একজন অসাধারণ কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ

Aug 01, 2019 07:10 pm
কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ

 

গল্প আমার প্রিয়তম মাধ্যম। এরই মধ্যে নতুন গল্পের কুঁড়িও ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু শরীর ও সময়ে ঠিক কুলোচ্ছে না। ভাবছি, গভীরভাবে গল্পে ও লেখায় নিজেকে অভিনিবিষ্ট করব। দু’তিন রকম গল্প লেখার চিন্তা জেগে উঠেছে আমার মাথায়। বেশ কিছুকাল ধরে জেগে আছে। গল্প-উপন্যাসের চেয়ে সত্য অনেক বেশি বিস্ময়কর। গল্প-উপন্যাস রচনার জন্য সরাসরি অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। যে দুই অভিজ্ঞতা আমার অর্জিত হয়েছে এবং হচ্ছে তা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। তার একটি ব্যক্তিগত, অন্যটি সামাজিক। আমার সাহিত্য জীবনে আমি দেখেছি আমি যা লেখার বিষয় কল্পনা করি, অনেক সময় আমার কলম চলে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন সড়ক ধরে। সৃষ্টিশীলতার আনন্দ ও বিস্ময় এখানেই। আমার অন্য সব সাহিত্য মাধ্যমের মতো গল্পেও আমি এক জায়গায় থাকিনি। ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে গেছি। - আবদুল মান্নান সৈয়দ।

পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্য-সম্পাদক ছিলেন তিনি। লিখেছেন কবিতা ছাড়াও গল্প, উপন্যাস, সমালোচনা, নাটক প্রভৃতি। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখেছেন, ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী নাম তাঁর আবদুল মান্নান সৈয়দ। ছদ্মনাম অশোক সৈয়দ।
১৯৪৩ সালে ৩ আগস্ট, অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশের পশ্চিমবঙ্গে জালালপুর গ্রামে আবদুল মান্নান সৈয়দ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সৈয়দ এ এম বদরুদ্দোজা মা কাজী আনোয়ারা মজিদ। বাবা-মা দুইজনেই ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। তাঁরা ছয় ভাই, চার বোন। ১৯৫০ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা হয় পশ্চিমবঙ্গে। তখন তার বাবা সপরিবার পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসেন এবং ঢাকার গোপীবাগে বাড়ি বানিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। যা ছিল আবদুল মান্নান সৈয়দের আমৃত্যু ঠিকানা।

তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঢাকা কলেজ থেকে কলা বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন ১৯৬০ সালে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৬৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৪ সালে স্নাতকোত্তর লাভ করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে সিলেটের এম সি কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করেন কর্মজীবন। তিনি অধ্যাপনা করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। ফরিদপুর শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজ, সিলেটের এম সি কলেজে এবং ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ারে। ঢাকার জগন্নাথ কলেজে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করার পর ২০০২ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত মেয়াদের জন্য তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের পদে দায়িত্ব পালন করেন।

সাহিত্য জীবনের প্রস্তুতিপর্ব সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আমার জীবনে লেটো পিরিয়ড আছে। নজরুলের মতো। পিরিয়ডটা হলো আমার ক্লাস সেভেন-এইট থেকে এমএ পাস পর্যন্ত। আমি বিরামহীন লেখালেখি করতাম আর ছবি আঁকতাম। কিন্তু আব্বা আমার লেখা প্রকাশিত হতে দিতেন না। ওই পিরিয়ডে আমি নিজেকে ক্রমে শিক্ষিত ও সংস্কৃত করার চেষ্টা করেছি। আমার কঠোর আব্বা কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন ; চাচাও মেধাবী ছাত্র ; আমাকে পড়ালেখায় বাধ্য করেছেন যেন আমি এমএ পাস করি। এ জন্য ১৯৬৫ সালকে আমি ধরি আমার আত্মপ্রকাশের বছর’।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একমাত্র মেয়ে জিনান সৈয়দের জনক। স্ত্রীর নাম সায়রা সৈয়দ রানু। প্রচণ্ড তোলপাড় করা শক্তি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। বাংলা কবিতায় কবিতায় তিনি যুক্ত করেছিলেন পরাবাস্তববাদী দিগন্ত। তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি ও ব্যঞ্জনা সৃষ্টি তাঁর ভাষাকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী। মহাসমর পরবর্তীকালে দুই বাংলাতেই তাঁর মতো সাহিত্য সমালোচক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে ছিল তাঁর অগাধ ধারণা। সমসাময়িক কালে তাঁর মতো বড় মাপের লেখক দেখা যায় না।

