আর্থ্রাইটিস বা বাতরোগ : যেভাবে হতে পারে চিকিৎসা

Nov 12, 2019 04:26 pm
আর্থ্রাইটিস বা বাতরোগ : যেভাবে হতে পারে চিকিৎসা

 

অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের আরেক নাম অর্থোপেডিক সার্জন। যিনি একজন যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসক এবং যিনি অস্থি ও অস্থিরোগ, বিকলাঙ্গতা ও হাড়ভাঙা রোগের এবং অস্টিও আর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সব ধরনের সমস্যার শল্যচিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। রিউমাটোলজিস্ট কিংবা ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা সার্জারি করতে পারেন না, কিন্তু অর্থোপেডিক সার্জনদের একটি বড় সময় কাটে অপারেশন থিয়েটারে। লিখেছেন ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

 

আর্থ্রাইটিস রোগের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে যেমন-
* ওষুধপত্র
* ব্যায়াম
* অকুপেশনাল থেরাপি
* মানসিক পরামর্শ
* সার্জারি
প্রকৃতপক্ষে নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসায় আর্থ্রাইটিস সম্পূর্ণ সারে না, বিশেষ করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কিংবা অস্টিও আর্থ্রাইটিস। ইনফেকশন আর্থ্রাইটিস ভিন্ন কথা। এটি অ্যান্টিবায়োটিকে ভালো সাড়া দেয়। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে আর্থ্রাইটিস যদি না-ই সারে তাহলে আপনি শুধু শুধু চিকিৎসা করাতে যাবেন কেন।

সত্যি বলতে কী, মেডিক্যাল চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথামুক্ত থাকা যায় ও প্রদাহ কমানো যায়। এ রোগের অগ্রসরণ মন্থর করে দেয়া যায় এবং অস্থিসন্ধিকে স্থায়ী ক্ষতিগ্রস্তের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। প্রয়োজনে সার্জারির মাধ্যমে অস্থিসন্ধির কাজকর্মের উন্নতি ঘটানো যায় এবং সারাজীবন রোগীকে ও রোগীর অস্থিসন্ধিগুলোকে সচল রাখা যায়।
একজন রোগীর জন্য কোনো একক চিকিৎসা নেই। বেশির ভাগ রোগীর সমন্বিত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দেখা গেছে, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন, ব্যায়াম ও ভিটামিন-ই ভালো কাজ করে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গোল্ড সল্ট, হটবাথ ও মাছের তেল ভালো কাজ করে। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে কোনো ওষুধই কাজ করে না।

অস্থিসন্ধি বা মাংসপেশির ব্যথার ক্ষেত্রে কখন ডাক্তার দেখাবেন
যদি আপনার ব্যথা তীব্র না হয় এবং তা কয়েক দিনের বেশি না থাকে তাহলে আপনার আর্থ্রাইটিস হওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু যদি আপনার ব্যথা কয়েক দিনের চেয়ে বেশি থাকে, কয়েক সপ্তাহ পর আবার দেখা দেয় কিংবা ব্যথা এত তীব্র হয় যে তা আপনার স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়- তাহলে বুঝতে হবে চিকিৎসক দেখানোর সময় হয়েছে। এক বা একাধিক অস্থিসন্ধিতে ফোলা থাকলে বুঝতে হবে সেখানে কোনো সমস্যা আছে। একইভাবে শরীরের দু’পাশের অস্থিসন্ধিগুলোতে একই সময়ে ব্যথা হলে কিংবা অস্থিসন্ধির ব্যথার সাথে অবসন্নতা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

