সমাজ দর্শন সভ্যতা ও সাহিত্য

Jul 24, 2019 04:35 pm
সমাজ দর্শন সভ্যতা ও সাহিত্য

 

জগতের চাকচিক্য প্রকৃতিগত হতে পারে, আবার মানবসৃষ্টও হতে পারে। তবে দুটোর সমন্বয়েই পূর্ণতার স্বাদ উপভোগ করা যায়। মানুষ তার আনন্দ উচ্ছ্বাস ও ভোগ্যসামগ্রীকে রকমারি করে জীবনের চাহিদাকে বহুমাত্রিক করেছে। বিলাসবহুলতা ও আরাম-আয়েশ দিন দিন বর্ধিত করার জন্য জীবনশ্রীকে সহজসাধ্য করেছে। ফলে আবিষ্কার জগতে বিস্ফোরণ ঘটা অবাক হওয়ার কিছু নয়। আদিম মানুষ তার চেহারা, চুল, নখ থেকে শুরু করে পরিধানের বস্ত্র পর্যন্ত বন্য রকম ছিল। ধীরে ধীরে সভ্য মানুষ তার দৈহিক সৌন্দর্যকে বর্ধনের জন্যে বিভিন্ন প্রকার প্রসাধন সামগ্রী আবিষ্কার করতে শিখেছে। কেশ থেকে শুরু করে পরিধানের পোশাক পর্যন্ত চাকচিক্যের দিকে যাচ্ছে। মডেলিংয়ের মাধ্যমে নারীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক দিকে ভোগ্যসামগ্রী ও অন্য দিকে রমণীয় সৌন্দর্য ও সহজ জীবনযাপন বর্তমান সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ উল্লাসতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে থেকে ভুলে যায় তার পরিণতির কথা। এমনকি সত্য-মিথ্যার কথা পর্যন্ত ভুলে যায়।

আনন্দ, উচ্ছ্বলতা জগতে যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষের জীবন দুনিয়ায় টিকে থাকা তত দুরূহ হচ্ছে। জগতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, মরণব্যাধি, দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে চলেছে। মানুষ যখন জাগতিক চাকচিক্যের ভেতর থেকে নিজকে মনে করে যে, তার আর দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে না, তখন তার কাছে জাগতিক ভোগ্যসামগ্রী ও সৌন্দর্য চূড়ান্ত এবং স্থায়ী মনে হয়। কিন্তু হঠাৎ করে প্রাণপ্রদীপ নিভে নিরাশার অন্ধকারে যাত্রাই প্রমাণ করিয়ে দেয়, মানুষ ভুলের ভেতর ছিল। এই ভুল শিক্ষা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া বড় কঠিন কাজ। আর এ কঠিন কাজকে দুনিয়ার বুকে যারা সহজ করতে পেরেছে তারাই হয়েছে মানবজাতির আলোকবর্তিকা। দুনিয়ায় থাকা না থাকা অথবা সৃষ্টিজগৎ টিকে থাকা অথবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া সব কিছুই প্রেম-ভালোবাসার ফলাফল। ভালোবাসা যত দিন থাকে, তত দিন সম্পর্ক থাকে। ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলে বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে ওঠে। নারী-পুরুষের প্রেমলীলার কাহিনী আমরা প্রাচীনশাস্ত্র বিলুপ্তির হাত থেকে রেহাই করে বংশবিস্তার করতে সাহায্য করেছে।

