আল হামরা

Jun 17, 2019 02:42 pm

 

ইতিহাসের মহানায়কদের হাতে সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় বিজয়ের উল্লাস আর আড়ম্বরময় স্বপ্ন নিয়ে। অতঃপর সে গৌরবোজ্জ্বল সময় আবার ক্ষয়ে যায় ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ হয়ে, চিহ্ন রেখে যায় পৃথিবীর প্রান্তরে। আধুনিক স্পেনের বুকে আজো দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক আল হামরা প্রাসাদ তেমনই এক গৌরবময় সময়ের বিবর্তন চিহ্ন যার নিষ্প্রভ কালচে দেয়ালে কান পাতলে আজো শোনা যায় অশ্বখুরের ধ্বনি। আজো স্মৃতির মিনারে ভেসে ওঠে সুবহে সাদিকের সুললিত আজানের সুর। মর্মর শ্বেত পাথরের নিস্প্রভ চেহারার আড়ালে ঢেকে আছে সময়ের জ্বলজ্বলে ক্ষণ।

আল হামরার ইতিহাসের সূচনা নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে। ১২৩৮ সালের এক স্বর্ণালি সময়ে মুসলিম স্পেনের মুর সুলতান মোহাম্মদ ইবনে নাসর সাড়ম্বরে গ্রানাডায় প্রবেশ করেন। গ্রানাডার কোনো এক আমিরের বাসস্থান হিসেবে গড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাসাদের এলভিয়ার নামক দরজা দিয়ে বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করেন তিনি। আর দরজার নতুন নাম করেন আল আহমার। আল আহমার ‘লাল’ শব্দকে নির্দেশ করে। কারো মতে মোহাম্মদ ইবনে নাসরের দাড়ির রঙ ছিল লাল, কারো মতে তার সংবর্ধনার প্রতীকী রঙ লাল, কারো বা মত পরে আলহামরার জন্য কাজ করা স্থপতি আল আহমারের নামেই এর নামকরণ হয়ে যায়। তবে এটির সম্ভাবনা খুব কম।

গ্রানাডা শহরের পশ্চিমে আল সাবিকা পাহাড়ের ওপরে দুর্লভ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন আল হামরা প্রাসাদ। বাঁ দিক দিয়ে বয়ে গেছে দারো নদী। আল হামরা নির্মাণের সময় খুবই ভেবেচিন্তে এর জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে। পর্বত চূড়ার প্রাসাদ থেকে বাইরে তাকালে মুরদের পুরনো শহর আলবাইজিন চোখে পড়বে। সামনের ঢালু সবুজভূমি একে বিস্তৃতি দিয়েছে। অসাধারণ এক সুন্দর শহর গ্রানাডা। আর ঠিক কেন্দ্রে এর শাসকের সুরম্য আবাস।

আল হামরা একেবারে সুবিন্যস্ত পরিকল্পনা নিয়ে গড়ে ওঠেনি। মুহাম্মদ ইবনে নসর যে প্রাসাদের দরজা দিয়ে গ্রানাডায় বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করেন সে প্রাসাদের সূচনা আরো বেশ আগেই। নবম শতাব্দীর শেষ ভাগে ৮৮৯ সালে আওয়ার ইবনে হামদুন নামের এক গোত্রপতি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এসে আশ্রয় নেন ধ্বংসপ্রাপ্ত এক অখ্যাত দুর্গে। নিজের থাকার প্রয়োজনে মেরামত করে দুগর্টি ব্যবহার করতে থাকেন। একে ঘিরে একসময় জনপদের আকার বাড়তে থাকে, গোড়াপত্তন হয় ছোট শহর গ্রানাডার। একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী জিরি রাজবংশের হাতে আলবাইজিন নামের আরেকটি শহরের জন্ম হতে থাকে। ইবনে হামদুনের জীবনকালের পরেও পরবর্তী বংশধররা এখানে বাস করে। তবে নিজেদের অধিকারে ধরে রাখতে পারেনি। মুর সুলতান মুহাম্মদ ইবনে নসর প্রবল পরাক্রমে শহরটি অধিকার করেন। ইবনে নসরের অধিকারে যাবার পরে গ্রানাডার জৌলুশ বাড়তে থাকে। একই সাথে আড়ম্বরযুক্ত হতে থাকে আল হামরা। উত্তরসূরি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মুহাম্মদ পর্যায়ক্রমে জেনেরালাইফ নামে উদ্যান, মসজিদ এবং আরো কিছু রাজকীয় স্থাপনা সংযোজন করেন। সুলতান প্রথম ইউসুফ এসে প্রথম আল হামরার বড় ধরনের সম্প্রসারণ করেন। আজকের আলহামারার যে ভৌত অবকাঠামো দৃশ্যমান তা আসলে সুলতান প্রথম ইউসুফ এবং তৎপরবর্তী সুলতান পঞ্চম মুহাম্মদের অবদান। প্রায় ষাট বছরকালের শাসনামলে তারা শহরটিকে আরো বিস্তৃত করেন। অনেক মসজিদ ও হাম্মামখানা নির্মাণ করেন। আল হামরার অভ্যন্তরীণ সজ্জাও ক্রমান্বয়ে জমকালো হয়ে ওঠে তাদের তত্ত্বাবধানে।

