পাকিস্তানের করতারপুর জয়

Nov 28, 2019 04:25 pm
পাকিস্তানের করতারপুর জয়

 

পাঞ্জাবের কারতারপুর করিডোর ৯ নভেম্বর উদ্বোধন করা হলো। এই ঘটনায় পাকিস্তান ও ভারতের শিখ সম্প্রদায় দু’দেশে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে। করিডোর উদ্বোধনের সাথে পাকিস্তান সরকার শিখদের জন্য নতুনভাবে তাদের ধর্মের প্রাণপুরুষ গুরুনানকের গুরুদোয়ারা বা ধর্মমন্দির তৈরি করে শিখ সম্প্রদায়ের হাতে তুলে দিয়েছে। এতে বিশ্বের ১৪ কোটি শিখ পাকিস্তান এবং এর প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ইমরানকে ধন্যবাদ জানান এবং পাকিস্তানের প্রশংসা করেছেন। ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও সাবেক ক্রিকেটার নবজ্যোত সিং সিধু কারতারপুর করিডোরে বলেন, ‘সিকান্দরে আযম’ আলেকজান্ডার অস্ত্র দিয়ে দুনিয়া জয় করেছিলেন আর ইমরান খান ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। চার প্রজন্ম ধরে শিখ সম্প্রদায় যার অভাব বোধ করছিলেন, তিনি তার সমাধান করেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘ভারত বিভক্তির পর এটাই প্রথম যে, একজন ভারত-পাকিস্তান বিরোধের একটি বাধা অপসারণে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালালেন।’ তিনি আরো বলেন, শিখ সম্প্রদায়ের তরফ থেকে তিনি ইমরান সাহেবকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন যাদের কথা ৭০ বছর ধরে কেউ শোনেনি। তিনি বলেন, ‘ইমরান খানের হৃদয় একটি সাগর’।

এখন থেকে শিখ সম্প্রদায় সারা বিশ্বে ইমরান খানের ‘অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে কাজ করবে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংও তীর্থযাত্রীদের প্রথম দলে ছিলেন। ভারতীয় পাঞ্জাবের চিফ মিনিস্টার অমরিন্দর সিংহ, ফিল্ম স্টার সানি দিওল প্রমুখ ছিলেন তার সাথে। মনমোহন বলেন, ‘এই সূচনা ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নে বিরাট সহায়ক হবে।’ পাকিস্তান পাঞ্জাবের গভর্নর চৌধুরী মোহাম্মদ সরওয়ার বলেছেন, ‘এটি কারতারপুর করিডোর নয়, পিস করিডোর।’ জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতেরেস কারতারপুর করিডোর উদ্বোধন হওয়ায় স্বাগত জানিয়েছেন এবং শিখরা ভিসা ছাড়া তীর্থযাত্রী হিসেবে পাকিস্তানে যেতে পারবেন- এই ব্যবস্থারও প্রশংসা করেছেন। তিনি এক বার্তায় বলেন, এই প্রচেষ্টা আন্তঃধর্ম সঙ্গতি ও প্রতীতির সহায়ক। বৃহত্তর ধর্মীয় বন্ধনকে উজ্জীবিত করায় যুক্তরাষ্ট্রও অভিনন্দন জানিয়েছে। এর মুখপাত্র কারতারপুর করিডোরকে সৌ সুভ্রাতৃত্বের চমৎকার উদাহরণ বলেছেন। শিখ তীর্থযাত্রীরা হাসিমুখে পাগড়ি ও কৃপান বা ছোট তলোয়ার হাতে নিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন।

কারতারপুর করিডোর
কারতারপুর করিডোর পাক পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর থেকে ১২০ কিলোমিটার এবং পাকিস্তান-ভারত সীমান্ত থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। সংশ্লিষ্ট রাস্তাটি চার কিলোমিটারের চেয়ে সামান্য বড় ও সরু, এখান দিয়ে তীর্থযাত্রীরা (মূলত সবাই শিখ) পর্যায়ক্রমে বাসে করে লাহোর এবং লাহোর থেকে কারতারপুর যেতে হয়। ফলে যাত্রাপথ ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, ভারতীয় সীমান্তে যারা বসবাস করেন তারা খালি চোখে গুরুদোয়ারা দরবার সাহিব কারতারপুর বা কারতারপুর সাহিব দেখতে পান। ভারত সরকার একটা উঁচু চত্বর বানিয়েছেন যেখান থেকে বাইনোকুলার ব্যবহার করে ভালোভাবে দরবার দেখা যায়। এখন প্রতিদিন পাঁচ হাজার ভারতীয় শিখ কারতারপুর করিডোর ব্যবহার করতে পারবেন।

