মুস্তাফা জামান আব্বাসীর ভ্রমণ-ভাষ্য

Aug 17, 2019 04:57 pm
মুস্তাফা জামান আব্বাসীর ভ্রমণ-ভাষ্য

 

বাংলাদেশের সঙ্গীত ভুবনে ও আড্ডায় এক পরিচিত নাম মুস্তাফা জামান আব্বাসী (জন্ম : ৮ ডিসেম্বর ১৯৩৭, বলরামপুর, কুচবিহার)। কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের ছেলে এই আব্বাসী সৃজনশীলতার নানান মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। শিল্প ও সাহিত্য সাধনায় তার একাগ্রতার কথা আমরা নির্দ্বিধায় ও আনন্দসমেত পর্যবেক্ষণ করতে পারি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক (১৯৯৫) প্রাপ্তি তার শিল্প-সম্পৃক্তির অনন্য স্বীকৃতি। পারিবারিক শিল্প-সংস্কৃতির প্রবল আবহে তিনি শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন। লোক-সঙ্গীত আব্বাসীর প্রধান বিচরণ-ভূমি। এই শিল্পমাধ্যমে পারফর্ম করা, প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা এবং লেখালেখি তার প্রিয়-প্রসঙ্গ। মূলত তিনি ভালোবাসেন গান গাইতে, গানবিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা বা পরিচালনা করতে এবং বিশেষত গানকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে। তবে তিনি নিজের ভাবনার জগৎকে সম্প্রসারিত করেছেন বিচিত্রভাবে। আমাদের বর্তমান প্রসঙ্গ মোস্তফা জামান আব্বাসীর ভ্রমণবিষয়ক রচনা। এই আলাপী ও প্রাণময় মানুষটি ভ্রমণের সময় কিভাবে চোখ আর মনকে প্রসারিত রেখেছেন, তার চিন্তার ডালপালাগুলো তখন কিভাবে চারপাশে ছায়া ছড়িয়েছে, সেই দিকেই আমাদের অনুসন্ধানী দৃষ্টি আপাতত নিবদ্ধ রাখতে চাই। আর এভাবে একজন সঙ্গীত-সাধকের পর্যটন-প্রবণতার ভেতর দিয়ে হয়তো আমরা পেয়ে যেতে পারি ভিন্নতর কোনো ভ্রমণ-ভাষ্য।

জাপান : সূর্য উঠেছে যেখানে (অনন্যা, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০০৭; দ্বিতীয় মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর ২০০৮) মুস্তাফা জামানের একটি ভ্রমণ-ভাষ্য। আমাদের বর্তমান আলোচনা ও পরিভ্রমণ এই গ্রন্থটিকে ঘিরেই। জাপানে ভ্রমণের সময় তিনি সে দেশের মানুষের আচার-অভ্যাস ও প্রতিদিনের কার্যকলাপের দিকে চোখ রেখেছেন নিবিড়ভাবে। বর্ণনার দিক থেকে এই বিবরণ হয়ে উঠেছে মাঝে মধ্যে তুলনামূলক। বাংলাদেশের প্রকৃতি, তার শোভা আর লোকদের চাল-চলনের সাথে তিনি বিভিন্ন প্রসঙ্গে জাপানিদের জীবন ও প্রতিবেশকে মিলিয়ে দেখতে চেষ্টা করেছেন। এই ভ্রমণ-ভাষ্যে আছে জাপান দেশের নানান ইতিহাস-সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য তুুলে ধরার চেষ্টা। আছে লোক-বিশ্বাস এবং লোক-কাহিনীর কথাও। কাহিনী বয়নের ছলে তিনি জাপানিদের জীবনের বিরাট ক্যানভাস স্পর্শ করেছেন। যেমন তিনি জানাচ্ছেন পারিবারিক ও ব্যবহারিক জীবনে প্রচুর বাঁশ ব্যবহার করেন জাপানিরা। বাঁশের সাথে জাপানিদের জীবনের মিল খুঁজে পেয়েছেন লেখক আব্বাসী। এই বিষয়ে তিনি লিখেছেন-

