১২ পরামর্শে কোমর ব্যথা সারবে সহজেই

Sep 03, 2019 01:16 pm
১২ পরামর্শে কোমর ব্যথা সারবে সহজেই

 

নারী-পুরুষ সবাই কোমর ব্যথায় ভোগেন। এজন্য পেইনকিলার বা ব্যথানাশক বড়ি খেয়েও লাভ হয় না। বিশেষজ্ঞরা এ জন্য ১২টি পরামর্শ দিয়েছেন।

১) ভারী কোনো জিনিস নিচ থেকে ওপরে তোলার সময় সামনে না ঝুঁকে হাঁটু ভাঁজ করে বসে তুলুন। তবে কোনো ভারোত্তোলন না করাই শ্রেয়।
২) শরীরের ওজন বাড়াবেন না। অর্থাৎ এমন খাবার খাবেন না, যাতে শরীরের ওজন বাড়ে।
৩) নরম বিছানায় না শুয়ে শক্ত শয্যায় শোবেন। ফোম বা গদিযুক্ত বিছানা ছাড়ুন।
৪) নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করুন। হালকা ব্যায়াম করুন।
৫) সংসারের কাজ- ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, মসলা বাটা, ঝাড়ু দেয়া ইত্যাদি কাজের সময় কোমর সোজা রাখুন।

৬) উপুড় হয়ে শোবেন না। শোয়া থেকে ওঠার সময় চিত হয়ে শুয়ে পা দুটো সোজা রেখে কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে উঠুন।
৭) আধা ঘণ্টার বেশি দাঁড়িয়ে থাকবেন না। উঁচু গোড়ালির স্যান্ডেল বা জুতো পরবেন না। সামনে ঝুঁকে কোনো কাজ করবেন না।
৮) ঘাড়ে বা পিঠে কোনো ভারী কিছু বহন করবেন না।
৯) রাতে শোয়ার সময় গরম পানির ব্যাগ বা হট ওয়াটার ব্যাগের শেক নিন কমপক্ষে আধা ঘণ্টা।

১০) সামর্থ্য থাকলে ফিজিওথেরাপি নিন। শিগগিরই সুস্থ হতে পারেন।
১১) সাবধান কোমর ব্যথার জন্য ঘন ঘন ব্যথানাশক বড়ি খাবেন না। এটা এক প্রকার বিষ, যা আপনার কিডনি নষ্ট করে দিতে পারে।
১২) সরিষার তেলে কয়েক কোয়া রসুন ছেঁচে দিয়ে গরম করে মালিশ করলেও উপকার পাবেন।


হাঁটুর ব্যথায় লেজার চিকিৎসা

ডা: মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী

হাঁটুর ব্যথা একটি সার্বজনীন রোগ। বেশির ভাগ মানুষই কোনো-না-কোনো বয়সে হাঁটুর ব্যথায় ভোগেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, একে বলা হয় অস্টিও-আর্থ্রাইটিস। হাত, পা ও মেরুদণ্ডের ওজন বহনকারী যেকোনো জোড়াই অস্টিও-আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হতে পারে। তবে মানবদেহের ওজন বহনকারী গুরুত্বপূর্ণ জোড়া বা জয়েন্ট হওয়ায় হাঁটুতে অস্টিও-আর্থ্রাইটিস আক্রান্ত ঝুঁকি ও প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। হাঁটুর জোড়া ফুলে গিয়ে পুঁজ বা তরল পদার্থ জমা হওয়ার প্রধান কারণ অস্টিও-আর্থ্রাইটিস।

মানবদেহের অস্থিসন্ধি বা জোড়ার তরুণাস্থির নিচে হাড়ের ক্ষয়জনিত পরিবর্তন কিংবা মেকানিক্যাল অস্বাভাবিকতা সাধারণত অস্টিও-আর্থ্রাইটিস হিসেবে পরিচিত। একে ক্ষয়জনিত বাত বা ক্ষয়জনিত জোড়ার রোগও বলা হয়।