এই ভালোবাসার খেলা শুধু মানসিক দিক দিয়ে নয়, বস্তুগত বিশ্ব এবং সব কিছুর অস্তিত্ব থেকে শুরু করে বিরাজমান অবস্থা পর্যন্ত সার্বিক প্রেমের বলয়ে আবদ্ধ। আর এই প্রেম সৃষ্টির পেছনে আকর্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি কোনো বস্তু আকাশের দিকে ছুড়ে দেই তাহলে তা আবার মাটির দিকে চলে আসে। এখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বিদ্যমান। আবার গ্রহ-নক্ষত্রগুলো আকাশ থেকে যে ছিটকে পড়ছে না, অথবা সংঘর্ষ হচ্ছে না এর প্রধান কারণ হলো মহাকর্ষণ। এই আকর্ষণের ফলে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। আর এই ভালোবাসা, টিকে থাকতে সাহায্য করে। মাটির কণিকায় কণিকায় ভালোবাসা, রাজা-প্রজার ভালোবাসা, দেশের প্রতি ভালোবাসা লক্ষ করা যায়। যদি ভালোবাসা না থাকে; গ্রহের সাথে গ্রহের সংঘর্ষ হবে, ফলে তার বোঁটা থেকে ছিটকে পড়ে যাবে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া বিবাদ লাগবে, রাজা আর এক রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। তদ্রƒপ দেশের প্রতি যদি ভালোবাসা না থাকে, দেশপ্রেম না থাকে তাহলে দেশের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। সুতরাং জগতে যদি আমরা মানুষের পদচারণা দেখতে চাই তাহলে সৃষ্টিজগৎ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। গোটা সৃষ্টিজগৎ যেমন ভালোবাসার টানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে না, তদ্রƒপ মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা যদি থাকে তাহলে শান্তির জন্য সংগ্রাম করা লাগবে না। কারণ শান্তিতে থাকাই হবে এখন মানুষের স্বভাব। সৃষ্টিজগৎ এক মহারহস্যপুরী। এটা অনুধাবন তারা করতে পেরেছে, যারা নাকি চাক্ষুষমান।
মানুষের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। তবে স্বেচ্ছাচারিতা স্বাধীনতার অর্থকে ম্লান করেছে। স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে থেকে অখণ্ড মানবতার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাবমুক্ত কোনো বিষয় যদি সুস্থ মন দ্বারা গৃহীত হয়, তাহলে সেটা সার্বজনীন আদর্শে রূপ নিতে পারে। ইন্দ্রিয়ের স্বাধীনতাকে যদি সংযম না করা হয়, তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে।

পাশ্চাত্যের এক চিন্তাবিদ মাছের মতো সাঁতার কাটা আর পাখির মতো আকাশে ওড়ার স্বাধীনতা মানুষকে না দিয়ে জাগতিক সুখকে বিসর্জন দেয়ার কথা বলেছেন। চিন্তাবিদদের এ ধরনের বক্তব্যের পেছনে যৌক্তিকতা যতটুকু আছে তার চেয়ে জীবনের অস্তিত্বের স্বার্থে অযৌক্তিকতার পরিমাণটা বেশি। কারণ অন্যান্য প্রাণী আর গাছগাছালির মতো মানুষ একই শ্রেণীভুক্ত হতে পারে না। মানুষের ভেতর আক্রমণাত্মক মনোভাব, প্রতিশোধের নেশা, না পাওয়ার হাহাকার আর সরণি প্রবৃত্তি তাকে পাশবিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। হাত দিয়ে যা খুশি করা যায় না, মুখ দিয়ে যা খুশি বলা যায় না।

রুশ বিপ্লব ও চীন বিপ্লবের সময় মার্কসবাদ আকর্ষিক চেতনা ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হওয়ার পর এবং বর্তমান চীন মার্কসবাদের দর্শন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। নৈতিকতাবর্জিত বুদ্ধির চর্চা, উসকানিমূলক বক্তব্য ও ধর্মের বিরোধিতা করলে নিজেকে প্রগতিশীল ভাবা যায়, কিন্তু বাস্তবে প্রগতিশীল প্রমাণ করা যায় না। ভোগবাদ ও চাকচিক্যময় বিলাসবহুল জীবন কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির উদাহরণ হতে পারে না। আলবার্ট আইনস্টাইন ভোগবাদ ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনকে জীবনের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ভাবেননি। তিনি ‘ওফবধং ধহফ ড়ঢ়রহরড়হং’ গ্রন্থের ‘ঞযব ড়িৎষফ ধং ও ংবব রঃ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেনÑ ‘ভোগবাদ যে নৈতিক আদর্শের কাঠামো খাড়া করে তাকে আমি শূকরের খোঁয়াড় বলে অভিহিত করি। যেসব আদর্শ আমার জীবনপথে আলো জুগিয়েছে এবং আনন্দের সাথে জীবনযাপনে সাহস জুগিয়েছে, যেগুলো হলো সহানুভূতি, সৌন্দর্য ও সত্য। সমমনা লোকদের সাথে আত্মীয়তাবোধ আর বাস্তব জগতের সাথে গভীর সম্পর্ক না থাকলে এবং শিলাকণা ও বিজ্ঞানের জগতের চির অধরাকে ধরার নিরন্তর চেষ্টা না থাকলে জীবন আমার কাছে অন্তঃসারশূন্য মনে হতো। গতানুগতিক জীবনধারার মানুষ যা কিছুর জন্য প্রয়াসপর থাকে। যেমনÑ সম্পত্তি, ক্ষমতা, জাঁকজমক সেগুলোকে সবসময় আমার কাছে অবজ্ঞাযোগ্য মনে হয়েছে।’