গুরুদোয়ারা বা শিখ মন্দির শিখদের পবিত্র ধর্মীয় স্থান। গত ৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হয়ে, কোনো পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়াই পাকিস্তানের কারতারপুর যাওয়া ৭০ বছরের ইতিহাস ভেঙেছে। সেখানে ঘুমিয়ে আছেন শিখ ধর্ম প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক। তিনি ১৫৩৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এই সমাধিই মূল গুরুদোয়ারা। মাঝে মধ্যে সংশ্লিষ্ট শহরের এবং গুরুদোয়ারার অনেক সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, শিখ তীর্থযাত্রীরা গুরুদোয়ারায় এসে পবিত্র পানি, আরক বা অমৃতের সরোবরে ডুব দেন। তারা বিশ্বাস করেন যে, শাস্ত্রীয় এই পদ্ধতিতে পবিত্র হওয়া যায়। প্রাথমিক প্রার্থনার আগে লঙ্গরখানায় বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করা হয়। মন্দিরে শিখরা নানকের কীর্তন করেন, আরদাস প্রার্থনা করে থাকেন।

গুরুদোয়ারা দরবার সাহিব ও কারতারপুর করিডোরের কাজ মাত্র ১১ মাস রেকর্ড সময়ে শেষ করেছে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। বিশ্বে শিখদের এটি সবচে বড় মন্দির। শিখ তীর্থযাত্রীরা ৪৯০ কেজি ওজনের, সোনার তৈরি একটি পাল্কি ভারত থেকে এনেছেন। সেটি ওই গুরুদোয়ারায় পাঞ্জাবের গভর্নর স্থাপন করেছেন। লাহোরে গুরু নানক শিখ ধর্ম প্রচার শুরু করেছিলেন। ৮০০ একর জমির ওপর এই কারতারপুর কমপ্লেক্স। এখানে লঙ্গরখানা, জাদুঘর, লাইব্রেরি, ডরমিটরি, লকার রুম, ইমিগ্রেশন সেন্টার এবং একটি বড় বাঁধ (যেন মন্দিরে কোনো বন্যার পানি ঢুকতে না পারে) রয়েছে। পুরো জমিটি গুরুদোয়ারা পরিচালনা কমিটিকে পাকিস্তান উপহার স্বরূপ দিয়েছে। গুরুদোয়ারা অবকাঠামো কমপ্লেক্সের জন্য ৪২ একর এবং কৃষির জন্য ৬২ একর যাতে লঙ্গরখানা চালাতে কোনো সমস্যা না হয়। এখানে ব্যবহৃত মার্বেল ও টাইলসগুলো ইউরোপ থেকে আনা। ১২ বেডের একটা হাসপাতালও এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পাকিস্তান মনে করে, তীর্থযাত্রীদের সফর থেকে বছরে পাকিস্তানি ৫৭১ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা যাবে। প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে ধার্যকৃত ২০ ডলার সার্ভিস ফি আদায় করা হলে প্রতিদিন এক লাখ ডলার আয় হতে পারবে।

সম্প্রীতি
পাকিস্তান ও ভারতের পরস্পর বিরোধ ও অবিশ্বাসের চরম অবস্থায় পাকিস্তান এই করিডোর উদ্বোধন করল। তীর্থ পর্যটন এখন এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। উল্লেখ্য, এ ছাড়া হাসান আবদাল ও লাহোরে আরো বেশ কয়েকটি শিখ মন্দির রয়েছে। শিখরা পাকিস্তানে তীর্থযাত্রায় এসে ওই সব গুরুদোয়ারাও দর্শন লাভ করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রতিশ্রুতি অনুসারে, গত ৯ নভেম্বর ও ১২ নভেম্বর শিখ তীর্থযাত্রদের কাছ থেকে ২০ ডলার করে সার্ভিস চার্জ নেননি। উল্লেখ্য, সিন্ধুর থর এলাকা হিন্দুদেরও বড় মন্দির রয়েছে। বেলুচিস্তানের হিংলাজ মন্দির, পাঞ্জাবের কাতাস রাজÑ এগুলো বিশেষত ভারতের হিন্দুদের দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত। ভারতেরও উচিত, সেখান অবস্থিত দর্শনীয় ধর্মীয় স্থানগুলোতে যেন সহজভাবে ও কম খরচে মুসলমানরা তীর্থযাত্রা করতে পারে তার ব্যবস্থা করা। শিখদের জন্য যেমন পাকিস্তান হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তেমনি ভারত সরকারেরও উচিত আজমির শরিফের দরগাহে চিশতি, দিল্লির দরগাহ নিজামউদ্দিন আওলিয়াতে অনুরূপ সুবিধা সৃষ্টি করা।