হাঁটুর ব্যথার লক্ষণ ও কারণ : হাঁটুর হাড়ের জোড়ায় ব্যথা, স্পর্শকাতরতা, শক্ত হয়ে যাওয়া, অনড় অবস্থা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফুলে গিয়ে তরল পদার্থ জমা হওয়া অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ। এ রোগে আক্রান্ত হলে জোড়ার তরুণাস্থি হাড়ের ওপরের অংশকে সঠিকভাবে সুরক্ষা দিতে পারে না। এতে হাড় অনাবৃত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাড়ের উপরিভাগের পিচ্ছিল তরুণাস্থির ক্ষয় হয়ে যায় এবং লিগামেন্ট আলগা বা শিথিল হয়ে পড়ে। রোগী চলাচল ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, এমনকি নড়াচড়া করতেও কষ্ট অনুভব করে।

রোগী সাধারণত অবিরাম অসহনীয় ব্যথা বা হাড়ের সাথে সংশ্লিষ্ট মাংসপেশি এবং লিগামেন্ট বা রগে (হাড় ও মাংসের সাথে সংযুক্ত তন্তু) জ্বালাপোড়া অনুভব করে। আক্রান্ত জোড়া নড়াচড়া করলে বা স্পর্শ করলে ‘ক্র্যাক’ (ক্রেপিটাস) শব্দ হতে পারে। এ অবস্থায় রোগী মাংসপেশির খিঁচুনি ও রগের সঙ্কোচন অনুভব করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোড়ার ভেতরে পুঁজ-জাতীয় তরল পদার্থ জমা হতে পারে। রোগ বেড়ে গেলে আক্রান্ত হাড় ফুলে ওঠে, অচল ও ব্যথাময় হয়ে ওঠে।

হাড়ের জোড়ার নিজস্ব মেরামত ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং মেকানিক্যাল চাপকে অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের প্রধান কারণ বলে বিবেচনা করা হয়। এসব চাপের উৎসের মধ্যে রয়েছে জন্মগত বা রোগের কারণে হাড়ের বিন্যাসে ত্রুটি, আঘাত, অতিরিক্ত ওজন, জোড়ার সাপোর্টিং মাংসপেশির শক্তি ক্ষয় এবং সংযুক্ত স্নায়ু বা নার্ভ দুর্বল হয়ে যাওয়া। প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই বংশগত কারণকে এ রোগের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অতিরিক্ত ওজনের (স্থূলতা) সাথে হাঁটুর অস্টিও-আর্থ্রাইটিস বৃদ্ধির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেক্স হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও অস্টিও-আর্থ্রাইটিসে আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে চল্লিশোর্ধ্ব মহিলাদের ঋতুচক্র বন্ধ হওয়া (মেনোপজ) বা সার্জারি করে জরায়ু ফেলে দেয়ার পর একই বয়সী পুরুষের তুলনায় এ রোগে আক্রান্তের প্রবণতা অনেক বেশি।

অস্টিও-আর্থ্রাইটিস যেভাবে হাঁটুর ক্ষতি করে : অস্টিও-আর্থ্রাইটিস হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ হলেও এটি তরুণাস্থির অত্যধিক ক্ষতি করতে পারে। এ রোগের ফলে জোড়ার অন্যান্য টিস্যুর গঠন ভেঙে যেতে পারে। আক্রান্তের প্রথমপর্যায়ে হাড়ের জোড়ায় সুক্ষ্ম জৈব রাসায়নিক (বায়োকেমিক্যাল) পরিবর্তন ঘটতে পারে।

মানবদেহের সুস্থ তরুণাস্থি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঙ্কুচিত হয়ে ভেতর থেকে পানি বের করে দেয় এবং পুনরায় ফুলে ওঠে ভেতরে পানি প্রবেশ করায়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তরুণাস্থির ভেতরের পানির অংশ সামঞ্জস্যপূর্ণ (ব্যালান্স) থাকে। এ ক্ষেত্রে কোলাজেন ফাইবার সঙ্কুচিত হওয়ার শক্তি জোগায়। কিন্তু অস্টিও-আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হলে কোলাজেন মেট্রিক্স অসংগঠিত হয়ে পড়ে এবং তরুণাস্থির মধ্যে প্রোটিওগ্লাইকেনের উপাদান কমে যায়। এতে কোলাজেন ফাইবার ভেঙে যাওয়ার ফলে পানির উপাদান বেড়ে যায়। প্রোটিওগ্লাইকে নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত কোলাজেন কমে পানির উপাদান বাড়তে থাকে।