জাপানিদের সাথে বাঁশের কী মিল? বাঁশ সহজেই নুয়ে যায়। চারদিকে হেলানো যায় একে, কিন্তু যখনই একে ছেড়ে দেয়া যায় আবার তার নিজের আসল আকারে প্রত্যাবর্তন করে এবং দীর্ঘ ও শক্ত হয়ে বাড়তে থাকে, সহজেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় সে। ঠিক জাপানিদের মতো। ধ্বংসের স্তূপ থেকে, যুদ্ধের থেকে বেরিয়ে এসে তারা শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালী জাতিতে পরিণত হয়েছে। যেহেতু জাপানি সভ্যতা এখনো চারদিকে ততটা পরিচিত নয়। তাই তাদের আমরা ‘তাকে’র মতো চোখে দেখছি বটে, কিন্তু ‘তাকে’র মতোই সঙ্ঘবদ্ধ তারা। (পৃষ্ঠা- ১৪)
জাপানিরা কোমল স্বভাবের। প্রকৃতি আর ফুলের রয়েছে সাথে তাদের আন্তরিক, অকৃত্রিম সম্পর্ক। জাপানিদের নরম মনের পরিচয় অন্বেষণে বেরিয়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসী ফুলের প্রতি তাদের অপরিসীম ভালোবাসার কথা তার পাঠককে জানাতে ভুল করেননি। প্রসঙ্গত তিনি বলেছেন-
জাপানিরা ফুল ভালোবাসে। যারা ফুল ভালোবাসে, মনও তাদের ফুলের মতোই।... জাপানের মতো এত ধরনের প্রভাত পুষ্প আমি আর দেখিনি। আমেরিকানরা বলেন, মর্নিং গ্লোরি অর্থাৎ প্রভাতের মহত্ব, জাপানিরা বলে প্রভাতের মুখ, চীন দেশের প্রভাতপুষ্প জাপানে আসে অনেক পরে। এদো যুগে জাপানিরা প্রভাত পুষ্পের প্রেমে পড়ে যায়। (পৃষ্ঠা- ২০)

প্রসঙ্গত, লেখক ‘আসাগাও : প্রভাতের ফুল’ শীর্ষক অধ্যায়ে কবি মাসাওকা মিশির একটি বিখ্যাত হাইকুর কথা স্মরণ করেছেন- ‘আসাগাও ইয়া/ইস কাকু উচিনি/শিওরেমিরি।’ (প্রভাতের ফুল/যখন আঁকছি আমি/ঝরে যায়।)

অতিথিপরায়ণ জাপানি, অনুষ্ঠান-উদযাপনের আনন্দে উদ্বেলিত জাপানি, যুদ্ধের প্রবল আঘাত কাটিয়ে জেগে-ওঠা জাপানির দেখা মিলবে আব্বাসীর এই বইতে। বিনয়ী মনের মমতাময় ছোটখাট মানুষদের মানসিক শক্তির উৎস ও প্রেরণা যে কী, তা সম্ভবত ভ্রমণশিল্পী আব্বাসী খুঁজে পেয়েছিলেন।

জাপান নিয়ে গ্রন্থ রচনার পরিকল্পনা আব্বাসীর ভাবনায় ঘুরপাক খাচ্ছিল প্রায় ৩২ বছর ধরেÑ এ কথা আমরা জানতে পারি তার জবানীতেই। ১৯৭৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সময়-পরিসরে মূলত তৈরি হচ্ছিল এই বইটির ক্যানভাস। এর মধ্যে অনেক চিন্তা ও বিষয়ের সমাবেশ ঘটেছে। একাধিকবার জাপানে ভ্রমণকালে তার মনে হয়েছে এই দেশটি যেন ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ক্রমে ক্রমে জেগে উঠেছে। উন্নতি দেখার পাশাপাশি লেখক অনুভব করেছেন জাপানিদের জীবনযাপনের শিল্পকলা। সে-অনুভবের কথা লিখেছেন ‘জীবন ঘিরে দু’টি বোধ’ শিরোনামে গ্রন্থটির ভূমিকায় : ‘তাদের জীবন ঘিরে আছে দু’টি বোধ, একটি হলো তাদের জীবনের গভীরে গ্রথিত সংরক্ষণ প্রবণতা, আরেকটি চির নতুনের প্রতি আকর্ষণ বা চির নতুনের অভিসার। আবার তিনি ‘শুভ নববর্ষ : ওশো গোৎসু’ শিরোনামের অন্য একটি অধ্যায়ে বলছেন-