সমালোচনা সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ, সম্পাদনা ছাড়াও বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবিদের নিয়ে লিখেছেন অবিশ্রাম ও নিরলসভাবে। কবি জীবনানন্দ দাশ এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের ওপরও তাঁর রয়েছে গবেষণা। বাংলাদেশের সাহিত্য মহলে ‘মান্নান সৈয়দ’ নামেই পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ‘পোয়েট ইন রেসিডেন্স’। তাঁকে স্কলার-ইন-রেসিডেন্স পদমর্যাদায় নিয়োগ করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগ্রামী জীবনকে গ্রোথিত করে পূর্ণাঙ্গ নজরুল জীবনী রচনার দায়িত্ব দেয়া হয়।

আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বিরলপ্রজ একজন কাব্যসত্তার অধিকারী। সময়, বাস্তবতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাংলা ছোটগল্প রূপ পেয়েছে তাঁর ছোঁয়ায় নতুন দিগদর্শনের। ছোটগল্পের ব্যতিক্রমধর্মী গতি-প্রকৃতি, শৈলী, শক্তিসত্তা যার হাত ধরে পেয়েছে নতুন মাত্রা। তার লেখা ছোটগল্পে বিষয়-বৈচিত্র্য নয়, শুধু প্রকরণ সৃষ্টির আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য যেন বিস্ময়কর। ব্যক্তি মানুষের মানবিক দিক, মধ্যবিত্ত সমাজ জীবনের টানাপড়েন, আশা-আকাক্ষা, সমাজ ও রাজনৈতিক পারিপার্শ্বের সমাজ বাস্তবতা ও সমাজ জীবনের ভাঙাগড়া যার গল্পের নিজস্ব মনোজগৎ সৃষ্টিতে ছিল সদা উজ্জ্বল। বিষয় প্রকরণ, বাস্তব জীবনের বাস্তবতা কি পরাবাস্তব তাঁর রচনায় ইতোমধ্যে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠিতে আসীন হয়েছে। তাই তো তার গল্প সমাজ বাস্তবতার অলক্ষ্যে ছোটগল্পকে প্রতিষ্ঠিত ও সমৃদ্ধ করেছে।

গল্প-উপন্যাসে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রাধ্যন্য পেযেছে। বলা হয়েছে, ‘ষাটের গল্পকারদের মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ সবচেয়ে বেশি প্রাতিস্বিকতা বিলাসী শিল্পী। আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার গল্পভাষ্য নির্মাণে তিনি সিদ্ধহস্ত। বিষয়াংশ এবং প্রকরণের অভিনবত্বে তাঁর গল্পসাহিত্য বিশিষ্টতার দাবিদার।

বিচ্ছিন্নতা ও নির্বেদের যন্ত্রণায় তাঁর বেশির ভাগ নায়ক পীড়িত ও পর্যুদস্ত। প্রতীকী এবং পরাবাস-ববাদী পরিচর্যা আবদুল মান্নান সৈয়দের ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রথম পর্বের গল্পের ভাষারীতিতে আরোপিত আধুনিকতা দ্বিতীয় পর্বে পরিত্যক্ত হয়েছে; ফলে, গল্পস্রোত হয়েছে অনেক বেশি সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ।
তাঁকে বলা হয়েছে সব্যসাচী লেখক। বাংলা সাহিত্যের যে শাখায়ই তিনি চর্চা করেছেন, সাফল্য ও কীর্তি ধরা দিয়েছে অবলীলায়। বলা হয়েছে এদেশে তাঁর মতো পরিশ্রমী লেখক নেই। যেকোনো লেখার মধ্যেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন।

সব্যসাচী লেখক মান্নান সৈয়দ কথাসাহিত্যেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে গেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি হলো সত্যের মতো বদমাস, চল যাই পরোক্ষে এবং মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা। এর মধ্যে সত্যের মতো বদমাশ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। অশ্লীলতার অভিযোগে তৎকালীন সরকার কর্তৃক এ গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হয়। তাঁর বহুল আলোচিত দুটি উপন্যাস হলো ‘পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী’, আর ‘অ-তে অজগর’।