যদি প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধগুলো যেমন- অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রফেন খেয়ে আপনার অস্থিসন্ধির ব্যথা কমে যায় তাহলে আত্মতুষ্টিতে ভুগবেন না। যদি আপনি নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ খান এবং ওষুধ বন্ধ করলে আবার ব্যথা ফিরে আসে, তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে ভুল করবেন না।
দেরি করে চিকিৎসা করালে কি পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন?
হ্যাঁ, দেরি করে চিকিৎসা করালে আপনি পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন। যদি আপনার সেপটিক আর্থ্রাইটিস হয় তাহলে মারাত্মক ক্ষতি এড়াতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অস্থিসন্ধির ইনফেকশনের চিকিৎসা করতে হবে। সংক্রমিত অস্থিসন্ধি লাল হয় ও ফুলে যায় এবং এটার তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রেও যদি চিকিৎসা নিতে দেরি করেন তাহলে আপনি পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন। বর্তমানে বেশির ভাগ চিকিৎসক মনে করেন, যদি আপনি রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা নিতে দেরি করেন তাহলে আপনার অস্থিসন্ধিতে স্থায়ী বিকলাঙ্গতা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে এটা জানা গেছে যে, অস্থিসন্ধির স্থায়ী ক্ষতি বেশ আগেই ঘটে- কখনো কখনো উপসর্গ দেখা দেয়ার কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে। বিস্তৃত সাইনোভিয়াল টিস্যু অস্থিসন্ধির মধ্যে কার্টিলেজকে আক্রমণ করে, এর ফলে কার্টিলেজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। একবার এই ক্ষতিসাধন হলে তা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।

এ জন্য বর্তমানে অনেক চিকিৎসক বিশ্বাস করেন, রোগের শুরুতেই চিকিৎসা করানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে রোগীকে পরবর্তীকালে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় না।

আর অস্টিও আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে
স্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই যে প্রাথমিক চিকিৎসা করালে অস্টিও আর্থ্রাইটিস ভালো হবে, কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা করালে যে লাভ হয় তা হলো আপনি আপনার অসুস্থ অস্থিসন্ধিকে রক্ষা করার জন্য এবং তাকে দীর্ঘ জীবন দানের জন্য কিছু শিখতে পারেন। সিঁড়ি দিয়ে নিয়মিত দৌড়ে ওঠানামা করলে আপনার ব্যথা চলে যাবে এবং আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন- এমন উদ্ভট চিন্তা কখনোই মাথায় আনবেন না। এতে আপনার আরো ক্ষতি হবে এবং অস্থিসন্ধিতে স্থায়ী বিকলাঙ্গতা ঘটতে পারে। তার মানে অস্থিসন্ধিতে যে ধরনের সমস্যাই হোক না কেন, দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসক দেখানো উত্তম।

কোন চিকিৎসক দেখাবেন?
আপনি প্রথমে আপনার জেনারেল প্রাকটিশনারকে দেখাবেন। তিনি আপনাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার ব্যাপারে অভিজ্ঞ। তিনিই ঠিক করবেন আপনাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে কি না। তিনি যদি দেখেন আপনার অসুস্থতা অনেক বেশি, তাহলে তিনি আপনাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠাবেন। অবশ্য অনেক চিকিৎসক চালাকি করে রোগীকে নিজেদের কাছেই রাখতে চান, রোগীর রোগের ইতিহাস ভালো করে শোনেনও না। আরো দেখা গেছে, কিছু জেনারেল প্রাকটিশনার রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ঠিকমতো নির্ণয় করতে পারেন না।

আপনি যখনই অস্থিসন্ধিতে কোনো সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাবেন, তার দায়িত্ব হলো আপনার কাছ থেকে সমস্যার বর্ণনা ভালো করে শোনা। আপনার অস্থিসন্ধি সতর্কতার সাথে ভালো করে পরীক্ষা করা এবং কিছু পরীক্ষা আগেভাগে করিয়ে ফেলা।
আপনার চিকিৎসক অবশ্যই আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করবেন, যদি তিনি দেখেন যে আপনার অসুস্থতা মারাত্মক, যা তিনি নিরূপণ করতে ও চিকিৎসা দিতে পারছেন না। আপনার জেনারেল প্রাকটিশনার আপনার রোগ নিরূপণের ব্যাপারে সন্দিহান হলেও অবশ্যই আপনাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করবেন।
যদি আপনার জেনারেল প্রাকটিশনার আপনাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার না করেন, তাহলে আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাকে দেখাবেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনি এক অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ দেখাবেন।

অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ কী চিকিৎসা দেবেন
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের আরেক নাম অর্থোপেডিক সার্জন- যিনি একজন যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসক এবং যিনি অস্থি ও অস্থিরোগ, বিকলাঙ্গতা ও হাড়ভাঙা রোগের এবং অস্টিও আর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সব ধরনের সমস্যার শল্যচিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। রিউমাটোলজিস্ট কিংবা ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা সার্জারি করতে পারেন না, কিন্তু অর্থোপেডিক সার্জনদের একটি বড় সময় কাটে অপারেশন থিয়েটারে। বিশেষ করে একজন অর্থোপেডিক সার্জন ভাঙা হাড়কে জোড়া দেন, কার্টিলেজ ছিঁড়ে গেলে তা জোড়া লাগান, মাংসপেশি ছিঁড়ে গেলে ঠিক করে দেন, টেনডন বা লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে তা মেরামত করেন এবং কিছু অস্থিসন্ধি সম্পৃক্ত নার্ভের সমস্যা হলে তার চিকিৎসা করেন।

তার মানে অনেকে ভাবতে পারেন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেই আপনাকে অপারেশনের টেবিলে শুতে হবে। কিন্তু বাস্তবিক তা নয়। অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞরা অপারেশনের চেয়েও বেশি কিছু করেন। যদি অস্থিসন্ধিতে সার্জারি করতে হয় তাহলে তারাই হলেন এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। আর কোনো দ্বিতীয় মতামতের সুযোগ নেই।
কিছু অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ আর্থ্রাইটিসের রোগীদের বিশেষ করে অস্টিও আর্থ্রাইটিসের রোগীদের নন-সার্জিক্যাল মেথডে চিকিৎসা করেন। অর্থাৎ কোনো অপারেশন নয়, শুধু ওষুধ ও ব্যায়াম। তবে দেখা গেছে, অর্থোপেডিক সার্জনদের কাছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আর্থ্রাইটিসের রোগী আসেন আগে রিউমাটোলজিস্টকে দেখিয়ে। রিউমাটোলজিস্ট সর্বদা অপারেশন ছাড়া চিকিৎসা করতে বেশি পছন্দ করেন, কিন্তু ওষুধ ও ব্যায়ামে কাজ না হলে অবশ্যই রোগীকে অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে পাঠাতে হবে।

আপনি কীভাবে একজন অর্থোপেডিক সার্জন খুঁজে বের করবেন
আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে না। যদি আপনার চিকিৎসক মনে করেন যে আপনাকে অর্থোপেডিক সার্জন দেখানো প্রয়োজন তাহলে তিনিই আপনাকে যোগ্য অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে রেফার করবেন।

যদি আপনি এবং আপনার চিকিৎসক দু’জনেই সিদ্ধান্ত নেন যে আপনার অস্থিসন্ধিতে সার্জারি করা প্রয়োজন তাহলে আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই একজন অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে রেফারও হয়ে যাবেন। তবে যখন আপনি অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে যাবেন, অবশ্যই জেনে নেবেন তিনি আপনার রোগের কী ধরনের চিকিৎসা করবেন। আপনার কি স¤পূর্ণ অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন (টোটাল জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট) লাগবে, নাকি শুধু এবড়ো-থেবড়ো কার্টিলেজগুলো কেটে ফেললেই হবে? জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট এখন একটি বড় ব্যবসা, যাকে এখন আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত করা হয়। আপনি নিশ্চিত হয়ে নেবেন, তিনি এ ধরনের অপারেশন কতটা করেছেন এবং সফল হয়েছেন কতটুকু। তবে বেশির ভাগ অর্থোপেডিক সার্জন এ ধরনের অপারেশন অনেক করে থাকেন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।

চেম্বার-১ : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা। ফোন: ০৯৬১৩৭৮৭৮০২
চেম্বার-২ : আজগর আলী হসপিটাল, ১১১/১/এ ডিস্টিলারি রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।
ফোন : ০১৭৮৭৬৮৩৩৩৩, ১০৬০২