অবশেষে সুলতান আল আহমারের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয় কালাত আল হামারা বা লাল কেল্লা। দুর্গের পুরনো অংশে ওয়াচ টাওয়ার ও কিপ নির্মাণ করা হয়। দারো নদী থেকে খাল কেটে পানি নিয়ে এসে প্রাসাদের বাগানের নিজস্ব সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। তারপর অন্যান্য দুর্গ ও স্টোররুম তৈরি করা হয়।

আল হামরার দৈর্ঘ্য ২৪৩০ ফুট এবং প্রস্থ গড়ে ৬০০ ফুট। প্রায় ১৫,৩০,০০০ বর্গফুটের এই বিশাল প্রাসাদ উত্তর পশ্চিম থেকে দক্ষিণ পূর্বে প্রলম্বিত। আল হামরায় ১৭৩০ মিটার দেয়াল ঘেরা শহরের ভেতরে রয়েছে ত্রিশটি টাওয়ার আর চারটি সদর দরজা। এর মূলত তিনটি অংশ- রাজকীয় সেনাবাহিনীর বাসস্থান বা আলকাজাবা, শাসকের পরিবারের প্রাসাদ, এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য উদ্যান শোভিত শহর বা মদিনা।

পশ্চিম অংশটি মূলত আল কাজাবা দুর্গ। এটিই সবচেয়ে পুরনো অংশ এবং পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু স্থানে অবস্থিত। মোটামোটি ত্রিকোণাকৃতির অবয়ব। চারদিকে উঁচু দেয়ালের ভেতরে তিনটি বুরুজ বা টাওয়ার এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। ৮৫ ফুট অর্থাৎ প্রায় আট তলার সমান উঁচু এ টাওয়ারটি স্পেনিশ ভাষায় ‘টরে ডি ডেলা’ নামে পরিচিত। ‘ওয়াচ টাওয়ার’ বা পর্যবেক্ষণ বুরুজে একটি ঘণ্টা ছিল যা, সেচ কাজে ব্যবহৃত হতো। যদিও অনেকে ইসাবেলার সময়কার খ্রিষ্টানদের ঘণ্টা মনে করত তবে এর উপস্থিতি ছিল আরো আগে থেকেই। গ্রানাডার সমতলভূমিতে সেচের পানি ছেড়ে দেয়া ও বন্ধ করতে এই পর্যবেক্ষণ বুরুজের ঘণ্টা থেকে সঙ্কেত দেয়া হতো। দ্বিতীয়টিতে সম্ভবত নামাজ কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তৃতীয়টি ছিল একটি গিরিপথের প্রবেশ দ্বার। আল আহমারের সময়েই অশ্বখুরাকৃতির আর্চওয়ে সমৃদ্ধ এ টাওয়ারগুলো তৈরি করা হয়। আল-কাজাবাতে ভিতর দিকে একটি অস্ত্র অঙ্গন (আর্মস কোর্ট) রয়েছে। গেট পাড়ি দিয়ে ঢুকলেই মিলিটারি কোয়ার্টার (টেরেস অব গেট অব আরমস’) বা সেনা ছাউনি। সেনা ছাউনির পশ্চিমে হাম্মামখানা রয়েছে। দক্ষিণ পাশের একটা বুরুজকে সুলতানার বুরুজ বলা হয়। দক্ষিণ পাশে একটি পূর্ব-পশ্চিম লম্বা বিশাল প্রাচীন গাছে ঢাকা বাগান ‘গার্ডেন অব আদার ডেস’। প্রবাহিত পানির ব্যবস্থা রয়েছে বাগানটিতে।