জাপানিরা সত্যি সত্যি সব কিছু নতুনভাবে শুরু করার শপথ নেয়, পুরনো বিবাদ মিটিয়ে ফেলে, নতুন ডায়েরির পাতায় লেখে : নতুন করে জীবন শুরু হোক। আমাদের বর্ণাঢ্য, নববর্ষ উদযাপন সব দেশের মানুষকে একতাবদ্ধ করেছে, তাদের নতুন একটি বোধের জন্ম দিয়েছে, যে আমরা বাঙালি। এই ব্যাপারটি জাপানেও ঘটেছে। তবে তাদের উৎসবের আমেজ নিয়ে এসেছে : নতুন সংকল্প। এই খানটায় পিছিয়ে পড়লাম। নিজেদের জীবনে যে নতুনত্ব আনব তার, চাবিকাঠি তো : নিজের হাতে। কেউ তো এসে জীবনটাকে বদলে দেবে না। (পৃষ্ঠা- ১১)

প্রসঙ্গত, লেখক জাপানি শব্দকল্পের সাথে বাংলা শব্দকল্পের তুলনামূলক সম্পর্ক, উৎসব-পার্বনে বাঙালির মতো তাদের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, তাদের কোমল বাকভঙ্গি (যেমন : ‘ফুজি পাহাড়কে জাপানিরা আদর করে ডাকে ফুজিসান, অর্থ ফুজি সাহেব, যেন সে একটি মানুষ’, পৃষ্ঠা- ২৩), চীনা ভাষার সাথে জাপানি ভাষার সম্পর্ক, তাদের ছুটির দিন, সাহিত্য-সঙ্গীত-শিল্পকলা-সংস্কৃতি, লোক-কাহিনি, উৎসব-আনন্দ, ধর্মাচার ও সাধনা, বাণিজ্য ও রফতানি সামগ্রী, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা, খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি-সচেতনতা, পোশাক-পরিচ্ছদ, সভ্যতার সমুদয় চিহ্ন, সাংবাদিকতা ও মিডিয়া, মার্শাল আর্ট ও শরীরবিদ্যা, শিক্ষা-ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত রাষ্ট্রীয় অগ্রগতি, গ্রাম-দুর্গ-শহর, জাপানি লোক-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস এবং নানান আবিষ্কার ও উপহার সামগ্রী সম্বন্ধে পাঠককে বিপুল ধারণা দিয়েছেন। তিনি গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে আমাদেরকে কখনো নিয়ে যান ঐতিহ্যের উঠানে, কখনো-বা পরিবারের প্রতিদিনের কর্মসূচির সীমানার ভেতরে। যেন আমরা বাংলাদেশের জমিনে বসে অনুভব করছি সুদূর জাপানের সমুদয় আচার-ব্যবহারের সোনালি সব কথামালা।

জাপানিদের খাদ্যাভ্যাস সম্বন্ধে বর্তমান গ্রন্থে আব্বাসীর একটি বিবরণ এ রকম-
সুন্দরী জাপানি মেয়েরা কিমোনো পরে যখন সমুদ্র তলদেশের কাইসুর সাজি নিয়ে গ্রামের পথে, তখন সে দৃশ্য কারো ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। মনে হয় যেন জাপানের অষ্টম শতাব্দীর কাব্যিক সংগ্রহ মন-ইয়ো-সু’র তো একটি পাতা ছিঁড়ে দেখাচ্ছে কেউ। জাপানিরা ভালোবাসে লতাপাতা খেতে। যা কিছু সবুজ, যা কিছু সবজি, তাই তাদের খাদ্য। কাঁচা হোক, আধা সেদ্ধ হোক, হোক রান্না করা। আর ভালে লাগে কাইসু, সমুদ্রের তলদেশে যে আগাছা গুল্মলতা জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য তা দিয়ে তৈরি হয় তাদের মিসো সুপ, তাদের নোরি, তেনগুসা, হাইজিকি, কনচু, আরো অসংখ্য খাবার। (পৃষ্ঠা- ৪৫)

