মমতার কৌশলে বিপকে বিজেপি!

Nov 26, 2019 08:20 am
মমতা ব্যানার্জি ও অমিত শাহ

 

মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে যেসব স্থানে উদ্বাস্তুরা বসবাস করছে, সেখানকার সব ভূমির আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মমতা উদ্বাস্তুদের ‘না ঘরকা না ঘাট কা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বসবাস শুরু করার পর থেকে তাদের কোনো ভূমির নথিপত্র নেই।

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়ন এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস করার উদ্যোগের জবাব হিসেবে মমতা ব্যানার্জি ও তৃণমূল কংগ্রেস এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে যাওয়া হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, শিখ, পারসি ও খ্রিস্টানদেরকে বিশেষ সুবিধায় নাগরিকত্ব প্রদান করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে তা রাজ্যের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। উল্লেখ্য, আগামী বছর রাজ্যটিতে পৌরসভার নির্বাচন ও ২০২১ সালে রাজ্য বিধান সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে প্রায় দুই লাখ উদ্বাস্তু পরিবার পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, কুচ বিহার, জলপাইগুড়ি ও দার্জেলিংয়ের মতো সীমান্ত জেলাগুলোতে বসবাস করছে।

এছাড়া উত্তর কোলকাতার বাঁকুড়া, আসানসোল, দুর্গাপুর, যাদবপুরের মতো এলাকাগুলোতেও উদ্বাস্তুদের দেখা গেছে। তারা কেবল রাজ্য সরকারের জমিতে নয়, কেন্দ্রীয় সরকার ও রেলওয়ে জমি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি ভূমিতেও বসতি স্থাপন করেছে। রাজ্যের সচিবালয়ে মমতা ব্যানার্জি বলেন, আমরা ইতোপূর্বে এ ধরনের ৯৪টি উদ্বাস্তু করোনিকে আইনসম্মত করা শুরু করেছিলাম।

তিনি বলেন, তার সরকার ইতোমধ্যেই প্রায় ৭০ হাজার পরিবারের বাড়ি নিয়মিতকরণ করেছে। তিনি বলেন, আরো প্রায় ২০০ কোলনির ১.২৫ লাখ পরিবারকে আইনসম্মত করা বাকি আছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের জমিতে থাকা উদ্বাস্তু বসতিগুলো প্রায়ই উচ্ছেদ নোটিশ পেয়ে থাকে। এটি একটি বড় সমস্যা। ৪৮ বছর হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে আমরা একবারে তিন একর জমি পর্যন্ত আইনসম্মত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

উদ্বাস্তু পরিবারগুলোতে জমির মালিকানা দেয়া হবে। তারা এই সম্পত্তির মালিকানা লাভ করে সরকারকে ট্যাক্স প্রদান করবে।

রাজনৈতিক পদক্ষেপ

বিজেপির এনআরসি-নাগরিকত্ব বিলের পাল্টা ব্যাবস্থা হিসেবেই দেখা হচ্ছে মমতা সরকারের এই পদক্ষেপকে। উল্লেখ্য, অমুসলিম ভোট বাগাতেই বিজেপি ওই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
মমতা সরকার ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের জন্য ডিজিটাল রেশন কার্ড স্কিমের আওতায় নতুন পরিচিতি প্রমাণ ইস্যু করার কাজ শুরু করেছে। তারা এখন উদ্বাস্তু ও অন্যদের জমির দলিলের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেইজ ও নথি প্রস্তুত করবে।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেতা বলেন, নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করে আমরা আমাদের পরাজয়ের কারণ খুঁজেছি। আমরা বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তু সম্প্রদায় মাছুয়াদের অনেক ভোট পাইনি। তারা কয়েকটি জেলায় বসতি স্থাপন করেছে। আমরা তাদের ভোট আবার পেতে চাই।

তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার রাজস্বও আয় করবে। ফলে এটা সরকার ও দলের জন্যও কল্যাণকর হবে। একে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মনে করছি।

বিজেপির আইনি ব্যবস্থার হুমকি

তবে বিজেপি নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমির ওপর বসতি স্থাপন আইনসম্মত করার কোনো অধিকার রাজ্য সরকারের নেই।

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি ও এমপি দিলিপ ঘোষ দি প্রিন্টকে বলেন, এসব পুরোপুরি ভুয়া প্রতিশ্রুতি। কেন্দ্রের ভূমির দলিল দেয়ার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? কেন্দ্রের, রেলওয়ের ও বেসরকারি জমি দেয়ার কোনো অধিকার রাজ্যের নেই। সরকার কিভাবে তা বলতে পারে? এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।

তিনি বলেন, সরকার ফেডারেল কাঠামো লঙ্ঘন করলে আমরা আইনি হস্তক্ষেপ চাইতে পারি।

ঘোষ আরো অভিযোগ করেন, মমতা সরকার এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদেরকে ভূমির নথিপত্র দেয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, এগুলো উদ্বাস্তুদের নয়, বরং অনুপ্রবেশকারীদের দেয়া হচ্ছে। তিনি আসলে অনুপ্রবেশকারী কোলনিগুলোকে আইনসম্মত করছেন, তার ভোট ব্যাংক বাড়াচ্ছেন। তবে এই কৌশলে কাজ হবে না। কোনো লোক নাগরিক না হরে কিভাবে তাকে জমির অধিকার দেয়া যায়?

দি প্রিন্ট