কবি আবিদ আজাদ সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী শিল্পতরু’র উপদেষ্টা সম্পাদক হিসাবে মান্নান সৈয়দ দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় তিনি নবীন-প্রবীণ সব কবি-সাহিত্যিকের রচনা সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। তাঁর সম্পাদনার মাধ্যমে শিল্পতরু আশীর দশকের শেষ ভাগে একটি মর্যাদাবান সাহিত্যপত্রে পরিণত হয়েছিল।
কবিতা বা কথাসাহিত্যের চেয়েও সাহিত্য-সমালোচক হিসেবে অধিকতর খ্যাতিমান আবদুল মান্নান সৈয়দ। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর তিনি সাহিত্য-সমালোচনার ময়দানে নিরলসভাবে কাজ করে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর সমালোচনা নিবিড় গবেষণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমালোচনার জন্য তিনি আবিষ্কার করেছেন একটি নিজস্ব ভাষা যা প্রায়শঃ দুর্জ্ঞেয়- দুরতিক্রম্য।

কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও কবিতায় তাঁর সৃজনশীলতা অসাধারণ। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় প্রচুর কাজ করেও তিনি বলেছিলেন, ‘মাইকেল সম্পর্কে, বঙ্কিমের উপন্যাস সম্পর্কে আমার লেখার ইচ্ছা আছে। ফররুখ আহমেদ একজন বিরাট লেখক। আমার একটা আক্ষেপে, এত বড় কবি জসীমউদ্দীন, তাঁর ওপর আমি কোনো কাজ করিনি। জীবনানন্দকে নিয়ে আমি যে কাজটা করেছি, মানিক বন্দোপাধ্যায়কে নিয়েও সে রকম কাজ করা আমার উচিত ছিল।’

শুদ্ধতম কবি, করতলে মহাদেশ, দশ দিগন্তের দ্রষ্টা প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রবন্ধ ষাটের কাব্য-লক্ষণ গদ্যভাষার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রবন্ধের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি মূলত নন্দন তত্ত্বের বিভিন্ন শাখায় স্বচ্ছন্দ। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর প্রবন্ধে যুক্তি-জ্ঞান-অভিজ্ঞতার চেয়ে কবি-কল্পনাই প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর প্রথম প্রবন্ধ মুদ্রিত হয়েছিল সাম্প্রতিক পত্রিকায়, ১৯৬৩ সালে, শিরোনাম ‘কথাসাহিত্য প্রাসঙ্গিক’।
আবদুল মান্নান সৈয়দ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, নজরুল পুরস্কার, নজরুল পদক, কবি তালিম হোসেন পুরস্কার এবং অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার।

তাঁর আত্মজৈবনিক লেখার মধ্যে বিষাদের সুর পরিলক্ষিত হয়। যে তুলনারহিত সৃজনশক্তির স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন তার মূল্য জীবদ্দশায় যথাযথভাবে স্বীকৃত হয়নি। স্বীয় বিশ্বাসে রাজনৈতিক ঔদার্যের কারণে তাঁকে প্রায়শ রাষ্ট্রীয় উপেক্ষার শিকার হতে হয়েছে।
২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। জীবিত কালে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৫০। উল্লেখযোগ্য হলো- কবিতা : জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, জ্যোৎস্না রৌদ্রের চিকিৎসা, ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ, কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, পরাবাস্তব কবিতা, পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি, মাছ সিরিজ, নির্বাচিত কবিতা এবং আমার সনেট। উপন্যাস : পরিপ্রেক্ষিতের দাস-দাসী, অ-তে অজগর, কলকাতা, ক্ষুধা প্রেম আগুন, পোড়ামাটির কাজ এবং হে সংসার হে লতা। ছোটগল্প : সত্যের মতো বদমাশ, চলো যাই পরোক্ষে, মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা, নেকড়ে হায়েনা এবং তিন পরী।

প্রবন্ধ : বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা, দশ দিগন্তের দ্রষ্টা, নির্বাচিত প্রবন্ধ, করতলে মহাদেশ, আমার বিশ্বাস এবং ছন্দ। স্মৃতিকথা : ভেসেছিলেম ভাঙা ভেলায়। গবেষণা গ্রন্থ : কালান্তরের যাত্রী। জীবনী : নজরুল ইসলাম: কবি ও কবিতা, বেগম রোকেয়া, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, ফররুখ আহমদ, শাহাদাত হোসেন, প্রবোধচন্দ্র সেন এবং আবদুল গনি হাজারী।