প্রোটিওগ্লাইকেনের প্রতিরোধপ্রক্রিয়া না থাকলে তরুণাস্থির কোলাজেন ফাইবার আশঙ্কাজনকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং নিঃশেষ প্রক্রিয়া আরো বাড়তে থাকে। এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হলেও পাশর্^বর্তী জোড়ায়ও প্রদাহ হতে পারে। এতে হাঁটুর তরুণাস্থি ভেঙে পড়া বা আক্রান্ত উপাদানগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং জোড়ার আবরণের সেল এগুলোকে বাইরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে। এতে জোড়ার শেষ প্রান্তে স্পার্স বা অস্টিওফাইটিস নামে নতুন হাড় গজিয়ে ওঠে। হাড়ের এই পরিবর্তন ও প্রদাহের কারণে আক্রান্ত স্থানে ব্যথার সৃষ্টি হয় এবং নিস্তেজ করে ফেলে।

রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা : রোগের ইতিহাস ও ডাক্তারি পরীক্ষার পর প্রয়োজনে এক্স-রের মাধ্যমে রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। জোড়ার স্থানের আকার ও আয়তন পরিবর্তন, জোড়ার পিচ্ছিল তরুণাস্থির নিচের হাড় শক্ত হয়ে যাওয়া তরুণাস্থির নিচে গর্ত তৈরি হওয়া এবং নতুন হাড় গজানোসহ সাধারণ পরিবর্তনগুলো এক্স-রের মাধ্যমে ধরা পড়ে।

হাঁটুর ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা : সাধারণত ব্যায়াম, জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও ব্যথানাশক ওষুধের সমন্বয়ে অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা করা হয়। এরপরও ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠলে এবং শারীরিক অক্ষমতা বা পঙ্গুত্বের পর্যায়ে চলে গেলে অপারেশনের মাধ্যমে জোড়া পুনঃস্থাপন করে রোগীর জীবনযাত্রা উন্নত করা হয়।

অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের আধুনিক চিকিৎসা : অস্টিও-আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ও ক্ষতি ফেরাতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার মাইক্রো ফ্র্যাকচার পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ কাটাছেঁড়া ও রক্তপাতহীন লেজাররশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে আক্রান্ত হাড় ও তরুণাস্থিতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিক্ষুদ্র ছিদ্র করা হয়।

ন্যানো-ফ্র্যাকচার পদ্ধতিতে লেজাররশ্মির মাধ্যমে হাড়ের জোড়ার উপরিভাগে (সারফেস) অস্টিও-আর্থ্রাইটিস আক্রান্ত খোলা অংশে লেজার বিম দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিক্ষুদ্র ছিদ্র করা হয়। এই ছিদ্রের মাধ্যমে অস্থি ও তরুণাস্থির সংযুক্ত নিচের হাড়ে রক্ত সঞ্চালন এবং নতুন বোন মেরু কোষের উপস্থিতি বাড়িয়ে দেয়। সঞ্চালিত রক্ত ও বোন মেরু কোষ হাড়ে নতুন তরুণাস্থি তৈরি করে। উল্লেখ্য, বোন মেরু থেকে উৎপন্ন মেসেনচাইমাল স্টেম ঘনীভূত করে প্রয়োগে আক্রান্ত জোড়ার হাড় পূর্বাস্থায় ফিরে আসে এবং পিআরপি ঘনীভূত প্রয়োগের মাধ্যমে জোড়ার চারপাশের নরম টিস্যু ও লিগামেন্টগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

এই পদ্ধতিতে আর্থোস্কোপ নামক যন্ত্রের মাধ্যমে হাড় ও জোড়ার অংশগুলো নিরীক্ষণ করে লেজার রশ্মি প্রয়োগ করা হয়। এই চিকিৎসায় যে ধরনের বা যে মাত্রার লেজার রশ্মি ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাতে কোনো রকম পাশ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকে না বললেই চলে। উন্নত বিশ্বে এই পদ্ধতির চিকিৎসার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ব্যাপক। বাংলাদেশেও ইনস্টিটিউট অব লেজার সার্জারি অ্যান্ড হসপিটালে অত্যন্ত সফলভাবে লেজার রশ্মির মাধ্যমে অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা করা হচ্ছে।

লেজার সার্জারি বিশেষজ্ঞ
পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব লেজার সার্জারি অ্যান্ড হসপিটাল, ঢাকা।