পুণ্যই জ্ঞান এবং জ্ঞানই পুণ্য। একজন মানুষ যদি জ্ঞানী হয় তাহলে তিনি পুণ্য থেকে নিজকে গাফিল রাখতে পারেন না। আর জ্ঞানটা হতে হবে সত্যের জ্ঞান। কারণ একজন ব্যক্তি অনেক কিছু জানেন। কিন্তু যা জানেন তা ভুল। তা হলে তিনি মূর্খ। আর একজন ব্যক্তি সত্য জানেন কিন্তু মানেন না, তাহলে সেও মূর্খ। মানুষকে সত্যবাদী হতে হবে এবং কাজকর্মে এর প্রমাণ রাখতে হবে। শিল্প সাহিত্য এ ক্ষেত্রে মানুষের মনকে স্বচ্ছ করে। উদার করে। পৃথিবীর যারা সৃষ্ট মনীষী তাদের কাজ ছিল আগে মানুষকে তৈরি, তার পর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে যাওয়া। মানুষ যদি তৈরি না হয়, তাহলে রাষ্ট্রে পদে পদে বিপর্যয় ঘটবে। আর যদি জাতি তৈরি হয়, তাহলে শান্তির জন্য সংগ্রাম করা লাগবে না। শান্তিতে থাকাই হবে তখন সমাজবাসীর ধর্ম। বিশ্বশান্তির জন্য বিশ্বের চিন্তাবিদেরা যেসব কথা বলেছেন, তার ভেতর আইনস্টাইনের কথা উল্লেখযোগ্য। মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতে, মানুষ যদি শান্তিতে থাকতে চায়, তাহলে একটা অতি শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করতে হবে, যার কথা শুনতে সবাই বাধ্য থাকবে। ইঙ্গ-মার্কিন যদি পারমাণবিক বোমা ফাটিয়ে সাম্রাজ্যবাদী নীতির মাধ্যমে পৃথিবী একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে কোটি কোটি মানুষ মারা শুরু করে দেয়, তাহলে তাদের শায়েস্তা করার মতো কোনো শক্তি পৃথিবীর বর্তমানে নেই। তারা বস্তুতান্ত্রিক ভোগবাদী শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে নৈতিকতাবর্জিত সভ্যসমাজে পরিণত হয়েছে, যার পরিণতি ভয়াবহ! জবাবদিহিতা ও শাস্তির ভয়ে, মানুষ মূল্যবোধ লালন এবং ইন্দ্রিয় সংযম করতে বাধ্য হয়। আর মানুষের যদি জবাবদিহিতা না থাকে, তাহলে অতি কর্তৃত্ব ও ভোগের আশায় যা খুশি তাই সে করবে; যে কারণে সেক্স ও ভায়োলেন্সের ভয়াবহতার দিকে সে ছুটে চলেছে যা মানবসমাজ ও সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাহলে মানুষ বাঁচার জন্য একটু স্বস্তির জন্য কী করবে। স্বস্তি পরিষদ তো স্বস্তি দিতে পারবে না। কারণ সে অন্যের গোলামির কারণে পুতুলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ অবস্থায় জগতের যারা প্রকৃত বন্ধু তাদেরকে রাষ্ট্রসঙ্ঘ সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তার সময় এসেছে এবং চিন্তর ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ধারণা দিতে পারে সুস্থ শিল্প সাহিত্য; যা সামরিক চিন্তাকে নিয়ে যাবে উন্নতির দিকে। হ