ব্যালেট পেপার কেন্দ্র সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ৩১০টি। এখানে গড় ভোট হার ৮০.৮০ শতাংশ। ব্যালট পেপার ও ইভিএমে ভোট প্রদানের মধ্যে ভোটের পার্থক্য ২৯.৩৮ শতাংশ। ৭৫টি নির্বাচনী এলাকার ৫৮৭টি ভোটকেন্দ্রের প্রদত্ত সব ভোট নৌকা প্রতীকে পড়েছে।

এ দিকে, ১৯৯১ সালের পর অনুষ্ঠিত ৬টি (ফেব্রুয়ারি ২০৯৬-এর নির্বাচন ছাড়া) নির্বাচনের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮৭.১৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বনি¤œ ৪০.০৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়, ভোটের জন্য নির্ধারিত সময়ে শতভাগ ভোটপড়া কি সম্ভব? যে সব সংসদ সদস্যের এলাকায় শতভাগ ভোট পড়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মন্ত্রিসভার সাবেক সদস্য আবুল হাসান মাহমুদ আলী, মো: নাসিম, নূরুল ইসলাম নাহিদ, মোধ শাহজাহান খান, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, মো: মোসলেম উদ্দিন, মো: ইমাজ উদ্দিন, এইচ এন আশিকুর রহমান, মো: মোতাহার হোসেন প্রমুখ, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য আসাদুজ্জামান খান কামাল, এ কে আব্দুল মোমেন, আ হ ম মুস্তফা কামাল, আ ক ম মোজাম্মেল হক, ডা: দীপু মনি, জনাব টিপু মুন্সী, মো: শাহরিয়ার আলম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ডা: মো: এনামুর রহমান, জাহিদ আহসান রাসেল, ইমরান আহমেদ, মো: মাহবুব আলী, মো: মুরাদ হাসান, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী প্রমুখ।

শতভাগ ভোট পড়ার বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাও একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন যে, শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের করার কিছু নেই। একই প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, যেহেতু শতভাগ ভোটের মধ্যে বাতিল ভোটও রয়েছে, তাই এটাকে শতভাগ ভোট পড়া বলা যাবে না।

নির্বাচনের অসঙ্গতির বিষয়ে তথ্য তুলে ধরে সুজন সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছিলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিঃসন্দেহে অনিয়মের খনি বলতে পারি। আমরা মনে করি, চরম অনিয়ম হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মানুষের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এখন পুরোপুরি যদি ভেঙে যায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। নির্বাচন ব্যবস্থা যদি ভেঙে যায়, অশান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার বদল হয়, তখন আমরা কেউ নিরাপদ থাকব কি না, এই প্রশ্ন রইল।
তিনি বলেন, ইভিএম ও ব্যালটে ভোট নেয়া আসনগুলোতে ভোটের শতকরা হারে কেন এত তফাত হলো? ইভিএম কেন্দ্রে কী রাতে ভোট কাটা সম্ভব হয়নি। কমিশনের পক্ষ থেকে এর একটি ব্যাখ্যা দেয়ার দাবি রইল।