আমিরদের বসবাসের জন্য তৈরি আল হামরা প্রাসাদকে মোটা দাগে ছোট-বড় তিনটি প্রাসাদের সমন্বয়ে একটি কমপ্লেক্স হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই প্রত্যেকটি প্রাসাদ আবার অনেকগুলো স্থাপনা এবং মধ্যস্থ খোলামেলা উঠোনের সমন্বয়। সবচেয়ে পুরনো প্রাসাদটি মাচুকা প্যালেস হিসেবে জানা যায়। আল কাজাবা দুর্গ থেকে পূর্ব দিকে আল হামরা প্যালেস অংশে ঢুকতে হলে প্রথম তোরণ পাড়ি দিলে বেশ খোলা জায়গা বাগিচাসমৃদ্ধ। একপাশে একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ এখনো দৃশ্যমান। দ্বিতীয় তোরণ পাড়ি দিলে বাগানসমৃদ্ধ উঠোনটি কোর্ট অব মাচুকা। উঠোনের উত্তর পাশে মেক্সুয়ার বা সমাবেশস্থল। আরবি মাশোয়ার শব্দের স্পেনিস উচ্চারণ মেক্সুয়ার হিসেবে এটি পরিচিত। চতুর্দিকে আর্চওয়ে সমৃদ্ধ বারান্দা বলা যায়। যেকোনো ছোটখাটো জনসমাগমের জন্য ছায়াঢাকা কিন্তু খোলা জায়গা। কেউ কেউ ধারণা করেন দক্ষিণ পাশেও একই রকম আরেকটি বারান্দা ছিল। উঠোনের মধ্যখানে দুটি গোলাকৃতি পানির ফোয়ারা। মাচুরা চত্বরের পূর্ব পাশেই নাসরিদ বংশীয় সুলতানদের রয়েল প্যালেস বা প্রাচীন রাজপ্রাসাদ। বিভিন্ন উচ্চতার এবং আকারের চৌচালা ছাদ সমৃদ্ধ একাধিক বাহুর সম্মিলনে মোটামোটি আয়তকার প্রাসাদ। এর মাঝখানে আবার ছোট ছোট কিছু উঠান তৈরি হয়েছে। মাচুকা প্যালেসকে আল হামরার সবচেয়ে পুরনো অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। এটি এখন আর খুব বেশি দৃশ্যমান নয়।

বর্তমান সময়ের বড় দুটো প্রাসাদের একটির নাম কোমারেস প্যালেস। মেক্সুয়ার পূর্বে ঝর্ণা ও চত্বরে সমৃদ্ধ কোমারেস প্যালেসের মাঝখানের খোলা চত্বর কোর্ট অব মার্টল নামে পরিচিত। মার্টল ঝোপের আধিক্যের কারণে এ নামে ডাকা হলেও এটার আসল নাম ছিল দিওয়ান। যেকোনো মুসলিম প্রাসাদেরই এটি একটি পরিচিত অঙ্গন। এখানে সুলতান তার স¤্রাজ্যের প্রশাসনিক কাজ চালাতেন। আয়তাকার বিশাল চত্বরের মাঝখানে পানির নহর। নহরের চারপাশে পায়ে হাঁটার সুসজ্জিত পথ। একপাশে প্রশাসনিক ভবন যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় অতিথিখানায় (হল অব অ্যাম্বেসেডরস) পরিণত হয়। উল্টো পাশে সুলতানদের নিজ প্রাসাদের অবস্থান ছিল। এখন আর এটির অস্তিত্ব নেই। রাজা পঞ্চম চার্লস তার জন্য আরেকটি প্রাসাদ বানাতে গিয়ে পুরনো সুদৃশ্য প্রাসাদটি ধ্বংস করে ফেলেন। সেখানে আরো কিছু কাঠামো ছিল এবং ছিল একটি মসজিদ। সবই বিস্মৃতির তালিকায় চলে যায়। এখন কেবল ঢোকার পূবের্র প্রশস্ত বারান্দা দৃশ্যমান। এই কক্ষের অভ্যন্তরীণ সজ্জা খুবই জাঁকালো। মেঝে দেয়াল এবং ছাদে নানাবিধ সূক্ষ্ম কারুকাজ।
আল হামরার আরেকটি আকর্ষণীয় ও নান্দনিক স্থাপনা কোর্ট অব লায়ন কোমারিস প্রাসাদের ঠিক পরেই অবস্থিত। আলাদা ভবন হিসেবে নির্মিত হলেও গ্রানাডার পতনের পর কোমারিস প্রাসাদের সাথে সংযুক্ত করা হয়। পঞ্চম মুহাম্মাদ কোর্ট অব লায়নকে দেখার মতো করেই বানিয়েছিলেন। চত্বরের উত্তরে হেরেমের অবস্থান, পশ্চিমে মাকার্নাস চেম্বার। পূর্বে হলো অব জাস্টিস বা ন্যায়বিচার কক্ষ। চত্বরকে ঘিরে রেখেছে সরু কলামের সারি।