শিক্ষা-পরিকল্পনা যে একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার বড় প্রেরণা, তা জাপানিরা জানে। বড় হওয়ার স্বপ্ন যে ছোটবেলায় দেখতে হয়, তার বিরাট উদাহরণ জাপানের প্রাথমিক পর্যায়ের সিলেবাস ও কারিকুলাম। জাপানিদের শিক্ষা-ব্যবস্থা সম্পর্কে, বিশেষত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ-পরিকল্পনা ও প্রেজেন্টেশন বিষয়ে মুস্তফা জামান আব্বাসীর একটি বিবরণ দেখে নিতে পারি-

জাপানি শিক্ষা ব্যবস্থায় গত কয়েক দশক থেকে, বিশেষ করে আশির দশক থেকে যা চোখে পড়ার মতো তা হলো প্রাইমারি স্কুলপর্যায়ে থেকে প্রতিদিন বালক বালিকার মস্তিকের কোটরে এই কথাটি পরিষ্কার করে বসিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে যে তারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেকনিক্যাল বা কারিগরি জ্ঞান ধারণ করার ক্ষমতার অধিকারী।... একটি জাপানি শিশুর টেবিলে শুধু বই নেই, আছে সে দেশের তাবৎ অডিও ভিজুয়েল উপকরণ যা থেকে একটি শিশু সমগ্র পৃথিবীকে তার ক্লাসরুম থেকেই অবলোকন করার সুযোগ পাচ্ছে।... জাপানি শিশুরা ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শিখছে যে সোনি ওয়াকম্যান মোবাইল ফোনের বংশধরেরা যেতে যেতে একলা পথে কিভাবে পৃথিবীর কাজে লাগতে পারে। (পৃষ্ঠা- ৫৮)

গ্রন্থটির প্রধান দুর্বলতা হলো ভাষার প্রয়োগ। এখানে বাক্য গঠনে যথেষ্ট সতর্কতা পরিলক্ষিত হয়নি। প্রমিত বানান প্রয়োগের দিকেও খুব একটা নজর দেয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। আর বিরামচিহ্নের যথার্থ প্রয়োগের ছোঁয়া লাগেনি এখানে, অনেক ক্ষেত্রেই। অবশ্য প্রকাশনার ক্ষেত্রে ভাষা-সম্পাদনা আমাদের দেশে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেনি। অনেক লেখক কিংবা প্রকাশকের কাছেও এই প্রসঙ্গটি তার তাৎপর্য নিয়ে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। তবে আমার মনে হয়, প্রকাশকের একটি অন্যতম দায়িত্ব হলো পান্ডুলিপির ভাষা-সম্পাদনা। ওইটুকুু পেশাদারিত্বের স্পর্শ পেলে জাপান : সূর্য উঠেছে যেখানে গ্রন্থটি আরো সুখপাঠ্য হয়ে উঠতে পারত। এর সৌন্দর্য আরো সম্প্রসারিত হতো।
ভ্রমণ যে জ্ঞান অর্জনের একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ মাধ্যম, তার সবটুকু অনুভব আমরা পেতে পারি মুস্তাফা জামান আব্বাসীর ভ্রমণ-ভাষ্য জাপান : সূর্য উঠেছে যেখানে বইটি পড়ে। দেখার সাথে জানার যে সম্পর্ক, জানার মধ্যে যে বিপুল আনন্দের সমাহার, সে-উপলব্ধির একেবারে গভীরে পাঠককে নিয়ে গেছেন বইটির লেখক- এ সত্যটুকু স্বীকার না করে পারা যায় না।