মুসলিম ইস্যু : যেখানে একই অবস্থানে মিয়ানমার-ভারত

অমি কাজমিন | Dec 17, 2019 08:49 am
সু চি ও মোদি

সু চি ও মোদি - ছবি : সংগৃহীত

 

মিয়ানমারের উদাহরণ অনুসরণ করছে কি ভারত? ওই দেশটি তো এখন রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর দমন অভিযান চালিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার অভিযোগ মোকাবিলা করছে। চলতি মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুমোদন করেছে। এই আইনের ফলে বেশ বড় সংখ্যক মুসলিস সংখ্যালঘু-সংবলিত বহুত্ববাদী সেকুলার গণতান্ত্রিক দেশটিকে হিন্দুদের সহজাত আবাসভূমিতে পরিণত হয়ে গেছে। এখানে ইসলামকে স্পষ্টভাবেই বাদ রাখা হয়েছে।

প্রতিবেশী পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানদের যারা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের আগে ভারতে প্রবেশ করেছে, তাদেরকে দ্রুততার সাথে নাগরিকত্ব প্রদান করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো ভারত তার উদ্বাস্তু নীতিতে ধর্মকে বৈশিষ্ট হিসেবে গ্রহণ করল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার বলছে, এই আইনটি আসলে মুসলিম নির্যাতনের শিকার হওয়া উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেয়ার মানবিক প্রয়াস এবং ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ বিভক্তির অসমাপ্ত কাজের সমাপ্তি টানা। বিলটির সমর্থন করে এমপি স্বপন দাসগুপ্ত বলেছেন, এটি তাদের সহজাত আবাসভূমি। এসব লোক ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকে ‘মাদার ইন্ডিয়া’ হিসেবে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এটি মহাত্মা গান্ধীর অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিশনের লঙ্ঘন। ওই ভিশনে বলা হয়েছিল, ভারত সব বিশ্বাসের লোকজনের আবাসভূমি।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের মিলান বৈষ্ণব বলেন, এই আইনের বিপদ হলো, আপনি অনিবার্যভাবে নাগরিকত্বের দুটি স্তর কাঠামো তৈরী করছেন। একটি হবে সুবিধাপ্রাপ্ত সম্প্রদায়, অপরটি প্রান্তিক সম্প্রদায়। প্রান্তিক সম্প্রদায়টির মনে হবে, তারা স্থায়ীভাবে নিম্নশ্রেণিতে রয়েছে।

একই বিষয় দেখা যায় মিয়ানমারে। ওই দেশটিতে ১৯৮২ সালে নতুন নাগরিকত্ব আইনে ছয়টি জাতিগত গ্রুপকে ‘জাতীয় বর্ণ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তারাই নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু প্রধানত মুসলিমদের নিয়ে গঠিত রোহিঙ্গাদের অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী মনে করে নাগরিকত্ব থেকে বাদ রাখা হয়। তাদেরকে প্রমাণ করতে বলা হয় যে তারা যে ১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের স্বাধীনতার আগে দেশটিতে প্রবেশ করেছিল, তা প্রমাণ করতে। কিন্তু তা করা তাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব। চলাচল, শিক্ষা, চাকরি ও বিবাহ নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও রোহিঙ্গারা থেকে যায়। দশকের পর দশক ধরে চলা নির্যাতন চরমে আসে ২০১৭ সালে, সাত লাখ রোহিঙ্গাকে প্রতিবেশী বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়।
এই প্রেক্ষাপটেও ভারতীয় আইনটি শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। ভারত সরকার দাবি করছে, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ মুসলিম অভিবাসীতে তারা ভেসে যাচ্ছে। আর এ কারণে ১৩০ কোটি লোকের দেশে নাগরিকত্ব লাভের যোগ্যদের তালিকা প্রণয়ন করা হবে।

একসময় রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে দাবি করা হয়েছিল, ভারতও বলবে, মুসলিমদেরকে তাদের পূর্বপুরুষেরা কবে থেকে এই দেশে বসবাস করছে, তা প্রমাণ করতে। যদি তারা না পারে, তবে তারা অবৈধ ঘোষিত হয়ে বহিষ্কারের শঙ্কায় থাকবে। তবে হিন্দু ও অন্যান্য গ্রুপের সদস্যদের নতুন আইনের আওতায় আশ্রয় দেয়া হবে। রাষ্ট্রহীন হওয়ার শঙ্কায় থাকবে কেবল মুসলিমেরা।

ইয়েলের অধ্যাপক ও ‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ গ্রন্থের লেখক জ্যাসন স্ট্যানলি বলেন, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারত তার নাগরিক ও অনাগরিকদের মধ্যে একটি পার্থক্য রচনা করতে চাইছে। যদি অমুসলিম হও, তবে দ্রুত নাগরিকত্ব পাবে। কিন্তু ভারতের কোটি কোটি মুসলিম, যাদের পরিবারগুলো অনেক দিন ধরে বাস করছে, অবৈধ অভিবাসী ঘোষিত হতে পারে।

যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে না, তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা এখনো অস্পষ্ট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘উইপোকাদের’ বহিষ্কার করার কথা বলছেন। কিন্তু অন্য কোনো দেশ তাদের গ্রহণ করবে, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভারত এখন ওইসব রাষ্ট্রহীন লোকদের জন্য আটক কেন্দ্র নির্মাণ করছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি অবশ্য প্রশ্ন করেছেন, ভারত কি নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ এত বিপুলসংখ্যক লোককে আটক রেখে পোষাতে পারবে?

তিনি বলেন, তাদেরকে তাদের জীবিকা থেকে সরিয়ে রেখে রাষ্ট্রই তাদের খাইয়ে চলবে? তারা কি দাস শিবিরে যাচ্ছে? পরিকল্পনাটি বোঝা কঠিন। তবে কোটি কোটি মুসলিম যে চরম নিরাপত্তাহীনতায় থাকবে, সেটি সত্য।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস


 

ko cuce /div>

দৈনিক নয়াদিগন্তের মাসিক প্রকাশনা

সম্পাদক: আলমগীর মহিউদ্দিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: সালাহউদ্দিন বাবর
বার্তা সম্পাদক: মাসুমুর রহমান খলিলী


Email: online@dailynayadiganta.com

যোগাযোগ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।  ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Follow Us