চত্বরের কেন্দ্রে জটিল পানিপ্রবাহ ব্যবস্থা সংবলিত মার্বেল বেসিনের ঝর্ণা। কোর্ট অব লায়ন নামে পরিচিত হলেও এর আদি পরিচয় হেরেম বা অন্দরমহল। কোর্ট অব লায়নের মাকার্নাস চেম্বারের গম্বুজাকৃতির কারুকার্যখচিত সিলিং আল হামরার অন্যতম সেরা স্থাপত্য। প্রাসাদের মধ্যে উন্মুক্ত খোলা চত্বরে বারোটি সিংহের ভাস্কর্য আছে বলেই এটি এখন কোর্ট অব লায়ন বা সিংহ চত্বর নামে পরিচিত। মুসলিম সা¤্রাজ্যের পতনের পরে এখানে সিংহের ভাস্কর্য স্থাপিত হয়। দিওয়ান চত্বর উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত হলেও সিংহ চত্বর পূর্ব পশিমে বিস্তৃত। চত্বরের পূর্ব পাশে বিচারালয়। অন্য তিন দিকেও বিভিন্ন দফতরের অবস্থান ছিল।

মূল আল হামরার অনেক পরে সংযোজন হলেও এখন চার্লসের প্যালেসও দর্শকদের পরিদর্শনের তালিকায় থাকে। এই প্রাসাদটি আল হামরার থেকে ভিন্নতর স্টাইলে তৈরি। আল হামরার সব উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ চতুষ্কোণ হলেও চার্লসের প্যালেসের চত্বরটি গোলাকার। ইতালির বিখ্যাত শিল্পী মাইকেল এঞ্জেলোর ছাত্র পেড্রোস মাচুকার নকশায় রেনেসাঁ স্টাইলের অন্যতম স্থাপত্যকর্ম এটি। তবে সৌন্দর্যে নিষ্প্রভ আল হামরার সামনে।

ডারউইন পোর্টার ও ডানফোর্থ প্রিন্স বলেন, ‘পঞ্চম চার্লসের রেনেসাঁ স্টাইলের প্রাসাদ আল হামরাতে সাঙ্ঘাতিকভাবে ভুলস্থানে স্থাপিত। স¤্রাট পঞ্চম চার্লস খুব শখ করে আল হামরার সাথেই এই প্রাসাদ তৈরি করতে গিয়েছিলেন কিন্তু এটা করতে গিয়ে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষবশতই হোক আর অজ্ঞতার কারণেই হোক ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেন মূল আল হামরার। এই প্রাসাদের নিচ তলাতে এখন ‘মিউজিও ডি লা আলহামরা’। এতে আলহামরা থেকে সংগৃহীত অনেক দ্রব্য রয়েছে। আছে গ্রানাডা ও কর্ডোভা থেকে সংগৃহীত আরো নানান স্মারকবস্তু।

আল হামরার প্রাসাদগুলো স্থাপত্যশৈলী খুবই জটিল। অসংখ্য কলাম, তোরণ, ঝর্ণা, প্রবাহিত জলধারা এবং স্বচ্ছ পুকুরগুলো এর নান্দনিক সজ্জার জটিল স্থাপত্যশৈলীকে আরো জটিল করেছে। প্রাসাদগুলোর বাইরের দিকটা অবশ্য সাদামাটা, তবে ডিজাইন করা হয়েছে এমনভাবে যেন ভেতরে প্রচুর আলো-বাতাস ঢুকতে পারে। প্রাসাদের ভেতরের দেয়ালগুলোয় বিভিন্ন কবির কবিতা উৎকীর্ণ আছে। লোকেরা মুহাম্মদ ইবনে নছরকে স্বাগতম জানায় স্রষ্টার করুণায় যিনি বিজয়ী হয়েছেন তাকে স্বাগতম (মারহাবান লি-ল-নাসির) বলে, জবাবে তিনি উত্তর দেন- ‘আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ বিজয়ী নন।’ বেশ অনেক জায়গায় এ বাক্যটি খোদাই করা আছে। এছাড়া রয়েছে নানারকম জটিল জ্যামিতিক কারুকাজ এবং পরস্পর জড়াজড়ি করে থাকা ফুলপাতার নকশা বা অ্যারাবেস্কের কাজ। প্রাসাদের সিলিংয়ের সাজেও আছে বৈচিত্র্য। কাঠের তৈরি গম্বুজাকার সিলিং সাজানোর জন্য মাকার্নাসের নকশা।