কবি ইকবাল
গুরু নানক জীবনের শেষ ১৮ বছর কারতারপুরেই কাটিয়েছেন। ৯ নভেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের জন্মবার্ষিকী হওয়ায় এই দিনটি আরো একটি বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। আল্লামা ইকবাল বাবা গুরু নানকের অনেক প্রশংসা করেছেন। তার কাব্য ‘বাঙ-ই-দারা’য় গুরু নানকের ধর্মীয় চিন্তাধারার প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ফির উসি আখির সদা তাওহিদ কি পাঞ্জাব কাঁহা, হিন্দ কো আব এক মরদ-ই-কামিল নে জাগায়া খোয়াব সে।’ (আবারো তাওহিদের আওয়াজ পাঞ্জাব থেকে উঠেছে; এক কামিল মতবাদের নিদ্রায় নিমগ্ন ভারতের লোকদের জাগিয়েছেন) একই কাব্যে মহাকবি আরো লিখেছেন, ‘চিশতিনে জিস জমিন মেঁ পয়গাম-ই-হক শুনায়া; নানক নে জিস চমন মেঁ ওয়াহদাত কা গীত গায়া’ (যেখানে চিশতি মানুষকে সত্যের বাণী শুনিয়েছেন; যে স্থানে নানক একত্ববাদের গীত গেয়েছেন)। কবি ইকবাল ছাড়াও নাজির আকবরাবাদী নানকের প্রশংসা করেছেন নিরাকার একত্ববাদ প্রচারের জন্য। নানকের অনুসারীরা অনেক বড় মনের পরিচয় দিয়ে থাকেন, যেমন সম্প্রতি ভারতের পুনা থেকে কাশ্মিরের অবরুদ্ধ শ্রীনগরে কাশ্মিরি মহিলাদের পাহারা করে বাড়ি দিয়ে আসেন কিছু শিখ; যা ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য ভারতীয় শিখরা সাহায্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন; যা ভারতের অন্য কোনো সম্প্রদায় করেনি। গুরু নানক উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিবার থেকে এসেছিলেন। ৯ বছর বয়সে তার বাবা এই ব্রাহ্মণ সন্তানকে পৈতা পরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। নানক প্রতিবাদ করেছিলেন এই জন্য যে, তার বড় বোনকে কেন পৈতা পরানো হয়নি? আর কিছু উচ্চবর্ণের হিন্দুরা ছাড়া সাধারণ হিন্দুরা কেন পৈতা পরতে পারে না? মানুষের ভেতর বিভেদের বিষয়ে তিনি ছোট বেলা থেকেই ছিলেন প্রতিবাদী।

পরিশেষ
কারতারপুর এই মুহূর্তে একটি শান্তির এবং মিলন বন্ধনের নাম। এই উৎসবমুখর পরিবেশ কিন্তু ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত বিতর্কিত রায়ে অনেকটা ভাটা পড়েছে। এমনিতেই কাশ্মির পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানসহ গোটা উপমহাদেশের মুসলমানরা চিন্তিত। এর ওপর বাবরি মসজিদের প্রশ্নবিদ্ধ রায়। পাক সরকারপ্রধান ইমরান খান ভারতের প্রতি সম্প্রীতির বার্তা পাঠিয়েছেন, সীমান্ত সমস্যা দূরীকরণ এবং উভয় দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতীয় শাসকরা চাণক্য নীতির অনুসারী। সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিডিয়ায় এর আগে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের বন্ধু ভারতের শত্রু।’ পাকিস্তানও কম যায় না, তারা বলেছে, কাশ্মির ইস্যুতে যারা ভারতের পক্ষ নেবে, তারা পাকিস্তানি মিসাইলের টার্গেটে পরিণত হবে।’

যা হোক, এখন শান্তির যে বারতা পাকিস্তান দিয়েছে সেটিকে উপলক্ষ ধরে ভারত কাশ্মির, পানি সমস্যা ও সিয়াচেন ইস্যুসহ সমস্যাগুলো দূর করার জন্য এগিয়ে আসতে পারে। করিডোর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মোহাম্মদ কোরেশি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা ঐতিহাসিক ভাষণের পর্যায়ে পড়েছে। তিনি বলেছেন, ‘ভারতকে বলতে চাই- আসুন, আমরা এই করিডোরকে ভালোবাসার রাস্তা বানাই। আমরা যে ওয়াদা করেছি সেটি বাস্তবায়ন করেছি। মোদিকে বলছি ভারতের অপর প্রধানমন্ত্রীও এক ওয়াদা করেছিলেন; ৭২ বছর ধরে কাশ্মিরের লোকেরা অপেক্ষা করে আছে।

আসুন, আমরা এক রাস্তার অনুসন্ধান এবং ভালোবাসার বীজ বপন করি। আজ গুরুদোয়ারা আবাদ হয়েছে, পাকিস্তানের ৪০০ হিন্দু মন্দিরকেও আমরা সংস্কার করব, এটাও এখানকার হিন্দু সমাজকে ওয়াদা দিয়েছি। এটাই মুহাম্মদি সুন্নত। শিখদের জন্য আমরা যেমন গুরুদোয়ারা খুলে দিয়েছি, শ্রীনগরের জামিয়া মসজিদও আপনি নরেন্দ্র মোদি খুলে দিন; যাতে ওখানকার মুসলমানরা নামাজ আদায় করতে পারে। আপনি ইমরান খানকে ধন্যবাদ দিয়েছেন, তাকেও ধন্যবাদ দেয়ার সুযোগ দিন আপনাকে, কাশ্মিরের কারফিউ তুলে নিয়ে আপনি সেটি করতে পারেন। ৯ নভেম্বর বার্লিন দেয়ালেরও পতন হয়েছিল। তা হলে আমরাও লাইন অব কন্ট্রোলের বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারব।’

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ সরকার