গ্রানাডার স্থাপত্য চর্চার ধারাটি মূলত বাইজেন্টাইন স্থাপত্য থেকে উৎসরিত হলেও সমকালীন মুসলিম শিল্পের একটি গভীর ছাপ এটিকে আলাদা করেছে। আব্বাসীয় খেলাফতে শিল্পচর্চার যে বিকাশ ঘটে তা থেকে মুর শিল্পীরা নতুন উপাত্ত সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি তাদের নিজস্ব কিছু উদ্ধাবনও ছিল। তোরণ এবং সিলিংয়ের কারুকাজ অনেক বেশি সূক্ষ্মতা এবং নতুনত্ব নিয়ে আসে। গ্রানাডার শেষ সময়ে বিকশিত এ স্থাপত্যকৌশলের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে আজকের আধুনিক মুসলিম স্থাপত্যগুলোতে। আল হামরায় স্থাপত্যের একটি লক্ষণীয় দিক হচ্ছে অশ্বখুরাকৃতির সারি সারি আর্চসমৃদ্ধ বারান্দা। দুপাশে তিনটি করে ছটি সমান সাইজের আর্চওয়ে এবং মাঝে একটি বড়। মাঝের বড় আর্চওয়ে দিয়ে বারান্দায় প্রবেশ করতে হয়। মোট চারটি দরজা দিয়ে আল হামরায় প্রবেশ করা যায়। প্রাসাদের প্রথম দরজাটিকে বলা হয় গেট অব আর্মস বা অস্ত্রাগারের দরজা। আল কাজাবা দুর্গ হয়ে ঢোকার পথ এটি। দ্বিতীয়টি গেট অব আর রাবাল। এই দুটি গেট উত্তর অংশে অবস্থিত। দক্ষিণ দিকে আছে গেট অব জাস্টিস বা ন্যায়বিচার দরজা। ন্যায়বিচার দরজা পার হলে একটা খালি জায়গা। এই জায়গার নাম হলো স্পেনিশ ভাষায় ‘প্লাজা ডি লস আলজিবেস’। অর্থাৎ পানির চৌবাচ্চা চত্বর। এই এলাকা পার হলেই আল হামরা প্রাসাদে প্রবেশের চতুর্থ দরজা। ডানে চার্লস প্যালেস এবং বাঁয়ে আর কাজাবা দুর্গ রেখে এই দরজার অবস্থান। দরজাটিকে স্পেনিশ ভাষায় ‘পোয়েটা ডেল ভিনো’ অর্থাৎ ‘সুরার দুয়ার’ কেন বলা হয় সেটা অজানা।

মুসলিম জাহানের গৌরব আন্দালুসিয়া সময়ের ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে গেছে। তারিক বিন জিয়াদ আর মুসা বিন নুসায়েরের হাতে নতুন সভ্যতার দুর্দান্ত উত্থান হলেও উত্তরসূরিদের দায়িত্বের ভুলে হারিয়ে যায় সে সোনালি সময়। পরাজিত জাতির কেন্দ্র হলেও জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আল হামরার ক্ষতিসাধন করা হয়। চুনকাম করে কিছু নকশা ঢেকে ফেলা হয়, কিছু বিকৃত করা হয়। ১৬০০ শতাব্দীতে পঞ্চম চার্লসের সময় এর নাম পাল্টে করা হয় চার্লস প্রাসাদ। যদিও পরে আবার নিজ নামে ফিরে আসে। ১৮১২ সালে এক যুদ্ধে ফরাসিদের গোলায় টাওয়ারগুলো বেশির ভাগ ধসে পড়ে। ১৮২১ সালে ভূমিকম্পেও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আল হামরা। তবুও আন্দালুসের মুসলিম শাসনের শেষ শতকের স্থাপত্যরীতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন হয়ে আল হামরা টিকে আছে। আল হামরার নির্মাণে সেই সময়ের মুরিশ স্থপতিরা তাদের পরিশ্রম ও অতুলনীয় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন যা আজও বিমোহিত করছে দর্শককে। নিজস্ব স্থাপত্য ভাবনা, পরিকল্পিত নির্মাণ, স্বতন্ত্র ও কারুকার্যময় সাজসজ্জা একে অনন্যতা দিয়েছে। উদ্যান, পানির নহর, ঝর্ণা এবং এর সাথে প্রাকৃতিক সবুজের সমন্ময়ে জেনারালাইফ নামে যে বাগান তারা তৈরি করেছিল সেটা অলংকৃত করেছিল গোলাপ, কমলালেবু আর মার্থেল ফুলের রঙে। ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো আল হামরাকে বিশ্ব ঐতিহ্য এবং জেনারালাইফকে মানবতার জন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।